স্মরণ

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অনন্য কাব্যভাষার জগৎ

মঙ্গলবার, ২৫ মে ২০২১ | ৯:২৬ অপরাহ্ণ | 193 বার

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অনন্য কাব্যভাষার জগৎ

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অনন্য কাব্যভাষার জগৎ
।। সরকার আবদুল মান্নান ।।


 

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বাহাত্তর বছর (৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৮ থেকে ২৪ মে ২০২১) অতিক্রম করে চলে গেলেন। সময়টা নেহাত কম নয়। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে একটি কাজই করেছেন, আর সেটি হলো কবিতা নামক সর্বগ্রাসী শিল্পের ভেতর দিয়ে নিরন্তর নিজেকে উন্মোচন করে যাওয়া। তার প্রমাণ ৩৩টি কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে দুটি উপন্যাস, দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ, একটি স্মৃতিকথা এবং দশটির মতো ছড়ার বই। এ থেকে অনুমিত হয়, তিনি থামেননি- কোনো কারণে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়নি তাঁর লেখক-জীবনে। কিন্তু এ শুধু পরিমাণের বিষয় নয়- প্রবলভাবে শিল্পেরও বিষয়। যে বিস্ময়কর জীবনাদর্শ ও জীবনতৃষ্ণা ভাষা ও কল্পনাপ্রতিভার জটিল এক রসায়নে শিল্প হয়ে ওঠে, তার বরপুত্র সবাই হন না। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাব্যগ্রন্থে জীবনতৃষ্ণার এই জটিল রসায়ন আশ্চর্যরকমভাবে মিলে যায় এবং দৃশ্য-অদৃশ্য বুনন-বিন্যাসে বিস্ময়কর গড়ন লাভ করে।

হাবীবুল্লাহ সিরাজী কবিতার জন্য খুঁজে নিয়েছেন নিজস্ব একটি ভাষার জগৎ। কিন্তু সেটা ‘খুঁজে নিয়েছেন’ বললে একদম ঠিক হবে না। বরং বলা যায় কল্পনাপ্রতিভার বিস্ময়কর প্রেরণা থেকে এবং সৃষ্টির তৃষ্ণা থেকে আবিষ্কার করে নিয়েছেন নিজস্ব এক ভাষিক জগৎ। এবং কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাব্যভাষার এই জগৎ তাঁকে অধ্যয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অধ্যায়। আর তার সঙ্গে আছে অনুভবের অন্বয়-দূরান্বয়। মনে হয় কবি ভাষার যে শৃঙ্খলা তৈরি করেছেন তার পশ্চাতে নিহিত আছে তাঁর মনোগড়নের অনন্যতা। তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থের নাম “যে শ্রেষ্ঠ একা”। শ্রেষ্ঠ চিরকাল একা। একা হওয়ার জন্যই কেউ বা কিছু শ্রেষ্ঠ হয় নাকি শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য একা হয় সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় যে, এই নামের মধ্যে কোনো দুর্বুদ্ধতা নেই। কিন্তু এই শিরোনামের কবিতাটি যখন স্মরণ করি, তখন কী দাঁড়ায়! কয়েকটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করি :

অন্ধ হ’য়ে যাবো?
ভেজা চোখে সম্মুখের সবকিছু
বড়ো কিংবা ছোট নয়, ফাঁকা
যে শ্রেষ্ঠ একা!

 

