ভাষাচিত্র ঈদ সাময়িকী

সুপ্রিয়া দেবনাথ-এর ছোটগল্প ‘মায়াজাল’

শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১ | ৮:৩২ অপরাহ্ণ | 218 বার

সুপ্রিয়া দেবনাথ-এর ছোটগল্প ‘মায়াজাল’

।। সুপ্রিয়া দেবনাথ ।।


 

আজ বুঝি অমাবস্যা! কেমন ঘুটঘুটে নিশীথ রাত। নীরুর মনে একটি গানই বেজে চলেছে সেই কখন থেকে। সে গুনগুন করে গানটি গেয়ে যায়-
`নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনও বাকি
প্রদীপ নিভিয়া যায়, শুধু জেগে থাক তব আঁখি।’
আকাশে গাঢ় কালো মেঘ। কিছুটা সরে যেতেই সে স্পষ্ট দেখে একটি প্রতিচ্ছবি। সামনের বিল্ডিংয়ে তার বরাবর ফ্ল্যাটটিতে ত্রিশোর্ধ এক যুবকের অবয়ব। গা ছমছম করে তার, ভয়ে নাকি তৃষ্ণায় তা সে জানে না। নীরুর বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। জানালার শিক ধরে দাঁড়াতে তার খুব ভালো লাগে। তবে আজকাল পরিস্থিতিটা বেশ ভিন্ন। আবারও সে সামনের দিকে তাকায়।
সামনের পুরুষটি সম্ভবত ব্যাচেলর। এক প্রৌঢ়া ছাড়া কখনই আর কাউকে দেখেনি নীরু। নীরুর কল্পনার ঘুড়িটা দূর আকাশে দেয় ছুট। সে স্পষ্ট দেখে পুরুষটি পাশে বসে নিজের হাত দুটো তার কাঁধে তুলে দেয়। এই ঘুটঘুটে রাতে নিজেকে নীরু সম্পূর্ণরূপে সমর্পন ‌করে। আরও ঘনিষ্ঠতা, প্রেম গাঢ় হতে হতে তারা মর্মর ধ্বনিতে মিশে যায়। মধুর স্বপ্নঘোরে নীরুর দেহমন শিথিল হয়ে ওঠে।
হঠাৎ অপ্রত্যাশিত শব্দের অনর্থক প্রবেশে সে পেছন ফিরে তাকায়। রোগা শীর্ণ এক কংকালপ্রায় কায়া বিছানায় লেপটে আছে। বছর দুয়েকের পরিচর্যায় অচ্ছুত কেউ। যাকে নীরু চিনতে পারে না। এই অবাঞ্ছিত মানুষটির দিকে বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকে। নীরুর মনে হয় এত সুন্দর রাতটিতে স্বপ্ন যাপনের অধিকারটুকুও এই মানুষটি যেন কেড়ে নিল।

 

পৃথিবীতে এর চেয়ে কোনো বড় শত্রু তার আর নেই। প্রচণ্ড ক্রোধে তীব্র গতিতে সে ছুটে যায় মুমূর্ষু মানুষটির দিকে। ওপাশে কাতরে ওঠে মানুষটি। ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকে, ‘নীরু! নীরু! একটু পানি দেবে প্লিজ।’
নীরুর এতটুকু মায়াও হয় না। কেউ যেন ধারালো ছুরি দিয়ে তাকে বিদ্ধ করে। ভয়াবহ ও রাগত চোখে সে পাশে থাকা বালিশটি হাতে তুলে নেয়। আজ যেন কোন ময়দানব তাকে ভর করেছে। সে অভিষ্ট অর্জন না করে কিছুতেই ছাড়বে না। নীরুর অবয়বে ভয়ানক হিংস্রতা ফুটে ওঠে। পাশে শুয়ে থাকা পাংশুবর্ণ মুখটা আরও পাণ্ডুর হয়ে ওঠে। ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সে কাতরে উঠে, ‘নীরু! প্লিজ নীরু, কী হয়েছে তোমার? নীরু, আমি পরেশ! তোমার পরেশ! কী হয়েছে তোমার!’
আমি শব্দের পর অন্য শব্দগুলো ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়। এসব কোনো কথাই নীরুকে নিরস্ত করতে পারে না। কোনো নিশি যেন পেয়ে বসেছে তাকে। জেদ আর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। আজ সে নীরু নয় বরং স্বাধীনতাকামী এক নারী প্রতিমূর্তি। সে এবার দু’হাতে শক্ত করে বালিশটি ধরে। হাত দুটি পরেশের মুখের খুব কাছাকাছি। ওর মুখটা এখনই চেপে ধরবে। কী যেন হালকা শব্দে নীরুর চৈতন্য ফেরে। এক বাচ্চা কণ্ঠ ডেকে ওঠে, ‘মা।’
একটানা কান্নার শব্দে নীরুর চেতনা হয়। বাচ্চাটি আবার ডাকে, ‘মা! মা! বাথরুমে যাব।’
একমন বোঝা ফেলে মানুষ যেমন হাফ ছেড়ে বাঁচে তেমনই নীরুও হালকা হয়ে ওঠে। সে যেন এক বুদবুদ। এখনই উড়ে যাবে। হঠাৎ খেয়াল হয়, ‘একি তার হাতে বালিশ কেন?’ দৌড়ে কন্যাটিকে কোলে তুলে সে বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়।
পরেশের চোখ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অথর্ব হয়ে সে চেয়ে থাকে। অবাক হয়ে নির্বাকভাবে সে নীরুর গতিবিধি লক্ষ করে। সে ভাবে-নীরু কি তবে পালটে গেল। সে কি আর তাকে ভালোবাসে না? এমনি নানাবিধ প্রশ্নবাণে সে নিজেকে জর্জরিত করে।
বাথরুম থেকে ফিরে নীরু মেয়েকে পাশের বিছানায় শুইয়ে দেয়। এত ঝড় ঝাপ্টার মধ্যেও বাচ্চা দুটিই তার প্রেরণা। এবার খুব ধীর গতিতে এসে স্বামীর পাশে বসে সে।
পরেশের ঘোর তখনও কাটেনি। এক অবিশ্বাসী চোখে সে নীরুকে অবলোকন করে। তার মনে হয় এক ভয়াল দানব মানুষের বেশে প্রচ্ছন্নরূপে বিরাজ করে। আঁধার রাতে তারা বেরিয়ে আসে। তাদের ইচ্ছার পরিতৃপ্তি ঘটায়। সে প্রার্থনা করে, ‘হে খোদা! এ কঠিন রাত পার হোক।’
নীরু পরম স্নেহে স্বামীর মাথায় হাত বুলায়। পরেশের কানে বেজে ওঠে নীরুর গাওয়া একটি গান-
‘পাতার ভেলা ভাসাই
ভাসাই নীরে
পাতার ভেলা ভাসাই
পিছন-পানে চাই নে।’
গানটি স্পষ্ট তার কানে বাজে। আর দুরু দুরু বুকে সে প্রার্থনা করে, এই অভিশপ্ত রাতটুকু সমাপ্ত হোক।

Facebook Comments Box