হাসান তারেক চৌধুরীর প্যারাসাইকোলজি বিষয়ক বই ‘দ্বিখন্ডিত’

সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১ | ১২:১৮ অপরাহ্ণ | 245 বার

হাসান তারেক চৌধুরীর প্যারাসাইকোলজি বিষয়ক বই ‘দ্বিখন্ডিত’

বইয়ের নাম: দ্বিখন্ডিত
লেখক: হাসান তারেক চৌধুরী
ধরণ: প্যারাসাইকোলজি /প্যারানর্মাল সাইকোলজি
প্রচ্ছদ: খন্দকার সোহেল
প্রকাশক: ভাষাচিত্র
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০

‘যন্ত্রনার নীল পঙতিরা আজ
ভেসে বেড়ায় অবাধ,
অবলা এক আধাঁরের কোণে।
নিঃশব্দে, বেদনায় তার মহাপ্রয়াণ,
আগুনে সঁপেছি প্রাণ আমি,
আজ আগুনে সঁপেছি প্রাণ।’

পংক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে সহজেই ঘটনার আকস্মিকতা, অস্থিরতা ও অনিশ্চিত কোন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত পাই। লেখক হাসান তারেক চৌধুরী উক্ত পংক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে তার ‘দ্বিখন্ডিত’ নামক স্পেকুলেটিভ ফিকশনের মূল বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। সাইন্স ফিকশনের অন্যতম অভিজাত ঘরানা ‘স্পেকুলেটিভ ফিকশন’ যেখানে বর্তমানের সত্যিকারের তত্ত্ব বা আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করেই এমন কিছু ‘ভবিষ্যতিক’ চিত্র আঁকা হয় যা বাস্তব হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
তিনটি গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে এই গ্রন্থটি যার প্রতিটির মধ্যে মানবিক আত্মচেতনা, চেতন ও অবচেতন মনের দ্বন্দ্ব, বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার মিশেল এবং চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক জগতের সার্বিক রূপটি ফুটে উঠেছে।
‘জাতিস্মর’ চলচ্চিত্রে দেখি এন্টনি ফিরিঙ্গির ও বর্তমানের একটি চরিত্রের অতীত ও বর্তমানে একইসঙ্গে পরিভ্রমণ। দ্বিখন্ডিত গ্রন্থটিতে প্রথম গল্প আবর্তনের মুখ্য চরিত্র আবীরের মধ্যেও অতীত ও বর্তমানের দোলাচল অনুভব করতে পারি। এ যেন এক অন্যরকম জগৎ যেখানে বর্তমান , অতীত ও ভবিষ্যৎ সব একই সরলরেখায় দাঁড়িয়ে আছে।
তিনটি গল্পের প্রতিটি গল্পেই দেখি বিচ্ছিন্নতাবাদ ও স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যাবার প্রচেষ্টা। এ যেন নিজের থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা। এক সত্তার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বার অবস্থান। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন গল্পে মানবিক বেদনা, মানবিক পৈশাচিকতার ঝলক, আবার সম্পর্কের উচ্ছ্বাস আকর্ষণীয় ভাবে ফুটে উঠেছে। প্রতিটি কেন্দ্রীয় চরিত্র পুরুষ যারা একটা আত্মিক নিরাপত্তাহীনতা এবং একাকিত্বের শিকার। সেখানে কুসংস্কার আছে, আছে অন্ধ প্রেম ও বন্ধুত্বের অটুট বন্ধন। কিন্তু এত কিছুর পরেও বিশ্বাসের মধ্যে অবিশ্বাসের দোলাচল মনকে যেন আবিষ্ট করে আছে। শেষ গল্প দ্বিখন্ডিততে দেখি