দেশের বই ঈদ সাময়িকী ॥ প্রবন্ধ

সেলিম আল দীনের নাটকে শ্রমজীবী মানুষ ও লৌকিক ধর্মের স্বরূপ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ | ১০:৪২ অপরাহ্ণ | 288 বার

সেলিম আল দীনের নাটকে শ্রমজীবী মানুষ ও লৌকিক ধর্মের স্বরূপ

সেলিম আল দীনের নাটকে শ্রমজীবী মানুষ ও লৌকিক ধর্মের স্বরূপ
॥ শাহাদৎ রুমন ॥

সমাজ নামক প্রতিষ্ঠানের উদ্ভবের পর থেকে মানুষের সার্বিক জীবনাচারের সঙ্গে জড়িত সংগঠনগুলোর প্রধানতম হলো ধর্ম এবং রাষ্ট্র। সেইসঙ্গে যুগ-পরম্পরায় ধর্ম ও রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রাজনীতি।

 

 

আধুনিককালেও কোনো কোনো রাষ্ট্রে ধর্মের সাহচর্যে রাজনীতির প্রত্যক্ষ যোগ লক্ষ করা যায়। ধর্ম, রাষ্ট্র এবং রাজনীতি চিরকালীন সমাজব্যবস্থায় মানুষের কল্যাণে প্রয়োগ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায়শই এই সংগঠনগুলো সমাজস্থ মানুষের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থিত হয়। বর্তমানে তা যেন অধিকভাবে সত্য। বিশেষ করে, বাংলাদেশ এবং বিশ্বরাজনীতির মূলে যখন ধর্মের অবস্থান বিশেষায়িতরূপে চিহ্নিত- তখন আর রাষ্ট্র কিংবা রাজনীতি ও ধর্ম একটি থেকে আরেকটিকে আর পৃথক করা যায় না। সেলিম আল দীনের (১৯৪৯-২০০৮) নাটকসমূহে বিস্তৃত পরিসরে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাঁর প্রায় সবকটি নাটকের অভ্যন্তরে আছে ধর্ম, রাষ্ট্র এবং রাজনীতির যুগপৎ অবস্থান। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের মৌল উদ্দেশ্য হলো, তাঁর নাটকে প্রতিফলিত ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক অবস্থা কীভাবে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ভালো ও মন্দ দুই-ই বিরাজমান থাকে সে-রূপ পর্যবেক্ষণ। একইসঙ্গে ধর্ম, রাষ্ট্র এবং রাজনীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবস্থা চিত্রণের মধ্য দিয়ে নাটকে প্রতিফলিত সেলিম আল দীনের দার্শনিক অভিপ্রায়ও উদ্ঘাটনের প্রয়াস থাকবে। এর মধ্য দিয়ে সমাজ ও মানুষের জন্য সেলিম আল দীনের ভাবনার স্বরূপটি অনুধাবন করা যাবে বলে বিশ্বাস। তবে আলোচনার সুবিধার্থে বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধকে দুইটি উপপর্বে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যথা :
১. সেলিম আল দীনের নাটকে ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম ভাবনা
২. সেলিম আল দীনের নাটকে রাজনীতি ও রাষ্ট্র ভাবনা

 

১. সেলিম আল দীনের নাটকে ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম ভাবনা
এক বা একাধিক অতিপ্রাকৃত শক্তি তথা অলৌকিক কিংবা ঐশ্বরিক শক্তির ধারণা এবং ঐ সত্তার আরধনাই হলো ধর্ম। প্রকৃতির নানামাত্রিক উপাসনার অভ্যন্তর দিয়ে ধর্মের উৎপত্তি। অর্থাৎ আদিতে ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল কৃত্যের অভ্যন্তর দিয়ে। মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে এবং প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে কতকগুলো আচার পালন করতো, সে আচারগুলো ছিল অবশ্যই পালনীয়। আবার অত্যাবশ্যকভাবে পালনীয় সেই আচারগুলো ছিল কতকগুলো বিধি-বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আদি সমাজে পালনীয় এই আচারগুলোকেই অভিহিত করা হয় ‘কৃত্য’ হিসেবে।১ প্রারম্ভে কৃত্যাদির উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। পরবর্তী পর্যায়ে কৃত্যের অভ্যন্তরে জীবনপূর্ব এবং জীবনোত্তর রহস্যসূত্র যুক্ত করে দিয়ে মানবসমাজে ধর্মের উদ্ভব ঘটে। কারণ, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত কৃত্যের তথা পালনীয় আচারের “সুযোগটি গ্রহণ করে প্রবিষ্ট করায় জন্মান্তরবাদ অর্থাৎ এ জন্মের দুঃখ কষ্ট সবই পূর্বজন্মের কর্মফল, এই দুঃখ কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করতে পারলে পরবর্তী জীবনে নিশ্চিত সুখভোগ। এই অভিনব তথ্য সংযোজনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নিরুপদ্রব রাজ্য শাসন।”২ অন্যভাবে বললে, “ব্যক্তি বিশেষের সংবেদনশীল মনের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকেই ধর্মের উৎপত্তি। ধর্মের সঙ্গে মানুষের হৃদয়বৃত্তির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। পারলৌকিক আচার এবং পবিত্র আচার- এই দুটো উপাদানই সব ধর্মের মূলমন্ত্র।”৩ অর্থাৎ অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস এবং বিশ্বাসীদের আচার-আচরণ ও মনোভাবের সম্মিলনই হলো ধর্ম। সমালোচকের মতে :
জ্ঞানের যেখানে শেষ, ধর্মের সেখানে শুরু। বিজ্ঞান যা পারেনি ধর্ম মানুষের জন্য সে কর্ম সাধন করে। ধর্ম জীবন ও বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের গূঢ় অর্থ ব্যাখ্যা করে; মৃত্যুর সমস্যা, হতাশা, যন্ত্রণা ও সংঘাতের সমস্যার সমাধান দেয়। ধর্ম মানুষকে দুঃখ দৈন্য, ব্যথা-বেদনা, হতাশা ও নিরাশার দুঃসহ ভার বহন করবার মনোবল দেয় এবং উপায়হীন মানুষকে বিশ্বাসের অবলম্বন দিয়ে জগৎ-সমুদ্রে পাড়ি জমাতে সাহায্য করে। মৃত্যুতে শেষ নয়,- এরপরও জীবন আছে, সে জীবন আদি অন্তহীন; দুঃখ-বেদনা, হতাশা অর্থহীন নয়, সকল দুঃখের শেষে অনন্ত সুখের সাগর বিস্তৃত। ধর্ম মৃত্যুপথ যাত্রীকে মৃত্যুর পরবর্তী অনন্ত-জীবনের লোভ দেখায়; যখন সব সহায় সম্বল শেষ হয়ে যায়, ধর্ম তখন মানুষের সামনে আশার বর্তিকা জ্বেলে দেয়।
ধর্ম তাহলে, এমন একটা ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা মানুষের সেসব চরম সমস্যার মোকাবিলা করতে চেষ্টা করে, যে সব সমস্যা আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়।৪