কবিতাটির নাম শুনে মনে হতে পারে, এটি নিশ্চয়ই কোনো দর্শন বিষয়ক কবিতা। কিন্তু কুড়ি পঙ্ক্তির এই কবিতার মধ্যে সচেতন কোনো দর্শন নেই। শ্রেষ্ঠর একাকিত্বের কোনো বোধ নেই। তা হলে কী আছে এই কবিতার মধ্যে? আমার মনে হয়, চিন্তার ধারাক্রম দিয়ে সাজানো যায় এমন কোনো ভাবনার পারম্পর্য খুঁজতে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং চিত্রকলায় রং, রেখা, আলো, আঁধার নিয়ে বোধের যে জগৎ তৈরি করে যেখানে কোনো গল্প থাকে না, কাহিনি থাকে না, ঘটনা থাকে না, অন্বয় থাকে না – থাকে শুধু বোধের প্রবাহ, চেতনা প্রবাহের ধারা কিংবা অভিব্যক্তির ছিন্নবিচ্ছিন্ন অনুক্রম- তাই আছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর এই কবিতায়। আর সেই ভাবনার বিপর্যাস বিস্ময়কর শক্তি নিয়ে এবং স্থাপত্যের দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর ভাষার ওপর। অর্থাৎ তিনি বিষয় দিয়ে কবিতা লেখেন না। এমনকি প্রথাগত অর্থে তিনি ভাষা দিয়েও কবিতা লেখেন না। তার মানে কি এই যে, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতায় বিষয়ও নেই, ভাষাও নেই? নিশ্চয় নয়। তিনি কবিতা লেখেন অনন্য এক কাব্যভাষা দিয়ে- কবিতার বাইরে যে ভাষার কোনো রূপ লক্ষ করা যায় না। এই ভাষা শুধুই কবিতার ভাষা। প্রতিটি শব্দ কবিতার, প্রতিটি শব্দবন্ধ কবিতার, প্রবহমান শব্দের শ্রোতে ছন্দের যে বিভা আপনা থেকেই গড়ন লাভ করে তার স্বরূপ একান্তই কবিতার। এখন এই কবিতার বাকি অংশ উল্লেখ করি।

মিথ্যে তার বিছেধরা ঠোঁটে
যতো জোট অতীতের
চোটে তার রক্ত টানে
আয় তন্দ্রা, হরণের ছন্দবিন্দু
কম্পনের আড়ালে থাকুক সত্য অভিনয়!
প্রভাতের আল্টপকা ডাকে
মধ্যাহ্নের চাতুরিরা বুকে পৌঁছেছিলো
তারপর জল, সাঁতারের অপেক্ষা
যে খণ্ড বেলা, অবহেলায়
কাঁকড়া খোঁজার সময় নিলো
ফেনায় ঝিনুক ভেঙে পুঁতে দিলো নিরীহ পঁচিশ
ঝাউবনে র’য়ে গেলো কামনা-কলহ
ক্ষত চোখে তার কোনো বিম্ব নেই
অন্ধ হ’য়ে আছি।
অন্ধের কোনো দোষ নেই
যে শ্রেষ্ঠ একা!

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর প্রতিনিধিত্বকারী কবিতা। তাই পুরো কবিতাটি উল্লেখ করলাম। “যে শ্রেষ্ঠ একা” এই বোধের সঙ্গে যদি আমরা কবিতার ভাবনার জগৎকে মিলাতে চাই, তা হলে মিলে না নিশ্চয়ই এবং ‘অন্ধের কোনো দোষ নেই’ এমন সহজ স্বীকারোক্তির সঙ্গে কবিতাটির বাকি বক্তব্যের সম্পর্ক কোথায়? কাব্যভাষার মায়াবী গ্রন্থনার ভেতর দিয়ে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বোধের কতগুলো চিত্রকল্প ও রূপকল্প তৈরি করেছেন যার সঙ্গে চিত্রশিল্পের সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ।
আমরা যদি বলি ইতিহাস আর ঐতিহ্যের বোধ নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘আমাদের নতুন স্কুল’ তা হলে যে কেউ তার প্রতিবাদ করতে পারবেন। কবিতার মধ্যে প্রতিবাদের এই সীমা থাকেই। কিন্তু কতদূর, তার কি কোনো মাপজোখ আছে? হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতায় ভাবনার এই ভিন্নতার কোনো সীমা নেই। ‘আমাদের নতুন স্কুল’ গড়নের দিক দিয়ে যেমন কবিতা বিষয়ক একটি নতুন স্কুলের আস্বাদ মিলে, তেমনি ভাবনার মধ্যেও আছে নতুন এক শৃঙ্খলার পরিচয়, যার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে কোনো শৃঙ্খলার বোধ তৈরি হবে না। ‘পাটিতে মাটির পাঠ/আকাশ শেখায় তার গলাগলি ভাব’- এ পর্যন্ত নিশ্চয়ই প্রথাগত সহজ বোধগম্যতার অনুক্রম। এবং এর পরেই কবি যখন লিখেন ‘সমুদ্রের অভিযানে স্বপ্ন জানে বায়ু/আগুনের ভিন্ন মানে অরণ্যে গোপন/খুলিতেছে আমাদের প্রাইমারি স্কুল:’ তখন ঘটনাটি আর সহজ থাকে না বরং আমাদের ভাবনার প্রথাগত প্যাটার্ন ভেঙে দিয়ে অন্যরকম কিছু ভাবতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু কোলনের পরে ১. ২. ৩. ৪. ৫. -এ যে বাক্যবন্ধ মুদ্রিত হয়েছে তার গড়নের মধ্যে কবিতার অন্য এক ইতিাস রচিত হয়েছে। পঙ্ক্তি কয়টি উল্লেখ করি :
১. পরিযায়ী পাখিরা তো ভূগোলে তুখোড়
২. বাঙলায় মহাব্যস্ত ধ্রুব বনসাই
৩. ইতিহাস উল্টা-পাল্টায় ওরাংওটাং
৪. স্যামনের পেটে-পিঠে ইংরেজির তেল
৫. অঙ্কের নানান বোঝা গোলাপের ঘাড়ে

 

‘খুলিয়াছে আমাদের সেকেন্ডারি স্কুল :’-এ গিয়ে আমরা আর ১. ২. ৩. ৪. ৫. দেখি না- সেখানে লেখা হয়েছে ক. খ. গ. ঘ. ঙ.। এবং শেষ চারটি পঙ্ক্তি এ রকম : ‘বিন্দু দিলে ফোটে আলো/পথের হিশেব থাকে নাথের চাকায়/গন্তব্যের মানে লেখা খোলা পাঠ্যক্রমে/চলিতেছে আমাদের নতুন স্কুল।’ ভাবনার এই স্থাপত্যের মধ্যে যে ব্যাকরণ মান্য করা হয়েছে তার কোনো পূর্বানুক্রম এবং উত্তর সাধক নেই। কবি নিজে পথ তৈরি করেছেন এবং সেই পথে তিনি নিজেই হেঁটেছেন।
‘শীতের ম্যানুয়াল’ নামে ‘শব্দের কবিতা’টি নিয়ে কথা বলা যায়। লক্ষ করবেন, বলা হয়েছ ‘শব্দের কবিতা’। কবিতা তো শব্দেরই হবে। তা হলে সিরাজীর কবিতাকে আলাদা করে শব্দের কবিতা বলা হবে কেন? বিষয়কে অতিক্রম করে গিয়ে শব্দের গ্রন্থনা যখন কোনো রহস্যময়তাকে প্রগাঢ় করে তোলে তখন তাকে ‘শব্দের কবিতা’ ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়! এই কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করি :

পিঁপড়ে প’ড়েছে ঘরে, তাপে বাড়ে ঝোঁক
যদি ফোটে কুয়াশার চোখ
মধ্যরাতে মুণ্ডু ছেঁটে ভার্চুয়াল ভোগ
যতো তাজা ততো বাজা আমের মঞ্জরী
ওলো হিম হাতজোড় করি
না ফোটা প্রথম ঠোঁটে ইচ্ছা নীলাম্বরী

 

কবিতার এই অংশটুকুকে কেন্দ্র করে একজন পাঠকের ভাবনা কোনা ধরনের আশ্রয় লাভ করবে? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর থাকার কথা নয়। কারণ, পৃথিবীর তাবৎ শ্রেষ্ঠ কবিতা পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয়ে নির্দ্বন্দ্ব করে রাখে না বরং আশ্রয়হীনতার মধ্যেই রচিত হয় ভাবনার গতিময়তা। কিন্তু এই কবিতায় – বলা যায় হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অধিকাংশ কবিতায় কাব্যভাষা ও ছন্দের গভীর স্রােতময়তার মধ্যে রচিত হয় আশ্রয়ের নিশ্চয়তা। কেননা, ‘কাব্যভাষা’ – এই অভিধাটি তাঁর কবিতার প্রাণ।
আধুনিক মানুষ বিচিত্র অসহায়ত্বের মধ্যে বসবাস করেন। এই অসহায়ত্ব হলো তার কিছু করার থাকে না। তার বুদ্ধি আছে; সে হাঁটে, চলে ফিরে, কথা বলে, কাজ করে, কিন্তু তার পরেও সে অসহায়, তার কিছু করার থাকে না। এই নিয়তি মানুষ উপেক্ষও করতে পারে না। ‘ওহির অপেক্ষায় আছি’ কবিতায় মানুষের এই চিরায়ত নিয়তি ও অসহায়ত্বের পরিচয় আছে। কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করি:
আমি হাটহদ্দ, যথাদিষ্ট, আভিমুখ্য ত্রিফলা
বখতিয়ারের সঙ্গী তবু এখতিয়ারে কানাকড়ি নেই
চিনিমাত্রা তছনছ ক’রে দিচ্ছে নিদ্রাকাঠামো
সন্ত্রাসের এত্তেলায় উড়ছে লাল ঝাণ্ডা
তখন আমার কী ভূমিকা