দীপন যেনতার নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া করতে চাচ্ছে। স্ত্রীর অসততা ও গোপনীয়তা তাকে এতটাই উন্মাদ করে দেয় যে এক পর্যায়ে স্ত্রীকে সে নিজের অবচেতনেই খুন করতে উদ্যত হয়। স্ত্রী নীলা যখন তার কাছে সব স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে সেই মানুষটিই আবার স্ত্রীকে পরম আবেগে বুকে টেনে নেয়। অনিশ্চয়তা শেষে যখন সুখী জীবনের হাতছানি তখন উদভ্রান্ত দীপনের কন্ঠে লেখক আবারো আশ্বাসবাণী শোনান-
“তারপর ধীরে ধীরে
ভোর হবে দিগন্তের একধারে
কালমেঘগুলো ভেসে যাবে বহুদূরে
দূর ঐ আকাশের ঠিক ওপারে
কথা হবে, ভালোবাসা হবে
রাত শেষের নিঃশব্দ আঁধারে।
আর সেই আধাঁরের বোবা স্পর্শ
নাড়িয়ে দেবে সম্পূর্ণ আমাকে।
আমি চোখ মেলে তাকাব
ছুঁয়ে দেখবো নতুন তোমাকে।”
লেখক গল্প গুলোর মধ্য দিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেন কেন এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব? একাকীত্ব ?অপরাধবোধ? স্বেচ্ছা নির্বাসন? এটাকি আধুনিক মানুষের হৃদয়েরই প্রতিচিত্র? নানা প্রশ্ন গল্পকার উত্থাপন করেছেন। সমন্বয়কারী চরিত্র ড.মাহমুদার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যাখ্যাতীত ঘটনারই সুন্দর বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্যারাসাইকোলজির ব্যাখ্যা:
প্যারাসাইকোলজির আরেক নাম ‘সাইকো ফেনোমেনা’ বা ‘প্যারানরমাল সাইকোলজি’। সম্পূর্ণ যুক্তিহীন ব্যাখ্যাতীত ঘটনা প্যারাসাইকোলজির বিষয়বস্তু। যে সকল বিষয় অতীতে ব্যাখ্যা করা যেত না যেমন হিপনোটিজম, সাইটোকাইনেসিস, টেলিপ্যাথি, রিমোট ভিউইং, মাইন্ড রিডিং, অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি বা ইএসপি, মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, সিক্সথ সেন্স ইত্যাদি সকলই এর অন্তর্ভুক্ত।
‘দ্বিখন্ডিত’গ্রন্থ দেখি মানুষের মনের বিচিত্র গতিপ্রকৃতি, চিন্তার রহস্যময়তায় মস্তিষ্কে অসাধারণ ক্ষমতা হ্যালুসিনেশন, টেলিপ্যাথি, টেলেকাইনেসিস এর মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রতিটি অদ্ভুতুড়ে ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুখ্য চরিত্র ও সমন্বয়কারী ড. মাহমুদা হোসেন। ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব দ্বারাও এর ব্যাখ্যা করা যায়। তবে তা চেতন বা অবচেতন মনের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ‌।
শেষ গল্প দ্বিখণ্ডিততে ড. মাহমুদার বক্তব্যে আমরা পাই-“দীপনের ডান হাত যা কিনা তার যৌক্তিক লেফট ব্রেইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, যখন আপনাকে ভালোবেসে আদর করে কাছে টানছিল, ঠিক তখন তার রাইট ব্রেইন দীপনের অজান্তে বিদ্রোহ করে বসে। তাই তার সম্পূর্ণ অগোচরে তার বাঁ হাত আপনার গলা টিপে ধরে প্রচন্ড ঘৃনা আর আক্রোশে।”