আবার আভিধানিক ব্যাখ্যায় দেখা যায়, “ধৃ ধাতু মনিন্ প্রত্যয় যোগে ধর্ম শব্দ নিষ্পন্ন-অর্থ যা ধারণ করে। ধারণ মানে যা গ্রহণ করতে হয় না, স্বাভাবিকভাবেই থাকে। জীবন্ত বা জড় সকলেরই ধর্ম আছে। যেমন পশুর ধর্ম পশুত্ব, আগুনের ধর্ম পোড়ানো, জলের ধর্ম ভিজানো এবং সেভাবেই মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব।”৫
ধর্ম সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সাংস্কৃতিক প্রবাহধারায় যে সংগঠনগুলোর ভূমিকা মুখ্য হিসেবে বিবেচ্য- তন্মধ্যে ধর্মীয় সংগঠন প্রধানতম। তাই ধর্মের সঙ্গে সমাজ ও সমাজস্থ মানুষের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। উপরন্তু, ধর্ম, সমাজ এবং সংস্কৃতি এক নয়। বরং প্রতিটি প্রত্যয় ভিন্নার্থক এবং সমাজ ও সমাজের মানুষের বিকাশে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু, একটি ছাড়া আরেকটির অস্তিত্ব পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিতও হতে পারে না। তাই ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃৃতির মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্ক বিরাজমান। বলা যায়, ধর্ম মানব সংস্কৃতি প্রকাশক সংগঠনগুলোর একটি। সাধারণত সমাজব্যবস্থায় ধর্মের দুটি ধারা প্রত্যক্ষ করা যায়। যথা : শাস্ত্রীয় এবং লৌকিক।
শাস্ত্রীয় ধর্ম বলতে মূলত, শাস্ত্র কেন্দ্রিক ধর্মগুলোকে অভিহিত করা হয়। শাস্ত্রীয় ধর্মগুলো হলো : সনাতন (বেদ-এ বিশ্বাস কেন্দ্রিক), ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং ইসলাম। বলা বাহুল্য, ধর্মের প্রবক্তাগণ বিশেষত শাস্ত্রীয় ধর্ম বেদ, ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা ইসলামে বিশ্বাসী ধর্মীয় প্রবক্তাগণ বিশ্বাস করেন যে, ধর্ম সরাসরি সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্বাচিত পুরুষ দ্বারা প্রেরিত। অন্যদিকে, যুগ যুগ ধরে শাস্ত্রের বাইরে গিয়ে মানুষের পালিত কিংবা বিশ্বাস্য ধর্মমতকে বলা হয় লৌকিক ধর্ম। প্রাচীনকাল থেকে বঙ্গীয় ভূখণ্ডে বিভিন্ন নামে লৌকিক ধর্মমতের প্রচলন ঘটে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতগুলি হলো : তন্ত্রসাধনা, নাথপন্থা, বৈষ্ণববাদ, পিরবাদ, বাউলতন্ত্র প্রভৃতি। উল্লেখ্য, একসময় সমগ্র বঙ্গ জনপদে বিস্তৃত বৌদ্ধ ধর্মমতও শাস্ত্র ব্যতিরেকেই প্রসারিত হয়েছিল। এ সকল শাস্ত্র ব্যতীত আচার ধর্মে প্রাচীনকালে শূদ্র শ্রেণি হিসেবে পরিচিত শ্রমজীবী মানুষের বিশ্বাস ছিল অধিক। তদ্রুপ বর্তমান সময় পর্যন্ত এ সকল ধর্মমতে শ্রমজীবী তথা গ্রামীণ মানুষের অংশগ্রহণই লক্ষ করা যায়। আবার, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রচলিত এই ধর্মগুলিকে দমন করার প্রয়াসও সবসময় বিদ্যমান ছিল। তারপরও এ সকল ধর্মগুলো প্রবহমান থাকার কারণ হিসেবে সমালোচক বলেন:
নিচুসমাজের মানুষ অসাম্প্রদায়িকভাবে গ্রাম্যসমাজে সহজে মিলতে মিশতে পারে। খোঁজ করলে দেখা যাবে অখণ্ড বাংলায় যত উপধর্ম সম্প্রদায় গজিয়ে উঠেছিল তাদের বেশির ভাগ প্রবর্তক একজন মুসলমান অথবা হিন্দু-মুসলমান যৌথভাবে। কর্তাভজাদের স্রষ্টা আউলেচাঁদ একজন মুসলমান আর তাঁর প্রধান শিষ্য রামশরণ পাল একজন সদগোপ। সাহেবধনী সম্প্রদায়ের প্রবর্তক একজন মুসলমান উদাসীন এবং এ ধর্মের প্রধান সংগঠন চরণ পাল জাতে গোয়ালা। আসলে বাংলার লৌকিক উপধর্মগুলির ভিত্তিতে আছে তিনটি প্রবর্তনা- মুসলমান বাউল ফকির দরবেশদের প্রত্যক্ষ প্রভাব, শোষিত শূদ্রবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবিরোধ এবং লোকায়ত বৈষ্ণব ধর্মের উদার আহ্বান।৬

শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে শাস্ত্রীয় ধর্মের পাশাপাশি বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব ছাড়াও নাথপন্থা, সুফি মতবাদ ও পিরবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে এ কথাও সত্য যে, শ্রমজীবী মানুষের যে অংশটি অধুনা ‘নিম্নবর্গ’ হিসেবে চিহ্নিত তাদের আচার বিশ্বাস সম্পর্কেও সমালোচকের অনুরূপ মন্তব্য পাওয়া যায়।
সহজিয়া বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব ছাড়াও বৌদ্ধ সহজিয়া চিন্তাধারা, ‘বাম’ তান্ত্রিক প্রথা, নাথপন্থী ধর্মমত, সুফী মতবাদ এবং নিম্নবর্গের ধর্ম সম্প্রদায়ের উপদেশগত ও রীতিনীতিগত প্রভাব লক্ষ করা যায়। এদের অন্য বৈশিষ্ট্য হল এই ভক্ত বা অনুগামীদের অধিকাংশই ছিল নিচু জাতের লোক।৭

উক্ত মন্তব্য থেকে ‘সম্প্রদায়’ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। অর্থাৎ সমালোচকগণ শাস্ত্রীয় ধর্মের বাইরের যে লৌকিক তথা ‘অপ্রধান ধর্মীয়’ মতাবলম্বীদেরও সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। কেননা “সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় তথাকথিত অপ্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলি জনসংখ্যার এক বড় অংশের আনুগত্য অর্জন করেছিল।”৮ শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অপ্রধান সম্প্রদায়গত এ সকল ধর্মীয় প্রভাব হিসেবে সেলিম আল দীনের নাটকগুলিতে বাউলপন্থা, পিরবাদ, নাথপন্থা প্রভৃতির নানাবিধ সাংস্কৃতিক পরম্পরা লক্ষণীয়। তাঁর নাটকসমূহে শাস্ত্রীয় ধর্মাবলম্বী মানুষের নানাবিধ পরিচয়ও উদ্ঘাটিত হয়েছে। অধিকন্তু, তাঁর নাটকসমূহে শাস্ত্রীয় ধর্মের পাশাপাশি লৌকিক ধর্মাবলম্বীদের গোঁড়ামি এবং মানুষের জন্য অকল্যাণকর কর্মের প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে।
সেলিম আল দীনের নাটকসমূহে মধ্যযুগের বাংলা এবং তাঁর সমকালীন বাংলার মানুষের ধর্মীয় বোধ-বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়। লক্ষ করা যায়, তাঁর নাট্যকাহিনির বিস্তৃত প্রেক্ষাপট জুড়ে আছে সামাজিকগণের ধর্মীয় রীতিনীতির নানাবিধ প্রয়োগবিন্যাস। বলা আবশ্যক, তাঁর নাটকসমূহে ধর্মকে ব্যবহারপূর্বক মানুষের নানা প্রকার স্বার্থ উদ্ধার কিংবা ধর্মের নামে মানুষের ক্ষতিসাধন করার চিত্র বর্ণিত হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে ধর্ম এবং রাজনীতির পারস্পরিক সম্পৃক্ততা এবং ধর্মীয় বিবিধ সংস্কৃতির চিত্র। কারণ, রাষ্ট্র নামক সংগঠনটির উদ্ভবের পর থেকে লক্ষ করা যায়, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদীগণ তথা শাসক সম্প্রদায় ধর্মকে ব্যবহার করে আসছে হীনস্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে।
লৌকিক পিরবাদ বঙ্গদেশে খ্রিষ্টীয় দশম-দ্বাদশ শতক থেকে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে।৯ অর্থাৎ এ সময় থেকে বাংলাদেশে পিরদরবেশ, সুফিসাধকগণ ইসলাম ধর্মের প্রসারে প্রচার শুরুকরেন। এক্ষেত্রে তাঁরা সে সময়কার মুসলমান শাসকদের সহায়তাও লাভ করেছিলেন। তবে তাঁদের ক্রিয়া-কর্ম কেবল ধর্ম প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং “তাঁরা নিজেদের নানাভাবে ছড়িয়ে দিয়ে নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশের আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং নানা মত ও পথের সন্ধান দিয়ে দুর্ভাগ্যপীড়িত দেশবাসীর চিত্তলোকে স্থায়ী আসন লাভ করেন।”১০
মুহম্মদ এনামুল হক বঙ্গে সূফী প্রভাব গ্রন্থে বলেন, ফার্সি শব্দ ‘পির’-এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো ‘বৃদ্ধ ব্যক্তি’।১১ তবে প্রচলিত অর্থে তা প্রযোজ্য নয়। কারণ “আধ্যাত্মিক গুরু অর্থে’ মুসলমান সাধক পীর আখ্যা পেয়ে থাকেন। পীর আধ্যাত্মিক জ্ঞানে মহাজ্ঞানী, শুধু তাই নয়, তিনি অতিমানবিক (Superhuman) এবং অতিলৌকিক (Supernatural) ক্ষমতারও অধিকারী। তিনি পাপীতাপীর মুক্তি ও চিত্তশুদ্ধির পথ দেখান।”১২ মুসলমান পিরের সমার্থক হিসেবে হিন্দুর ‘যোগী’, বৌদ্ধের ‘থের’ প্রভৃতিকে বিবেচনা করা হয়।১৩ আবার সময়ের বিবর্তনে মুসলমান পির কেবল গুরু নন, হিন্দু দেবতার সমরূপ তাঁর স্থান। জীবিত সময়ে গুরু হিসেবে পরিচিত থাকলেও মৃত্যুর পর তাঁরা দেবতারূপ গুরুতে পরিণত হন। “বিশেষ করে, লৌকিক চেতনায় পীরের দেবত্ববাদের ধারণাটি সুস্পষ্ট। বাঙালি জনসাধারণ ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, কাল্পনিক পীরকে দেবতাজ্ঞানে পূজা এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে বিবিধ আচার পালন করে থাকে। সুতরাং বাংলাদেশে পীরবাদ সুফিমতের প্রভাবজাত হয়েও দেবত্ব কল্পনায় একদিকে চূড়ান্ত বিকার ও অন্যদিকে স্বতন্ত্র বিশিষ্টতা লাভ করেছে।”১৪
সমালোচকের মতে, “ব্যক্তি, প্রতীক এবং আত্মা- এ তিনরূপে পীরগণ লোকমনে বিরাজ করছেন। ব্যক্তিত্ব ও অস্তিত্বের দিক থেকে পীরপীরানিগণকে তিন শ্রেণীভুক্ত করা যায় :
এক. ঐতিহাসিক- বদরপীর, মাদারপীর, গাজীপীর।
দুই. পৌরাণিক- খোয়াজ খিজির, হাওয়া বিবি, ত্রিনাথপীর।
তিন. লৌকিক- সত্যপীর, মানিকপীর, সোনাপীর, বনবিবি, জঙ্গলীপীর, মনাইপীর,
ঠুনকাপীর, কাউয়াপীর, নোরাপীর, ঘোড়াপীর।”১৫

ওয়াকিল আহমেদের উপর্যুক্ত শ্রেণিকরণ থেকে লক্ষ করা যায়, সেলিম আল দীনের নাটকনিচয়ে তিনশ্রেণিরই পির-পিরানীর অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে। তাঁর নাটকসমূহে বনবিবি, গাজি পির, খোয়াজ খিজির, মাদার পির, মনাই পির প্রমুখের ভাবাদর্শে দীক্ষিত এবং তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রণত মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে বনবিবির প্রতি সুন্দরবনের বাওয়ালি সম্প্রদায়, খোয়াজ খিজিরের প্রতি জেলে সম্প্রদায়, আর মনাই পিরের প্রতি মানিকগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ এবং গাজি পির ও মাদার পিরের প্রতি বিভিন্ন অঞ্চল ঘিরে রচিত নাটকসমূহে বয়ান লিপিবদ্ধ হয়েছে। নীচে সেলিম আল দীনের নাটকে এ সকল সম্প্রদায়গত ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম প্রকৃতি সম্পর্কিত পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস থাকবে।

 

১.১ বনবিবি
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বনদেবী কিংবা বনদুর্গাই মুসলিম সমাজে বনবিবি নামে পরিচিত। সমালোচকের মতে : “বনদেবতার (sylvan goddess) বিশ্বাস ও পূজা আরণ্যক সমাজের অবদান। ফলমূল সংগ্রহ ও পশুপাখি শিকার দ্বারা যারা জীবিকা নির্বাহ করত তারাই আরণ্যক সমাজের প্রবর্তক, পরিতোষক ও প্রতিপালক।”১৬ আরণ্যক সমাজে মানুষের বৃক্ষপূজার অভ্যন্তর দিয়ে বনদেবীর পূজার উৎপত্তি ঘটেছিল। একসময় মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে বনদেবী হয়ে যায় বনবিবি। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল সুন্দরবন দ্বারা বেষ্টিত। ফলে উক্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণে বনের প্রভাব অত্যাধিক। আর “বনজঙ্গল শাপদসঙ্কুল। অতএব মানব জীবনের নিরাপত্তা সেখানে অনিশ্চিত। বাঘের দেবতা, সাপের দেবতা, কুমিরের দেবতা, বনের দেবতা এ-নিরাপত্তা দিতে পারেন।”১৭ এরূপ বিশ্বাসের ধারায় ধর্ম ভেদে মানুষ বিভিন্ন দেব-দেবী বা পির-পিরানীর পূজা করে থাকে। বনবিবি সুন্দরবন অঞ্চলের মুসলমান সম্প্রদায়ের পূজ্য। তবে সমালোচক গোপেন্দ্রকৃষ্ণ মত প্রদান করেন যে, ধর্ম ও বৃত্তি পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের কাছে পূজিত হন বনবিবি।
সুন্দরবনে যাতায়াতকারীর হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের বাউল, মৌলে, মালঙ্গি, নৌজীবী, শিকারী প্রভৃতি বনের মধ্যে নিরাপদে থাকতে পারে, আর তাদের যাত্রা শুভ হবে সেই বিশ্বাসে বনবিবিকে পূজা দেয়-ভক্তি করে।
বনবিবির আকৃতি অপর লৌকিক দেবতার মত উগ্র বা ভয়াবহ নয়, স্বভাবও তাদের মত প্রতিহিংসাপরায়ণ কি সদাক্রুদ্ধ বলে ভক্তরা মনে করে না। বনবিবি ভক্তবৎসলা ও দয়াবতী এ-ধারণা পল্লীর লোকেদের আছে। এঁর মূর্তিও গঠিত হয় অতি সুশ্রী – পৌরাণিক দেবীদের মতই লাবণ্যময়ী।১৮

অর্থাৎ গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু উপর্যুক্ত মন্তব্যে বনবিবি-বনদেবী কিংবা বনদুর্গাকে সমান্তরালভাবে বিচার করেন এবং একই নামে অভিহিত করার প্রয়াস পান। তাঁর মন্তব্যে বনবিবির স্বভাব ও আচার-আচরণ এবং আকৃতি সম্পর্কেও ধারণা লাভ সম্ভব হয়।
সেলিম আল দীনের করিম বাওয়ালীর শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা নাটকের বিষয় ও চরিত্রাবলি সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে বসবাসরত বাওয়ালিদের জীবনকে আলম্বনপূর্বক বিকশিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই সেই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাসের প্রতিরূপ নাটকে উঠে আসে। নাটকে দেখা যায়, বন ছেড়ে কল-কারখানায় কাজ করতে যাওয়া যুব সমাজকে করিম বাওয়ালি দেখে বনবিবির প্রতি আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাসের পরম্পরায়। তাই সে মনু বাওয়ালিকে বলে : “বনবিবির ভরসা নাই মনে।”১৯ এছাড়াও উক্ত নাটকে বনের গাছ মারা যাওয়া এবং গাছের পাতা হলুদ হয়ে যাওয়ার পেছনেও করিম এবং মনু বাওয়ালি ভাবে যে, বনবিবির প্রতি বনবাসীর আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাসের ফলস্বরূপই এ সকল ঘটনার সূত্রপাত।

 

১.২ মনাই পির
মনাই পির লোক সমাজের। গ্রামীণ সমাজের মানুষ মনাই পিরের ভক্ত। তিনি মূলত সন্তানের দেবতারূপে পূজ্য। “মনাই পীরের উদ্দেশ্যে যে আচার পালন করা হয় তাতে বন্ধ্যা নারীকে সন্তানবতী অথবা নিষ্ফলা গাছকে ফলবতী করার কামনা ব্যক্ত হয়।”২০ ফলে গবেষক মনাই পিরের সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা কার্তিকের সাযুজ্য খুঁজে পান।২১ হিন্দু পুরাণ মতে কার্তিক সন্তানের দেবতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জ-এ মনাই পিরের নামে মানত বা দরগা তোলার চিত্র দেখা যায়। সেলিম আল দীনের বিভিন্ন নাটকে মনাই পিরের উল্লেখ আছে। সেলিম আল দীন মনাই পিরের উদ্দেশ্যে ভক্তদের মৌল অভিপ্রায়ের ধারায় সন্তানের দেবতারূপে চিত্রিত করেননি। বরং তিনি মনাই পিরকে করে তোলেন অসহায় মানুষের পথপ্রদর্শক। অর্থাৎ অসহায় ও বিপন্ন মানুষ মনাই পিরের দ্বারস্থ হয়।
কিত্তনখোলা নাটকে দেখা যায়, ভিক্ষুক ভিক্ষা করার সময় বলে, “মনাই বাপে দোয়া নসীব করবো তারে- আন্ধারে যে দেবেন দুইটা পয়সা কড়ি।”২২ অর্থাৎ মনাই পিরের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ব্যবহারপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে মনোযোগী হয় ভিক্ষুক। কারণ, সে জানে তাতে তার আয় হবে। অন্যদিকে, ইদুকে খুন করে সামাজিক রূপান্তরের আরেকরূপ সম্পর্কে সোনাই মনাই পিরের উদ্দেশ্যে বলে : “মনাই বাবা- মনাই বাবা- ঠাঁই কয়া দেও – ঠাঁই কয়া দেও- তোমার বিচার মেঘের বুকের ঠাডা না- তার জন্য মরণ পইরযন্ত বইসা থাকতে হয়- কেয়ামত নাগে- রোজহাশর নাগে- সে বিচার আমি করছি।”২৩ এখানে সোনাই বিভ্রান্ত হয়ে মনাই পিরের সহায়তা কামনা করে। অর্থাৎ সোনাইয়ের ভাবনায় শেষাবধি মনাই পির দেবতা হয়ে ওঠে।

 

১.৩ খোয়াজ খিজির
বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের বিকাশের কিছুকাল পর খোয়াজ খিজিরের অর্চনার পত্তন। ধারণা করা করা হয় মধ্যযুগের কোনো এক সময়ে এতদ্ঞ্চলে হিন্দুপুরাণ মতে জলদেবতা বরুণই মুসলমান মতে খোয়াজ খিজিরে রূপান্তরিত হয়। প-িতের মতে, নবি ইলিয়াসের রূপক চরিত্র খোয়াজ খিজির। নবি ইলিয়াস ইহুদিদের এলিজার রূপান্তরিত রূপ।২৪ খোয়াজ খিজির এই অঞ্চলে জিন্দাপির হিসেবে পরিচিত। বলা আবশ্যক, জিন্দাপির কে – এ নিয়ে মতভেদ আছে। অঞ্চল বিশেষে গাজি পির এবং মাদার পির জিন্দাপির হিসেবে অভিহিত হন। বাংলাদেশে জলকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে খোয়াজ খিজিরের প্রভাব অধিকভাবে লক্ষ করা যায়। সাধারণ মানুষ ও জেলে সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, খোয়াজ খিজির ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী এবং তিনি তাদেরকে নৌকাডুবি থেকে রক্ষা করবেন ও মৎস্য আহরণে সহযোগিতা করবেন। এছাড়াও খোয়াজ খিজির অঞ্চলভেদে সর্ব-প্রকার বিপদ-আপদ থেকে রক্ষাকর্তা হিসেবেও পূজিত হন। খোয়াজ খিজিরকে স্মরণপূর্বক পূজারিগণ ভাদ্রমাসের শেষ সপ্তাহে ‘রেবা ভাসান’ উৎসবের আয়োজন করে থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও চট্টগ্রামে খোয়াজ খিজিরের প্রভাব বিদ্যমান। সেলিম আল দীনের হাত হদাই, নিমজ্জন ও স্বর্ণবোয়াল নাটকে খোয়াজ খিজিরের প্রতি অর্ঘ প্রদান এবং সমন্বয়ধর্মিতার পরিচয় বিধৃত।
খিজির নবিকে ঘিরে এতদ্ অঞ্চলে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন লক্ষ করা যায় হাত হদাই নাটকে। নাটকে দেখা যায়, সনাতন ধর্মাবলম্বী নারু জলের জীব মৎস্য সম্পদকে খিজির নবির সম্পদ বলে বিশ্বাস করে। তাই সে মাছ শিকারে গিয়ে বলে, “সারা শীতকাল পত্যেক বছর আঁই খাল গাঙ্গের কূলে কূলে খিজির নবীর জীবে গো পিছে ঘুরি।”২৫
খিজির নবি নদী-সমুদ্রের অধিপতি এবং আবেহায়াতেরও উৎসমূল।২৬ সেইসঙ্গে তিনি যে ভক্তদের বিপন্মুক্ত করেন ও সহায়-সম্পত্তি প্রদান করেন- মানুষের এমন বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি সেলিম আল দীনের স্বর্ণবোয়াল নাটকে বর্ণিত আছে। নাটকে দেখা যায়, খোয়াজ খিজিরের উদ্দেশ্যে জেলে পাড়ার নর-নারীরা ‘বেরা ভাসান’ উৎসব পালন করে। তারা মোমবাতি জ্বালিয়ে ভাসিয়ে দেয়ার সময় গায়:
এই না নিলাম খোয়াজ খিজির নিলাম তোমার নাম
তোমার নামে সেজদা দিয়া
বাত্তি বাসাইলাম
ও কি না আ রে।২৭

অর্থাৎ সাধারণের মধ্যে যে বিশ্বাস প্রতিফলিত আছে, সেলিম আল দীন স্বর্ণবোয়ালের উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিদ্বয়ে তারই রূপ বয়ান করেন। ফলে নাটকে সমাজস্থ মানুষের ভাবনার বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপন ঘটে। আবার এতদ্অঞ্চলে বিভিন্ন পিরকে কেন্দ্র করে যে ধর্মীয় সম্প্রীতির রূপ প্রতিফলিত আছে- তা সেলিম আল দীনের হাত হদাই নাটকে মাছ শিকারে গিয়ে নমঃশূদ্র নারুর খোয়াজ খিজির ও কূর্ম-দেবতাকে প্রায় একসঙ্গে প্রণতি জানানোর মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয়ে ওঠে।

 

১.৪ গাজি পির
সাধারণত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে মুসলমান সমাজ বাঘের দেবতারূপে গাজি পিরের পূজা করে থাকে। গাজি পির ‘গাজি সাহেব’ কখনো-বা ‘বড়ো খাঁ গাজি’ নামেও পরিচিত। গাজি পিরকে ঘিরে মধ্যযুগে বাংলায় ‘গাজির গান’ নামক পির পাঁচালির উদ্ভব ঘটে। গাজির গানে মূলত গাজির পরমার্থিক বা অলৌকিক মাহাত্ম্য প্রচার করা হয়। গাজি পির ব্যক্তি মানুষ থেকে পিরে রূপান্তরিত হন। তবে সমালোচকগণের মতে, গাজি পিরের ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে মতভেদ বিদ্যমান। সুকুমার সেনের মতে, চৌদ্দ শতকের পির সফি খাঁ ষোল শতকের দিকে গাজি পিরে রূপান্তরিত হন।২৮ আবার ব্লকম্যানের মতে, পা-ুয়ার বিখ্যাত পির জাফর খাঁ গাজির ছেলে বড়ো খাঁ গাজিই হলেন গাজি পির।২৯ কারো কারো মতে, পনেরো শতাব্দীর রুকনউদ্দীন বারবক শাহের সেনাপতি ইসমাইল গাজিও বড়ো খাঁ গাজি হতে পারেন।৩০ উপরন্তু, শেখ ফয়জুল্লাহকৃত সত্যপীর কাব্য, বিদ্যাপতি রচিত সত্যনারায়ণ পাঁচালীতে বন্দনা অংশে একত্রে উপর্যুক্ত তিনজনকেই স্মরণ করা হয়। ওয়াকিল আহমদ ধারণা করেন যে, গাজি পির উপর্যুক্ত তিনজনের সমসাময়িককালের প্রভাবশালী স্বতন্ত্র পির।৩১ তিনি লিখেন, “গাজীপীরের ঐতিহাসিক পরিচয় থাকলেও লোকচেতনায় তাঁর বাস্তব সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়েছে। তিনি হিন্দুর দেবতার মতো আধ্যাত্মিক আত্মায় পরিণত হয়েছেন। দেবাত্মা রূপেই তিনি ভক্তের শিরনি পেয়ে থাকেন।”৩২ সমালোচকের এই মন্তব্যের সারাৎসার অনুধাবন করা যায় সতের শতকের দিকে বাংলায় গাজি পিরের জীবনকাহিনি কেন্দ্রিক কৃত্যমূলক পির পাঁচালি ‘গাজির গানে’। গাজি পিরের অলৌকিক মাহাত্ম্য ও জীবনকে ঘিরে মৌখিকভাবে প্রচলিত বিভিন্ন পালা তথা পির পাঁচালির সাক্ষাৎ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। পালাগুলোর মধ্যে গাজি পির হিসেবে খ্যাত বড়ো খাঁ গাজী ও কালু গাজির উপস্থিতি দেখা যায়। এবং অধিকাংশ পালার মধ্যেই গাজি পিরকে বাঘের আক্রমণ থেকে মানুষকে রক্ষা করা ও বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত করার বিষয় বর্ণিত হয়েছে।
গাজি পির গ্রামীণ সমাজে হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির ‘সমন্বয়ের অগ্রদূত’।৩৩ গবেষক গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু সংগৃহীত “গাজী মিঞার হাজোত সিন্নি সম্পূর্ণ হল।/ হিন্দুগণে বল হরি মোমিনে আল্লা বল”৩৪ পঙ্ক্তিদ্বয়ে হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির সমন্বয়ধর্মী রূপ সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। সেলিম আল দীনের নাটকের মধ্যেও গাজি পিরের জীবনালেখ্য ঘিরে প্রসারিত গাজির গানের প্রসঙ্গ উপস্থিত। এক্ষেত্রে সেলিম আল দীন সমাজব্যবস্থায় গাজি পিরের গান কেন্দ্রিক সমন্বয়ধর্মিতা যেমন বিবৃত করেন- তেমনি সমাজ মানুষের জন্য কখনো কখনো ক্ষতিকর হিসেবেও গাজির গানকে তুলে ধরেন তিনি। বিশেষত তাঁর যৈবতী কন্যার মন নাটকে গাজির গানের প্রবল স্রোতে ধর্মনিরপেক্ষ পালার প্রতি মানুষের অনাগ্রহ ও শেষাবধি আলালের গাজি পিরে আত্মসমর্পণ এবং কালিন্দীর আত্মহননের মধ্য দিয়ে তাই প্রতীয়মান।

 

১.৫ মানিক পির
অঞ্চলভেদে মানিক পির গরু-বাছুরের রক্ষাকর্তা ও ব্যাধি উপশমের দেবতা হিসেবে পরিচিত। সমালোচকের মতে, “পল্লীসমাজে গোরক্ষনাথই গোরক্ষক দেবতারূপে পূজ্য। নাথধর্মভুক্ত বৌদ্ধরা ইসলামধর্মে দীক্ষা লাভের পর গোরক্ষনাথের ছায়ায় মানিক পীরের কল্পনা করতে পারে।”৩৫ ফকীর মহাম্মদকৃত মানিক পীরের গীত কাব্যে মানিক পিরকে রোগ-ব্যাধির দেবতা হিসেবে অঙ্কন করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলা ঐতিহ্যবাহী নাট্য ‘জাগগান’-এ মানিক পিরকে গরু-বাছুরের রক্ষাকারী হিসেবে চিত্রিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানিক পির মূলত গরু-বাছুর রক্ষাকর্তা রূপেই পূজিত হন। সেলিম আল দীনের চাকা ও ধাবমান নাটকে মানিক পিরের এই রূপটির পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থাৎ গ্রামীণ সমাজে মানিক পির যে গরু-বাছুরের রক্ষাকর্তা; তাই লক্ষ করা যায়, চাকা ও ধাবমান নাটকে। চাকা নাটকে লক্ষ করা যায়, দিনমজুর বাহের গাড়োয়ান মানিক পিরের সেবাইতের দুটি ষাঁড় ভাড়া নিয়ে ধান কাটার উদ্দেশে বের হয়। ষাঁড় দুটি মানিক পিরের সেবাইতের, তাই বাহের গাড়োয়ানের ভক্তি তাদের ওপরও বিদ্যমান। এই ভক্তি-রূপ বাহেরের কথায় অনুমান করা যায়। বাহের গাড়োয়ান যখন অনামা লাশটিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে খানিক ভাঙা রাস্তা পার হয় তখন সে ষাঁড় দুটোকে উদ্দেশ্য করে বলে : “পীরের সেবায়িতের ষাঁড়গো আপনেরা নিজের ভালমন্দ নিজে বুঝে লিবেন* হামাকের যানি গুনা না হয়* লাশের ভেদ আপনেরা হামাকের চায়া বেশী সমঝেন গো।”৩৬ অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ে পিরের প্রতি যতটা ভক্তি, ঠিক তাঁর থানের সেবাইতের ষাঁড়ের প্রতিও ততটাই ভক্তিরূপ প্রকাশিত হয় বাহেরের কথায়। সাধারণের বিশ্বাস আছে যে, মানিক পিরের প্রভাবে তাঁর সেবায়েতের ষাঁড়ের মধ্যেও অলৌকিক গুণাবলি বিদ্যমান। চাকা নাটকে বাহের গাড়োয়ান এই বিশ্বাসেই বলে : “মানিক পীরের ষাঁড় আছে না অন্তরের খবর জানে।”৩৭
অন্যদিকে ধাবমান নাটকে লক্ষ করা যায়, নহবত আলির ষ-মোষ সোহরাবকে কসাই থেকে শুরু করে বাজারের বহু মানুষ ভাবে যে, এটি মানিক পিরের উদ্দেশ্যে মানত করা ষাঁড়। তাই সোহরাবকে দেখে কসাই সুজাত বলে : “দেই পাঁচ টাকা বাইন্ধা। মাদার কি মানিক পীরের মানোত। ওরে জবাইয়ের সওয়াব যেন আমার হয়।”৩৮ এভাবে অঞ্চলভেদে মানিক পীরের ওপর বিশ্বাসের প্রতিরূপ প্রতিফলিত হয় সেলিম আল দীনের নাটকসমূহে।

 

১.৬ বাউল পন্থা
সেলিম আল দীনের নাটকসমূহে আরও এক প্রকার সম্প্রদায়গত লৌকিক ধর্মের প্রভাব লক্ষ করা যায়, তা হলো বাউল পন্থা। বস্তুত, বাউল মতবাদে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়।
বাউল মতবাদের বিকাশ হয় সামন্ত সমাজের শাসকশ্রেণীর প্রতিকূল মতবাদ হিসেবেই। বাউলরা প্রচলিত ধর্ম, জাত বা বর্ণবৈষম্য, দেবদেবী, পূজা-আচার, নামাজ-রোজা, মন্দির-মসজিদ কণ্টকিত সামন্ত সমাজের ধ্যান-ধারণাকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করতেন, এবং সেই ভাবধারাতেই আপ্লুত তাঁদের ‘মনের মানুষ’ এক নতুন মানবতাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সামন্ত সমাজের নিপীড়িত জনমানসে তাই সেই মানুষটি আসন পাততে পেরেছিল। সমাজের অতি দরিদ্র ভূমিহীন নিঃস্ব চাষি ও  তথাকথিত নিম্নজাতি থেকেই বাউলরা এসেছিলেন।৩৯

বাউল মতবাদের উদ্ভব সম্পর্কে বলা হয়, বাংলার মাটি থেকে উৎসারিত এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলামের এক সমন্বয়ধর্মী পন্থা হলো বাউল মতবাদ।৪০ বাউল মতবাদে গান কিংবা স্বীয় প্রচারাভিযানের মাধ্যমে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে সমাজে প্রচলিত ধর্ম, জাতি, সামাজিক রীতিনীতি, নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রভৃতি নানা বিষয় সম্পর্কে মানুষকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তা ছাড়া ধর্মীয় রীতিনীতির ক্ষেত্রে বাউল সম্প্রদায় সমন্বয়ের আদর্শে বিশ্বাসী। তারা যে-কোনো প্রকার আচারসর্বস্ব এবং শারীরিক ক্ষমতার ব্যবহারের বিরোধী। তারই আলোকে সেলিম আল দীনের কোনো কোনো নাটকে বাউল মতবাদের পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়।
বাউল মতবাদে বাংলার সব মানুষ একই আবহাওয়ায়, একই পানিতে গোসল করে, একই পরিবেশে বেড়ে ওঠে; তাই এখানে জাতের প্রশ্ন অবান্তর। উদাহরণ হিসেবে বাউল লালন ফকিরের গানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে : “জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা/ ব্রাহ্মণ চণ্ডাল চামার মুচি/ একই জলে হয় গো শুচি।”৪১
সেলিম আল দীনের স্বর্ণবোয়াল নাটকে লক্ষ করা যায়, বাউল লালন ফকিরের ‘জাত’-বিষয়ক প্রশ্নটি তিরমনের হৃদয়েও জেগে ওঠে। সে তিসিকে বলে : “জাত জিনিসটা কি।”৪২ তিরমন তিসিকে বিয়ে করতে চায়, ধর্মের বাধা সে দূরে ঠেলে দিতে পারে; অথচ জাতের বাধা উপেক্ষা করতে পারে না। তিরমনের ভেতরে জাত-বিষয়ক দ্বিধা তৈরি হয়। সে অপারগ হয়ে তিসিকে বলে : “আহা জাতের বাধা না থাকলে আমি তরে বিয়া করতাম- ধর্ম মানতাম না।”৪৩
উক্ত নাটকেই নায়েবালি বয়াতির অভ্যন্তর দিয়ে আরও এক দার্শনিক তত্ত্বের বয়ান করেন সেলিম আল দীন। নাটকে লক্ষ করা যায়, বাজার থেকে ফেরার পথে নায়েবালি তিরমনকে বলে : “জয় কি পরাজয় কি। সব মিছা কথা বাপজান। জয় পরাজয়ের নৌকা ঐ এক আল্লার এক ঘাটেতেই বান্ধা হয়।”৪৪ অর্থাৎ আপাত বাহ্যিক জগতে জয়-পরাজয় বলে কিছু নেই, সবই ভ্রান্তি- এমন এক মতের প্রতিফলন সমগ্র স্বর্ণবোয়ালে বিদ্যমান। নাট্যকাহিনির শেষার্ধে লক্ষ করা যায়, স্বর্ণবোয়াল শিকার করেও না করতে পারার বেদনা ভুলে তিরমন এক সম্ভ্রম জাগানিয়া মতভেদে। সে পিতা খলিশা মাঝিকে বলে : “তবে শিকার কি বাজান। শিকার বইলা কিছু নাই। আছে পেটের দায়। সেইখানে হারজিত কোনে। কও আমারে- এই ভাবের ভেদটা আমার জনমটারে আলগা এট্টা রঙ দিয়া গেল বাজান- রঙের ছোপ।”৪৫ অর্থাৎ তিরমন শেষাবধি এমন এক উপলব্ধিতে উপনীত হয় যেখানে জয়-পরাজয়ের ভেদ থাকে না। জীবনের এক মহত্তম উপলব্ধি কাজ করে যায় তার চেতনায়। এই চেতনার রূপ স্বর্ণবোয়াল শিকাররত তিরমনের হৃদয়ে জাগিয়েছিল সম্ভ্রম। তাই সে স্বর্ণবোয়ালকে সশ্রদ্ধচিত্তে ‘আপনি’ সম্বোধন করে বলেছিল : “আপনেরে- আপনেই কইলাম। এত ঝিলিক এত নূর শরীর আপনার যদি তবে- হার নাই জিত নাই যদি হার গো মুক্তি মুক্তি দেন আমারে।”৪৬ অর্থাৎ বাহ্যিক পৃথিবী, সংসারের অভ্যন্তরে বাউল মতবাদ যে সমন্বয়ধর্মী এবং ইতিবাচক শক্তি-সাধনা সম্পর্কে সক্রিয়- তারই প্রতিরূপ তিরমনের কথায় অভিব্যক্ত। কিংবা বলা যায়, বাউল মতবাদ মানবজীবন সম্পর্কিত যে ইতিবাচক ধ্যান-ধারণার চর্চা করে- তারই প্রত্যক্ষ প্রভাব সেলিম আল দীনের স্বর্ণবোয়াল নাটকের বিষয়-বিন্যাসের গভীরে প্রতিফলিত।
এছাড়াও সেলিম আল দীনের নাটকে নাথপন্থা, শাক্ত মতবাদ-এ বিশ্বাসী চরিত্রাবলির সঙ্গে লৌকিক তথা সাধারণ মানুষের দেব-দেবীরূপে মনসা, স্বরসতী, কালি প্রমুখের পূজায়রত মানুষের উপস্থিতিও বিদ্যমান। বিশেষত, বনপাংশুল নাটকে মান্দাই নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেখা যায় শৈব বা শাক্ত মতে বিশ্বাস স্থাপন করতে। আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে শূদ্র শ্রেণিজাত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্পদেবী মনসার পূজার প্রচলন আছে। সেলিম আল দীনের যৈবতী কন্যার মন নাটকে বাগদি সম্প্রদায় তথা শ্রীকরের কন্যা শলপীকে দেখা যায় মনসার পূজা করতে। তবে শ্রীকরের আরেক কন্যা কালিন্দী মনসার পূজায় সন্তুষ্ট নয়- সে চায় কালির মতো হতে। আবার তাঁর প্রাচ্য নাটকে লক্ষ করা যায়, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সর্পদেবী মনসাকে পূজা দেয়। দিনমজুর সয়ফরচানের বিয়ের পালকিতে অঙ্কন করা হয় দেবী মনসার ছবি। সয়ফরচান-নোলকের বাসর ঘরের খাটেও টানানো হয় মনসার পটচিত্র। অর্থাৎ প্রাচ্য নাটকে বাংলার মানুষের মধ্যে পরম্পরাগত বিশ্বাসের ধারায় এক সমন্বয়ধর্মী চেতনার প্রতিফলন সক্রিয়। উপর্যুক্ত নানাভাবে সেলিম আল দীনের নাটকসমূহে বঙ্গীয় সমাজে বহমান লৌকিক তথা সাধারণের বিশ্বাসকৃত ধর্মের রূপরীতি প্রতিফলিত আছে।

 

১.৭ সেলিম আল দীনের নাটকে ধর্ম ভাবনার স্বরূপ
সেলিম আল দীনের নাটকসমূহে মানুষের শাস্ত্রীয় ধর্মসমূহের কার্যক্রম সম্পর্কিত বিস্তারিত পরিচয় লভ্য নয় বললেই চলে। অথচ সমাজবাস্তবতায় প্রায় প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো শাস্ত্রীয় ধর্মমতে বিশ্বাসী। তদুপরিও সেলিম আল দীন নাটকের বিষয়-ঘনিষ্ঠতার কারণেই হয়তো-বা শাস্ত্রীয় ধর্মের কার্যক্রমকে বিশেষভাবে প্রতিফলন করেননি। কারণ তাঁর নাটকের মূল উপজীব্য হলো মানুষ। মানুষের জীবনবাস্তবতার আলোকেই তিনি চরিত্রসমূহের ভাবনাকে নাটকে তুলে ধরেন। সে সকল ভাবনাকে ঘিরে সেলিম আল দীনের ধর্ম ভাবনার যে-রূপ অবলোকন যায় তা অনেকাংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম ভাবনার বহিঃপ্রকাশ। সেলিম আল দীন যে-নানাভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা-চেতনাজাত প্রেরণায় অনুপ্রাণিত ছিলেন তা সমালোচকের ভাষায়ও ধ্বনিত। সমালোচকের মতে :
রবীন্দ্র-অন্তঃপ্রাণ আল দীন রবীন্দ্রনাথের মতোই আন্তর্জাতিকতাবাদের দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেও আমরা তার লেখনীকে মহাকাব্যিক প্রয়াসের দিকে এগিয়ে যেতে দেখি। ধর্ম, স্থানীয় মিথ, বিষয়-চরিত্র-সময়ের ব্যাপ্তিতে আল দীন তার প্রয়াসকে অব্যাহত রাখেন।৪৭

লক্ষণীয় যে, সেলিম আল দীনের রচনায় ধর্ম ও মানুষ সম্পর্কিত যে দার্শনিক অভিপ্রায় নিহিত- তার মূলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব বিরাজমান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিসর্জন, অচলায়তন, মুক্তধারা, ডাকঘর প্রভৃতি নাটকে সনাতনপন্থা বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে দেখেছেন প্রচলিত মানুষের জীবনযাত্রার পশ্চাৎপদ ভাবনা ও মানবশৃঙ্খল হিসেবে। সেলিম আল দীনের বনপাংশুল নাটকেও অনুরূপভাবে সনাতন ভাবনা ও বিশ্বাসের কারণে মানবজীবনের আর্তনাদ কীভাবে প্রকটিত হয়ে ওঠে- তা অনুধাবন করা যায়।
বনপাংশুল-এ দেখা যায়, দাদা গুণীনের আবিষ্কৃত ধর্মীয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ সুকি। সে ধর্মের আবদ্ধে শিবের কুচুনীরূপে জীবন অতিবাহিত করার পরিবর্তে মানবিক জীবনধারণে আগ্রহী। শিবের কুচুনী বিষয়ে গুণীনের গল্পটাকে সুকি নিজেও বিশ্বাস করে না। কিন্তু সম্প্রদায়গত বিশ্বাসকে দূরেও সরিয়ে দিতে পারে না। তাই সে তার আরাধ্য অনিল কোচের কাছে জানতে চায়: “আমারে নিয়া যে গল্পটা বানছে দাদায় তা কি তোমার বিশ্বাস হয়॥ […] এই যে শিব দরশন দিয়া বলেছে সুকির আর বিয়া হবে না। সুকি হল গিয়া শিবের কুচুনী।”৪৮ প্রত্যুত্তরে অনিল কোচের কথায় সম্প্রদায়গত বিশ্বাসের প্রতিফলন দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায়। সে বলে : “বেবাক মানুষ যা বিশ্বাস করে তারে কি ধানের ভূষি উড়ায়ে দেওন যায়।”৪৯ অর্থাৎ সনাতনপন্থা তথা বিশ্বাসই এখানে সুকির মানবিক চাহিদাকে নিষ্পেষিত করে চলে।
কার্ল মার্কস ধর্ম প্রসঙ্গে গ্রন্থে বলেন : “ধর্ম হল জনগণের জন্যে আফিম।”৫০ অর্থাৎ ধর্ম মানুষের কাছে নেশা জাতীয় দ্রব্যের মতো প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। সেলিম আল দীনের কেরামতমঙ্গল নাটকে তারই প্রতিরূপ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে, মুসলমান মির্জা কূটকৌশলে দরিদ্র শ্রমজীবী কৃষকদের মনে ধর্মীয় উন্মাদনায় ‘নকলা’ খণ্ডে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করার মধ্যে- উপর্যুক্ত কথার প্রতিফলন আভাসিত।
আবার ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকা রাজনীতিকদের সম্পর্কে সেলিম আল দীনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত হয়ে আছে কেরামতমঙ্গল, নিমজ্জন ও ধাবমান নাটকে। তাঁর দিনলিপিতে এ সম্পর্কিত ধারণা পাওয়া যায়। তিনি দিনলিপিতে বলেন :
রাষ্ট্রতন্ত্র কি পরাজিত হয় নি ধর্মের কাছে? নইলে ধর্মের হাতে ক্ষুর উঠে কেন! আর এরা নির্বাচন, মেনিফেস্টো সব কিছুতে ধর্মতন্ত্রকে উচ্চে তুলে ধরে। কুসংস্কারারাচ্ছন্ন সম্পদলোভী কিছু মানুষ ধর্মকে অমর্ত ফল জানে- ফল এই করে সম্পদ লুট করা যায়, নারীর সম্ভ্রম হরণ করা যায় ধর্মাশ্রিত বিবেকের কাছে এই বলে সান্ত¦না মেলে যে, যা করা হলো ধর্মেরই নামে।
এ সবের দায়ভাগ এই উপমহাদেশের কুষ্ঠাক্রান্ত মুখাবয়ব রাজনীতিকদের নিতে হবে।৫১

