দেশের বই ঈদ সাময়িকী

সাধনা সাহার দুইটি কবিতা

সোমবার, ০৯ মে ২০২২ | ৫:২৪ অপরাহ্ণ | 402 বার

সাধনা সাহার দুইটি কবিতা

ভাষাচিত্র বুক ক্লাব আয়োজিত শুক্রবারের কবিতা শীর্ষক আয়োজন থেকে বাছাইকৃত কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে “দেশের বই ঈদ সাময়িকী”। আজ প্রকাশিত হলো সাধনা সাহা-এর দুটি কবিতা


 

 

[১]
আজ নাকি কবিতা দিবস!

আনমনে ভাবি বারবার শব্দের বাঁধনে
কবিতারা আছে যে আমার।
ও মা! এ যে দেখি কবিতারা মেলেছে পাখা!
মন ছুঁতে চায় যত, স্বপ্নরাজ্যে ওরা ওড়ে ততো,
একটা কবিতা কি আজও দেবে না ধরা?
ব্যর্থ প্রয়াসে ভেবে ভেবে বিবস মনে,
কাগজে করে যাই শুধু আঁকিবুকি
মনেতে কষ্ট জাগে বাড়ে হতাশার আফসোস,
আজ নাকি কবিতা দিবস?

মনের গহীনে জমে থাকা কষ্টগুলো
মেঘের আঁচল বেয়ে কখন যে নেমে আসে!
কবিতার শব্দমালা বেদনার স্রোতে ভেসে
কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে চায় এক নিমিষে।
কোন গহীনের হৃদয় গহন তলে বেজে ওঠে,
বিধুর রাগিণী, ব্যকুলিত হাসি আমারি ঠোঁটে
পড়ে থাকে শুধু হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস!
আজ না…কি কবিতা দিবস?

আমার কবিতারা আজ করেছে হরতাল
শ্লোগান দিয়েছে তারা, আসবে না আর।
তাদের অধরে কেন বেদনার ধারা বয়ে চলে?
কেন ওঠে না প্রেম ভালোবাসার প্রলয়িত ঘূর্ণিঝড়?
দ্রোহের আগুনে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি স্ফুলিঙ্গে,
স্ফুলিঙ্গায়িত হয়ে ঝলসাতে পারে না কেন
অনাচার, অত্যাচার বিবেকহীনতার নাগপাশ?
আজ না…কি কবিতা দিবস?

বিক্ষুব্ধতার আগুনে পোড়ে মন আমার
এক সমুদ্র পিপাসা নিয়ে নদীর কাছে জল খুঁজি!
আকাশ আমায় বিহ্বলতার শব্দ শেখায়,
কবিতার শব্দেরা নিশ্চুপিতার আন্দোলন করে বুঝি।
আমার অক্ষমতায় আমি যে বেভুল
বিবস মনে সঙ্গোপনে খুঁজে চলি কবিতা লেখার ভুল!
জোনাকজ্বলা ক্ষুদ্র আলোয় আমার রাত্রিবাস!
আজ না কি কবিতা দিবস?

 

[২]
আমি আর ইন্দ্রাণী

যখন মামাবাড়ি বেড়াতে আসতাম
মা বলতেন, “নদীতে একা একা নাইতে নেমো না।”
আমি বলতাম, “কেন মা? সবাই তো নামে..!”
“তুমি ও তো একা একা নেমে যাও..!
তবে কেন মা? আমাকে নিয়ে তোমার এত ভয়!
নাকি তুমি জল প্রচন্ড ভয় পাও..?”

দেখছো না, দাদু বানিয়েছেন কি সুন্দর মজবুত
সুন্দরী আর শাল গাছ দিয়ে কাঠের পাটাতন!
ঠিক দোতলার ছাদের মতো মনে হয়।
তার সঙ্গে সুন্দর পাকা বাঁশের সিঁড়ি,
নীচে নেমে গেছে মা! একদম জল ছুঁই ছুঁই।
জোয়ারে পাটাতনে বসেই জল হাতে পাই
নূপুর পড়া পা দুখানি ভিজাই আর আনমনে হাসি!

তুমি তো জানো মা! জল কখনো-কখনো পাটাতন
ছাপিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যায় বাড়ির উঠোন।
ছোট ছোট মাছ, নোনা পোকা আর কাঁকড়ার দল,
বাড়ির উঠোন ডুবসাতারে মাতিয়ে রাখে।
আমি বারান্দার সিঁড়িতে বসে দেখি আর ভাবি,
যদি কোনোদিন মাছ হতে পারতাম,
কী মজাটাই না হতো!
তোমার ডাকে আমার ভাবনারা গুটিয়ে যায়
মাছেদের স্বপ্নবোনা আর দেখা হয় না!

অলস দুপুরে তুমি যখন ভাতঘুমে নিমগ্ন
আমি তখন ঘাটপাড়ে পাটাতনে পা দুলিয়ে
মাছেদের সাথে মধুর আলাপনে,
আমার গল্পের ঝুড়ি খুলি।
সঙ্গে আমার আরও একজন থাকে
বলো তো কে? পারলে না তো?
আরে ইন্দ্রাণী! আমার বন্ধু ইন্দ্রাণী।

ও যে এখন জলকন্যা! জল থেকে
উঠে এসে বসে আমার পাশে,
দুজনে মিলে দেখতে থাকি ভাটির টান!
কী দুর্বার আকর্ষণে ভেসে যায় শ্যাওলা, তৃণ,
ঝরাপাতা, বড়ো বড়ো গাছের গুঁড়ি,
এমনকি জাগতিক সব আবর্জনাগুলো।
কী দুর্নিবার সে স্রোত! মুহুর্তেই মনে হয়
বিশ্ব চরাচরও বুঝি ভেসে যাবে
চোখের পলকে, সবার অলক্ষ্যে।

তুমি প্রচণ্ড ভয় পাও, নদীর এই সময়টাকে!
তোমার মনে বিচ্ছেদের মুহূর্তগুলো জাগরিত হয়!
অথবা নতুন প্রাণের স্পন্দিত ধারা বহমানের
অপেক্ষায় কিছু কিছু সুখ ভেসে যাবার ভয়!
হ্যাঁ মা! ভেসেছিল তো আমার অতলান্ত সুখ!
ইন্দ্রাণীর বন্ধুত্বের সুখ, ওর ভালোবাসার সুখ,
ক্লান্ত দুপুর, অবসন্ন বিকেলের হাজারও খুনসুটি!
এক দুর্বার আকর্ষণে হারিয়ে যেতাম আমি
জলে ভেজানো পায়ের তলায় যখন সুড়সুড়ি
দিতো, একপায়ে মাছেরা আর অন্যপায়ে ইন্দ্রাণী।

জানো মা! সেদিন যখন মামাবাড়ি ছেড়ে আমাকে
বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে তখন, ঘাটপাড়,
পাটাতন, বাঁশের সিঁড়ি, নদী, নদীর আশপাশ,
মাছেরা, এমন কি ইন্দ্রাণীও এক মায়াজালে
আছন্ন করে রেখেছিল আমায়!
ভালোবাসার নোনাজলে ওরা আমায় এমনভাবে
বেঁধেছিল যে, তোমার দুঃখগুলো আমি ছুঁতেই
পারলাম না, বরং এক অজানা সুখের
আহ্বানে এক পা দু’পা করে এগিয়ে গেলাম!

তুমি ঠিকই বলতে মা, ভাটির টানে বড়ো বেশি
আকর্ষণ থাকে। তোমার কথাই সত্যি হলো!
তোমার কাছে ফিরে আসার পথে এক অমোঘ
টান অনুভূত হলো আমার হৃদয়ে। তোমার
হাতটি ধরার জন্য সে কি আকুলিবিকুলি!
সেই ছোটবেলার মতো! পারলাম না মা!
পারলাম না তোমার হাতটি ধরতে!

জল থেকে ইন্দ্রাণী উঠে এলো! আমায় দু’হাতে
জড়িয়ে ধরে সেকি আনন্দে অবগাহন!
আমাকে নিয়ে যে এখন তার ছোটার পালা!
এখন যে ঐ দূর আকাশের তারা হতে তার
কোনো বাঁধা নেই..! বাঁধা তো আমারও নেই..!

তুমি দুঃখ করোনা মা, তুমি আর কেঁদো না!
আমি আর ইন্দ্রাণী এখন ঐ আকাশের তারা।
তুমি যেখানেই থাকো বাড়ি কিংবা মামাবাড়ি;
আমি তোমার সাথে সাথেই থাকবো।
তোমার নিকানো উঠোন, পুঁইয়ের মাচা,
কাঁঠাল গাছ, শিউলিতলা সব, সবকিছু পাহারা দেবো।

আর একটা কথা, তুমি যখন মামাবাড়ি আসবে,
ঐ পাটাতনটায় একটু বসো, পা দু’টি জলে ভিজিয়ে!
রিম্পা বলে না হয় আমায় একটু ডেকো!
নিশ্চয়ই আমি সকালের সোনারোদ হয়ে,
ক্লান্ত দুপুরে ভালোবাসার ছায়া হয়ে, অথবা
সন্ধ্যার ঝিরিঝিরি বাতাস হয়ে তোমায় ছুঁয়ে যাবো।
তখন তুমি চাইলেও আর আমায় ফেরাতে
পারবে না মা! তোমার পাশে বসেই না হয়
আবার আমি মাছেদের স্বপ্নবোনা দেখবো!

Facebook Comments Box