একইভাবে তিনি এএসপি জাওয়াদকে দীপনের আত্মহত্যা প্রচেষ্টার সম্পর্কে বলতে যেয়ে জানান-“নীলার প্রতি গভীর ভালোবাসা, তাকে গলাটিপে হত্যা চেষ্টার অপবাদ, হাজতের গ্লানি ইত্যাদি সব মিলে নিজের গলা টিপে আত্মহত্যার এক প্রবল ইচ্ছা হয়তো তার মধ্যে জেগেছিল তারই প্রতিফলন ঘটেছে ওই দাগগুলোতে আর তার অসুস্থ হয়ে পরার মধ্যে।”
একইসাথে ড. মাহমুদা দর্শকের ও ইন্সপেক্টর জাওয়াদের কৌতুহল নিবৃত করেন ও প্রচণ্ড দক্ষতার সঙ্গে ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

প্রচ্ছদ ও নামকরণ:
‘দ্বিখন্ডিত’ প্যারাসাইকোলজিটি তিনটি গল্পে সাজানো হয়েছে যা হচ্ছে- ‘আবর্তন’, ‘ইনফার্নো’, ও ‘দ্বিখন্ডিত’। দ্বিখন্ডিত শব্দটি ইংলিশে bifurcated/bisected/bifid যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘দুই ভাগে বিভক্ত’। চেতন ও অবচেতন, বাস্তুব কিংবা পরাবাস্তব সবই দুইটি ভাগে বিভক্ত।আবার আমাদের মস্তিষ্কের লেফট হেমিস্ফিয়ার রাইট হেমিস্ফিয়ার দুটি ভিন্ন কাজের জন্য নিযুক্ত। একটি লজিস্টিক সাপোর্ট দেয় ও অন্যটি হোলিস্টিক যা আর্টিস্টিক অনুভূতি, ইমোশনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সর্বত্রই এই দ্বিধাবিভক্তি এ কারণেই গ্রন্থটির নামকরন মনে করি সার্থক হয়েছে।
প্রথম গল্প ‘আবর্তন’ এর অর্থ ঘূর্ণন। গল্পটিতে প্রধান চরিত্র আবীর তার সাময়িক স্মৃতিভ্রংশ্ট হবার সমস্যা নিরসনার্থে অ্যাম্ফিটামিনের অতিরিক্ত ডোজ নিয়ে ফেলে।যার ফলে সে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে খেই হারিয়ে এমন এক জায়গায় চলে আসে যেখানে বারবার তার মাথায় একই জিনিস ঘূর্ণিপাকের মত ঘুরতে থাকে। এ যেন জীবনের এক অনবরত ঘূর্ণন। দ্বিতীয় গল্প ‘ইনফার্নো ‘যার অর্থ ‘প্রজ্জ্বলিত শিখা’। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাহেরের স্ত্রী শিখা যার শেষ ইচ্ছাকে বাঁচিয়ে রাখতে তৈরি হয় গৃহটি পাহাড়ের ঠিক সেই স্থান যেখানে স্ত্রী শিখা মৃত্যুবরণ করেছিল, আর নাম দেয়া হয় ইনফার্নো। আর এখানেই সাহের তার কল্পনার জগতে সৃষ্টি করে তার নিজস্ব শিখাকে। তৃতীয় গল্পের নাম ‘দ্বিখণ্ডিত’ যার অনুসরনেই গ্রন্থটির নাম দ্বিখণ্ডিত।আসলে মানুষের জীবন এবং তার কর্মকাণ্ড, তার চারিত্রিক রূপ ও পারিপার্শ্বিকতা সকলি দ্বিধাবিভক্ত। তাই গ্রন্থের নামকরণ যেন জীবনের এই দ্বিমুখী রূপকেই তুলে ধরে।
প্রচ্ছদেও আমরা দেখি দুটো মুখ পাশাপাশি সম্ভবত ব্রেইনের রাইট এবং লেফট হেমিস্ফিয়ারকে আবার অন্যদিকে জীবনের দ্বিমুখী সত্তাকে নির্দেশ করছে।

কাহিনী সংক্ষেপ:
তিনটি গল্পের মধ্যে তিনটি ভিন্ন প্রসঙ্গ থাকলেও ঘটনাগুলো সমন্বিত হয়েছে ড. মাহমুদা হোসেনের মাধ্যমে যিনি একজন বিখ্যাত নিউরো-সাইন্টিস্ট । তার জীবনেরও আছে ভিন্ন গল্প। প্রথম গল্প আবর্তনের মুখ্য চরিত্র আবীর এক সময় ড. মাহমুদার ঘনিষ্ঠ ছিল। এই মাহমুদার কাছে একসময় সে যায় যখন তার মেমোরি লস হতে থাকে। ড. মাহমুদার পরামর্শে আবীর অ্যাম্ফিটামিনের ডোজ নিতে শুরু করে। কিন্তু এতে কোনো কাজ হয় না। ফলে ড. মাহমুদার চেম্বার থেকে চুরি করে সে অ্যাম্ফিটামিনের অতিরিক্ত ডোজ নিয়ে ফেলে। যার ফলশ্রুতিতে তার সামনে ঘুরতে থাকে তার ফেলে আসা অতীত দিনের ঘটনা। তার মার মৃত্যু, ছোটবোনের পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ও বোনের বান্ধবীর সাথে অজান্তে করা একটি অপরাধ তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে।বর্তমান ও অতীতের সব ভেদাভেদ তার কাছে বিলুপ্ত হয়ে যায়।সে বুঝতে পারে তার কাছে এটাই বর্তমান। ধীরে ধীরে চৈতন্য হারিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আবীর।
দ্বিতীয় গল্প ‘ইনফার্নো’ যেখানে দেখি সাহের নামক মানুষটি তার স্ত্রী শিখাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। একটি মর্মান্তিক এক্সিডেন্টে স্ত্রী শিখাকে হারালে দীর্ঘদিন সে নিজের মধ্যেই বসবাস করে। স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণ করতে সেই পাহাড়ি অঞ্চলে তৈরি করে তার স্বপ্নের ইনফার্নো। ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্কের প্রবল ক্ষমতা দিয়ে টেলিকাইনেসিসের মাধ্যমে শিখার একটি ইমেজ তৈরি করে ফেলে সাহের। এটা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে একটা সময় সকলেই মৃত শিখাকে ধীরে ধীরে একটি অবয়বে রূপ নিতে দেখে।ছোটবেলার বন্ধু রাহাত তাকে বুঝাতে চাইলে সাহের বলে “প্রতিদিনের রিয়্যালিটি কি আসলেই রিয়েল? কিন্তু আজ এখানে এই মুহূর্তে, আর আমার সামনের অজানা ভবিষ্যতে এই শিখাই আমার একমাত্র রিয়্যালিটি।”ঘটনার আকস্মিকতায় যখন সবাই বিপর্যস্ত তখন সাহের তারই সৃজিত শিখাকে নিয়ে দূরে কোন নির্জন প্রান্তরে নিজেদের সংসার সাজায়। সেখানে সে নিজেকে নিজেই যেন বোঝায়- “আর না,এই বেশ আছি।”
তৃতীয় গল্প ‘দ্বিখন্ডিত’ যেখানে দেখি দীপন নামক রোমান্টিক ধাঁচের এবং একটু অদ্ভুত স্বভাবের একটি মানুষ তার স্ত্রী নীলাকে প্রচন্ড ভালোবাসে।কোন এক বর্ষা মুখর দিনে স্ত্রীকে কাছে টানতে গিয়ে তাকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজেরই অবচেতন মনে স্ত্রীর গলা টিপে ধরে।সেখান থেকেই কাহিনীর সূত্রপাত‌।এরপর দীপনের হাজতে যাওয়া, নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া এবং তার উদ্ভ্রান্ত আচরণ শেষে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা। স্ত্রী নীলাও দীপনকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কাহিনীতে নতুন দিক উন্মোচিত হয় যখন কেসটি ওসি রহমান এর হাত থেকে প্রখর ও তীক্ষ্ণ এএসপি জাওয়াদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। জাওয়াদ কেসটি নিয়ে ড. মাহমুদার সঙ্গে আলাপ করলে ড. মাহমুদা বিষয়টির সমাধান করেন। স্ত্রী নীলার সাময়িক পদস্খলন দীপনের হৃদয়ে এক চরম আক্রোশ ভরে দিয়েছিল। সেই আক্রোশই পরবর্তীতে ঘৃণার জন্ম দেয়। নীলা যখন স্বামীকে সব খুলে বলে তখন দীপন আবারো তাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়। ঘটনাগুলির যৌক্তিক ব্যাখ্যা উঠে আসে ড. মাহমুদার প্রচেষ্টায়।তবে চরিত্রগুলো প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির শিকার এবং এই পরিস্থিতিই তাদেরকে ধীরে ধীরে উদভ্রান্তির পথে নিয়ে যায়।

