ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

সাদাত হোসাইন-এর ছোটোগল্প ‘কে?’

শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০ | ১১:৩০ অপরাহ্ণ | 1779 বার

সাদাত হোসাইন-এর ছোটোগল্প ‘কে?’

কে?
॥ সাদাত হোসাইন ॥

[প্রথম পর্বের পর]

বিপু বলল, ‘আমাদের কেউ অনুসরণ করছে?’
‘তাই তো মনে হচ্ছে’।
‘কিন্তু আমাদের অনুসরণ করার কারণ কী হতে পারে?’
‘বুঝতে পারছি না’।
‘পুলিশ?’

 

 

অনু সামান্য সময় নিয়ে বলল, ‘পুলিশ তো সরাসরিই জিজ্ঞেস করতে পারে। তাদের কেন আমাদের লুকিয়ে-চুরিয়ে অনুসরণ করতে হবে?’
‘তাহলে?’
অনু জবাব দিলো না। সে ডুবে আছে গভীর চিন্তায়।
অনুদের গাড়ির গতি কমেছে। ড্রাইভার নিচু গলায় বলল, ‘পেছনের গাড়ি থেকে থামার সঙ্কেত দিচ্ছে। কী করবো?’
অনু গাড়ি থামাতে বলল। পুলিশের গাড়িটা তার কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে থামলো। তবে গুরুতর কিছুই হলো না। অনু আর বিপুর পরিচয়পত্র দেখে তাদের ছেড়ে দিলেন অফিসার। তবে তার আগে সতর্ক ভঙ্গিতে বললেন, ‘দয়া করে হুটহাট কোনো নিউজ করবেন না’।
অনু মৃদু হাসলো, ‘কী নিউজ করবো? আপনারা তো কোনো তথ্যই দিচ্ছেন না’।
‘সময় হলেই দেবো। তবে তার আগে দয়া করে আপনারা সাংবাদিক হয়ে পুলিশের ভূমিকায় নামবেন না। মামলার তদন্তের ভার পুলিশের, সাংবাদিকের নয়’।
‘শখ করে কি কেউ এই রাত-বিরাতে ডেথ স্পটে ঘুরে বেড়ায় বলুন?’ অনু তরল ভঙ্গিতে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো। যদিও উত্তরের অপেক্ষা করলো না সে। সাথে সাথেই বলল, ‘আপনারা কিছু ইনফরমেশন তো এটলিস্ট আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন? তাহলে আমাদের আর কষ্ট করে পুলিশের ভূমিকায় নামতে হয় না’।
কথা বলতে বলতেই গাড়ির রিয়ারভিউ মিররে চোখ আটকে গেল অনুর। তাদের গাড়ির ঠিক পেছনেই খানিক দূরত্ব রেখে একটা মোটর বাইক দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় সাঁই সাঁই করে চলে যাওয়া গাড়ির হেডলাইটে হেলমেট পরা বাইকারের মুখটাও মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট হয়ে উঠল অনুর কাছে।
লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছে সে!

 