 

এখানেও আমরা বিষয় নিয়ে ভাবিত নই। বিষয় উপস্থাপনের কাঠামোটি দেখবার মতো। কবি যে ভাষায় কথা বলেন, সেই ভাষা এবং তার নির্মিতির মধ্যে যে সংযম ও ভাবনার গড়ন তৈরি হয় সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অনন্য শিল্পমানস।
‘কন্যা এই’- আর একটি কবিতা। পুরো কবিতাটিতে একজন কন্যার- বলা যায় যুবতির দেহ-মনের বিস্ময়কর এক অস্তিত্বের পরিচয় আছে। কিন্তু সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়- বিষয় হলো কবির ভাবনা কোন ভাষায়, কোন রূপকল্পে, কোন চিত্রকল্পে গড়ন লাভ করছে। সম্পূর্ণ কবিতাটি উল্লেখ করি :
কন্যা এই গোল ব’সে সম্মোহনে খেলে সুরপাশা
বুকে ধরে বিভাবসু পুনর্জন্ম গহন পিপাসা
মাথার বলক ঘন আরো ঘন চোখের কম্পন
ঔষ্ঠ্যলীলা মান্য করে সুধাগন্ধ কৃষ্ণের সমন
কৃষ্ণ তার তপ্ত গল্প রক্তভালে চন্দনের সেতু
কৃষ্ণ তার নুনচিন্তা সর্বস্বত্বে নিষ্ঠ স্বপ্নকেতু
কৃষ্ণ তার ভূমিযাত্রা হেমন্তের পরিপুষ্ট বীজ
কৃষ্ণ তার যমুনার কবিতার মুগ্ধ মনসিজ
ছায়াবৃত্তে ঘুঁটি ফেলে কন্যা এই অসমাপ্ত রাধা
আমি যতো কৃষ্ণ ততো স্বর্গ-মর্তে সমান সমাধা

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কাব্যভাষার এই জগৎ সহজ লভ্য নয়। নিরন্তর লিখে লিখে এবং অফুরন্ত অনুধ্যানের অর্ঘ্য হিসেবে তিনি কবিতা নামক শিল্প সৃষ্টির এক মহিমামণ্ডিত স্তরে সিদ্ধি লাভ করেছেন। এই সিদ্ধির পেছনে তাঁর কাব্যপ্রতিভার সঙ্গে অসাধারণ যৌক্তিকতায় মিশে আছে তাঁর বিজ্ঞানভাবনা। বিজ্ঞানের বিচিত্র সত্য ও সৌন্দর্যকে তিনি কতভাবে যে কবিতায় ব্যবহার করেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এমন কি তাঁর এই বিজ্ঞানভাবনার ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেছে কবিতা-স্থাপত্যের ন্যায়সূত্র। “যে শ্রেষ্ঠ একা” এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা ‘কোন্খানে গোল হ’য়ে প’ড়ে আছে কে’ কবিতার মধ্যে কবির এই বিজ্ঞানবোধ কতটা শিল্পোত্তীর্ণ রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারে তার পরিচয় আছে। বাংলা কবিতার ইতিহাসে কবি হাবীবুল্ল্হ সিরাজীর এই অবদান নিশ্চয়ই অনন্যতা লাভ করবে।

Facebook Comments Box