চরিত্র বিশ্লেষণ:
প্রতিটি ঘটনা যদি পর্যালোচনা করে দেখা যায় অতীত-বর্তমান সেখানে এক হয়ে গেছে। প্রতিটি চরিত্রের হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। হাইপার একটিভ ব্রেনে মস্তিষ্ক রেক্রিয়েট করছে নিজস্ব কিছু ইমেজ।প্রেমের ঘনিষ্ঠতা ও আশ্বাস আছে সেখানে আরো আছে কুসংস্কার। তবে সব কিছুই ঘটেছে স্বল্প চরিত্রের সমন্বয়ে বাস্তব ও পরাবাস্তবের মধ্যে সৃজিত এক ব্যাখ্যাতীত ভুবনে। ‘আবর্তন’ গল্পের আবীর যখন ওষুধের অতিরিক্ত ডোজ নিয়ে ফেলে তখন তার চোখ, মুখ উদ্ভ্রান্ত ও দিশেহারা। জীবন থেকে হারিয়ে যায় তার বর্তমানের স্মৃতি‌। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতীতের কিছু বিচ্ছিন্ন ইমেজ।’ইনফার্নো’ গল্পের সাহেরকে দেখি স্ত্রীর মৃত্যুতে একাকীত্ব ও নির্বাসনের জগতে ডুবে থাকতে। আবার সেই সাহেরই পৃথিবীর সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে কাল্পনিক মনোরমাকে নিয়ে চলে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। আমাদের সকলের মনেই নিজের কাঙ্খিত জনকে নিয়ে নিজের ছোট্ট একটি ভুবন তৈরির স্বপ্ন থাকে। এ যেন সেই স্বপ্নেরই প্রতিফলন।’দ্বিখন্ডিত’ গল্পে দীপনকেও দেখি তার ভালোবাসার মানুষটিকে হত্যার চেষ্টার ফলে ভিতরে ভিতরে কুঁকড়ে যেতে। লেখক এক জায়গায় বর্ণনা দিয়েছেন-“জেলের এক
কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে দীপন। ছটফট করছে সে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দুঃস্বপ্ন দেখছে সে।”
বিধ্বস্ত দীপনের চোখেও বিভ্রান্তি ও বেদনা একইসঙ্গে ঔদাসীন্যের ছাপ।আবীর, সাহের,দীপন প্রতিটি মুখ্য চরিত্রই তাদের কর্মকান্ডে কখনও অনুতপ্ত আবার কখনো উদ্ভ্রান্ত যেনবা কিছু খুঁজছে। কি তা তাদেরও অজানা। বিষয়টিকে ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব দ্বারা বিশ্লেষণ করা যায়। মানবিক মনকে ফ্রয়েড চেতন-অবচেতন এর মধ্যে দোলাচল হিসেবে দেখেছেন। সেখানে অবচেতন মনই মুখ্য কেননা খুবই গোপনে তা সত্য অনুসন্ধান করে। আর সে সত্য বড্ড বেশি যাতনার, ভয়ঙ্কর ও বীভৎস। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তাই প্রতিটি চরিত্রের গভীরে যেয়ে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
আবীরের শৈশব কেটেছে নিঃসঙ্গ মা-বাবা ও বোনের মৃত্যু যন্ত্রণায় এবং যৌবনে প্রেয়সীর বিচ্ছেদ যাতনায়। বিচ্ছিন্ন হওয়া সঙ্গী মাহমুদা যাকে পরবর্তীতে একাধিকবার জিজ্ঞেস করলেও তার চলে যাওয়ার কারণটি ব্যাখ্যা করেনি আবীরের কাছে। লেখক এখানে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে মাধবীলতা ওরফে ড. মাহমুদা বিয়ের আগের দিন রাত্রে জেনেছিলেন আবীর তাকে নিয়ে দ্বিধান্বিত, দায়িত্ব নিতে ভয় পাচ্ছে সে।তাই মাধবীলতা তাকে ছেড়ে জার্মানে চলে যান। এরপর কখনও আর বিয়ে করেননি। কিন্তু কেন? এতটা সাকসেসফুল, সুন্দরী একজন নারী কি তাহলে তার অতীতের সে কষ্টটাকে ভুলতে পারেননি? প্রশ্নটা থেকেই যায়। তবে এসকল ঘটনার ফলশ্রুতিতে আবীরের এক রকম বিভ্রান্তি ও স্মৃতিভ্রংশের ঘটনা ঘটতে থাকে। হারাতে থাকে তার স্মৃতি।উঠতি যৌবনে ছোট বোনের বান্ধবী যাকে সে প্রচন্ড ভালোবাসতো ছোট বোন হিসেবেই তার বুকে হাত দেওয়ার ঘটনা বোনটির চোখে পানি নিয়ে এসেছিল। সেই অপরাধবোধ, সে কান্না মিশ্রিত চোখ আবীরের মনের কোন এক সুপ্ত কোনায় গেঁথে ছিল। সেগুলোরই ফ্লাশব্যাক তার বর্তমানের স্মৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে উঠে আসে।
দীপনের স্ত্রী নীলা তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে তাই মৃত্যুর দরজার কাছ থেকে ফিরে এলেও স্বামীর বিরুদ্ধে দাড়ায় না। দীপনের জীবনটা ঘেঁটে দেখলে সেই একই সূত্র পাওয়া যায়। দীপনও অনাথ। তবে মেধাবী ও প্রচন্ড আকর্ষণীয়। তার নেই কোন পিছুটান তাই ভবঘুরে স্বভাব ও রোমান্টিসিজম তার চরিত্রেরই অংশ।সকল কলীগেরা যখন কাজে ব্যস্ত তখন সে নির্বিকারভাবে ছুটি নিয়ে দিনটি অলস ভাবে কাটায়। এতে নাকি পৈশাচিক আনন্দ পায় সে।
‘ইনফার্নো’গল্পের সাহেবের জীবনেও ছোট কালের বন্ধু ও স্ত্রী শিখা ব্যতীত কেউ নেই। তাই তার কল্পনার জগতে সে রাহাত ও শিখার ইমেজের সঙ্গেই অবস্থান করে।ড. মাহমুদা এর ব্যাখ্যায় সাহেরকে বলেন-“আপনি কোন না কোনভাবে এর সাথে মস্তিষ্ক দিয়ে যুক্ত এবং আপনি একে নিয়ন্ত্রণ করছেন সচেতনভাবে সম্ভবত কোনো রকম টেলিপ্যাথির মাধ্যমে”।
প্রতিটি গল্পের মুখ্য চরিত্রই একটি ঘোরের মধ্যে বাস করে ও একটি লক্ষ্যহীন পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। দুঃস্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন,ট্রমা এ সকল স্টেজের মধ্য দিয়ে হাঁটে। যেনবা জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেয়।
এই চরিত্রগুলোর বাইরে ‘দ্বিখণ্ডিত’ গল্পে ওসি সাহেব- একটি চরিত্র যিনিও একটি বিশেষ পরিস্থিতির শিকার। তিনি অনেক বেশি উৎসাহিত হয়ে দীপনকে শাস্তি দিতে উদ্যত হন কেননা নীলার মধ্যে তিনি তার মেয়ে পিয়াকে দেখতে পান। তার একমাত্র মেয়ে পিয়া তার স্বামীর হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছিল। তার মানসপটকে উন্মোচন করতে গিয়ে লেখক একটি জায়গায় বর্ণনা দেন-“তিনি একজন পুলিশের কর্মকর্তা হওয়ার পরেও তার মেয়েটিকে বাঁচাতে পারেননি মানুষ নামের ওই নরপিশাচটা থেকে। শাস্তি তাকে ঠিকই পেতে হয়েছে কিন্তু তাতে কি বাবা- মায়ের বুকের শূন্যতা কখনো পূরণ হতে পারে?” এমনকি মিলার মা যখন কেসটা তুলে নিতে চান তখন অফিসিয়ালি তাকে একরকম শাসন করেন ও তার আচরণে বিরক্ত হন। যেনবা যেকোনো পরিস্থিতিই আসুক না কেন তিনি দীপনকে শাস্তি দেবেনই। এও এক ধরনের চরিতার্থতা, নিজের অপরাধবোধ কম করার দুর্বল প্রয়াস।
লেখক বাস্তবতার ভিতরে যে পরাবাস্তব জগৎ এর অবস্থান তাকে নেড়েচেড়ে দেখেছেন বার বার।এর স্বরূপ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে গেছেন। তাই প্রতিটি চরিত্রের ভেতরের টানাপোড়েন এবং এর জটগুলো ধীরে ধীরে খুলেছেন তবে অন্য চরিত্রের বয়ানে। সাহিত্যে এটাও এক অনবদ্য ধারা। সমন্বয়কারী চরিত্র ড. মাহমুদারও একটা নিজস্ব গল্প আছে। তিনি প্রচণ্ড তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিমতী। প্রথম দেখায় কেউ হয়তো তাকে বুঝতে পারবে না যে তিনি একজন এত বড় নিউরো-সাইন্টিস্ট। কিন্তু তার তীক্ষ্ণতার সামনে দাঁড়ানো সত্যিই কঠিন। ছিমছাম গড়নের মধ্য বয়সী নারী তিনি। নিয়মিত যোগ ব্যায়াম করেন। তার ভিতরে হাস্যরসের দিকটিও বিদ্যমান।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে জেলের প্রসঙ্গ। এই যে শুধু গরাদ নয় এ যেন মানুষের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকা। কোন মানুষই গন্ডির বাহিরে নয়।আবীর ও দীপন দুই চরিত্রই জেলে কিছুদিনের জন্য ছিল তবে তাদের কারণটা ভিন্ন ছিল। চরিত্রগুলোর মধ্যে বিষণ্ণতা ও বেদনাবোধও চোখে পড়ার মতো।

কিছু সঙ্গতি ও অসঙ্গতি:
মানবিক জীবনের চিত্রপট, মানবিক অসহায়ত্বের চিত্র, সময় ও পরিস্থিতির ব্যবধানে চরিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন গল্পগুলিতে চোখে পড়ে।এছাড়াও দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের পরও ভুতুড়ে, অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডের ব্যাখ্যাতীত সমাহার সত্যিই রোমাঞ্চকর।তবে একটা বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে- ড. মাহমুদার সৌন্দর্য ও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা নিয়ে আবীর, রাহাত এমনকি এসপি জাওয়াদের মুখেও প্রশংসাবাণী যেন লেখকের তার প্রতি মুগ্ধতার প্রতিচ্ছবি। তিনজন পুরুষই অনন্যসাধারণ চরিত্রটির ব্যক্তিত্বে বিমুগ্ধ।লেখক হাসান তারেক চৌধুরী প্রাণরসায়নে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করলেও পেশার দিক থেকে ব্যবস্থাপনাকে বেছে নেন। তাঁর রচিত তিনটি গল্পেই দেখি ভালোবাসাবোধ, গোছানো সংসার ও নিভৃতে নিজের ঘনিষ্ঠজনকে নিয়ে নিজের একটি ভুবন সৃষ্টির প্রয়াস। লেখক নিঃসন্দেহে প্রচন্ড রোমান্টিক মনের মানুষ।
শেষ কথা:
হয়তো বইটির প্রতি প্রচণ্ড মুগ্ধতার কারণে কোনো অসঙ্গতি আমার চোখে পড়েনি। প্রতিটি ডিটেইল বর্ণনা এবং ব্যাখ্যাতীত ঘটনাকেও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা দেয়ায় রচনাটি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।যা এক অর্থে মনোমুগ্ধকর। বইটি অসাধারণ।


[ বই-পুস্তক-প্রকাশনা এবং বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের যে কোনো সংবাদ প্রকাশের জন্য আমাদের ই-মেইল করতে পারেন : desherboi@gmail.com ]

Facebook Comments Box