পাঁচটি প্রশ্ন

সৃজনশীল বই একটা সমাজের সবাই পড়ে না

শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ | 455 বার

সৃজনশীল বই একটা সমাজের সবাই পড়ে না

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা। আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি তরুণ লেখক মুহম্মদ নিজাম-এর


 

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
প্রথম বই ঝড় ও জনৈক চিন্তাবিদ। দীর্ঘ তিন বছর সময় নিয়ে লেখা। শুরুতে ভেবেছিলাম, এত ভালো একটা বই আমি লিখছি, যেকোনো প্রকাশনী একবার এর সন্ধান পেলে একেবারে লুফে নেবে! ২০১৩ সালের দিকে এই বইয়ের সন্ধান দিতেই হয়তো, এক বন্ধুকে নিয়ে আজিজ সুপারে একটা প্রকাশনীতে গেলাম। প্রকাশক পাত্তা দিলেন না। সেখান থেকে ব্যর্থ হয়ে গেলাম কাওরান বাজার। ব্যর্থ আবারও! এরপর আরও দুইটা জায়গায় গেলাম। বন্ধু সবুর তালুকদার ততক্ষণে হতাশ। এইভাবে প্রত্যাখাত হব ভাবতেই পারিনি আমরা। মানে, কেউ পাণ্ডুলিপিই দেখতে চাইছে না।

 

সবুরকে হলে পাঠিয়ে আমি তখন একটা রিকশা নিয়ে বাংলাবাজার চলে গেলাম। অনেকগুলি প্রকাশনীতে গিয়ে হানা দিলাম। আমি চাইছিলাম, কেউ যেন অন্তত প্রথম পৃষ্ঠাটা পড়ে। কিন্তু না, তার আগেই তারা বলছিল, হবে না। অন্য কোথাও দেখুন। কেউ কেউ আবার খরচাপাতি নিয়ে আসছি কি না জানতে চাইছিল। খরচা নিয়ে যাওয়া মানে বই প্রকাশের টোটাল টাকাটা নিজের পকেট থেকে দেওয়া। এইটা তো আমার কল্পনাতেও ছিল না! বিফল হয়ে ফিরে এলাম। বাসা থেকে সবাই জানতে চাইছিল, বই প্রকাশের কী খবর? ছাপাবে? নিয়েছে কেউ? সরাসরি উত্তর দিলাম না। বললাম, পত্রপত্রিকায় গল্প দিয়ে পাঠক তৈরি করতে হবে আগে। এরপর বই আনতে হবে।

 

বাংলাবাজার থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার সময় নিজেই আসলে এই ফন্দিটা ভেবে রেখেছিলাম। এরপর কিছুদিন পত্রিকায় গল্প দিলাম। ছাপা হচ্ছিল। পনের সালের জানুয়ারি মাসে আবারও পাণ্ডুলিপি এবং টাকা নিয়েই বাংলাবাজারে গেলাম। বই ভালো লিখেছি বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু এই বইটাকে লখিন্দরের মতো সাপেকাটা লাশ ভেবে বেহুলার মতো দেবতাদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা মাগার ইচ্ছে হয়নি। কেননা, আমার চোখে কাউকেই তখন দেবতা মনে হয়নি। সেই তুলনায় টাকাটা সস্তা ও সহজলভ্য ছিল। শুধু বই ছাপানোর জন্যে নয়, প্রথম বই প্রকাশ উপলক্ষে বন্ধুরা মিলে উল্লাস করব, খানাপিনা করব, এইজন্যে আরও প্রায় অর্ধলক্ষ টাকার বাজেট করেছিলাম তখন।

বই ছাপা হয় পনের সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন আমার মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলে। ব্যস্ত ছিলাম খুব, তবুও তৃপ্তি পেয়েছি। দীর্ঘ শ্রম ও সাধনালব্ধ একটা লেখা চমৎকার পেইজে, চমৎকার একটা মলাটে বন্দি হয়ে বই আকারে আমার হাতে এসে উঠল। হাতে আমার কাঁপুনি শুরু হয়ে গিয়েছিল! প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, এই বইটার দ্বিতীয় এডিশন আসে উনিশ সালের শেষের দিকে বায়ান্ন (‘৫২) থেকে। পত্রপত্রিকা এবং অনলাইনে লেখালেখির সুবাদে ততদিনে আমার কিছু পাঠকও তৈরি হয়ে গেছে আর আমাকে তখন নিজের পকেট থেকে কোনো ধরনের খরচাপাতিও বের করতে হয়নি!

 

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বই পড়ার অভ্যাসটা তৈরি হয়েছিল। একদিকে নিজের চারপাশে বিদ্যমান আদিম রহস্যঘেরা হাওরে পৃথিবী, অন্যদিকে বইপত্রের ভাঁজ থেকে উঠে আসা ইতিহাস, বিজ্ঞান, শিল্প ও কল্পনার রঙে রঙিন সুন্দরতম আরেকটা পৃথিবী। দিনরাত এইসব ব্যঞ্জনায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। সবসময় ইচ্ছে হতো খুব বড় কিছু একটা করে দেখাই।

জ্ঞান হবার পর, আরও একটু বয়স হবার পর বুঝতে পারলাম, নিজের জীবনটাকে অর্থবহ করার জন্যে কিছু একটা করতে হবে আমাকে। সম্ভাব্য অনেকগুলো সুন্দরতম পন্থার মধ্যে একটা হতে পারে, লেখালেখি করা। বুকের ভেতর জমাটবাঁধা মুগ্ধতা, আলো ও অন্ধকারকে প্রকাশ করার একটা সুযোগ পাওয়া যায় এতে। এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করার ইচ্ছে হলো না। লিখতে শুরু করলাম। তারপর ক্রমে ক্রমেই এটা নেশা এবং পেশার সাথে যুক্ত হয়ে গেল।

 

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
লেখার জগতে আসার পর প্রায় প্রতিনিয়তই নানা ধরনের অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, এখনও হচ্ছি। প্রথম বইয়ের স্মৃতি নিয়েই একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। বইটা ছাপা হবার পর, অনেকেই মেলার মাঠে ছুটে গিয়ে অত্যন্ত আগ্রহের সাথে কিনে নিয়েছে। অনেকে সৌজন্য সংখ্যা চেয়ে বিড়ম্বিত করেছে। সৌজন্য শিকারিদের অনেককেই অনেক সময় ইগনোর করা যায় না। দিতে হয়। এমনই একটা সৌজন্য সংখ্যা লেখা বই একবার নীলক্ষেতে একটা পুরনো বইয়ের দোকানে পেয়ে গেলাম। আমার খুব কষ্ট হলো। এমন ভালোবাসার একটা জিনিস, আবদার করে নিয়ে গেল, আমিও তার উপর অটোগ্রাফসহ কত ভালো ভালো কথা লিখে দিলাম, সেই বইটা তারা বিক্রি করে দিলো? এটা একজন লেখকের জন্য লজ্জার ব্যাপার বলে জ্ঞান করলাম। বইটা নীলক্ষেতের সেই দোকান থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য আমিই আবার কিনে নিতে চাইলাম।

দোকানির কাছে জানতে চাইলাম, ‘দাম কত?’

উত্তর এলো, ‘নব্বই টাকা।’

কিছুটা ধমকের সুরেই বললাম, ‘এই মিয়া, অখ্যাত লেখকের এই অখ্যাত একটা পুরনো বই, নব্বই টাকা কীভাবে হয়? চল্লিশ টাকা দেই, দিয়ে দাও!’

দোকানী বলল, ‘হবে না। এই বইয়ের মলাটের দামই আছে পঞ্চাশ টাকা। বইয়ের গেট-আপ দেখছেন?’

তখন আমার বেকারত্বের কাল। পকেটে আছেই মাত্র পঞ্চাশ টাকা। সুতরাং বই না কিনেই চলে এলাম। এই ঘটনার দেড় বছর পর একটা চমৎকার ব্যাপার ঘটল। বইমেলায় অগ্নিপুরাণ এসেছে। প্রচুর পাঠক আসছে, অগ্নি নিচ্ছে। একজন এলো ঝড়ের সেই পুরনো কপিটা নিয়ে। অটোগ্রাফ চাইল। উপরে সৌজন্য-সংখ্যা লেখা পাতাটা ছিঁড়ে ফেলে আমি আবার অটোগ্রাফ দিলাম। আমার মতো সামান্য একজন মানুষের জীবনে, বই নিয়ে এর চাইতে মধুর ও মহৎ স্মৃতি আর কিছুই হতে পারে না।

 

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশের সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
এই ক্ষেত্রে আমি দেখেছি, আমার উত্তরটা অন্য অনেকের সাথেই মিলে না। অনেকেই মনে করেন, বই এখন মানুষ আগের চাইতে কম পড়ছে। আমার অবজারভেশন ভিন্ন কথা বলে। সৃজনশীল বই একটা সমাজের সবাই পড়ে না। যারা পড়ে, তারা সংখ্যায় আগের যেকোনো কালের চাইতে এখনও অনেক অনেক বেশি। ইদানীং লক্ষ্য করছি, সৃজনশীল বই পড়া যে একটা আর্ট, নতুন প্রজন্মের পাঠকেরা তা বুঝতে শিখেছে। এই আর্টের কথা তারা সাধ্যমতো প্রচারও করে বেড়াচ্ছে। আর যদি লেখকদের কথা বলি, আমার ধারণা বাংলাদেশে এখন একটা চমৎকার বিল্পবের কাল চলছে। সাহিত্যের অনেকগুলি জনরা নিয়ে এখন ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে, এর আগে যা হয়নি। অনেক বেশির মধ্যে মন্দ লেখাও বেরুচ্ছে। কিন্তু মন্দগুলিকে একপাশে সরিয়ে রাখলেও যে পরিমাণ শিল্পমানসম্পন্ন লেখা আমরা দেখতে পাই, তাতে মুগ্ধ এবং আশাবাদী না হয়ে উপায় থাকে না। সুতরাং সবদিক বিবেচনা করে, বাংলাদেশে সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ খুবই চমৎকার বলেই রায় দিতে বাধ্য হচ্ছি।

 

প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?
এত এত গল্প পেছনে ফেলে এসেছি, তা নিয়ে দীর্ঘ কলেবরে একটা উপন্যাস লিখতে চাই। এই বইটা লেখার জন্যেই মূলত এতগুলি বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রস্তুতি পর্ব সাঙ্গ হয়নি এখনও। প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে, খুব আশায় আশায় থাকি, কখন মনে হবে, যোগ্য হয়ে উঠেছি! যেন, আমি আমার সমস্ত আয়ুকাল ধরে পেছনে ফেলে আসা সবচাইতে সুন্দর গল্পটা লিখতে বসতে পারি…

Facebook Comments Box