ভাষাচিত্র ঈদ সাময়িকী

সাধনা সাহা’র পত্রসাহিত্য

সোমবার, ১৭ মে ২০২১ | ২:২৮ অপরাহ্ণ | 224 বার

সাধনা সাহা’র পত্রসাহিত্য

।। পত্রসাহিত্য ।।


 

প্রিয় ভাষাচিত্র,
কী বলে তোমায় সম্মোধন করবো জানি না…! কারণ, তুমি তো আমার বদ্ধ ঘরের গুমোট মনের স্বপ্ন ঘুড়ি ওড়ানো স্বচ্ছ আকাশ। প্রজাপতি পাখনা মেলে স্বপ্ন ডানায় ভেসে যাওয়া শুভ্র বাতাস। দুঃখ, ব্যথা, বেদনার মাঝে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস। থমকে যাওয়া জীবনের নতুন ছন্দে চলা আনন্দের এক ঝর্ণধারা। নিজেকে জীবনের উচ্ছলতায় ফিরিয়ে আনার এক অদম্য হাতছানি। তোমাকে ফেরানো যায় না, বরং তোমার মাঝে নিজেকে উজার করে দিতে মন চায়। কিন্তু কী করে সম্ভব বলো তো..?
করোনা নামক অদৃশ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জুজুবুড়ির ভয়ে আমরা যে ভ্রান্ত, শ্রান্ত, বাক্হীন। আমরা যে চরম দিশেহারা। বসন্তের আন্দোলিত ভালোবাসার আগমনী বার্তায় প্রকৃতির চারদিকে যেমন ঝড়াপাতার করুণ রাগিনী বেজে ওঠে তেমনি করোনাকালীন সময়েও আমার, আমাদের মনে হারিয়ে ফেলার বা মৃত্যুর করুণ রাগিনী হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে তার কাটা সেতারের মতো বেশ বেসুরোভাবে বাজতে শুরু করে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা! না পারি জীবনকে উপলব্ধি করতে, না পারি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে। ভারসাম্যহীন এক গৃহবন্দি জীবন আমাদের। আবাল, বৃদ্ধ, বনিতাসহ সবে মুকুলিত ছোট্ট শিশুটাও চার দেওয়ালের শৃঙ্খলিত জীবনে মানিয়ে নেওয়ার কি অদম্য স্পৃহা! এরই নাম হয়তো জীবন!
তবুও, জীবন চলে জীবনের ছন্দে! প্রতি ক্ষণে ক্ষণে বদলায় এর গতিপথ! হয়তো বা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার্থে তার এই বদল! মৃত্যুর হাতছানির মাঝেও নতুন পথ বাতলে নেয় সে। জীবন থেমে থাকে না! এমনই জীবন-মৃত্যুর দোদুল্যমানতার এক চরম সন্ধিক্ষণে আমার পদচারণা তোমার আঙিনায়!স্বাগত জানালে আমায়!
তোমার অভ্যর্থনায় মনের আগল ভেঙে বেরিয়ে এলাম আমি। আমার মনের গহীনে গোপন কুঠুরিতে সযতনে লুকিয়ে রাখা সিন্দুকে যে আয়নাটা লুকানো ছিল তার উপর স্তুপকৃত ২৮ বছরের রাশি, রাশি ময়লা সরানো অনেক কষ্টের কাজ ছিল। অনেকবার সরাতে যেয়েও পারিনি, পিছিয়ে এসেছি ভয়ে! জঞ্জালের বেড়িতে আমার মনটাও একরকম বাঁধা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুমি…! তুমি আমার আগল ভাঙা সেই বন্ধু! সেই তোমার সম্মোহনী সুরে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো আমার অন্তরের সব কদর্য, সব কালিমা এক নিমিষে কোন পাহাড়ের অতল তলে লুকিয়ে ফেললে!
“ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে
ও বন্ধু আমার।”
যখন আমার আকাশে, বাতাসে রবীঠাকুর গুমরে গুমরে বেড়ায় তখনি তুমি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলে। তুমি আমার সেই বন্ধু হলে! তারপর শুরু হলো আমাদের পথচলা। কিন্তু দেখো ভাগ্যের কি নির্মম লুকোচুরি খেলা। তোমাকে পেলাম! কিন্তু করোনার লকডাউন সারা বিশ্বকে থমকে দিলো। বিশ্বের সবদেশ স্থবির হলো, স্তম্ভিত হলো, পরাভূত হলো মৃত্যুর কাছে। আমাদের দেশও বাদ পড়লো না। অর্থ, অহমিকা, যশ, প্রতিপত্তি কিছুই ধোপে টিকলো না। উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত সবাই এক কাতারে এসে হাজির হলো।
তোমার মাঝে নিজেকে প্রকাশ করার, নিজেকে উজাড় করে দেবার এক অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করলাম। চরম বাস্তবতার কষ্টিপাথরে ঘসে ঘসে নিজেকে খাঁদবিহীন করার চরম আকুলতা অনুভব করলাম। তাই তো হাতে তুলে নিলাম তোমার আঙিনায় বসবাসরত আমার সহযাত্রীদের নব নতুন সৃষ্টিকে। মনের আয়নাকে সযতনে ধূলোবিহীন করা এর থেকে ভালো পন্থা আমার জানা ছিল না! তুমি আমায় দিয়েছো সেই ধৈর্য, সেই সাহস, সেই মনোবল। তোমার আঙিনা পরিভ্রমণ মানেই মনের কলুষতা দূর হওয়া, তোমার গৃহস্থালিতে যোগ দেওয়া মানে মনে আনন্দের খোরাকের যোগান দেওয়া, মনকে প্রসারিত করা। তোমার সভাসদের সঙ্গ মানেই জীবনকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলা, বেঁচে থাকার আর এক নতুন প্রত্যাশা।
তোমাকে আকড়ে ধরেই তো বাঁচতে চেয়েছি। কিন্তু সবসময় সব চাওয়া কি পূর্ণতা পায়!
না! না…! তোমার দিক থেকে কোনো অপূর্ণতার আস্বাদন পাইনি আমি। কিন্তু করোনা! করোনা আবার ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে! অসহিষ্ণু হয়ে, মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে! লাশের গন্ধ বাতাসে ভাসে, স্বজনের আহাজারি বাতাস ভারী করে তোলে, ক্ষুদার যন্ত্রণা পৃথিবীর মস্তিষ্কে মাইগ্রেন সৃষ্টি করে, প্রান্তিক মানুষের নিশ্চল কর্মহীন জীবন সামাজিক অবক্ষয় বাড়িয়ে দেয়। এত কিছুর পরেও দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষেরা শেখে না কিছুই। অবক্ষয়িত জীবনই যেন তাদের একান্ত কাম্য।
নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হয়…! হাতরাতে হয়
অবক্ষয়িত ভিড়ের মাঝে নিজের অস্তিত্বকে। খুঁজে বেড়াতে হয় সত্য সুন্দরের আহবানকে। জানি না তখন কেন শুধু তোমার অবয়বকেই হৃদয়ের আয়নায় ধারণ করে। হয়তো তুমিই সেই…! যার হৃদয়ের আঙিনায় কলমের লাঙল চালিয়ে শব্দের বীজ বোনা যায়…! হাসি, আনন্দ, বেদনা, স্নেহ, ভালোবাসার সার দিয়ে, অন্তরের প্রকোষ্ঠে জমানো আন্তরিকতার জল সিঞ্জনে সে বীজের অঙ্কুরিত চারাগাছকে একদিন বিশাল মহীরুহতে পরিণত করা যাবে এই আশায়!
যাবেই…!
হয়তো একদিন করোনা পরাভূত হবে। আমরা আবার জীবনের ছন্দ খুঁজে পাব। হতাশার ম্লান আলো দূর হয়ে আত্মবিশ্বাসের সোনালি সকাল পাব। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়। একটা নিশ্চিত জীবনের অস্তিত্বের স্বপ্নগুলো জাগিয়ে তুলতে, একটা ছন্দময় জীবনের গতিপথের সন্ধান পেতে তুমি পাশে থেকো বন্ধু আমার!
তোমার আলোর হাত বাড়িয়ে রেখো, তোমার জ্ঞানের মশাল প্রজ্জ্বলিত থাকুক আজীবন!
তোমার আঙিনার সবাই ভালো থাকুক সুস্থ থাকুক এই প্রার্থনা করি। সবার মাঝে আমার অল্পতাকে ফিরিয়ে দিও না। তোমার হৃদয়ের একটু কোণে না হয় ছোট্ট একটু জায়গা রেখো। তোমার সার্বিক মঙ্গল কামনায় তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকব। ভালো থেকো।

 

ইতি
ভাষাচিত্র ০০২০৬

Facebook Comments Box