স্মরণ

সেলিম আল দীন ও তাঁর নাট্যজীবন

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২০ | ৯:৩২ অপরাহ্ণ | 285 বার

সেলিম আল দীন ও তাঁর নাট্যজীবন

॥ সুপ্রিয়া দেবনাথ ॥

“হৃদয়ে মম বসত তোমার হে আচার্য
শিল্পদ্রষ্টা হে তোমায় প্রণাম”

 

 

 

সেলিম আল দীন নাট্যজগতের মহাকবি ও ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যরীতির প্রবর্তক। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক, নাট্যনির্দেশক এবং শিল্পতাত্ত্বিক। নাটকই তার ধ্যান, জ্ঞান ও মগ্নতা। রবীন্দ্রোত্তর একমাত্র তাঁর নাটকেই পরিলক্ষিত হয় মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি, শিল্পসৌকর্য এবং বাংলা ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতির সদম্ভ প্রয়োগ। তাঁর নাটকে সামাজিক নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট উপস্থাপিত হয়েছে বহুস্তরিক বাস্তবতার মধ্যদিয়ে।

 

জন্ম শিক্ষা ও কর্মজীবন
নাট্যকার সেলিম আল দীন ১৮ আগস্ট ১৯৪৯ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে। বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
কর্মজীবনের শুরুতে বিজ্ঞাপন সংস্থা বিটপি’তে কপিরাইটারের পদে যোগ দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৭৪ সালে। নাট্যনির্দেশক ও শিল্পসঙ্গী নাসির উদ্দীন ইউসুফ-এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা থিয়েটার। ১৯৮১-৮২ সালে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠায় রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৮৬ সালে তারই উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। স্বল্পায়ু এ অক্লান্ত নাট্যকর্মী ও গবেষক তার শিল্পজীবনে রচনা করেছেন অসংখ্য নাটক, গীতিনৃত্যনাট্য, কবিতাগ্রন্থ, অনুবাদগ্রন্থ, ১৫০টিরও বেশী প্রবন্ধ, উপন্যাস এবং গবেষণাধর্মী গ্রন্থ।

 

পুরস্কার ও সম্মাননা
নাট্যকার সেলিম আল দীন অর্জন করেছেন একাধিক পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলো হলাে-
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪)
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৩, ১৯৯৪)
নান্দীকার পুরস্কার (১৯৯৪)
শ্রেষ্ঠ টেলিভিশন নাট্যকার পুরস্কার
মুনীর চৌধুরী সম্মাননা (২০০৫)
খালেকদাদ সাহিত্য পুরস্কার
অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭)
একুশে পদক (২০০৭)

সেলিম আল দীন রচিত হরগজ নাটকটি সুইডিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নাটক পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। সেলিম আল দীনকৃত ‘চাকা’ নাটকটি নিয়ে চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম ১৯৯৪ ও কীত্তনখোলা নাটকটি নিয়ে আবু সাইয়িদ ২০০১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

 

শিল্প আঙ্গিকে সেলিম আল দীন
সেলিম আল দীন একাধারে বিনির্মাণ করেছেন ঐতিহ্যবাহী বাংলানাট্যরীতি ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’, ফিউশনতত্ত্ব ও নৃগোষ্ঠী জনজীবনের ওপরে আখ্যানধর্মী নিও এথনিক থিয়েটার।
তাঁর নাট্য জীবনের প্রথম পর্বে আমরা দেখি বিভিন্ন ধরনের ফ্যান্টাসিধর্মী নাটক। এ পর্বের নাটকের মধ্যে সংবাদ কার্টুন, একটি সর্প বিষয়ক গল্প ও অন্যান্য নাটক (১৯৭৩), জন্ডিস ওবিবিধ বেলুন (১৯৭৫), মুনতাসির ফ্যান্টাসি (১৯৮৬) উল্লেখযোগ্য।
‘কীর্তনখোলা’ নাটকটি রচনার মধ্যদিয়ে তিনি তার নিজস্ব নাট্যশৈলী নির্মাণ ও স্বীয় ভুবন খুঁজে পান। ‘কেরামতমঙ্গল’ ও ‘হাতহদাই’ লেখকের মহাকাব্যিক ব্যাপ্তির আখ্যান; যাতে উঠে এসেছে বাংলার জনগণ, সমাজ, নিম্নস্তরের মানুষের দুঃখ কথা এবং তাদের জীবনের নানান দিক।
দ্বিতীয় পর্বের উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো ‘শকুন্তলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘চাকা’। পরিণত সময়ের উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হচ্ছে ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘বনপাংশুল’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘স্বর্ণবোয়াল’, ‘ঊষা উৎসব’ ও সর্বশেষ নাটক ‘পুত্র’।

নাট্যকার স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে পাশ্চাত্য রীতি অনুসরণ না করে নির্মাণ করেছেন বাঙালির হাজার বছরের ধারা ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। নাট্যকারের ভাষায় বহুর মধ্যে এক, একের মধ্যে বহুর উপস্থিতিই হলো ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’। ছোটো ছোটো আখ্যান বা গল্পের মধ্যদিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন এক একটি বিশাল জীবনের সুগভীর ও সূক্ষাতিসূক্ষ বিবরণ। তাই নাটকগুলো প্রকৃতপক্ষে হয়ে উঠেছে আখ্যান।
আরেকটি ধারা ‘ফিউশন তত্ত্ব’ যার অর্থ একাঙ্গীকরণ বা সাঙ্গীকরণ। একাঙ্গীকরণ শিল্পের এক অবশ্যম্ভাবী শক্তি। বহু উপাদানের একত্রে মিলনই ফিউশন তত্ত্ব।
মহান এই নাট্যকার তার শিল্পজীবনে একাধিক নাটকের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়েও ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী। নাটক শুধু নাটকই নয় বরং দেশ ও বিশ্ব, সমাজজীবন ও ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিক জীবনের আলেখ্য। মহান এই আচার্য ১৪ জানুয়ারি ২০০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকায়। রেখে যান হাজারও স্মৃতি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments