সুমন কুমারের ছোটোগল্প শুভযাত্রা

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০ | ৩:১৮ অপরাহ্ণ | 565 বার

সুমন কুমারের ছোটোগল্প শুভযাত্রা

শুভযাত্রা

॥ সুমন কুমার ॥

১.
পাড়ার মোড়ে ছোটো দোকানটিতে গোবরের ঘুটের চুলায় চায়ের জল গরম হচ্ছে। পাশেই ‘নিত্যকালী’ মন্দির। দুজন মধ্য বয়স্ক লোক গামছা গায়ে ষোলগুটি খেলায় ব্যস্ত। পাশে ভিড় করে দর্শকও জমেছে। সে সময় খায়রুল ইসলাম দোকানে ঢুকে এককাপ চায়ের অর্ডার দেয়। চায়ের গ্লাস হাতে নিতে নিতে জিজ্ঞাসা করে, ‘এ পাড়ায় ভালো কীত্তন গায়-দশ এগারো বচরের মেয়ে, বাড়ি কোন দিকে?’
ষোলগুটির এক খেলোয়াড় জবাব দেয়, ‘ওই তো ওদিকে, মন্দিরের ডানপাশের রাস্তায় কয় পা আগোলি পরে বেলগাছওলা বাড়ি।’
পাশেই বাঁশের চরাটে বসা বৃদ্ধ লোকটি বলে, ‘তা মশায়ের ঠিকানা?’
‘বেশিদূর না, মদুখালি।’ খায়রুল জবাব দেয়।
‘কী করা হয়?’ বৃদ্ধলোকটি আবার প্রশ্ন করে।
‘কীত্তন দলের সরকার।’ চায়ের কাপ রাখতে রাখতে সংক্ষিপ্ত উত্তর খায়রুলের।
দোকানি বলে, ‘ওই তো মাখন বিশ্বেসের মাইয়ে-নারায়ণী, গলা আসলেই ভালো। তা নিতি আয়েচেন, তাই না? কিন্তু সে তো বায়নায় যায় না।’
খায়রুল টাকা মিটিয়ে বের হয়ে পড়ে।
ঢেউটিনের ছোট ছাপড়া ঘর। বড়জোর সতের বন্দের হতে পারে। পাশেই আধপড়া রান্নাঘর, তার ডুয়ার কাছে বসে হাড়ি-পাতিল খেলছে মেয়েটি-এরই নাম নারায়ণী। গৃহিণীর শাড়িটি বড়ই নোংরা আর কয়েক জায়গায় ছেঁড়া।

 

বেতের ছোটো কাঠায় মুড়ি আর নারিকেলের নাড়– খেতে দেয় গৃহিনী। একবার মুখে দিয়েই খায়রুল বোঝে গত বছরের-উদানো, দীর্ঘদিন টিনের জারে থাকার দরুণ কিছুটা লোহাটে গন্ধ।
বারো তেরো বছরের একটি ছেলে মাখন বিশ্বাসকে ডেকে আনে। কাঁচি-মাথাল বড় ঘরের খুঁটিতে ঝুলিয়ে সে দুহাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে নমস্কার করে সে। খায়রুল জলচৌকি হতে উঠে দাঁড়ায়, ‘দাদা আমার নাম গৌরহরি কীত্তনিয়া। মদুখালির জয়মা সম্প্রদায়ের সরকার।’
মাখন ছাপড়ার বারান্দায় বসে, ‘সে তো অনেক দূর, আমরা চেনবো না, দলের নাম শুনিচি বুলে মনে হচ্চে, তা দাদা আমার বাড়িতি?’
‘বড় বিপদে পড়ে আলাম। আমাগের দলে এট্টা মায়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েচে। দাদা আপনি কিন্তু না বলতি পারবেন না। এই উপুগারটুক কত্তিই হবে।’
‘সে কি! আগে কবেন তো ঘটনা কী। তাছাড়া আমি কী করে আপনার উপুগার করবো?’ অবাক হয়ে বলে মাখন।
‘দাদা আমি খোঁজ নিয়েই আইচি, আপনার মাইয়ে নারায়ণী, ভালো কীত্তন গায়। ওরে এক রাতির জন্যি দিতি হবি। আইজ গান গাব ঘাটের কাচে, জুড়াকান্দি।’
‘সেও তো পিরায় দশ মাইল। তাছাড়া মায়ে গান গাতি পারে কিন্তু বায়নায় তো গায় না।’
‘দাদা সে আমি বুজবানে। ওখেনে রতন সাহার বাড়ি বায়না নিচি। তার নাতনির নামকরণ উপুলক্ষে পালা। মানসম্মান থাকপিনানে। দাদা আপনি চিন্তা করবেন না, আমি নিজি নিয়ে যাব নিজি কাল সকালে পৌঁছায় দিয়ে যাব।’
‘কী কচ্চেন? আপনারে চিনিনে-জানিনে, আপনার সাতে মায়ে দেব, তা কী হয় নাকি?’ ঘরের দরজা থেকে জবাব দেয় গৃহিণী। ‘তাছাড়া অত না চিনা না জানা মানুষির সামনে নারায়ণী কি গান গাতি পারবি নাকি?’
‘বৌদি যে আসতি পারবে না সেই আমাগের আসল গায়িকা, লোকে মাইরে থুবিনানে। দাদা এই ধরেন দশ টাকা। তারেও প্রতি রাতি দশটাকা দিতাম।’
‘এই শোনো উনারে না কয়ে দেও। শেষে রাত্তিরি নারায়নী কান্দাকাটি করবি।’ গৃহিণী বলে।
অভাবের সংসারে দশটাকা পেয়ে মাখনের মনটা একটু নরম হয়। গৃহিণীকে বলে, ‘শোনো কামডা কিন্তু ভগমানের। খালি যে উনার মানসম্মান তা না, তাছাড়া মা আমার গেল বার কালীতলায় কত মানুষির সামনে রাইতভোর গান গাইলো না।’
‘বৌদি আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। ও তো আমার মেয়ের মতনই। আমার মাও বাঁইচে থাকলি এতবড়ই হতো। দুইদিনির জ্বরে মরে গেল।’ চোখ মুছতে মুছতে বলে খায়রুল।
এই অপরিচিত গৌরহরি কীত্তনিয়ার মেয়ে মারা যাবার গল্প শুনেই হোক আর দশটা টাকার লোভেই হোক শেষ পর্যন্ত দরিদ্র দম্পতি শর্তসাপেক্ষে রাজি হয়ে গেল। শর্ত মোতাবেক নারায়ণীর সাথে যাবে ভুবন-মাখনকে ডেকে আনা বারো তেরো বছরের জ্যাঠতুত ভাই। নীলরঙা ফ্রক গায়ে, হাতে গানের খাতা আর একখানি চাদর গায়ে নারায়ণী প্রথম বাবা মা ছাড়া এতদূর রওনা হলো, সাথে বড়োজোর পুলিয়ার হাটে যাবার অভিজ্ঞতাওয়ালা জ্যাঠাতো ভাই ভুবন।
বাস থামে কাওড়াকান্দি বাস টার্মিনালে। একটু হেঁটে ঘাটে এসে একটি ছোটো লঞ্চে ওঠানো হলো ভুবন ও নারায়নীকে। সে লঞ্চে বেশ বড় বড় বাকসো। নারী-পুরুষ মিলিয়ে চল্লিশ পঞ্চাশজন মানুষ। নারায়ণীর ভালোই লাগছে। জীবনে প্রথম লঞ্চে ওঠা, রাতে অনেক মানুষের সামনে গান গাওয়ার সুযোগ তার এই ছোট্ট মনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
খায়রুল ভুবনকে বলে ‘কিছু খাবা নাকি?’
ভুবন মাথা নেড়ে অসম্মতি জানায়।
‘আরে লজ্জা কইরো না, আমি তুমার কাকার মতন, চলো আমার সাথে, নারায়ণীর জন্যিও কিচু কিনে আনি।’ খায়রুল ছেলেটির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে।
‘ও যাবে না?’ বলে ভুবন।
‘ও ছোট মানুষ, বসে থাকুক তুমি চলো।’

 

 

২.
কিছুক্ষণ পরই বটবট শব্দে ধোঁয়া উড়িয়ে লঞ্চ ছেড়ে দেয়। নারায়ণী তখন কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘ভুবন দাদা কই, সেই কাহা কই।’
পাশের পান খাওয়া নিলাজ মেয়েটি বলে, ‘ও মনি তুমি কিডা, কনে যাবা? কাইন্দে না, কও।’
‘আমার নাম নারায়ণী, কীত্তন গাতি নিয়াইচে এক কাহা। বাবার কাচে কলো সকালে দিয়াসপে বাড়ি। সাতে ভুবন দাদা ছিল। বিস্কুট কিনতি নীচে নামেচে। লৌকাডা থামাতি কন।’
‘ওরে মাগি তুই তো মরিচিস, এ যাত্তারার দলের লঞ্চ।’ বলেই হি হি করে হাসে পান খাওয়া নিলাজ। পাশের শাড়িপরা মেয়েটির গায়ে হাসতে হাসতে এলিয়ে পড়ে, ‘এ খায়রুল শুয়োরের কাম, হু?’
‘তা নাই তা কি? ওই দিন মালিক খায়রুল ম্যানেজারের কাচে কচ্চেলো এইসব ফেদি পেঁচি দিয়ে চলবে না, ভালো মায়ে লাগবে। দরকার হলি বানায়ে নিতি হবে।’ বলে শাড়িপরা।
‘তাই নাকি? তা আমরা এখন ফেদি পেঁচি হয়ে গেলাম, আমাগেরও তো রস ছিল, সে রস খালো কিডা? ওই মোহন কুণ্ডু আর খায়রুল শুয়োরই তো।’ তারপর নারায়ণীর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘মাগি তোর জীবন শেষ। আর তোর বাবাডাই কিরাম বুকা, একা একা পাঠালো, নাকি বেচে দেচে, হারে?’
শাড়িপরা বলে, ‘ধুর মাগি তুই হাসি থামা। দেকতিচিসনে ভয় পাচ্চে। মনি তুমি কাইন্দে না, আমরা দেকচি।’
এ সময় পাশে এসে দাঁড়ায় খায়রুল ইসলাম, হাতে নানান ধরনের খাবারের প্যাকেট, আদেশের গলায় বলে, ‘তোগের কিচু দেকতি হবে না, যা একেনতে।’
গৌরহরি কাকাকে দেখে কান্না থামায় নারায়ণী, ‘ভুবন দাদা কই?’
‘আচে সে, ভয় নেই, এই নেও, দেকো তুমার জন্যি কী আনিচি।’
সারারাত গানের বদলে কেবল লঞ্চের বটবট শব্দ, একটু পরপর ‘ভুবন দাদা কই’ বলে বলে কাঁদতে লাগলো নারায়ণী, রাতে কীত্তন গাওয়ার কথা ভুলেই গেল এবং কয়েকদিনের মধ্যে আবিষ্কার করলো সত্যি সত্যি সে যাত্রা দলে চলে এসেছে।
এখানকার নারীগুলো তার মায়ের মতো নয় কিংবা পাশের বাড়ির মালতী দিদির মতোও নয়। এদের লজ্জা কম-ঘোমটা দেয় না, পুরুষ মানুষের সাথে নির্লজ্জের মতো কথা বলে। মাঝে মাঝে পালা আর গানের রিহার্সেল হয়। সেখানে নারায়ণীও বসে। কখনও বাবা, মা কিংবা ভুবন দাদার কথা মনে হলে কেঁদে ওঠে। তখন খায়রুল তাকে খাবার, খেলনা, পোশাক কিনে এনে দেয়।
এভাবে গান ও অভিনয়ের শিক্ষা চলতে থাকে। কখনও পালার রাতে দরকার মতো গান গায়, আবার কখনও একানির পাট করে। বাড়ির কথা মনে হলে কাঁদে, ‘ও কাকা আমি বাড়ি যাব, আমারে বাড়ি থুইয়াসো।’
‘এইতো কয়দিন পরই যাতি পারবা। তুমার বাবার কাচে আমি চিঠি লেকিচি। তারা ভালো আচে। টাকা পাঠাইচি। তারাও চিঠি লেকেচে। তুমার কতা জানতি চায়চে, বিশ্বাস না হয় এই দেকো।’ বলে খায়রুল ব্যাগ থেকে চিঠি বের করে দেখায়। চিঠির খাম দেখেই তখনকার মত শান্ত হয় নারায়ণী। তারপর একদিন সত্যি সত্যি খায়রুল তাকে নিয়ে রওনা হয় তাদের বাড়ির দিকে।

৩.
তখন বেশ রাত, নারায়ণীকে কোলে নিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে মা। বারান্দায় চুপ করে বসে থাকে মাখন। ভুবন এতরাতেও উঠে আসে এ’বাড়ি।
‘দাদা আমি তো আর ওরে চুরি করে নিইনি। তাছাড়া যদি কতাম আমি মোছলমান আপনি দেতেন ওরে? আর একেবারে মিচে কতা তো কইনি। ওরে দিয়ে সতী বেহুলা, মা লক্ষ্মী, রাম-লক্ষ্মণ এইসব পালায় গান গাওয়াই। তারপর ধরেন মাসে মাসে ওর যে পাওনা তা তো আপনারে ঠিকই পাঠাইছি চিঠির সাথে।’
‘দাদা শোনেন আমি প্যাটে ধরিচি, আমি জানি কিরাম ঠেকিচে এই এট্টা বচর। গত কাত্তিকে নিয়ে গেচেন, এখন আষাঢ়।’
‘থাক এখন আর চেঁচায়ো না। অতিথি নারায়ণ। উনারে চাইট্টে খাতি দেও। আর শোনেন সকালে মোরগ বাগ দিয়ার আগে আপনি চলে যাবেন।’ হুকা নিয়ে তামুক বানাতে বসে মাখন।
কয়েকমাস পর এক সন্ধ্যায় আবার আগমন ঘটে খায়রুলের। গৃহিণী বলে, ‘না মেয়ে আমার ফোরে উটিচে। ওরে পড়াবো। ওরে তুমি যাত্তারায় দিতি পারবা না।’
মাখন দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। মাসে মাসে গতবছর যে টাকা কয়টি এসেছিল তা তো যেনতেন ব্যাপার নয়। অভাব ছিল না, ‘বলি ও নারায়ণীর মা, লক্ষ্মী আচে, রঞ্জিত আচে তুমার কোলে। উনি এত করে যকন বলচেন, যাক না আর এট্টা বচর।’
শেষাবধি অভাবের কাছে পরাজিত হয় মায়ের ভালোবাসা। এবার দিনের আলোয় নারায়ণী ছোট একটি পুটলি হাতে বের হয়ে যায়। গ্রামের সবাই দেখে মধুখালির গৌরহরির সাথে নারায়ণী কীর্তন গাইতে যাচ্ছে।
পথের বাঁকে খাইরুলের সাথে মেয়ের ফ্রকের রেখা মিলিয়ে গেলে মোড়ের দোকানে চা খেতে খেতে মাখন বলে, ‘বুইজলে দেবেন খুড়ো, মাইয়ে নাকি গতবচর খুব ভালো গায়চে। ওর কীত্তন শুনে কত লোক কাইন্দে বুক ভাসায়চে, তা সরকার বাবু আইসে হাত পায় ধইল্লো। কী আর করবো। কীত্তন হলো ভগমানের জিনিস। তার পুজোও হলো আর দুডো পয়সাও হলো, জমি ভাগে নিয়ে তো আর এত মানুষির সংসার চলে না। দেও দাদা সবাইরে আমার তরফে চা দেও।’
ষোল গুটির খেলোয়াড় দুজন এই গল্প অবাক হয়ে শোনে। তারা এরই মধ্যে ভুলে যায় শেষ চালটি কে দিয়েছিল।

 

 

৪.
এই যাওয়া আসার মধ্য দিয়ে নারায়ণীর ঘোরা হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানের অনেক এলাকা। যশোর, রাজবাড়ী, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, পাবনা, টাঙ্গাইল, নাটোর, রাজশাহী, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালি আরও কত জায়গা। দলের মেয়েদের সাথেও তার ভারি সখ্য হয়ে যায়। তিন-চার বছরে দলে কত নতুন মানুষ আসে পুরাতন মানুষ চলে যায়। অভিজ্ঞতার সাথে বাড়তে থাকে নারায়ণীর বয়স।
চতুর্থ বছর থেকে খায়রুল কাকার আচরণ পালটে যায়। নারায়ণীর গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। যখন তখন বিছানায় এসে বসে, শরীর ছুঁয়ে কথা বলে। নারায়ণী বুঝতে পারে এটা সাধারণ কোনো আচরণ নয়, এর মধ্যে অন্য ইঙ্গিত আছে। কিন্তু এই উঠতি বয়সে সেও নিজেকে সামলাতে পারে না। মধ্য বয়স্ক মুসলমান খায়রুলের অযাচিত স্পর্শ তার শরীর ছাড়িয়ে কখন যেন মনেও লাগে। আড়ালে আবডালে নারায়ণীর কাছেও সে সব স্পর্শ কাম্য হয়ে ওঠে।
মোহন কুণ্ডু একদিন রাতে নারায়ণীকে তার ঘরে যেতে বলে। পাশেই দাঁড়ানো খায়রুল বলে, ‘মোহন দাদা ওরে আজ নতুন পালার গান শিখাবো, মাস্টার অপেক্ষা করতিচে।’
‘শিখবেনে কাল রাতে।’ বলে মোহন।
‘না আইজ মাস্টারের মন ভালো, আসো নারায়ণী।’ বলে হাত ধরে নারায়ণীর।
‘খায়রুল তুমি ছিলা নবকলি অপেরার বাজার সর্দার, তুমারে আমার মল্লিকা অপেরায় আইনে ম্যানেজার বানাইছি। এই লাইন তুমার চেয়ে কম বুঝি না। শোনো, কোনো কিছু আমার চোখ এড়ায় না। এট্টা হিন্দুর মাইয়ে তুমি একা খাবা তা হবে না। ও আইজ আমার ঘরে থাকবে।’
‘দেকেন দাদা ফালতু কতা কবেন না, আমি ওরে এই দলে নিয়ে আইচি।’
‘হ্যাঁ তুমি নিয়ে আয়চো, কিন্তু দল আমার, ও আমার দলে একন নায়িকা। আমি যা কবো তাই হবে।’
‘তাই নাকি!’
‘হ্যাঁ তাই, নারায়ণী আমার ঘরে আয়।’
‘কাকা এইসব আপনারা কি কচ্চেন।’ বলে নারায়ণী।
‘ঠিকই কচ্চি, না হলি আমার এই দলে তুমারে আর রাকপো না।’ বলে ঘরে চলে যায় মোহন।
‘শোনো মোহন দাদা, ওরে আমি নিয়ে আয়চি আমি যা কবো তাই হবে।’ বলে নারায়ণীকে টানতে টানতে নিজের ঘরে নিয়ে যায়।
রাতে নারায়ণী নিজের ঘরে ফিরতে চায়। খায়রুল বলে, ‘আজ রাতে তুমার নিজের ঘরে যাওয়া উচিত হবে না। মোহন একটা জানোয়ার, কত মাইয়ের যে ইজ্জত নেচে তার ঠিক নেই। ওই যে মিনতি, মনিরা সবারে সে ভোগ করেচে। আজ রাতে তুমারে একা পালি ও ছিড়ে খাবে। মদ খায়চে বুজতি পারোনি?’
‘কিন্তু আপনার ঘরে…।’ তার আশংকা জানায় নারায়ণী।
‘ভয় কী আমি বাগ না ভাল্লুক?’ রাত গভীর হয়। গল্প চলতে থাকে, নানান গল্প। কথার গভীরতার সাথে স্পর্শও গভীর হয়। হাতে, চোখে, কথায় আহ্বান। আহ্বান শরীরের, আহ্বান মনের। নারায়ণীর মতো ছোট মানুষ এ অনাস্বাদিত আনন্দের আহ্বান অগ্রাহ্য করতে পারে না।

৫.
পরদিন সকালে মোহন কুণ্ডুর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে নিজেই দল থেকে বিদায় নেয় খায়রুল। সাথে নেয় নারায়ণীকে। সে বলে, যে দলে নিজে থাকবে না সে দলে নারায়ণীও থাকবে না। ওকে ওর বাবা মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসা তার দায়িত্ব।
টাকা পয়সা মিটিয়ে সত্যি সত্যি তারা দুপুরের মধ্যে রওনা দেয়। কিন্তু তারা নারায়ণীর বাড়ির বদলে অন্য দিকের গাড়িতে উঠে বসে। নারায়ণী বলে, ‘এ গাড়ি তো আমাগের বাড়ির দিকি যাবে না।’
‘বিক্রমপুর আছে নিউ ঊষা অপেরা, আমরা সেকেনে যাব। তুমিও যাবা আমার সাথে।’
‘ক্যান আমারে না বাড়ি দিয়ে আসপেন?’
‘নারায়ণী আমি তুমারে ছাড়া থাকতি পারবো না।’
‘আমি আর যাত্তরা করবো না।’
‘তুমারে আমি বিয়ে করতি চাই।’
‘কী কন এসব, আপনি মোছলমান, কাল রাতি বললেন আপনার সংসার আছে, আপনি বয়সে আমার বাবার সুমান।’
‘সব ঠিক তয় সংসারে যদি এত টান থাইকতো বছরের পর বছর কি যাত্তারা দলে পইড়ে থাকতাম? বয়স হয়চে বলে কি আমার সব শেষ। কাল রাতে তুমি আমারে চেনো নাই?’
সকালের ঝগড়ার আবহে গতরাতে ঘটনা এতক্ষণ ভুলে ছিল নারায়ণী। প্রসঙ্গ উঠতেই লজ্জায় ঘৃণায় তার শরীর কেমন করে ওঠে, ‘আমি বাড়ি যাব।’
‘নারায়ণী তুমি কতদিন যাত্তারা দলে ছিলে, তুমারে একজন হিন্দু কি আর নেবে। তুমারে নিয়ে আইছি- কলি পরে বাড়ি দিয়ে আসপো, কিন্তু বিয়ে হবে না, সমাজে মিশতি পারবা না। তার চেয়ে আমারে বিয়ে করো, মাসে মাসে তুমার বাবারে টাকা পাঠাবা। তুমার টাকায় হাত দেবো না। চলো নিউ ঊষায়। তুমারে পালি তারা লুইফে নেবে।’
নারায়ণীর আর কিছুই করার থাকে না। গাড়ি নিউ ঊষা অপেরার দিকে চলে যায়।

৬.
‘হুম মেয়ে তো সুন্দর, তা কয়ডা পালা মুখস্ত?’ জিজ্ঞাসা করেন নিউ ঊষার মালিক নিমাই সাহা।
‘জি, তা পনেরো সতেরোটা হবে।’ উত্তর দেয় খায়রুল।
‘কিন্তু এবার নায়কার পাট দেয়া যাবে না। দলে কাকনরে নিছি অনেক টাকা দিয়ে। ও নায়কার পাট ছাড়া আর কিছু করতি রাজি হবে না। পরের মৌসুম দেখা যাবে।’
‘দাদা কাকনবালা অসুস্থ থাকলি দুই এক নাইট….খুব ভালো অভিনয় করে, গানের গলা খুবই ভালো।’
‘দেখা যাক। তা হিন্দু না মোছলমান, নাম কী?’
‘জি রাজিয়া।’ বলে খায়রুল।
‘দেইখা তো মনে হয় না। শোনো আমার দলে হিন্দু-মোছলমান ফস্টিনস্টি চলবে না।’
‘দাদা আপনারে লুকায়ে লাভ নেই, ও হিন্দুই ছিল। মনের মিল হয়চে, আমি ওরে মোছলমান বানায়ে বিয়ে করিচি। ওর উপ্রে মোহনদা’র চোখ পড়িছিল।’
‘কবে, কনে বিয়ে করেচো?’
‘জি কাইল, নিমতলা কাজি অপিসি, কাবিন করা আছে।’
‘বিয়ে যখন করেচো ভালো কথা, থাকো, আর আইজ থেকে তুমি ম্যানেজার, নতুন লোক নিছিলাম, সবকিছু বোঝে না, সে এখন থেকে তোমার সহকারী।’
এই দলে কাকনবালা বেশ সুন্দরী, বয়স পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ, সে রাজিয়াকে ভালোভাবেই নিলো। পরিচয়ের সময়ই বলল, ‘তা ভালো, নিমাই দাদা যখন নিছে তখন বোঝা যায় তুমি রত্ন। সামনে নায়কা হবা, চিন্তার কিচু নেই, দুই চাইর নাইট তুমি গায়কার পাট গাইতে পারবা। আমার বয়স হচ্চে। মা-খুড়ি, বৌদির অভিনয় করে চালায়ে নেব। তয় ঠাস করে আমারে ঝাটা মাইরো না।’ বলে হাসতে হাসতে চলে যায়।
দলে বিশেষভাবে যে নজর কাড়ে তার মাথায় ঝাকড়া চুল, শ্যামলা, সুঠাম দেহ-আলতাফ আলী। সাতাশ-আটাশ বছরের যুবক, বিবেকের পাট করে। যেমন গানের গলা তেমনি অভিনয়। মেট্রিক পরীক্ষাও নাকি দিছিলো।
নিউ ঊষা অপেরায় চলতে থাকে রাজিয়ার সংসার। খায়রুলের মোহ যেন কেটে যায়। কিন্তু দায় দায়িত্ব সে ঠিকই পালন করে। মাস গেলে মাখন বিশ্বাসকে ডাকে টাকা পাঠায়। নবীন লতা বয়স্ক গাছটিকে পেঁচিয়ে ধরলে তার আর শক্তি থাকে না। অন্য নারীতে খায়রুলের আসক্তি নেই, তার সব ধ্যান জ্ঞান নিউ ঊষা আর সাত মাসের শিশুকন্যা নয়নতারা। তাদের সাড়ে তিন বছরের বিবাহের ফল।
রাজিয়া ঊষার প্রাণ হয়ে উঠেছে। সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আসে বায়নার পর বায়না। সেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে না আলতাফ আলী। যে নিজের মন প্রাণ সঁপে দিয়ে আছে রাজিয়াকে, আড়ালে আবডালে কথায়-কাজে তা প্রকাশও করে। প্রাণহীন খায়রুলের চেয়ে আলতাফের সাথে কথা বলে রাজিয়া আনন্দ পায়। আলতাফকে ঘুরায়, নিজের দরকারে খাটিয়ে নেয়। কিছু করতে পারলেই আলতাফ সুখ অনুভব করে, এমন ঘুরিয়ে আনন্দ পায় রাজিয়া নিজেও। সে এখন আর ছোট নয়। আঠারো উনিশ বছরের পূর্ণ যুবতী। তার সাড়ে তিন বছরের সংসারের অভিজ্ঞতা, সে অভিজ্ঞতার সাথে পেরে ওঠে না আলতাফ। রাজিয়া যেন তাকে স্পর্শ করে কিন্তু জড়িয়ে ধরে না।
এসব চোখ এড়ায় না খায়রুলেরও। নিমাই সাহার সাথে পরামর্শ করে- এ মৌসুম শেষেই আলতাফকে বাদ দেয়া হবে। তার বদলে সত্যেন হালদারকে আনা হবে মনিরামপুর থেকে।
এ পরিকল্পনা গোপন থাকে না রাজিয়া বা আলতাফের কাছেও। রাজিয়ার খারাপ লাগে। এ তার প্রেমের বয়স। খায়রুল তার শরীরের ক্ষুধা মেটাতে পারলেও মনের ক্ষুধা মেটাতে পারে না। আলতাফ অন্তত এইটুকু সজীবতা তাকে দেয়।
এ মৌসুমে শেষ পালার বায়না শ্রীবর্দী। তারপর সবাই যার যার বাড়ি চলে যাবে। রাজিয়ার জন্য বাড়ি ভাড়া করা হয়েছে ময়মনসিংহ শহরে। মমতাজের সাজঘর, তার পাশেই বাসা। খায়রুল সবকিছু শেষ করে কয়েকদিন পর সেখানে আসবে। কিন্তু রাজিয়া ঠিকই জানে কয়েকটা দিন কাশিয়ানিতে তার আগের সংসারে যাবে খায়রুল। এসব নিয়ে ঝামেলা করে না সে, খারাপ লাগে কিন্তু মুখ বুজে থাকে। তারই তো দোষ। সেই অন্য নারীর ঘর ভেঙেছে। তখন বয়স কম ছিল কিন্তু অপরাধ তারই, খায়রুলের আগের সংসারের তো নয়।

 

 

৭.
মৌসুম শেষ হয়। যে যার বাকসো-পুটলি গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ে টাকা পয়সা গুছিয়ে। ভোরেই বেরিয়ে পড়েছে আলতাফ আলী। খায়রুল মেয়ের গালে চুমু দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেয় রাজিয়াকে। শ্রীবর্দী থেকে ঘোড়ার গাড়িতে শেরপুর। তারপর বাসে জামালপুর, সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে ময়মনসিংহ। স্টেশনের পাশেই মমতাজ দিদির সাজঘর।
শেরপুর এসে আলতাফের সাথে দেখা হয় রাজিয়ার। তাকে বাসস্ট্যান্ডে দেখে অবাক হয় সে, ‘আরে আলতাফ ভাই, তুমি! সেই ভোরে না বের হয়ে আইসলে?’
‘হ একটু কাম আছিল শেরপুর। চল জামালপুর পর্যন্ত একলগে যাই।’
‘তা চলো গল্প কত্তি কত্তি যাওয়া যাবে, আর মালামালও তো মেলা।’ রাজিয়া খুশি হয়।
মালামাল ধরাধরি করে তোলে আলতাফ। বাস চলতে শুরু করে জামালপুরের দিকে। দুটি হৃদয় মুহূর্তে সজীব হয়ে ওঠে গল্পে, হাঁসি-ঠাট্টায়। ‘আলতাফ ভাই তুমার সাথে আর দেখা হবে না।’ বলে রাজিয়া।
‘না হওয়ায় ভালা।’
‘ক্যান আমারে তুমার ভালো লাগে না?’
‘লাগলেই কী? কেউ কী আমারে পাত্তা দেয়?’
‘হা হা হা, কি যে কও না, তুমার যে রূপ, কত মাইয়ে পাগল হয়ে রইচে। আমাগের দলেরই তো, ওই যে প্রিন্সেস জিরো জিরো নাইন….তুমারে তো সেদিন অন্ধকারে জড়ায়ে ধইরে চুমোও দিছে, দেয় নাই?’ ঝর্ণার মতো হাসে রাজিয়া, সে হাসিতে কিছুটা ঈর্ষাও আছে।
‘বাদ দে ওসব ঢঙ্গীর কথা, আর দিলোই বা!’
‘না, আমার কিচু না। ক্যান, তুমি কারে চাও, সাজাহানের কইন্যারে? পালায় তো তুমি খালি বিবেক হও….নায়ক হলি তো তুমি জাহানারার মতো কাউরে এক রাইতে মঞ্চে হলিও পাতি পাইত্তে।’ আবার হাসে রাজিয়া। ‘আলতাফ ভাই তুমি আমার উপর রাগ, না? ওরা আমার জন্যি তুমারে বাদ দিয়ে দিলো।’
‘তাই নাকি।’ ছোটো উত্তর আলতাফের, যেন কিছুই সে জানে না।
‘দেইখো তুমারে আগামী মৌসুম ডাকপে না। তুমি মনে হয় জানো না!’
‘আরে ধুর, রাখ তোর নিমাই সাহার ঊষা। কত দল আমার লাগি টাকার বান্ডিল হাতে বইসা আছে।’
‘তা এতদিন গ্যালা না ক্যান?’
‘যাই নাই খালি…..যাই নাই, মন চায় নাই তাই যাই নাই, আরে টাকার লাগি কি আমি যাত্রা করি নাকি। টাকার দরকার হইলে ব্যাবসা করতাম। পড়াশোনায় ভালো আছিলাম, মেট্টিক পরীক্ষা দিয়ে পালায়া আইছিলাম বাড়ি থেইকা। খোঁজও নেই নাই কী রেজাল্ট হইছিল। স্যাররা কইতো আমি ফাস্ট ডিভিশন পাবো। চার বছর পর বাড়ি গেছিলাম। তাইলে যাত্রার বিবেক না হইয়া তো আমি এসডিও হইতে পারতাম। ওই যে সেদিন আমগো প্যান্ডেলে আসছিল, মহকুমার বড় কত্তা। ওই কত্তা, বুঝিস?’
‘তুমি যাত্তারায় না আসলিই ভালো হইতো। আর কিইবা কবো, যাত্তারাডা মানুষির কপালে লেখা থাকে, আমার কতা তো জানোই- আমার কী দস্যু রানি ফুলন দেবী হওয়ার কথা ছিল নাকি দেবী চৌধুরানী হওয়ার কথা ছিল?’রাজিয়া হাসে, সে হাসিতে নিজের জীবনকে বিদ্রুপের আভাস।
‘আমি যাত্রায় না আইলে কী ভালা হইতো?’
‘সে তুমি বুজবা না।’
‘ওই খায়রুল হারামজাদা তোর জীবনডা নষ্ট কইরা দিলো। আর তুই তার ঘরেই উঠলি?’
‘ওইভাবে কইয়ো না খায়রুল ভাই, হোক মরা গাছ, সে তো আমারই। এই যে কোলে নয়নতারা-সে তো তারই ফল। তাছাড়া আমি কনে যাতাম, ওইটুক বয়সে বাধা দিয়ার কোনো ক্ষমতাই ছিল না। শরীর তো! তাছাড়া সত্যিই তো, কিডা আমারে বিয়ে কইত্তো? খায়রুল ছাড়া না হয় নৃপেন্দ্র, সুশান্ত এইরম কেউ, কিন্তু যাত্তারা দলের বাইরির কেউ না। কোনো এসডিও না।’

৮.
গাড়ি থামে জামালপুর ফেরিঘাটে। পার হয়ে মালামাল নিয়ে নেমে পড়ে আলতাফ, ‘চল রিকশায় যাই।’
‘ক্যান আরো খানিক তো বাসে যাতি পাত্তাম।’
‘চল না যাই, আর কিছুক্ষণ তোর পাশে বসি। কিছু তো পালাম না, একটু সময় না হয় দিলি।’
‘চলো, তুমারে কষ্ট দিলাম, কিন্তু কী কত্তাম? তুমারে যে ভালো লাগছিল। জীবনে ফুল ফুটার আগেই আমার ফল ধইরে গেল। যখন ফুল ধরার সুমায় তখন মধুরমাছি দেখলি গাছের মন তো কেমন কত্তিই পারে। ক্যান আগে তুমার দেখা পালাম না!’
রিকশা থামে গেটপার, ‘আলতাফ ভাই এদিক দিয়ে নিয়ে আইসলে ক্যান, সরাসরি স্টেশনে চলে যাতি পাত্তাম তো।’
আলতাফের কোলে নয়নতারা, ডান হাতে দুইটি বড় পুটলি নিয়ে হাঁটতে শুরু করে সে। পিছনে একটি ব্যাগ হাতে রাজিয়া, ‘ও আলতাফ ভাই কই যাও?’
‘আয় আমার লগে।’
‘ট্রেনের সুমায় হয়ে যাচ্ছে।’
‘ট্রেনে যাওন লাগবে না। তুই চল আমার লগে।’
‘কী কও, কনে যাব?’
‘আমগো বাড়ি, সইষ্যাবাড়ির তারাকান্দি।’
‘আলতাফ ভাই, পাগলামি কইরো না। নয়নতারারে আমার কোলে দেও। আমি যাই।’
‘পাগলামি না, চল। বাড়িত আমার আব্বার মেলা জমি আছে, বড় পুষ্কুনি আছে, শানবান্দানো ঘাট। সকাল বিকাল রোউ-কাতলে ঘাই মারে। গোয়াইলে দুধেল গাই আছে। সংসার করবার চাস- সংসার দিমু, যাত্রা করবার চাস, দল গড়মু?’
‘আলতাফ ভাই যাত্তারা আমার পেশা, তুমার নেশা কিন্তু জীবনডা হই হই কাণ্ড রই রই ব্যাপার না। আমার স্বামী আছে-হোক বুড়ো, তার মেয়ে আছে আমার কোলে। তুমি এইসব কী কও? দেও নয়নতারারে।’ রাজিয়ার চোখে জল চলে আসে।
‘না, আমি তোমারে না নিয়া যামু না। আমি গানের মানুষ, যেদিন থেইকা তোমারে দেখছি সেই দিন থেইকা আমার সাধনায় কেবল তোমারেই পূজা করছি। আইজ থেইকা না হয় আমিই নয়নতারার বাবা হইলাম। বুড়া গাছটা মইরা গেলে লতানো গাছ তারে কয়দিন আকড়ায় থাকবো? আবার নতুন গাছ খোঁজা লাগবো। নাকি যাত্রার পাটের মতো ছবি বুকে লইয়া কাইন্দা জীবন পার করবা? ওর আগের সংসারের কেউ তুমারে বাড়ি উঠবার দিব, নাকি বাবার বাড়িত উঠবার পারবা? দুই দিন আগে আর পরে, এখন হইলে ক্ষতি কী? রাজিয়া আমিও কই জীবনডা যাত্রা না।’ আলতাফের সম্বোধন আবেগে কখন তুই থেকে তুমি হয়ে গেছে তা উভয়ের কারো বোধেই আসেনি।
‘আলতাফ ভাই তুমার বয়স কম, এই মোহ থাকপে না। আমার বয়সও কম কিন্তু সাড়ে তিন বচর ধইরে একজনের সংসার কত্তিচি। জীবনের জানাবুজা তুমার চাইয়ে আমার বেশি। কী চাই তুমার? আমি কচ্চি, সামনের বার তুমারে নিঊ ঊষায় আনবোই। বাংলাদেশে চার পাঁচজন নায়কারে গুনায় ধত্তি হলি রাজিয়ারেও ধরা লাগবে। যা চাও আমার কাছে পাবা। কিন্তু লোকটা আমার স্বামী, বাঁইচে থাকতি তারে আমি ক্যাম্বায় ছাড়বো?’
‘তুমি যা কইলা শুধু তাই চাইলে আমারে কি তা আগেই দিতা না? তুমি ভাবছো-আমি তোমারে শুধু শুধু খাইটা দেই বলদের মতো, আমি কতই না জানি বোকা! সেদিন সন্ধ্যায় প্যান্ডেলের পিছনে মেহগনি বাগানে চাইলে কি সব পাইতে পারতাম না, তুমি বাধা দিতে পারতা, না দিতা? আমি কি কিছুই বুঝি না। আমি শুধু তোমারে চাই, সারা জীবনের লাগি তোমার সব চাই।’
‘কিন্তু নয়নতারার আব্বা….আর তুমার পরিবারে লোকজন, বাবা-মা, আমি যাত্তারার মেয়ে, হিন্দুর ঘরে জন্ম, তাছাড়া বিয়ে হয়চে, কোলে সাতমাসের মাইয়ে।’ রাজিয়ার গাল বেয়ে অঝোরে নামে অশ্রুধারা।
‘সে আমি দেখবাম, চলো। কথা দিলাম তোমারে জীবনে ফালায়া দিমু না। আমার আব্বা আম্মা খুশিই হইবো, হেরা আমারে বিয়া করায়া সংসারী করবার চাইছে, এমনকি যাত্রার মেয়েতেও আপত্তি আছিল না, তারা শুধু চায় মৌসুম শেষে পোলা যেন ঘরে ফেরে। আল্লায় কপালে তুমারে রাখছিল!’
রাজিয়া আলতাফের হাত থেকে একটি পুঁটলি নেয়। নয়নতারা তখনও আলতাফের বাম কাঁধে ঘুমন্ত। চোখ মুছতে মুছতে আলতাফের পুঁটলি ধরা ডান হাতটি ধরে। চোখে জল আসে আলতাফেরও, কেউ কোনো কথা বলে না, নিঃশব্দে কাঁদে, হাঁটে।
নয়নতারার ঘুমের মধ্যেই খায়রুল ইসলামের বদলে আজ, এখন থেকে তার বাবার নাম হয়ে গেল আলতাফ আলী। এমনকি সবার অলক্ষ্যে যে হই হই কাণ্ড রই রই ব্যাপারটি জামালপুরের গেটপারে ঘটে গেল, শহরের এত ভীড়ের মধ্যেও তার কোনো সাক্ষী-দর্শক রইলো না।

Facebook Comments