পাঁচ.
ঘটনার সপ্তাহখানেক বাদে অফিসে সম্পাদকের ঘরে বসে আছে অনু। সম্পাদক সায়েম সালেক বললেন, ‘আমার মনে হয় এটাকে এত গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই’।
‘একটা মেয়ে এভাবে খুন হলো আর পুলিশ সেই খুনের ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না?’
সায়েম সালেক হাসলেন, ‘তোমাদের বয়সে আমরাও এমন ছোটখাটো বিষয় নিয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠতাম। কিন্তু দেখো, চারপাশে আরো কত ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া একটা নাম পরিচয়হীন প্রস্টিটিউটের মারা যাওয়ার ঘটনায় তো আসলেই কারো কিছু আসে যায় না। এমন ঘটনা হরদম ঘটে। তাই না?’
অনু জবাব দিলো না।
সায়েম বললেন, ‘শুনেছি ভেতরে ভেতরে পুলিশ বলছে মেয়েটা সুইসাইড করেছে… কিংবা এটা নিছক একটা দুর্ঘটনা। তুমি খেয়াল করে দেখো কোনো পত্রিকাই কিন্তু বিষয়টা নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না’।
অনু কথা বলল না। তবে সায়েম সালেকের কথা সত্য। পত্রিকাগুলো যেন ঘটনা ভুলেই গেছে। অনু তার পরিচিত কয়েকজন কাছের সাংবাদিক বন্ধুর সাথেও কথা বলে দেখেছে, এ বিষয়ে কারো কোনাে আগ্রহ নেই। এখন সায়েম সালেকের কথা শুনে সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেল। তবে কি সে-ই একমাত্র মানুষ যে এই বিষয়টাকে অযথা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?
‘আমি যতটুকুই ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান করেছি, আমার মনে হচ্ছে মেয়েটা খুন হয়েছে এবং তাকে পরিকল্পিতভাবেই খুন করা হয়েছে…’। অনু যেন জোর করেই কথাটা বলল।
‘কে এবং কেন খুন করেছে? একটা প্রস্টিটিউটকে ওখানে ওভাবে খুন করার উদ্দেশ্য কী থাকতে পারে? ডাজ ইট মেক এনি সেন্স?’
‘তা জানি না। তবে কিছু একটা তো আছেই। তাছাড়া সেদিন আমাদের কেউ অনুসরণও করছিল’।
‘অনুসরণ? তোমাদের?’
‘পুলিশ নয়তো?’
‘পুলিশই। তবে তারা সরাসরিই আমাদের অনুসরণ করেছে। কথাও বলেছে। কিন্তু তারা ছাড়াও আড়াল থেকে অন্য কেউ ছিল’।
‘সাংবাদিকদের কেন অন্য কেউ অনুসরণ করবে?’
‘হয়তো কোনো তথ্য দিতে চাইছে কেউ? বা নিতে চাইছে’।
‘সেক্ষেত্রে সে ফোন করেই সেটা করতে পারে। অত ঝুঁকি নিয়ে অনুসরণ করতে যাবে কেন?’
‘তাতে ট্রেস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সে হয়তো ট্রেসড হতে চাইছে না। মানে কোনো রেকর্ড রাখতে চাইছে না ফোনে। এইজন্য সরাসরি কথা বলতে চায়’।
‘তাহলে অবগুণ্ঠন খুলে দেখা দিতে বলো’। তরল কবিতার স্বরে কথাটা বলেই হাসলেন সায়েম সালেক। যেন অনুর কথায় খুব একটা ভরসা বা আগ্রহ পেলেন না তিনি।
অনু সম্পাদকের ঘর থেকে বের হয়েই বিপুকে ফোন করলো, ‘আচ্ছা, তোর জানামতে আর কোনো পত্রিকা বা কোনো জার্নালিস্ট কি এই কেস নিয়ে কোনো কাজ করছে? বা কোনো ইনভেস্টিগেশন?’
‘নাহ’।
‘কেউ না?’
‘উহু’।
অনু ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে তার। তাহলে কি সে অযথাই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অনু খানিক থম মেরে বসে রইলো। পুরো বিষয়টাকে আবার মনে মনে প্রথম থেকে পর্যালোচনা করে দেখলো সে। কোথাও বড়াে ধরনের একটা খটকা আছে, যা সে ধরতে পারছে না। আর এ কারণেই হাল ছেড়ে দিতেও মন সায় দিচ্ছে না তার। সেদিন বিকেলে একা একা আবার ঘটনাস্থলে গেল অনু। তার ধারণা সেদিন কলোনির বাজারে আড়াল থেকে যে লোকটা তাদের অনুসরণ করছিল ঠিক সেই লোকটাই পরে আবার বাইক নিয়ে তাদের গাড়ি অনুসরণ করছিল। কিন্তু পুলিশের কারণে আর কাছে ভেড়েনি সে। আচ্ছা, সে কি আবারও তাকে অনুসরণ করবে? লোকটা কি তাকে কিছু বলতে চায়?
অনু একা একাই অনেকটা সময় কলোনির বাজারে, আশেপাশে ঘুরে বেড়ালো। কিন্তু কেউ এলো না। এমন কি আড়াল থেকে কেউ তাকে অনুসরণ করছে বলেও মনে হলো না। আছমত আলীর দোকানও বন্ধ। খানিক উদ্দেশ্যহীন হেঁটে অনু বাসায় ফিরল। তবে রাতে কিছুতেই ঘুম এলো না তার। ইন্টারনেটে এটা সেটা ঘাটাঘাটি করল সে। কলোনির বিল্ডিংগুলো হয়েছিল প্রায় বছর দশেক আগে। এর মধ্যে সরকার-প্রশাসনও বদলেছে। কিন্তু ভবনগুলো যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। ভঙ্গুর, অসমাপ্ত। দেখলে মনে হয় যেন এর কোনো সত্যিকারের মালিকানা নেই। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা বেওয়ারিশ স্থাপনা।
অনু ঘুমালো শেষ রাতে। তার ঘুম ভাঙল বিপুর উপুর্যপুরি ফোনে। ঘুম ঘুম চোখে ফোন ধরেেলা অনু, ‘বল?’
‘আজকের পত্রিকা দেখেছিস?’ বিপুর কণ্ঠে উত্তেজনা।
‘কোন পত্রিকা?’
‘সময়ের সংবাদ ও সন্ধানী’।
‘উহু দেখিনি। কেন কী হয়েছে?’
‘তারা প্রথম পাতায় লীড নিউজ করেছে কলোনীতে মেয়েটার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে’।
‘কী!’ ঝট করে উঠে বসলো অনু। ‘কী বলছিস তুই? এতদিন পর হঠাৎ? ঘটনা কী? কী লিখেছে তারা?’
‘তারা পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একইসাথে বিভিন্ন মানবাধিকার ও নারীবাদী সংগঠনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মেয়েটির মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে’।
অনু থ’ মেরে বসে রইলো। ঘটনার এতদিন পর হঠাৎ এভাবে সংবাদ হওয়ার ঘটনায় বিস্মিত হয়েছে অনু। যেখানে সে নিজে দেখেছে এই ঘটনা নিয়ে কারো কোনো আগ্রহ নেই। এমনকি কেউ এটা নিয়ে কোনো ধরনের হোমওয়ার্কও করেনি। ইনভেস্টিগেশনে আগ্রহ দেখায়নি। বরং সব সাংবাদিকরাই বিষয়টাকে অত্যন্ত গুরুত্বহীন করে দেখেছে। সেখানে রাতারাতি এত গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার মানে কী?
অনু বিছানা ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আর কোনো পত্রিকা নিউজ করেনি?’
‘নাহ্’।
‘শুধু এই দুটো পত্রিকাই?’
‘হুম’।
অনু চিন্তিত মুখে ফোন রাখল। বিষয়টা খুবই অস্বাভাবিক লাগছে তার কাছে। গত মাসখানেক সময়ে সে বহু সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছে। তার বন্ধু, কাছের-দূরের কিন্তু কারো কাছে এই ঘটনার কোনো গুরুত্ব আছে বলে অনুর মনে হয়নি। কিন্তু আজ হঠাৎ দুটো পত্রিকা একযোগে এত গুরুত্ব দিয়ে এই খবর ছাপার মানে কী? অনু বাজার থেকে দুটো পত্রিকাই কেনালো। তারপর দীর্ঘসময় মনোযোগ দিয়ে খবরগুলো পড়লো। অনু জানেনা কেন, খবরগুলো পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সম্পাদক সায়েম সালেকের ফোনটা এলো তখুনি। তিনি জরুরি তলব করেছেন অনুকে। অনু রুমে ঢুকে দেখে সায়েম সালেক গম্ভীর মুখে বসে আছেন। তার সামনে আজকের আলোচিত পত্রিকা দুটি। অনু বসতে বসতে বলল, ‘কোনো সমস্যা সায়েম ভাই?’
সায়েম সালেক বললেন, ‘আজকের এই পত্রিকাগুলো দেখেছ?’
‘জি দেখেছি’।
‘এরা হঠাৎ এত তথ্য কোথায় পেল? অথচ তুমি এত গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টা নিয়ে কাজ করেও কোনো তথ্য উদ্ধার করতে পারলে না?’
অনু সময় নিয়ে বলল, ‘নিউজে কি কোনো তথ্য আছে সায়েম ভাই?’
‘নেই?’ সায়েম সালেক অবাক চোখে তাকালেন।
‘থাকলে বলুন। আমি তো পড়ে এমন কিছু পেলাম না। এখানে যা আছে তা হলো পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। আর বিষয়টা নিয়ে কিছু সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা’।
সায়েম সালেক থমকে যাওয়া গলায় বললেন, ‘হুম, তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু সেটাই আমরা কেন করতে পারলাম না?’
‘কারণ সেটা আপনি চাননি’। অনু সম্পাদকের মুখের ওপরই কথাটা বলল। সায়েম সালেক অবশ্য তাতে কিছু মনে করলেন না। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু বিষয়টা কেমন হয়ে গেল না?’
অনু তার কপালের বাঁ দিকের শিরাটা তর্জনীতে চেপে ধরতে ধরতে বলল, ‘অবশ্যই কেমন হয়ে গেল। তবে এই সংবাদে সামথিং ইজ রং’।
‘সামথিং ইজ রং?’
‘হুম’।
‘কী?’
অনু গম্ভীর মুখে বলল, ‘সেটা আমি আগ বাড়িয়ে এখুনি বলতে চাই না। পরে আবার আপনি কবিতা আবৃত্তি করে অবগুণ্ঠন খুলতে বলবেন। তার চেয়ে আমাকেই অবগুণ্ঠন খুলতে দিন’।
বলে উঠে দাঁড়ালো অনু। সায়েম সালেক সামান্য নমনীয় ভঙ্গিতেই বললেন, ‘এই সংবাদের সমস্যা কী দেখলে তুমি?’
‘আমার দেখা বা অবজার্ভেশনটা তো ভুলও হতে পারে সায়েম ভাই। আর এ কারণেই আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চাইছি না আমি। তবে নিউজে যে অস্বাভাবিক বিষয়টা রয়েছে সেটা হয়তো আপনার চোখেও পড়বে। সে পর্যন্ত না হয় অপেক্ষা করি…’।
সায়েম সালেক কে আর কিছুই বলার সুযোগ দিলো না অনু। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেদিন সেই অনুসরণকারীর বিষয়ে সায়েম সালেকের করা তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যটা খুব গায়ে লেগেছিল তার।
রাতে বাসায় ফিরতে গিয়ে একটা চিঠি পেল অনু। গেটের দারোয়ান বলল, ‘আপনের একটা চিঠি আইছিল খালা। অনেকদিন আগেই আইছিল। দিতে ভুলে গেছিলাম’।
অনু ঘরে ফিরে চিঠিটা খুলল। টাইপ করা চিঠি। মাত্র দুটো লাইন লেখা তাতে, ‘আপনার সাথে জরুরি কথা আছে। আগ্রহী হলে আপনি আগামীকাল সন্ধ্যায় হাতিরঝিলের দক্ষিণ দিকের ব্রিজে থাকবেন। আমি আপনাকে খুঁজে নিবো’।
চিঠির এক কোণায় হাতে লেখা তারিখ। তারিখের পাশে একটা গোল বৃত্তচিহ্ন আঁকা। বৃত্তের ভেতর লেখা ‘১ম’। অনু এই ১ম লেখার অর্থ বুঝল না। তবে সে হিসেব করে দেখল প্রায় দিন দশেক আগে চিঠিটা দিয়েছিল লোকটা। সময়মতো চিঠিটা পায়নি বলে যেতেও পারেনি অনু। ফলে লোকটার কথাও শোনা হলো না তার। কী বলতে চেয়েছিল লোকটা? কে সে? আর কেনই বা এই মোবাইল ফোনের যুগে সে ফোন না করে চিঠি লিখেছিল অনুকে? ফোনে নিজের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে?
অনুর হঠাৎই মনে হলো বিষয়টাকে সবাই যতটা স্বাভাবিকভাবে দেখছিল, আসলে ততটা স্বাভাবিক তা নয়। এমনকি হতে পারে যে এই লোকটাই তাকে অনুসরণ করেছিল? কিছু বলতে চাইছিল? কিন্তু সুযোগ না পেয়ে অনুকে চিঠি লিখে গিয়েছিল? কিন্তু তারপরও যখন অনুকে পেল না তখন অন্য কাউকে খুঁজে নিয়েছিল সে?

অনু ঝট করে উঠে বসলো। তার অকস্মাৎ মনে হলো লোকটার উদ্দেশ্য সে ধরতে পেরেছে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্যের পেছনের কারণ সে ধরতে পারেনি।

 

ছয়.
পুলিশ একটি সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিং করেছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে তারা জানিয়েছে কলোনির ঘটনায় আসামী গ্রেপ্তার হয়েছে। আসামীর নাম জিল্লু। সে কলোনির পাশেই পুরনো মালামাল বা ভাঙ্গারির ব্যবসা করে। তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সেসব অভিযোগের বেশিরভাগই ছোটােখাটাে মাদক সংক্রান্ত। তবে সে কলোনির বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ না। যদিও ব্যবসার প্রয়োজনে কলোনির বাসিন্দাদের কাছ থেকে পুরনো তৈজসপত্র, আসবাব, জামা-কাপড়সহ নানান মালামাল কিনতে প্রায়ই সে কলোনিতে যেত এবং মৃত মেয়েটাকে এর আগেও তার সাথে তার দোকানে দেখা গেছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক বা অন্য কোনাে সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কে বনিবনা না হওয়ার কারণেই এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে। জিল্লু প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, কলোনিতে নিয়মিত আসা-যাওয়া থাকায় কেউ কখনো তাকে কিছু জিজ্ঞেস করতো না। সেদিন রাতে সে মেয়েটিকে নিয়ে কলোনীর ছাদে চলে যায়। সেখানে তাদের ঝগড়া হয়। সেটি শেষ অবধি ধস্তাধস্তি অবধি গড়ায়। এই ধস্তাধস্তির এক পর্যায়েই মেয়েটি ছাদ থেকে পড়ে যায়। ঘটনার সময় তারা দুজনই মাদকাসক্ত ছিল।
অনু বারকয়েক প্রেস ব্রিফিংটি পড়ল। খুবই তাড়াহুড়ো করে করা একটি প্রেসব্রিফিং। দেখলেই বোঝা যায়। বিপু বলল, ‘আর কী? কেস তো খতম’।
‘উহু। খতম না’।
‘মানে?’
‘মানে পুলিশ এখনও কেসের কিছুই উদঘাটন করতে পারেনি। আসলে তারা এটি নিয়ে কোনো কাজই করেনি। কোনো গুরুত্বই দেয়নি। তারা জাস্ট কলোনির বাসিন্দাদের যাতে কোনো নেতিবাচক ইমেজের মুখে না পড়তে হয় সেটি নিশ্চিত করতে চেয়েছে। আর কিছুই না। বরং তারা ভেবেছিল দিন কয়েক গেলে এমনিতেই সবাই সব ভুলে যাবে। কিন্তু দিন দুই আগে দুটো পত্রিকার করা নিউজ তাদের বাধ্য করেছে ঘটনার একটি তড়িঘড়ি সমাধান দিতে’।
বিপু হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘আর কিছু?’
‘ব্রিফিংয়ের শেষ লাইনটি দেখ। যেন ইচ্ছে করেই মাদকাসক্তের বিষয়টি বলা হয়েছে। ধর যেভাবে পুলিশ ঘটনাটি ব্যাখ্যা করেছে, তোর কী মনে হয়, তাতে এই জিল্লু খুনের মামলার আসামী হিসেবে শাস্তি পাবে?’
‘আমি জানি না ম্যাডাম…’। বিপু হতাশ ভঙ্গিতে বলল।
‘পাবে না। বরং মাসদুয়েক পর এমনি এমনিই ছাড়া পেয়ে যাবে। কেউ জানবেও না’।
খানিক চুপ করে থেকে অনু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো, ‘চল’।
‘কই?’
‘জিল্লুর ভাঙ্গারির দোকানে’।
‘কেন? সে তো এখন জেলে। ওখানে গিয়ে কী হবে?’
অনু জবাব দিলো না। হাঁটতে শুরু করল।
জিল্লুর দোকানটা একটা নোংরা ডোবার ওপর। বাঁশের মাচা আর কাঠের পাটাতন দিয়ে ঝুলন্ত দোকান তৈরি করা হয়েছে। চারদিকে পুরনো মালের জঞ্জাল। তার দুজন কর্মচারিকে দোকানে দেখা গেল। একজন খালি গায়ে মেঝেতে শুয়ে টিভি দেখছে। টিভিতে হিন্দি গান চলছে। এই টিভির অনুষ্ঠানই যে শুধু দর্শনীয়, তা নয়। বরং টিভিটাও দর্শনীয়। চট করে দেখলে মনে হবে বহু আগের কোনো অ্যানটিক এই টিভি। যদিও তাতে রঙিন ছবি দেখা যাচ্ছে। লোকটা গানের মিউজিকের তালে তালে পা নাচিয়ে মুখে শিষ দিচ্ছে। অনু আর বিপুকে দেখেও গুরুত্ব দিলো না সে। বিষয়টাতে ভারি অবাক হলো বিপু। যে দোকানের মালিক খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছে, সেই দোকানীর কর্মচারিকে তার পরদিনই এমন খোশমেজাজে দেখতে পাওয়া বিরল ঘটনা। অনু অবশ্য অবাক হলো না। সে পুরনো মালামাল কেনার ভান করে দোকানে ঢুকল। এটা-সেটা দামদরও করল। এক ফাঁকে সে চট করে বলল, ‘আপনাদের এবারের ফার্নিচারগুলো ভালো না। এর আগেরবার যেগুলো নিয়েছিলাম, খুব ভালো ছিল’।
‘কী নিছিলেন?’
‘ওয়ারড্রোব ছিল। সম্ভবত জাহাজের পুরনো মাল। সাথে ছোটো ফ্রিজও ছিল’।
লোকটা দাঁত কেলিয়ে হাসল, ‘ওইগুলা পাইতে আবার সময় লাগব। দুয়েকদিনের মধ্যেই ওস্তাদের মাল আনতে যাওনের কথা ছিল। কিন্তু পারল না তো’।
‘কেন?’
লোকটা হাসল, ‘ওস্তাদ একটু ঝামেলায় আটকাইয়া গেছে’।
‘কী ঝামেলা?’
লোকটা জবাব দিলো না।
অনু বলল, ‘আর পাওয়া যাবে না?’
‘মাস দুই তিন পরে আইসা খোঁজ নিয়েন।’
‘ততদিনে আপনার ওস্তাদের ঝামেলা শেষ হবে?’
লোকটা এবার আর জবাব দিলো না। বরং বিরক্ত ভঙ্গিতে অনুর দিকে তাকালো। অনু দোকান থেকে বের হয়ে দেখল বিপু ছবি তুলছে। নানান অ্যাঙ্গেলে আশেপাশের এলাকাগুলোর ছবিও তুলছে সে। অনু তাকে ডেকে নিচু গলায় বলল, ‘বুঝেছিস কিছু?’
‘কী?’
‘ওস্তাদের দুই তিন মাসের মধ্যেই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে’।
‘হুম। কিন্তু এত নিশ্চিত কী করে ওরা?’
‘এমনও তো হতে পারে, তাদের ওস্তাদ নিয়মিত এইভাবে জেল খাটে’।
‘হুম’।
‘কিন্তু খুনের মতো অপরাধে…’।
‘ওদের দেখে কি মনে হয়েছে যে ওদের মালিক খুনের অপরাধে জেলে?’
‘নাহ্, তা মনে হয়নি’।
‘সেটাই’ বলে রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল অনু। ‘পুলিশ হয়তো জিল্লুকে দিয়ে সবকিছু ঠান্ডা করার আপাতত একটা ব্যবস্থা করেছে’।
আশেপাশে খোঁজ খবর নিয়ে অবশ্য অনুর মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেল। জিল্লু মাঝেমধ্যেই কিছুদিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। সে নিয়মিত জেল খাটা লোক।

 

সাত.
প্রথমদিন থেকে আজ অবধি বিভিন্ন সময়ে বিপুর তোলা ছবিগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখছিল অনু। আর সেই ছবি দেখতে গিয়েই একটা জায়গায় তার চোখ আটকে গেল। স্পষ্ট না হলেও অন্তত দুটো ছবিতে বাইকার লোকটাকে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টা এমন নয় যে বিপু ইচ্ছে করে তার ছবি তুলেছে। বরং ওয়াইড লেন্সের এই ছবি দুটোতে নিজের অজান্তেই ক্যামেরাবন্দি হয়েছে লোকটা। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে সে দূরে তার বাইকের ওপর বসে ফোন টিপছে। আরেকটা ছবি সম্ভবত সেদিন জিল্লুর দোকানের ওখানে। লোকটা একটা চায়ের দোকানে বসে আছে। পাশেই তার বাইকটা রাখা। বিপু নিজেও খেয়াল করেনি বিষয়টি। লোকটা তাহলে জিল্লুর দোকান অবধিও গিয়েছিল? কিন্তু কেন? অনু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না। লোকটা মাঝখানে তাদের অনুসরণ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, তাহলে হঠাৎ আবার কেন অনুসরণ করা শুরু করলো? সে যা-ই হোক, লোকটার সাথে কথা বলতে চায় অনু। যে করেই হোক তাকে খুঁজে বের করতে হবে।
কিন্তু লোকটাকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে? সে কি আবারও তাকে অনুসরণ করবে? অনু দিন দুই উদ্দেশ্যহীনভাবে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ালো। কলোনির ঘটনাস্থলে, বাজারে, তার আশেপাশে। কিন্তু লোকটাকে কোথাও দেখল না সে। হতাশ অনু হঠাৎ উপলব্ধি করল যে কারণে তাকে লোকটার দরকার ছিল, সেই দরকার হয়তো অন্যকোনোভাবেই পূরণ হয়ে গিয়েছিল। আর এ কারণেই আর অনুকে অনুসরণ করেনি সে। কিন্তু যদি তা-ই হবে, তাহলে অতদিন বাদে সেদিন কেন আবার জিল্লুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সে? নাকি সেদিনের ঘটনা কাকতালীয়? সে আসলে অনুকে নয়, অন্য কোনো কারণেই গিয়েছিল জিল্লুর দোকানের ওখানে?
অনু চট করে উঠে দাঁড়াল। বিপুকে নিয়ে জিল্লুর দোকানের উলটোদিকে আড়ালে একটা জায়গায় দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে নজর রাখল তারা। কিন্তু লোকটাকে দেখা গেল না। তবে যে চায়ের দোকানটাতে সেদিন বাইক রেখে বসেছিল লোকটা, সেই দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল অনু আর বিপু। তারপর বিপুর তোলা লোকটার বাইকসমেত ছবি দোকানিকে দেখাতেই সে চিনে ফেলল। বলল, দিনকয়েক এখানে এসেছিল সে। জিল্লু সম্পর্কে নানান খোঁজ খবর করছিল। বিষয়টা ভাবিয়ে তুলল অনুকে। তার কেন যেন মনে হচ্ছে বাইকওয়ালা এই লোকটার মাধ্যমেই ঘটনার একটা যোগসূত্রের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে সে। কিন্তু পুরো বিষয়টাকে কিছুতেই একসূত্রে গাঁথতে পারছে না। যে করেই হোক লোকটার খোঁজ তাকে বের করতেই হবে। তবে উপায়টা বাতলে দিলো বিপু। সে বলল, ছবিতে বাইকের নম্বর প্লেটটা দেখা যাচ্ছে। চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে, নম্বর প্লেট থেকে তার ঠিকানা বের করা যায় কি না?
কাজটা অবশ্য সহজ হলো না। বাইকটা যার নামে নিবন্ধন করা খোঁজ নিয়ে দেখা গেল তিনি আর ছবির লোকটি এক ব্যক্তি নন। হতে পারে বাইকটি তিনি তার বন্ধুর কাছ থেকে ধার হিসেবে নিয়ে চালিয়েছেন। কিংবা সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছেন। তবে পরদিন বিপু যে খবরটি অনুকে দিলো, তা চমকে ওঠার মতো সংবাদ। অনু অবশ্য খুব একটা চমকালো না। সে খানিক স্থির তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তুই শিউর?’
বিপু বলল, ‘ওয়েট। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ডকুমেন্টসটা হাতে পাবো। বাইকটা কিস্তিতে কেনা। কিস্তির জন্য অফিসের মান্থলি স্যালারির স্টেটমেন্ট দিতে হয়। সেই স্টেটমেন্টে স্পষ্ট লেখা আছে যে লোকটা মাই হোম হাউজিং প্রোপার্টিজে জব করে’।
অনু চুপ করে বসে রইলো। বাইকের কিস্তির ডকুমেন্টস অনুর হাতে এসে পৌঁছাল তারও কিছুক্ষণ পর। সে ডকুমেন্টস হাতে বসে আছে। সেখানে ক্রেতার স্যালারি স্টেমেন্টসে স্পষ্ট তার চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা। বিপু বলল, ‘কী হলো?’
অনু খানিক চুপ থেকে বলল, ‘সায়েম ভাইকে বলো আগামী দুদিন আমি অফিস করছি না। তারপর দিন এসে সরাসরি আমি ওনার সাথে বসবো’।
বিপু কিছু বুঝল না। তবে অনুর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।

তিনি দিন পর।
সায়েম সালেক গম্ভীর মুখে তার অফিসে বসে আছেন। অনু আর বিপুও। দীর্ঘসময় পরে সায়েম সালেক বললেন, ‘তুমি নিশ্চিত?’
‘হাতেনাতে ধরার আগ অবধি কিছুই নিশ্চিত করে বলা ঠিক নয়। তবে আমি আপনাকে এক এক করে যুক্তিগুলো দিচ্ছি’।
‘হুম’।
‘আজ থেকে প্রায় বছর দশেক আগে মাই হোম নামের হাউজিং প্রপার্টিজ লিমিটেড কলোনির ওই ভবনগুলো তৈরি করে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সাথে তাদের রাজনৈতিক দ্বন্ধ ছিল। অন্যদিকে তারা যে জায়গাটাতে ভবনগুলো তৈরি করে তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয় যে ওই ভবনগুলো অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে সরকারি জায়গায়। এই নিয়ে মামলা হয়। আর সেই মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন রায় যায় সরকারের পক্ষে…। ফলে সাময়িকভাবে ভবনের মালিকানা হাতছাড়া হয়ে যায় তাদের। পরে মামলাটি আবার কোর্টে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু ওপর মহলের অনিহায় এই ভবনের মালিকানা নির্ধারণের মামলাটি একভাবে চাপা পড়ে যায়। সরকারি কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এতগুলো কর্মচারীর আবাসন নিয়ে নতুন করে কোনো সংকট তৈরি হোক সরকারও আর তা চায়নি। ফলে নানা চেষ্টা করেও মাই হোম কর্তৃপক্ষ আর মামলাটি চালু করতে পারেনি…’।
‘এগুলো জানা কথা। পত্রপত্রিকায় এসব নিয়ে বহু আগেই অনেক লেখালেখি হয়েছে। এখনও ইন্টারনেট সার্চ করলেই এসব পাওয়া যায়’। অনুকে থামিয়ে দিয়েই বললেন সায়েম সালেক।
অনু বলল, ‘হুম। আমিও তথ্যগুলো ইন্টারনেট থেকেই পেয়েছি। এগুলো ওপেন ইনফর্মেশন’।
‘হ্যাঁ। কিন্তু সেসবের সাথে এই খুনের ঘটনার সম্পর্ক কী?’
‘তৎকালীন সরকার ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরও মাই হোম চেষ্টা করেছে মামলা পুনরুজ্জীবিত করার। কিন্তু ঠিক ওই একই কারণে তারা সেটি পারেনি’।
‘হুম। এটাও জানা কথা’। সায়েম সালেকের কণ্ঠে বিরক্তি।
‘আর ঠিক সেই মুহূর্তে মাই হোমকে বর্তমান প্রভাবশালী কেউ আশ্বাস দিয়েছিল কলোনিতে এমন কোনো নেতিবাচক-সংবেদনশীল ঘটনা ঘটাতে যাতে করে কলোনীতে যে নিয়মিত নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটে এমন একটা বিষয় যাতে সামনে চলে আসে। বিশেষ করে মিডিয়াতে। সেক্ষেত্রে এই ভবনগুলো নিয়ে পূর্বের সরকারের সিদ্ধান্ত, মামলা নিয়ে অনীহা এবং এর অব্যবস্থাপনার বিষয়টা সবার চোখের সামনে উঠে আসবে’।
‘তার মানে তুমি বলতে চাইছো, মাই হোম কর্তৃপক্ষ এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে?’
‘সরাসরি মাই হোম কর্তৃপক্ষ নয়। তাদের অংশীদারদের একজন। এইটা তার নিজস্ব প্ল্যান। কিন্তু তাদের সেই প্ল্যানে গড়বড় করে পুলিশ। পুলিশ বিষয়টা চেপে গিয়ে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়। এমনকি মিডিয়াও বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি’।
‘কিন্তু দুটো পত্রিকা যে হঠাৎ অতবড়াে নিউজ করলো?’
অনু হাসল, ‘মজাটা সেখানেই। আপনাকে সেদিন একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে?’
‘কী কথা?’
‘ওই দুটো পত্রিকায় ছাপা হওয়া সংবাদে কোনো তথ্য নেই। যা আছে তা হলো পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আর কিছু সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা?’
‘হুম’।
‘আরো একটা বিষয় ছিল সেখানে। দুটো সংবাদই হুবহু এক। দুয়েকটা শব্দ-বাক্য এদিক সেদিক করা ছাড়া আর সবই প্রায় এক। যেন কোনো প্রেস ব্রিফিং হুবহু ছেপে দিয়েছে তারা’।
‘আসলেই?’
‘হুম’। বলে সেদিনের পত্রিকা দুটো সায়েম সালেকের দিকে ছুঁড়ে দিলো অনু। সায়েম সালেক দীর্ঘ সময় নিয়ে দেখে বললেন, ‘এই বিষয়টা আমার চোখে আসেনি কেন সেদিন? তুমি সেদিন এটার কথাই বলেছিলে যে এই সংবাদে সামথিং ইজ রং?’
‘হুম’।
‘তার মানে তুমি বলতে চাইছো এই সংবাদ দুটো মাই হোম থেকে কেউ কোনোভাবে ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করিয়েছে?’
‘একদম তাই। না হলে যে ঘটনা নিয়ে কারো কোনো আগ্রহই ছিল না, সাংবাদিকরা কোনো গুরুত্বই দিচ্ছিল না, তারা কেন হুট করে এত গুরুত্ব দিয়ে এমন সংবাদ প্রকাশ করবে? আসলে ঘটনা ঘটিয়েও যখন মাই হোম দেখলো পুলিশ ও মিডিয়ার তরফ থেকে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। একদম সুনসান নীরবতা, তখন তারা অসহিষ্ণু হয়েই বেপরোয়া এই কাজটি করেছে। তারা চেয়েছিল যে কোনোভাবেই হোক এটি আলোচনায় আসুক। আর সেই সুযোগে তারা পূর্বের সরকারের খামখেয়ালি এবং এই ভবনে তাদের মালিকানার বিষয়টি নিয়ে উচ্চকিত হবে। বিষয়টা এমন যে তাদের বৈধ ও ন্যায্য মালিকানার প্রকল্প পূর্বের সরকার বেআইনীভাবে দখল করেছিল। যেখানে কি না এখন প্রস্টিটিউশন চলে, মাদকের আখড়া বসে এমন কিছুই দেখাতে চেয়েছিল তারা। এতে করে প্রথমেই তারা নতুন করে ভবনের দাবী নিয়ে সরব হতে অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। পাবলিক সিম্প্যাথিও পাবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সংবাদটি প্রথম আমাকে দিয়ে আমাদের কাগজেই করাতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেটি সম্ভব হয়নি’।
‘আমাদের কাগজে!’ অবাক হলেন সায়েম।
‘হুম। বাইক নিয়ে যে লোকটি আমাদের অনুসরণ করছিল, তিনিই মূলত এই প্রস্তাবটি দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। এমনকি আমার বাসার গেটে দারোয়ানের কাছে চিঠিও রেখে গিয়েছিলেন যে আমার সাথে কথা বলতে চান। সেই চিঠিতে ১ম লেখা ক্রমিক নংও দেয়া ছিল। যদিও আমি চিঠিটি সঠিক সময়ে না পাওয়ার কারণে তিনি আমার আশা ছেড়ে দিয়ে এই দ্বিতীয় ও তৃতীয় অপশন বেছে নেন’।
‘কিন্তু খুনটি কে করেছে?’
‘সেটা আসলে এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না’।
‘কেন?’
‘আসলে প্রথম দিকে পুলিশের ওপর নির্দেশনা ছিল বিষয়টাকে তেমন হাইলাইট না করতে। সবাই ধরে নিয়েছিল এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এখন পুলিশ খুব গুরুত্ব দিয়েই বিষয়টি দেখছে। তারা এখন এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য আঁচ করতে পেরেছে। হয়তো আজকালের মধ্যেই খুনি ধরা পড়ে যাবে। কারণ মাই হোমের সেই পার্টনার যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। আর খুনটি তিনি করিয়েছেন ভাড়াটে কাউকে দিয়ে। সো ওটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র’।
‘নিশ্চিত তুমি?’
‘হুম। আপনার অনুমতি ছাড়াই একটা কাজ করেছি আমি’।
‘কী কাজ?’
‘পুলিশের সাথে আমার তদন্তে প্রাপ্ত কিছু তথ্য-ভাবনা শেয়ার করেছি আমি। গত দুদিন আগে তারাই আমার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। বিনিময়ে অবশ্য তারাও আমার সাথে কিছু তথ্য শেয়ার করেছে’।
গায়েম সালেক সাথে সাথেই আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। তবে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘লোকটার বাইকের কিস্তিতে স্যালারি স্টেটমেন্টে অফিসের নাম দেখেই তুমি নিশ্চিত হয়ে গেলে ঘটনা?’
‘উহু। আমি আসলে অনেকগুলো লিংক এক করেছি। মূল সন্দেহটা তৈরি হয়েছিল পত্রিকার ওই নিউজ দুটো থেকে। তার আগে ও পরে ওই ভবনগুলো নিয়ে যথেষ্ট জানাশোনারও চেষ্টা করেছি আমি। এর মধ্যে একটা লোকের ওভাবে অনুসরণ করা। চিঠি দেয়া। ভবনের মালিকানার ইতিহাস। মামলার অন্তর্বর্তীকালীন রায়। আর সর্বশেষ ওই মােটর বাইকের ঘটনা আমাকে খুব লজিক্যালি এই ঘটনার একটা মালা তৈরি করতে সাহায্য করেছে। মানে বাইকের স্যালারি স্টেটসেন্টটা ছিল মালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিসিং পুঁতি। যেটি পেয়ে যাওয়ার পর আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যাই যে এর সাথে মাই হোমের কোথাও না কোথাও একটা সম্পৃক্ততা আছেই। আর তখনই আমি রেজার সাথে বিষয়টা শেয়ার করি। এসব ক্ষেত্রে ওর চেয়ে ভালো পরামর্শ আর কেউ দিতে পারে না’।
‘ওহ, আমদের সেই বিশেষ পুলিশ অফিসার এস আই রেজা?’ সায়েম সালেক খানিক ইঙ্গিতপূর্ণভাবেই কথাটা বললেন। তার মুখে হাসি।
অনু যেন খানিক লজ্জাই পেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘জি। উনিই আমাকে এখানকার দায়িত্বরত এক পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলতে বললেন। এবং সেই পুলিশ অফিসারকেও আমার সাথে কথা বলতে বললেন। পুলিশ অফিসার তখন নিজ থেকেই ফোন করে আমার কথা শুনতে চাইলেন। তথ্যগুলো চাইলেন। গত দুদিনে পুলিশও আমাকে অনেক হেল্প করেছে। সেই বাইকারকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সে ঘটনার অনেক কিছু স্বীকারও করেছে’।
সায়েম সালেক উঠে দাঁড়ালেন। তারপর সামান্য নুয়ে বাউ করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘থ্যাংক ইউ অনু। এনাদার এক্সিলেন্ট জব। আমরা কি সবার আগে এই এক্সক্লুসিভ নিউজটা করতে পারি? একদম ঘটনার শুরু থেকে শেষ অবধি একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট?’
‘নিশ্চয়ই। আমি রিপোর্টটা অলরেডি করেও এনেছি। আপনি একটু চোখ বুলিয়ে দিবেন প্লিজ’।
‘আচ্ছা, আরেকটা কথা।’
অনু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। সায়েম সালেক বললেন, ‘ওই বাইকার লোকটা কেন বেশ কয়েকদিন জিল্লুর ওখানে গিয়েছিল?’
অনু ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘নিউজ হওয়ার সাথে সাথেই যে পুলিশ এভাবে চট করে কাউকে গ্রেপ্তার দেখাবে সেটি মাই হোমের সেই পার্টনার ভাবতে পারেননি। ফলে জিল্লু সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার জন্যই তিনি ওই লোককে ওখানে পাঠিয়েছিলেন। তবে ওটাই শেষ অবধি আমার প্রায় গেঁথে আনা মালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিসিং পুঁতিটার সন্ধান দিয়ে দিলো’।
‘ওহ্, গট ইট’। বলে হাসলেন সায়েম সালেক। এই মেয়েটাকে ভারি পছন্দ করেন তিনি। যদিও সেভাবে কখনো প্রকাশ করা হয়ে ওঠেনি। তবে এই ষাট বছর বয়সেও অকৃতদার সায়েম সালেকের আজকাল প্রায়ই মনে হয়, নিজের এমন একটা মেয়ে থাকলে মন্দ হতো না।

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments