হুমায়ূন আহমেদ-এর কালো যাদুকর

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০ | ৯:৩৩ অপরাহ্ণ | 313 বার

হুমায়ূন আহমেদ-এর কালো যাদুকর

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক-এ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ভাষাচিত্র’ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দেশের বই’ যৌথভাবে ভাষাচিত্রের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ ‘ভাষাচিত্র বুক ক্লাব’-এ নিয়মিত বুক রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
আয়োজনের অংশ হিসেবে বাছাইকৃত ও নির্বাচিত বুক রিভিউ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে আমাদের পোর্টালে। আজ প্রকাশিত হলো নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ-এর উপন্যাস ‘কালো যাদুকর’-এর রিভিউ।


রিভিউ করেছেন সকাল কুমার

 


॥ সকাল কুমার ॥

উপন্যাসের নাম লিপিকায় জাদুকর শব্দটি থাকলেও জাদুর কোনাে ছড়াছড়ি নেই। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত এই বইটি ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশ হয়। পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত এই বইটির প্রচ্ছদ করেছিলেন ধ্রুব এষ।
প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষ, খুব সম্ভবত বইটির মূল কাহিনি না জেনে শুধু নামের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছিলেন প্রচ্ছদ। যে কারণে প্রচ্ছদে দেখতে পাই একটি ভয়ানক কালো হাত, আর সেখানে একটি প্লাস্টিকের বল দিয়ে পুতুলের মুখ আঁকার চেষ্টা। খুব সম্ভবত এটাকে তিনি জাদুকরের হাত এবং পুতুল হিসেবে এঁকেছিলেন।

 

অবিশ্বাস্য গল্পের চরিত্র ও দৃশ্যকল্প দিয়ে রচিত উপন্যাসটি অনেকের কাছেই আধাভৌতিক লাগতে পারে সে কারণে লেখক নিজেই ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন এটা তার নিজস্ব বিশ্বাস জগত থেকে লেখা।
উপন্যাসটির শুরু হয় পৌষের এক সন্ধ্যার দৃশ্যকল্প দিয়ে। সেখানে দেখতে পাই নেত্রকোনা শহরের বিউটি বুক সেন্টারের মালিক মবিন উদ্দিন তার বোন রাহেলার বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন। প্রচন্ড শীত থাকার কারণে গায়ে চাপিয়েছেন পুরনো একটা চাদর।
চাদর থেকে বের হওয়া পুরনো ন্যাপথলিন এর গন্ধ তাকে অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয়। তিনি অনেক কিছুর গন্ধ সহ্য করতে পারেন না এটা তার একটা রোগের মতন। গায়ের চাদরের ন্যাপথলিন এর গন্ধে তার মাথা দোলাতে থাকে, কিন্তু তিনি দরিদ্র বলে গায়ের চাদরটি ছুঁড়ে ফেলতে পারেন না।
লেখক এখানে, মবিন উদ্দিনকে তুলে ধরেছেন একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধান কর্তা হিসেবে। যার ছোটো একটি সংসার রয়েছে, নিজে দারিদ্রের সাথে লড়াই করলেও পরিবারের কাউকে তিনি সেসব বুঝতে দেন না। মূল গল্পের ভেতর আরও কিছু গল্প যোগ করে দেওয়াটাই হুমায়ূন আহমেদের একটা কৌশল। তাই তিনি উপন্যাসের চলমান দৃশ্যকল্পে যোগ করলেন অল্পবয়সী এক ম্যাজিশিয়ানকে। আর ম্যাজিশিয়ানই উপন্যাসের পরবর্তী সব অংশই টেনে নিয়ে গেছেন।

মবিন উদ্দিন নেত্রকোনা শহরে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের পথের ম্যাজিক দেখে থাকেন, প্রতিটা ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক-এর শেষে বিভিন্ন রকমের মজা করেন। এই মজা দেখে তিনি বিরক্ত হন। কিন্তু আজকের এই ম্যাজিশিয়ানটির বয়স খুব অল্প এবং তার সম্মোহনী ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। এই ভয়ানক শীতেও পাতলা একটা জামা পড়ে আছে ম্যাজিশিয়ান।
মবিন উদ্দিন ম্যাজিক দেখতে দেখতে একটা সময় লক্ষ্য করলেন তিনি আর ন্যাপথলিনের কড়া গন্ধটা পাচ্ছেন না। তার বদলে ম্যাজিশিয়ানের দেখানো বেলি ফুলের গন্ধ তার নাকে আসছে। বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে তিনি ম্যাজিশিয়ান ছেলেটিকে সাথে করে নিয়ে আসেন। তার ইচ্ছা ছিল ছেলেটিকে চারটে ভাত খাইয়ে দিবেন, কথা প্রসঙ্গে জানতে পারেন ছেলেটির নাম টুনু।

 

উপন্যাসের নতুন আরেকটা অধ্যায় শুরু হয় এখান থেকে। মবিন উদ্দিনের একমাত্র ছেলেটি পাঁচ বছর আগে মারা গিয়েছে। তার নামও ছিল টুনু। ছেলেটিকে নিয়ে তিনি বাড়ি ঢোকেন একটু আতঙ্কিত হয়ে, কিন্তু তার একমাত্র জন্মান্ধ মেয়ে সুপ্তী বিষয়টাকে সামলে নেয়।
উপন্যাসের এই অব্দি এসে লেখক জাদুবাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন। লেখক ক্রমাগত বর্ণনাশৈলির মাধ্যমে দৃশ্যকল্প রচনা করে টুনু চরিত্রটিকে রহস্যময় করে তুলেছেন। মবিন উদ্দিনের স্ত্রী ম্যাজিশিয়ান ছেলেটিকে প্রথমে রাখতে চায়নি, অথচ লেখকের কল্পিত গল্পকথায় চিত্রিত হয় মাসের পর মাস ম্যাজিশিয়ানের এ বাড়িতে থেকে যাওয়া।
সুপ্তীর হারানো ভাইটির ভালো নাম ছিল বাবলু, কালো ম্যাজিশিয়ান ক্রমাগত তার চেহারার ঝলকানিতে বেরিয়ে আসে নতুন রূপে, কাহিনির ধারাবর্ণনায় সে হয়ে ওঠে মবিন উদ্দিনের হারানো ছেলে বাবলু।

উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো মবিন উদ্দিনের মেয়ে সুপ্তী। কালো জাদুকরকে তার নিজের ভাই বলে ভ্রম হয়, ম্যাজিক ভাইয়ের কাছ থেকে সে অনেক ম্যাজিক শিখে নেয়। স্কুলে গিয়ে সবাইকে তা দেখায়, কিন্তু সে যখন চোখ বন্ধ করে তখন পৃথিবী যেন অন্ধকার হয়ে আসে, তার সাথে উড়াউড়ি করতে থাকে ভ্রম, আর সেই ভ্রম নিয়ে ক্রমশই প্রকাশ পেতে থাকে তার উচ্ছ্বলতা।

লেখক উপন্যাসের বেশকিছু অংশ জুড়ে এমন সব সরল কল্পচিত্র তৈরি করেছেন, যে কারণে বিরক্তিকর শব্দটার বিলুপ্তি ঘটেছে এখানে। উপন্যাসের জাদুবাস্তবতার তরঙ্গে দেখতে পাই- কালো জাদুকর মানুষের মনের কথা আগে-ভাগে জেনে যায়, নিজেকে সে বৃক্ষ বলে দাবি করে। তার অমূলক দাবি নিয়ে ক্রমাগত মধ্যবিত্ত পুরুষ মবিন উদ্দিন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং একটা সময় সে নিজেও অন্যের মনের কথা আন্দাজ করতে পারে, বৃক্ষমানব ম্যাজিশিয়ানের কল্যাণে।

উপন্যাসের শেষ অংশে দেখা যায়, মবিন উদ্দিন দেনার দায়ে তার একমাত্র সম্বল দোকান বিক্রি করে রেল স্টেশনে বসে আছেন। পরবর্তী সময়ে সংসার কীভাবে চালাবেন সে তাড়নায় ভাবতে থাকেন নিজের বাড়িটা বিক্রি করে দেবেন। আর ওদিকে আশ্চর্যের মতন কালো জাদুকর মবিন উদ্দিনের মনের সমস্ত কথা জেনে যায়।

 

ম্যাজিশিয়ান বলে, সে মানুষ নয়, বৃক্ষমানব। কিন্তু মানুষ থেকে কীভাবে বৃক্ষ হয়েছিল, সে গল্প কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না মবিন সাহেব। লেখক এখানে মনস্তাত্ত্বিক যে চরিত্রটি রচনা করেছেন, সেটা একটু বেশি আরোপিত হয়ে গেছে, তার বদলে সুপ্তীর চরিত্রকে আরেকটু বিস্তৃত করতে পারতেন।
উপন্যাসের শেষ মুহূর্তের আগে, লেখক নতুন এক দৃশ্যের অবতারণা করেন, যেখানে দেখা যায় কালো জাদুকর যেরকম চেহারা ও গন্ধ নিয়ে এসেছিল, অবিকল সেরকম ভাব নিয়ে চলে যায়। রেখে যায় নিজের না বলা অসমাপ্ত গল্পটা।
টগর নামে নতুন একটি অধ্যায় এখানে উল্লেখ করেছেন লেখক, যেখানে আরও একটি গল্পের সন্ধান পাই আমরা। কীভাবে অন্ধবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে একজন টগর হয়ে ওঠে কালো জাদুকর! তবে সে টগর অসমাপ্ত এক বৃক্ষ।
তার অসমাপ্ত গল্পটা শেষ হয়, অন্ধ হিসেবে জন্ম নেয়া মবিন উদ্দিনের একমাত্র মেয়ে সুপ্তীর স্বপ্ন দেখতে দেখতে জেগে ওঠে নিজেকে একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করার মাধ্যমে।
এখানে হয়তো উপন্যাসটা শেষ হতে পারতো, কিন্তু লেখক আরও একটু পরিশিষ্ট যোগ করে রচনা করেছেন সুপ্তীর আরও একটা নতুন ভূবন, যে অংশটা না হলেও চলতো। অনেক সময় যে শুধু একটি পৃষ্ঠা বাড়ানোর জন্যও লেখককে দিয়ে প্রকাশকরা লিখিয়ে নেন, সেটাও যেন অল্প একটু দৃশ্যমান এই উপন্যাসে।

পরিশেষে বলবো, নিরাশ না হওয়ার মতন একটি উপন্যাস, যদিও পাঠে আনন্দভ্রম হয় কিন্তু ভাবনা থেকে যাবে অনেকদিন। বইয়ের অঙ্গসজ্জা মধ্যম মানের। বাঁধাই বেশ ভালো। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে, শাহরুখ আদনান খানকে। ৯৬ পৃষ্ঠার বইটির মূদ্রিত মূল্য রাখা হয়েছে ৬০ টাকা মাত্র।

[২৩ মে ২০২০]


বইয়ের নাম : কালো যাদুকর
লেখক : হুমায়ূন আহমেদ
প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৮
ধরন : উপন্যাস
প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশন্স
মুদ্রিত মূল্য : ৬০ টাকা

 


প্রিয় লেখক-পাঠক-প্রকাশক

আপনার ভালোলাগা যে কোনো বইয়ের রিভিউ পাঠাতে পারেন আমাদের। বইয়ের একটি ভালো ছবিসহ আপনার লেখা ইমেইল করুন এই ঠিকানায় : desherboi@gmail.com

Facebook Comments