হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কয়েকটি মজার স্মৃতি

শুক্রবার, ০৪ মে ২০১৮ | ৩:৫৮ পূর্বাহ্ণ | 648 বার

হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কয়েকটি মজার স্মৃতি

সদ্যপ্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদ আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন। একাধিক কারণেই তার সঙ্গে আমার খুব ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাছাড়া আমরা ছিলাম একই বৃত্তের মধ্যে। তখন তো বিশ্ববিদ্যালয়টা এত বড় ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাউঞ্জে বা ক্লাবে দেখা হয়ে যেত আমাদের। মাঝে কিছুদিন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচ-ডি করতে গিয়েছিলেন। এরপর সত্তর দশকের শেষ বা আশির দশকের শুরু থেকে ভালো যোগাযোগ ছিল আমাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট ঘরানার শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হত। মতের আদান-প্রদান ছিল।

হুমায়ূন একটু চুপচাপ এবং লাজুক ধরনের ছেলে। তবে রসবোধে অনন্য। আমি তার চেয়ে কমপক্ষে বারো বছরের বড়। বয়সের এই পার্থক্য সত্ত্বেও তার সঙ্গে আমার একটা প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হুমায়ূন তার লেখা একটা বই আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন। আমিও আমার একটি বই তার নামে উৎসর্গ করেছিলাম। মাঝে মাঝেই আসতেন আমাদের বাসায়। তার অনেক বই নিজে বাসায় এসে দিয়ে গেছেন আমাকে।

মজার বিষয় হল, ওই সময়টাতে হুমায়ূন আজাদ আর হুমায়ূন আহমেদ পরস্পরের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। খুব সম্ভব আজাদই প্রথম আমার কাছে হুমায়ূনকে নিয়ে এসেছিলেন। ওকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই দুজন তখন প্রায় সারাদিন একসঙ্গেই কাটাতেন। বয়সেও কাছাকাছি। আজাদ হুমায়ূনের চেয়ে বছরখানেকের বড়। আমার বাসায়ও যখন যেতেন, প্রায়ই দুজন একসঙ্গে থাকতেন। তো, হুমায়ূন আহমেদের ওই সময়কার কিছু মজার স্মৃতি আমার খুব মনে পড়ে। গল্পগুলো শুনলে পাঠক হুমায়ূনের রসবোধ আর প্রকৃতি-প্রেম সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা পাবেন।

সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি তখন। হুমায়ূন শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। নিয়মমতো হল-প্রভোস্টের সঙ্গে আবেদনকারীর একটি সাক্ষাৎকার দিতে হয়। হুমায়ূন সেখানে গেলেন। সঙ্গে ছিলেন আরেক হুমায়ূন, মানে হুমায়ূন আজাদ। কোথায় কী করতে হবে এ সব ব্যাপারে তাকে তখন আজাদই সাহায্য করছিলেন। এই সাক্ষাৎকার-পর্ব শেষে আজাদ হুমায়ূনকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আমার বাসায় এলেন। কী ব্যাপার?

ব্যাখ্যা দিলেন আজাদ। প্রভোস্ট হুমায়ূনকে অনেক প্রশ্ন করেছেন। অনেক কিছু বলেছেন। হুমায়ূন কিছু বলেননি। শেষে প্রভোস্ট তার বক্তব্য শুনতে চাইলে হুমায়ূন অম্লান বদনে বলে দিলেন, ‘আপনাকে আমার এখন পেটাতে ইচ্ছা করছে।’ প্রভোস্টের অবস্থা তো বুঝতেই পারছেন। আজাদ তখন হুমায়ূনকে কোনও রকমে টেনেটুনে নিয়ে এলেন আমার বাসায়। আজাদ যখন ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন, হুমায়ূন তখন মাথা নিচু করে পাশে বসে আছেন। তার মানে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে তিনি ‘অপরাধী।’

এত কিছুর পরও কিন্তু হাউস টিউটরের চাকরিটা হুমায়ূন পেয়ে গেলেন!

তারপরের আরেকটা মজার ঘটনার কথা বলছি। আমি জানতাম, হুমায়ূন ততদিনে একটা গাড়ি কিনেছেন। এরপর একদিন শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট হুমায়ূনকে নিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করলেন আমার কাছে। বললেন, ‘আপনাদের মতো লেখকদের নিয়ে তো আর পারা যায় না।’ কেন, কী হল? তিনি এক বৃষ্টিদিনের বিবরণ দিলেন আমার কাছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টি হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের গাড়িটা তখন শহীদুল্লাহ হলের মাঠে। বৃষ্টিতে ভিজছে। অর্ধেক প্রায় ডুবে গেছে। ছাত্ররা খবর দেওয়ার পর প্রভোস্ট হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে গেলেন হুমায়ূনের রুমে। হুমায়ূনকে বিষয়টা বলতেই তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তো এটা আমার রুম থেকেই দেখতে পাচ্ছি। সুন্দর একটা দৃশ্য। আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে গাড়িটা। একসময় পুরোটা ডুবে যাবে।’ ‘দেখুন কেমন পাগলামি….’ আমাকে বললেন প্রভোস্ট।

এই হচ্ছেন গিয়ে হুমায়ূন। বৈষয়িক চিন্তা থাকলে এ সব পাগলামি তার মধ্যে জায়গা পেত না।

বাংলাদেশ লেখক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ১৯৮৮ সালে এক মাসের জন্য আমরা চীন ও উত্তর কোরিয়াতে শুভেচ্ছা সফরে গিয়েছিলাম। হুমায়ূন ছিলেন আমাদের দলে। তখন দেখলাম হুমায়ূন চীন সম্পর্কে প্রচুর বই পড়ে নিলেন। একটা ভালো ধারণা নেয়ার চেষ্টা করলেন। এটাও তার একটা বড় গুণ। যে কোনও বিষয়ে ভালোভাবে জেনে নেওয়া বা এ জন্য বই পড়া। অপ্রস্তুত অবস্থায় তিনি কোথাও যেতে চাইতেন না।

মজা হল চীনে গিয়ে। একটা পার্কের মধ্যে আমরা দলবেঁধে ঘুরছিলাম। হুমায়ূন হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘চীন নিয়ে এত বই পড়লাম। এখানে যে একটা বোঁটকা গন্ধ আছে এ কথা তো কোনো বইতে পেলাম না।’ সবাই ওর কথায় দারুণ মজা পেল।

চীন থেকে ফেরার সময় থাইল্যান্ড হয়ে আসছিলাম আমরা। ওখানে বিমান থামার পর সবাই বেশ কেনাকাটা করেছিলাম। দেখলাম, হুমায়ূন তেমন কিছু কিনলেন না। শুধু তার তিন মেয়ের জন্য জামাকাপড় কিনলেন। দেশে ফেরার পর সে জামা মেয়েদের পরিয়ে নিয়ে আমাদের বাসায় বেড়াতে এলেন। আমরা থাকতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে। তখন আমার স্ত্রী জীবিত ছিলেন। তিনি তাদের আপ্যায়ন করলেন। হুমায়ূনের এই অপত্য স্নেহ খুব উপভোগ করেছিলাম আমরা।

এর বছর দুয়েক পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচন হল। নির্বাচনে আমরা এস্টাব্লিশমেন্ট-বিরোধী শিক্ষকরা অংশ নিয়েছিলাম। হুমায়ূন আমাদের দলের একজন প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন তিনি। মূলত দুটো কারণে। শিক্ষকদের মধ্যে তার পরিচিতি তেমন ছিল না। দ্বিতীয় কারণ তার লাজুকতা। যারা তাকে চিনতেন, তার লেখারও ভক্ত ছিলেন, তাদের সঙ্গেও তিনি ওভাবে কথা বলতে পারেননি। হয়তো তারা তার প্রশংসা করে কথা বলছেন, হুমায়ূন কিছুই বললেন না- ওরা ধরে নিলেন তিনি অহঙ্কারী। আসলে হুমায়ূন মোটেই অহঙ্কারী ছিলেন না। তার চুপচাপ স্বভাবটার জন্য অনেকেই তাকে ভুল বুঝতেন।

আশির দশকের শেষদিকে হুমায়ূন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে পরিপূর্ণভাবে লেখালেখি ও নাটকের জগতে মন দিতে চাইলেন। তবু আমাদের মধ্যে যোগাযোগ একেবারে কমে যায়নি। নব্বই দশকে তিনি বানালেন প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি।’ আমাকে প্রিমিয়ারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গেলাম সেখানে। অনেক বছর পর তার আমন্ত্রণেই আবার তার আরেকটি চলচ্চিত্র ‘আমার আছে জল’ দেখতে গিয়েছিলাম। এভাবে আমাদের বিচরণের ক্ষেত্র আলাদা হয়ে গেলেও মাঝে মাঝে ভালোই যোগাযোগ হত।

হুমায়ূন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর চলে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। দু’মাস আগে যখন বাংলাদেশে এলেন, কেন যেন ওকে নিয়ে একটু ভয় কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল ওর সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা কে জানে। ওর ধানমণ্ডির বাসা ‘দখিনা হাওয়া’য় গেলাম। অনেক দর্শনার্থী আসছেন ওকে দেখতে। তাই বেশিক্ষণ বসলাম না। ওর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিলাম। সেদিন ওর মা-ও ছিলেন বাসায়। মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন সেই চিরাচরিত রসবোধের সঙ্গে। মাকে বলছিলেন, ‘মা, উনি অনেক বই লিখেছেন তবে তুমি উনার বই পড়লে কিচ্ছু বুঝতে পারবা না।’

আমাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যান্সার-রোগী আর বাংলাদেশি রোগীদের মধ্যেকার একটা পার্থক্যের কথাও বললেন। মার্কিনীরা কেমন একা একাই কেমো-টেমো নিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে আসে, আর আমরা এশীয়রা দলবেঁধে হাসপাতালে যাই, এক রোগীর পাশে একগাদা আত্মীয়-স্বজন থাকে– এসব বলে হুমায়ূন নিজের মতটাও দিলেন, ‘আমার এটাই ভাল্লাগে, আমাদের এশীয়দের এই বিষয়টা।’ সেদিন তিনি আমার স্বাস্থ্যের ব্যাপারেও খোঁজখবর নিলেন। বল্লেন, ‘স্যার, আপনি ভালো আছেন তো?’

এখনও কানে বাজে তার কথাটা। বাংলা সাহিত্য-নাটক-চলচ্চিত্রের জগতে সত্যিকারের একজন নায়কের মতোই ছিলেন তিনি। আর আমাদের কাছে ছিলেন এক আপনজন।

Facebook Comments