অর্থাৎ সেলিম আল দীন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি যে-কোনো পন্থায় মানববিনষ্টিরও বিরোধী। ফলে, তাঁর নাটকে মানব ভ্রুণবিনষ্টির মতো ঘটনাও পরম মমতায় স্থান পায়। লক্ষণীয় যে, ধর্মের ব্যবহারে মানুষের সৃষ্ট নানাবিধ কর্মকা-কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও দেখেছেন ভিন্নচোখে; অনেকটাই নেতিবাচকরূপে। ফলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপের সুরে বলেন :
ধর্মকেই মানুষ সংসারের সর্বাপেক্ষা জটিলতা দ্বারা আকীর্ণ করিয়া তুলিয়াছে। তাহা অশেষ তন্ত্রে-মন্ত্রে, কৃত্রিম ক্রিয়াকর্মে, জটিল মতবাদে, বিচিত্র কল্পনায় এমনি গহন দুর্গম হইয়া উঠিয়াছে যে, মানুষের সেই স্বকৃত অন্ধকারময় জটিলতার মধ্যে প্রত্যহ এক-একজন অধ্যবসায়ী এক-এক নূতন পথ কাটিয়া নব নব সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করিতেছে। সেই ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায় ও মতবাদের সংঘর্ষে জগতে বিরোধ-বিদ্বেষ অশান্তি-অমঙ্গলের আর সীমা নাই।৫২

অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরোক্ষভাবে ধর্ম সম্পর্কে উদার ও মানবতন্ত্রী মতবাদের কথা বলেন। সেলিম আল দীনও তাই। অধিকন্তু, তাঁদের দুজনের কেউই ধর্মবিরোধী নয়। বরং তাঁদের মত ও বিশ্বাসে ধর্ম হয়ে ওঠে ব্যক্তিক কার্যক্রম এবং বিশ্বাস। ফলে তাঁরা সমাজ এবং বৃহত্তর পরিবেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমর্থন করেন। আর মানবতাবাদের প্রসারে মনোযোগী হন। বলা বাহুল্য, “ইউরোপের নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রভাবে উৎপত্তি ঘটেছিল মানবজাতির স্বার্থ এবং কল্যাণ সংক্রান্ত মতবাদ মানবতাবাদের।”৫৩
মূলত ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ-এর মতবাদ হলো মানবতাবাদী ধর্ম। বস্তুত, “যে ধর্ম সর্ব অতীন্দ্রিয় ব্যাপারকে বাতিল করে প্রধানত মানবজাতির কল্যাণবৃদ্ধিতেই সচেষ্ট হয়, তাকেই বলা হয় মানবতাবাদী ধর্ম।”৫৪ সেলিম আল দীনের রচনার অভ্যন্তরে মানবতাবাদী ধর্ম দর্শনের প্রতিফলনই দৃষ্ট হয়। তাঁর নাটকে শাস্ত্রীয় ধর্মীয় কর্মকা- যেমন অনুপস্থিত বললেই চলে, তেমনি শাস্ত্রীয় ধর্মকে ব্যবহারপূর্বক একশ্রেণির মানুষের স্বার্থ উদ্ধারের নানামাত্রিক চিত্রও উঠে এসেছে।
সমালোচকের মতে, “সমাজের নিম্নবিত্তের মানুষের নিকট জীবনসংগ্রামে টিকে থাকা বড় কথা, ধর্ম নয়। ধর্ম বরং তাদের কাছে বাহ্যিক অলংকার। প্রান্তিক জনগণ একদিকে ধর্মীয় কুসংস্কারে যেমন বিশ্বাসী তেমনি জীবনের তাগিদে তারা যখন তখন ধর্মের বর্ম খুলেও ফেলতে পারে। জীবনের পরিচয় এখানে মারি ও মন্বন্তরে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় মূর্ত।”৫৫ সেলিম আল দীনের হাত হদাই নাটকে নমঃশূদ্র নারুর ক্ষুধার জ্বালায় কূর্ম অবতার তথা কচ্ছপ শিকার, কিত্তনখোলার ছায়ারঞ্জনের মুসলমান হতে চাওয়া, বনপাংশুলের পশুপতির শিবপূজা ত্যাগ করে সনাতন ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ এবং গৃহে কালিমূর্তি প্রতিষ্ঠা, হরের ভাই হরির খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ, কেরামতমঙ্গল নাটকে গারো সম্প্রদায়ের কারো কারো ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিষ্টানধর্মে বিশ্বাসী হয়ে ওঠা- এসব কিছুর পেছনেই মূলত দারিদ্র্য মূল কারণ হিসেবে বিবেচ্য। তা ছাড়া একথা তো সকলেই অবগত যে, বঙ্গ ভূখণ্ডের বিভিন্ন রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ধর্মান্তরিত হওয়ার পেছনে যতটা শাসকগোষ্ঠীর প্রভাব বিরাজমান ছিল, তারচেয়ে অধিকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল দারিদ্র্য থেকে মুক্তিজনিত মানব ভাবনা।
সেলিম আল দীনের নাটকসমূহে ধর্মকে অনেকটা দ্বৈতদৃষ্টিতে বিচার করার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। তিনি ধর্মীয় বিধির নেতিবাচক প্রভাবগুলো মানুষের জীবনে কী ভূমিকা রাখে- তা তুলে ধরেন। কিংবা বলা যায়, সেলিম আল দীন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোয় ধর্মের বিধি-বিধানকে নাটকে বয়ান করেন। ফলে শৈব-মতাবলম্বী কোচ বা মান্দাই জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসজাত নিয়ম-শৃঙ্খলা একজন নারীর বাস্তবিক জীবনবোধকে কীভাবে অসহনীয় করে তুলতে পারে- তা তিনি অনায়াসে বিবৃত করার প্রয়াস পান বনপাংশুল নাটকে। এবং নাটকের অন্তে মান্দাই জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস তথা গুণীনকৃত শিবের কুচুনী-বিষয়ক গল্পটি যে মিথ্যা- তা সুকির বেদনাসিক্ত জীবন পরিক্রমায় প্রমাণ হয়। নাটকে দেখা যায়, বাঙালি মহাজনের লাঠিয়াল কর্তৃক ধর্ষিত হয় সুকি- আর অনিল কোচ সুকিকে বিয়ে করে। অথচ, এই অনিল কোচ একসময় বিশ্বাস করতো যে সুকি শিবের কুচুনী, তাই সুকির প্রতি যে-কোনো প্রকার কামনা-বাসনা পাপ। বনপাংশুল নাটকে বর্ণিত গুণীনের এই উপাখ্যানটি সম্পর্কে সমালোচকও অনুরূপ মত প্রদান করেন।
পুর্ণযৌবনা সুকি নিজের সত্তায় তীব্র কামনা অনুভব করে কিন্তু অলৌকিকভাবে তার পরিতৃপ্তি ঘটেনা। আসঙ্গ লিপ্সায় সে শিবকে কামনা করে ব্যর্থ হলে অবিশ্বাস তাকে ভর করে। ফলে পূর্ববর্তী লোক পুরাণটির সঙ্গে সঙ্গে গুণীনের সৃষ্ট পুরাণের দ্বন্দ্ব সৃষ্ট হয় অনায়াসে। নাটকের শেষে গুণীন সৃষ্ট উপাখ্যানটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।৫৬

সেলিম আল দীনের কোনো কোনো নাটকে ধর্মীয় সহাবস্থানের চিত্রকে তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচক গোলাম মুরশিদ প্রাচীন বাঙালি কবির চেতনায় যে ধর্মের সমন্বয়কে লক্ষ করেন, তার স্বরূপ সেলিম আল দীনের রচনায়ও প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রাচীন বাংলার কবির সমন্বয়ধর্মী মনোভাব সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ লিখেন-
বঙ্গদেশে সহজিয়া, নাথযোগী, বাউল, কর্তাভজা, সাহেবধানী, মুরশিদী, মাইজভা-ারী ইত্যাদি বহু ধর্মসম্প্রদায়ের উদ্ভব হতে দেখি। তাও এই সমন্বয়ধর্মিতা থেকেই জন্ম ছিলো। সত্যপীর অথবা সত্যনারায়ণ; বনদুর্গা অথবা বনবিবি; দক্ষিণরায় অথবা গাজী পীরের জন্ম হয়েছিলো বাংলার সমন্বয়ধর্মী নরম মাটিতে। এই মাটিতে জন্ম-নেওয়া কবি তাই এমন দেবতার কথা ভাবতে পেরেছিলেন, যে-দেবতার অর্ধেক কৃষ্ণ, অর্ধেক মহাম্মদ।৫৭

সেলিম আল দীনের হাত হদাই নাটকে নমঃশূদ্র নারুর পাশে আনার ভাণ্ডারিসহ অন্যান্য মুসলমান, বনপাংশুল নাটকে কোচগণের পাশে মুসলমান লুৎফর মাস্টার, নাট্যঅন্তে মান্দাই নারী সোনামুখিকে লুৎফর মাস্টারের বিয়ে করা, প্রাচ্য নাটকে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সর্পদেবী মনসার উপর বিশ্বাস, স্বর্ণবোয়ালে নিকারি পাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং মুসলমানদের সহাবস্থান প্রভৃতি আলোকে বলা যায়, সেলিম আল দীন ধর্মনিরপেক্ষতাকেও গুরুত্ব প্রদান করেছেন। কেননা :
ধর্মনিরপেক্ষতা নাস্তিকতা নয়, আবার সমান ধর্মের সমমর্যাদা কিম্বা সমন্বয়ও নয়, এমনকি অসাম্প্রদায়িকতাও নয়, যদিও অসাম্প্রদায়িকতা এর একটা বৈশিষ্ট্য বটে। ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ধর্মের বিরাষ্ট্রীয়করণ, অর্থাৎ ব্যক্তিগতকরণ। ধর্ম মানুষের ব্যক্তি ব্যাপার, এতে রাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই, কৌতূহলও নেই, এটাই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রথম কথা।৫৮

অর্থাৎ সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করলে সেলিম আল দীন ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয়রূপেই নাটকে বর্ণিত করতে প্রয়াসী। তাই এই বিবেচনায় তাঁর ধর্ম ভাবনাকে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বলেও অভিহিত করা যায়। তবে, ধর্মনিরপেক্ষতার অভ্যন্তর দিয়েও সেলিম আল দীন রচনায় বাঙালির সমন্বয়ধর্মী চেতনার রূপ প্রস্ফুটিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।
এ সকল পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় লক্ষ করা যায়, সেলিম আল দীন নাটকে কোনো শাস্ত্রীয় কিংবা লৌকিক ধর্মীয় মতবাদের দর্শন প্রচারে মনোনিবেশ করেননি। বরং প্রতিটি ধর্মীয় মতবাদে বিরাজমান অসংগতি কিংবা ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চিত্রকে প্রায়শ তুলে ধরেন মানবজীবন বিকাশের পরিপন্থিরূপে। তাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে মানবতাবাদী ধর্মীয় দর্শনের অভিপ্রায় বলে গণ্য করা যেতে পারে।

 

টীকা ও তথ্যপঞ্জি
১. “Ritual is a repeated action aimed at producing the same effect again and
again. It is basically irrational, but it is also basically insistent. The effect
can be gained only when the process is repeated exactly in all its details.”
-Kenneth M. Cameron, J.C. Hoffman, A Guide to theatre Study, New
York, page- 36.

২. রণজিৎ কর, সনাতনধর্ম : মত ও মতান্তর, সূচীপত্র, ঢাকা, ২০০৫, পৃ. ১৭।
৩. মাহমুদা ইসলাম, সমাজ ও ধর্ম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭৩, প্রসঙ্গ-কথা দ্রষ্টব্য।
৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮-৯।
৫. রণজিৎ কর, সনাতনধর্ম : মত ও মতান্তর, পৃ. ২৫।
৬. সুধীর চক্রবর্তী, গভীর নির্জন পথে, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০২, পৃ. ২২-২৩।
৭. পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ‘জাতি ও নিম্নবর্গের চেতনা’, জাতি, বর্ণ ও বাঙালি সমাজ, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিজিৎ দাশগুপ্ত (সম্পাদিত), আই সি বি এস, দিল্লি, ১৯৯৮, পৃ. ৮০।
৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৯।
৯. ওয়াকিল আহমেদ, বাংলার লোক-সংস্কৃতি, গতিধারা, ঢাকা, ২০১২, পৃ. ১৯৫।
১০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৫-১৯৬।
১১. মুহম্মদ এনামুল হক, বঙ্গে সূফী প্রভাব, র্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০০৬, পৃ. ২৩০।
১২. ওয়াকিল আহমেদ, বাংলার লোক-সংস্কৃতি, পৃ. ১৯৬।
১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৬।
১৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৭।
১৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৩।
১৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৭
১৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৮
১৮. গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু, বাংলার লৌকিক দেবতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৮, পৃ. ২৯।
১৯. সেলিম আল দীন, নাটক সমগ্র ১, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০১৩, পৃ. ১৪৪।
২০. ওয়াকিল আহমেদ, বাংলার লোক-সংস্কৃতি, পৃ. ২৩১।
২১. “মনাই লৌকিক পীর। তিনি সন্তানের দেবতা রূপে কল্পিত। হিন্দুর কার্তিকের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য আছে। কার্তিক সন্তানের দেবতা আর ষষ্ঠী সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের দেবী। মনাই পীরের উদ্দেশ্যে যে আচার পালন করা হয় তাতে বন্ধ্যা নারীকে সন্তানবতী অথবা নিষ্ফলা গাছকে ফলবতী করার কামনা ব্যক্ত হয়। এদিক থেকে কার্তিকের সঙ্গে মনাই পীরের অধিক সাদৃশ্য।”
-প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩১।
২২. সেলিম আল দীন, নাটক সমগ্র ১, পৃ. ৪২৯।
২৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০৩।
২৪. James Hastngs (ed.), Encyclopedia of Religion and Ethics (ERE), vol. VII. Page 694.
২৫. সেলিম আল দীন, হাত হদাই, পৃ. ৫০।
২৬. A. R. Malik, British Policy and the Muslims in Bengal, p. 16.
২৭. সেলিম আল দীন, স্বর্ণবোয়াল, সময়, ঢাকা, ২০০৭, পৃ. ১০১।
২৮. সুকুমার সেন, ইসলামী বাংলা সাহিত্য, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃ. ১০৬।
২৯. H. Blochmann, “Notes and some Arabic and Persian Inscriptions in the Hugli District”, Journal of the Asiatic Society of Bengal, Part 1, No. IV, Calcutta, 1870, p 280-282.
৩০. মুন্সী ওয়াজেদ আলী (মতান্তরে ফকীর গরীবুল্লাহ), সত্যপীরের পুঁথি, বটতলা, কলকাতা, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ, পৃ. ২৩।
৩১. ওয়াকিল আহমেদ, বাংলার লোক-সংস্কৃতি, পৃ. ২১০।
৩২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১
৩৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১১।
৩৪. গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু, বাংলার লৌকিক দেবতা, পৃ. ২৯।
৩৫. ওয়াকিল আহমেদ, বাংলার লোক-সংস্কৃতি, পৃ. ২২৮।
৩৬. সেলিম আল দীন, চাকা, গ্রন্থিক, ঢাকা, ১৯৯১, পৃ. ১৭।
৩৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।
৩৮. সেলিম আল দীন, ধাবমান, জাগৃতি প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৭০।
৩৯. ওয়াকিল আহমেদ, বাউল গান, ঢাকা, ২০০০, পৃ. ৬৬।
৪০. “Baul is a mystic – religious cult which flourished on the soil of Bengal during the early process of Hindu-Buddhist-Islamic synergy.”
-Samia Dasgupta (translated and introduced), Songs of Lalon, Shahitya prakash, Dhaka, 2000, page- 15.
৪১. আবুল আহসান চৌধুরী (সম্পাদিত), লালন সমগ্র, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৩৫৪।
৪২. সেলিম আল দীন, স্বর্ণবোয়াল, পৃ. ৯০।
৪৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯১।
৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৬।
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪২।
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫।
৪৭. মাসউদ ইমরান মান্নু, ‘সেলিম আল দীনের নাটকে বি-উপনিবেশীকরণ এবং এথনিক-থিয়েটার হেজিমনি’ সোহেল হাসান গালিব (সম্পাদিত), বনপাংশুল, দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, (নভেম্বর-ডিসেম্বর- ২০০৯), ঢাকা, পৃ. ৩৬।
৪৮. সেলিম আল দীন, বনপাংশুল, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০০১, পৃ. ৪০।
৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০।
৫০. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডারিক এঙ্গেলস, ধর্ম প্রসঙ্গে, প্রগতি, মস্কো, ১৯৮১, পৃ. ৪০।
৫১. সেলিম আল দীন, দিনলিপি, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৯, পৃ. ৫৭।
৫২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রসমগ্র, খ- ৭, পাঠক সমাবেশ, ঢাকা, ২০১১, পৃ. ৪৬১।
৫৩. হারুনুর রশীদ, রাজনীতিকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৩১৭।
৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১৭।
৫৫. অনুপম হাসান, ত্রয়ী নাট্যকার : মুক্তিযুদ্ধ ও ব্রাত্যজন কথা, শোভা প্রকাশ, ঢাকা, ২০১৪, পৃ. ৬৫।
৫৬. লুৎফর রহমান, কালের ভাস্কর সেলিম আল দীন, রোদেলা, ঢাকা, ২০০৯, পৃ. ১৬০।
৫৭. গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি; অবসর, ঢাকা, ২০০৬, পৃ. ৫০৩।
৫৮. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাঙালীর জাতীয়তাবাদ, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ২০১১, পৃ. ৩০৭।

দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments