ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

সাদাত হোসাইনের রহস্য গল্প ‘কে?’

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ | ৪:১৩ অপরাহ্ণ | 3162 বার

সাদাত হোসাইনের রহস্য গল্প ‘কে?’

রহস্য গল্প ‘কে?’
॥ সাদাত হোসাইন ॥

‘আপনার নাম?’
‘অনু’।
‘অনু?’
‘হ্যাঁ’।
‘কিন্তু আপনার সহকর্মী বললেন অনন্যা’।
‘ওটা আমার অফিসিয়াল নাম। সংক্ষেপে অনু। সবাই এই নামেই চেনে’।
‘ইওর আইডি কার্ড প্লিজ?’

 

 

অনু পুলিশ অফিসারকে তার পরিচয়পত্র দেখালো। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে অনন্যা। পুলিশ অফিসার খানিক কী ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে অল্পসময়েই খুব নাম করে ফেলেছেন আপনি’।
অনু হাসলো, তবে জবাব দিলো না। পুলিশ অফিসার তাকে গেটের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। জায়গাটা একটা ঘিঞ্জি কলোনী। চারপাশে উঁচু বিল্ডিং। মাঝখানে ব্যাডমিন্টনের কোর্টের মতো সামান্য একটুকরো ফাঁকা জায়গা। ঠিক যেন সংকীর্ণ আয়তক্ষেত্র। অনু গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো। কেমন দমবন্ধ লাগছে তার। সে মাথা তুলে তাকালো। চারদিকের ভবনগুলো মাথা তুলে আছে আকাশে। তাদের ফাঁক দিয়ে ফুটবল মাঠের মতো চৌকোণা আকাশটাকে দেখা যাচ্ছে। মেয়েটাকে কোন ভবনের ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে আন্দাজ করা কঠিন।
অনু পুলিশের সিকিউরিটি কর্ডনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। এখনো ছোপছোপ রক্ত পড়ে আছে সেখানে। মেয়েটার মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে গিয়েছিল। জায়গাটাতে এখনও মাছি ভনভন করছে। ভাঙা চুড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এখানে-সেখানে। বিপু খটাস খটাস শব্দে ক্যামেরার শাটার টিপছে। অনু হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো। তারপর বলল, ‘বিষয়টা অদ্ভুত না?’
‘কী?’
‘একদম জায়গা মতো এসে পড়েছে মেয়েটা’।
‘মানে কী?’
‘মানে চারপাশে চারটা উঁচু ভবন। ভবনগুলো একটা আরেকটা থেকে এতোই কাছাকাছি দূরত্বে যে মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা খুব ছোট। ফলে যে ভবনের ছাদ থেকেই কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হোক না কেন সে এসে পড়বে এই নিচের ফাঁকা জায়গাটাতে। কিন্তু তখন এটা আন্দাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে যে সে আসলে কোন ভবন থেকে পড়েছে’।
‘মেয়েটা এই চার ভবনের কোনোটাতেই থাকতো না?’
‘নাহ্। সে এখানকার কেউ না। তাকে এখানে কেউ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কোন ভবনে নিয়ে এসেছিল সেটাই এখনো জানা যায়নি’।
বিপু গম্ভীর কণ্ঠে বললো, ‘হুম। সেটা জানা গেলে অন্তত নিশ্চিত হওয়া যেত যে কোন ভবন থেকে পড়েছে’।
‘হুম। সেটাই…’। মাটি থেকে কিছু কুড়িয়ে নিয়ে অনু বলল, ‘আর পুলিশ এটাও জানতে পারবে না যে তাকে কে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ এই চারটা বিল্ডিংয়ে কয়েক শ ফ্ল্যাট। হাজার হাজার মানুষ থাকে। কাকে সন্দেহ করবে পুলিশ? একজন চতুর খুনীর জন্য এরচেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না’।
‘তুই নিশ্চিত যে সে নিজে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেনি? এরকম তো আজকাল অহরহই হচ্ছে?’
‘হচ্ছে। কিন্তু সে তো এখানে থাকে না, তাহলে এখানে এসে কেন আত্মহত্যা করবে সে? আত্মহত্যা করার জায়গার কি অভাব পড়েছে? আমার কী মনে হয় জানিস?’
‘কী?’

‘এটা একটা দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত খুন। খুনী মেয়েটাকে এই চার ভবনের কোনাে একটা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে খুন করেছে। এবং খুব ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে সে খুনটা করেছে’।
‘কিন্তু তাতে তার ঝুঁকি থেকে যায় না?’
‘কীসের ঝুঁকি?’
‘বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যেতে পারে যে মেয়েটাকে নিয়ে কে বিল্ডিংয়ে ঢুকেছিল’।
‘আমার ধারণা এখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই’।
‘কেন থাকবে না?’
‘বিল্ডিংগুলো দেখ কত হাইরাইজ! কিন্তু একটা বিল্ডিংয়েরও কাজ ঠিকঠাক শেষ হয়নি’।
‘তাতে কী?’
‘এটা আসলে মাই হোম নামের একটা হাউজিং কোম্পানির প্রজেক্ট ছিল। তারা কম দামের সস্তা অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবেই তৈরি করে বিক্রি করতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায় যে তাদের এই প্রজেক্ট নিয়ে সরকারের সাথে নানান জটিলতা। সরকার বলছে এটা সরকারি জায়গা। তারা বলছে তাদের। এই নিয়ে মামলাও চলেছে বহুদিন। পরে সরকারের পক্ষে একটা অন্তর্বর্তীকালীন রায় গিয়েছে। ফলে সরকার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসন সমস্যা নিরসনে এটাকে তাদের জন্য কলোনীর মতো ব্যবহার করছে’।
বিপু এবার চারদিকটা ভালো করে দেখলো। আসলেই, সবকিছুতে কেমন একটা গা ছাড়া ভাব। উঁচু ভবনগুলোর দেয়ালের রং উঠে গেছে। কোথাও কোথাও পলেস্তরাও খসে গেছে। সে অনুর দিকে তাকালো, ‘তুই এতো কিছু জানলি কী করে?’
‘পড়েছি’।
‘কখন!’

‘গতকাল সকালে যখন মেয়েটার মৃত্যুর খবর পেলাম তখুনি। আসলে কাল তো কিছু করার ছিল না। পুলিশ জায়গাটা ব্লক করে রেখেছিল। কাউকে কোনো ইনফর্মেশন দিচ্ছিল না। সাংবাদিকদেরও ঢুকতে দিচ্ছিল না। তখন ভাবলাম অন্তত জায়গাটা নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখি’।
‘কিন্তু খুনী যখন মেয়েটাকে নিয়ে এখানে এসেছে তখন তো অন্য কারো দেখে ফেলার ঝুঁকিও ছিল। ছিল না?’
‘হ্যাঁ ছিল। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, সে মেয়েটাকে বোরকা পরিয়ে এনেছিল। কিংবা নিজে আলাদা ঢুকেছিল। আর মেয়েটাও আলাদা?’
‘হুম, তা হতে পারে’।
‘তাছাড়া চারদিকে তাকিয়ে দেখ, ঢোকার জন্য দু’পাশে দুটাে গেট। তাও ভাঙা। কোনো দারোয়ান-গার্ড নেই। গেটের কাছে কোনো আলোর ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই। ল্যাম্পপোস্টে লাইটও নেই’।
‘তোর তো দেখি শকুনের চোখ’। বিপু টিপ্পনী কাটলো। এত কিছু সে খেয়াল করেনি। তারপর বলল, ‘এখন কী করবি?’
‘মেয়েটার পরিচয় বের করার চেষ্টা করবো। তাহলে হয়তো খুনীর ইন্টেনশনটা কিছুটা হলেও পরিস্কার হবে। সমস্যা হচ্ছে পুলিশ কোনাে ইনফর্মেশনই পাস করছে না’।
‘পুলিশ কেন মেয়েটার বিষয়ে কিছু বলছে না?’
‘কারণ পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই’।
‘কী বলিস?’
‘হুম। আমার ধারণা মেয়েটার লাশের সাথে তাকে আইডেন্টিফাই করার মতো কিছুই ছিল না’।
‘তাহলে আমরা কীভাবে করবো?’
অনু চিন্তিত ভঙ্গীতে বলল, ‘সেটাই ভাবছি’।

 

দুই.
বৃদ্ধ চা দোকানীর নাম আছমত আলী। আছমত আলীর মুখ ভর্তি দাড়ি। দাড়িতে মেহেদী লাগিয়েছেন তিনি। চোখে সুরমা। পরনে হাফ হাতা ঘিয়ে রঙা ফতুয়া। তিনি মনোযোগ দিয়ে চা বানাচ্ছেন। যদিও দোকানে এই মুহূর্তে ক্রেতা কেউ নেই। দোকানটা কলোনী থেকে সামান্য দূরে। অনু কী দেখে আচমকা দাঁড়িয়েছে। দোকানের সামনের ফাঁকা বেঞ্চিতে বসতে বসতে সে বলল, ‘আশেপাশে কোথাও পুরি পাওয়া যাবে চাচা?’
আছমত আলী চোখ তুলে বললেন, ‘চা খাইবেন? চা খাইলে বহেন। পুরি আনানোর ব্যবস্থা করতেছি’।
তিনি তার সহকারী ছেলেটাকে দিয়ে পুরির ব্যবস্থা করলেন। অনু চায়ে ডুবিয়ে পুরি খেতে খেতে বলল, ‘এই বয়সেও এত সিগারেট কেন খান চাচা? আপনার চেহারার সাথে কিন্তু সিগারেট যায় না’।
আছমত আলী হকচকিয়ে গেলেন। তিনি সিগারেট খান কি না তা এই মেয়ে কী করে জানলো! অনু বলল, ‘অবাক হওয়ার কিছু নাই চাচা। আপনার ফতুয়ার কয়েক জায়গায় সিগারেটের আগুন পড়ে ফুটো হয়ে গেছে। আপনি আমার চায়ে পুরি ডুবিয়ে খেতে দেখে অবাক হয়েছেন বলে আপনাকে চমকে দিলাম’।
আছমত আলী বিব্রত ভঙ্গিতে হাসলেন, ‘ছাড়ার চেষ্টা করতেছি। কিন্তু নেশা বড় খারাপ জিনিস। ছাড়তে চাইলে আরো চাইপ্যা ধরে’।
‘আমার এটা কিন্তু নেশা না। এটা যে আমি পছন্দ করি তাও না। আমার খুব পছন্দের একজন মানুষ আছে। তার নাম রেজা। পুলিশে চাকরি করে। এই জিনিস তার খুব পছন্দ। চায়ে ডুবিয়ে পুরি খুবই বিচ্ছিরি খাবার। কিন্তু সে কেন এটা এত পছন্দ করে, সেটা বোঝার জন্য আমি মাঝে মাঝে খাই। কিন্তু এখনো বুঝতে পারিনি। খাবার হিসেবে এটা জঘন্য’।
আছমত আলী একটু সতর্ক হলেন। মেয়েটার কথাবার্তা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। তাছাড়া তাদের কলোনীর মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটাতেই গতকাল একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। এই সময়ে যতটা সম্ভব সাবধানে কথা বলা উচিত। তিনি বিগলিত ভঙ্গিতে হাসলেন। অনু বলল, ‘আপনি তো এই কলোনীতেই থাকেন তাই না?’
আছমত আলী বুঝতে পারছেন না তার কী বলা উচিত। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছেন যে মেয়েটা কিছু না জেনেই এখানে আসেনি। তাছাড়া মেয়েটার সাথে একটা ছেলেও রয়েছে। ছেলেটার হাতে বড় লেন্সের ক্যামেরা। সাংবাদিক টাংবাদিক হবে হয়তো। তিনি প্রশ্নটি না শোনার ভঙ্গিতে বললেন, ‘চায়ে চিনি ঠিক মতো হইছে খালা?’
অনু বলল, ‘আমি কিন্তু জানি আপনি এই কলোনীতেই থাকেন। এবং আপনার নাম আছমত আলী’।
আছমত আলী এবার চমকে গেলেন। তিনি বিচলিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনার পরিচয়?’
‘আমার নাম অনু। আমি সাপ্তাহিক দূরবীনে কাজ করি। সাংবাদিক’।
আছমত আলী সম্ভবত দূরবীনের নাম শোনেননি। দূরবীন নতুন সাপ্তাহিক পত্রিকা। সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও তেমন সাড়া না ফেললেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ক্রমশই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আছমত আলী অবশ্য সাংবাদিক পরিচয় শুনে নড়েচড়ে বসলেন। অনু বলল, ‘আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই চাচা। আপনার দোকানের সামনে সিটি কর্পোরেশনের কীসের যেন একটা অতি পুরনো রং ওঠা টিনের সার্টিফিকেট প্লেট সাঁটানো আছে। ওটাতে আপনার নাম আর ঠিকানা দেয়া আছে। ঠিকানায় কলোনীর নাম উল্লেখ করা’।
‘ওহহহ!’ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
অনু বলল, ‘কিন্তু একটা প্রশ্ন’।
‘কী প্রশ্ন?’
‘এই কলোনী তো শুধু সরকারি কর্মচারীদের থাকার জায়গা। কিন্তু আপনি তো সরকারি কর্মচারি নন, আপনি হচ্ছেন টং দোকানী। তো আপনি এখানে থাকেন কী করে?’
আছমত আলী ভড়কে গেলেন। তবে সাথে সাথেই জবাব দিলেন না। অনু বলল, ‘আপনার মতো কি আরো অনেকেই এখানে থাকে?’
আছমত আলী যেন এবার খানিক ভরসা পেলেন। তিনি একা দোষী হলে সমস্যা। কিন্তু আরো অনেকেই একই দোষে দুষ্ট হলে তেমন সমস্যা নেই। তিনি কাঁচুমাঁচু ভঙ্গিতে বললেন, ‘জি খালা। এই জায়গা ভালো মানুষের থাকার মতো না। ভিতরে গেলে বুঝবেন। বাথরুম ভাঙ্গা, পানি থাহে না, গ্যাস থাহে না। এইজন্য সরকারি লোকেরা অনেকেই থাকতে চায় না। কেউ কেউ অন্য জায়গায় বাসা ভাড়া কইরা থাহে। আর আমাগো মতন গরীব মানুষের কাছে তাগো বাসা ভাড়া দেয়। তাও ধরেন একেক রুমে চাইর পাঁচজন গাদাগাদি কইরা থাহি’।
‘এখানে এমন ভাড়া দেয়া বাসা কতগুলো আছে?’
‘তাতো বলতে পারবো না সঠিক। তয় পঞ্চাশ ষাইটটা বাসায় তো বাইরের লোক ভাড়া থাহেই’।
‘বিল্ডিং তো চারটা। ভাড়াটেরা কোনটাতে থাকে?’
‘সবগুলাতেই কম বেশি থাহে’।
‘আচ্ছা’।
অনু চিন্তিত ভঙ্গিতে চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। যেন কোনো একটা বিষয় তার ভাবনায় খচখচ করছে। কিন্তু বিষয়টা সে পুরোপুরি ধরতে পারছে না। অনু আর সেদিন অফিসে ফিরলো না। তবে রাতে বিপুকে ফোন করলো সে, ‘পুলিশ কিছু জানিয়েছে বা মিডিয়াতে কিছু বলেছে?’
‘হু’।
‘কী?’
‘মেয়েটাকে রেপের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি’।
‘যায়নি?’ অনুর কণ্ঠে খানিক উত্তাপ।
‘উহু’।
‘আর পরিচয়?’
‘পরিচয়ও মেলেনি এখনো’।
‘মেয়েটার কোনো আত্মীয় স্বজনও যোগাযোগ করেনি?’
‘সম্ভবত না। পুলিমতো কিছু বলল না’। বলে একটু থামলো বিপু। তারপর বলল, ‘বিষয়টা একটু অদ্ভুত না? অন্তত মেয়েটার রিলেটিভদের তো কারো না কারো এতক্ষণে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করার কথা ছিল…’।
‘ওয়েট… ওয়েট…’। বিপুকে থামিয়ে দিলো অনু, ‘উম্মমমম…’। কিছু বলতে গিয়েও যেন নিজেকে সামলে নিলো অনু। বিপু অবশ্য তার কৌতূহল দমাতে পারলো না। সে বলল, ‘কী? বল?’
অনু সাথে সাথেই জবাব দিলো না। অনেকক্ষণ একমনে কী ভাবলো। যেন জটিল কোনো হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে। তারপর বলল, ‘আচ্ছা, যদি এমন হয় যে মেয়েটা কোনো প্রস্টিটিউট?’
‘প্রস্টিটিউট?’
‘হুম। সেদিন রাতে মেয়েটাকে কেউ ওখানে নিয়ে এসেছিল। আর মেয়েটা প্রস্টিটিউট বলেই কেউ এখনো তার কোনো খোঁজ নিতে আসেনি!’
অনুর কথায় যুক্তি আছে। তবে বিপু এত সহজে মেনে নিতে চাইলো না। সে বলল ‘হুম তা হতে পারে। কিন্তু তাহলেও বড় একটা প্রশ্ন থেকে যায়’।
‘কী প্রশ্ন?’
‘মেয়েটা যদি প্রস্টিটিউটই হবে। তাহলে তাকে কেউ কেন বাসায় নিয়ে আসবে? সেক্সের জন্যই তো, তাই না?’
‘হুম’।
‘কিন্তু পুলিশ বলছে মেয়েটার সাথে সেই রাতে যৌন সংসর্গের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তাহলে? তাহলে কেন একজন পতিতাকে কেউ বাসায় নিয়ে যাবে?’
‘খুন করতে!’
‘খুন করতে! একজন প্রস্টিটিউটকে বাসায় নিয়ে যাবে খুন করতে?’ বিপু ভারি অবাক হলো।
‘হ্যাঁ’।
‘কিন্তু কেন?’
‘দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন। তাকে সুপরিকল্পিতভাবে এখানে খুন করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে একজন প্রস্টিটিউটকে কেন খুন করার জন্য এখানে নিয়ে আসা হবে?’
‘আমরা কিন্তু নিশ্চিত নই যে মেয়েটা প্রস্টিটিউটই। সো ওটা ধরে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ঠিক হচ্ছে না’।
‘তা হচ্ছে না। আর এজন্যই মেয়েটার পরিচয় পাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আর…’।
‘আর কী?’
‘আমাদের কাছে এই ঘটনার সাথে মেলানোর মতো একটা তথ্য কিন্তু আছে’।
‘কী তথ্য?’
‘ওই কলোনীতে প্রায় পঞ্চাশটার মতো বাসায় বাইরের লোক ভাড়া থাকে। বাকিরা সব সরকারি কর্মচারী। অর্থাৎ কর্মচারীরা সবাই মোটামুটি তাদের পরিবার নিয়েই থাকে। সুতরাং রাত-বিরাতে তাদের ঘরে বাইরের কোনো মেয়ে নিয়ে আসার সম্ভাবনা কম। তাই না?’
‘হু’।
‘সেক্ষেত্রে যুক্তি কী বলে?’
‘তুই বলতে চাইছিস যে মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিল ভাড়াটেদের কেউ?’
‘এক্স্যাক্টলি। হয়তো ভাড়াটেদের মধ্যে কেউ সেদিন বাসায় একা ছিল। সে মেয়েটাকে খুন করার উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছিল’।
‘কিন্তু এটা খুব বেশি কষ্ট কল্পিত চিন্তা হয়ে যাচ্ছে না?’
‘হয়তো। আমি জাস্ট অনেকগুলো সম্ভাবনা আর যুক্তি দিয়ে ঘটনার একটা মালা গাঁথার চেষ্টা করছি। এর সব যে ঠিক হবে তা নয়। আবার সব যে ভুল হবে, তাও নয়। সবচেয়ে বড় কথা সম্ভাবনাগুলো কিন্তু খতিয়ে দেখতে হবে। আর আমার ধারণা যুক্তি বিবেচনায় এই সম্ভাবনাগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী’।
বিপু এবার সাথে সাথেই জবাব দিলো না। তবে অনুর কথায় যুক্তি আছে। তার ভাবনায় হয়তো অনেক ফাঁক-ফোঁকড়ও আছে। কারণ সে যা বলছে তার পুরোটাই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া স্রেফ অনুমান বা যুক্তির ওপর নির্ভর করে এমন বড় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াও সম্ভব নয়। আবার যুক্তিগুলো ভাবলে বিষয়টাকে ফেলেও দিতে পারছে না বিপু।

 

তিন.
ঘটনার সপ্তাহখানেক পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে পুলিশের তরফ থেকে আর কোনো আপডেট পাওয়া গেল না। এমনকি মেয়েটির পরিচয়ের বিষয়েও না। তবে বিপু সেদিন ফোন করে বলল, ‘তোর ধারণাই ঠিক অনু’।
‘কী ধারণা?’
‘মেয়েটা একজন ভ্রাম্যমাণ পতিতা’।
‘পুলিশ আইডেন্টিফাই করেছে?’
‘হুম’।
‘তুই জানলি কী করে? পুলিশতো মিডিয়াকে কিছু জানালো না। কোনো ব্রিফিংও করলো না?’
‘এতদিন ধরে সাংবাদিকতা করি আর পুলিশের ভেতর থেকে এই সামান্য সংবাদ জানার কোনো সোর্স থাকবে না?’
‘হুম তা থাকবে। কিন্তু পুলিশ তাহলে এতদিনেও কেন পাবলিকলি তার পরিচয় প্রকাশ করছে না?’
‘কারণ বিষয়টা সেন্সিটিভ’।
‘ সেন্সিটিভ কেন’?
‘কারণ খুনটা যেখানে হয়েছে সেটি একটি সরকারি কোয়ার্টার, যেখানে লোকজন তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকে। সেখানে একজন প্রস্টিটিউটের এমন খুনের ঘটনা খুব সেন্সিটিভ না? এর সোশ্যাল ইম্প্যাক্টও কিন্তু খুব নেগেটিভ’।
‘তাই বলে পুলিশ বিষয়টা একদম ধামাচাপা দিয়ে দিবে? কোনো ইনভেস্টিগেশনও হবে না?’
‘হবে নিশ্চয়ই। তবে সেটা পুলিশ হয়তো পাবলিকলি করতে চাইবে না। নিজেরা চুপচাপ দোষীকে খুঁজে শাস্তি দিয়ে দিতে পারে’।
‘তার মানে পুলিশ চাইছে বিষয়টা নিয়ে মিডিয়া যেন কোনো আলাপ-আলোচনা না করে? তাহলে দু-দশ দিন গেলে এমনিতেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে?’
‘একদম। অলরেডি কিন্তু বিষয়টা আড়ালে চলে গেছে’।
‘হুম’। অনু যেন আনমনেই শব্দটা করলো।

সেদিন বিকেলেই আছমত আলীর চায়ের দোকানে গেল অনু। তবে প্রথম দিনের মতো আর তাকে আদর করে বসতে দিলেন না তিনি। বরং যেন দেখতে পাননি এমনি ভঙ্গিতে চোখ সরিয়ে নিলেন। তারপর নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আছমত আলী। অনু বসতে বসতে বললো, ‘আজ আর পুরি হবে না তাই না চাচা?’
‘লোক নাই’। আছমত বিরক্ত ভঙ্গিতে বললেন। তার চোখেমুখে একইসাথে সন্ত্রস্ত ভাব। অনু বলল, ‘তারপর আর কী খবর চাচা?’
আছমত আলী বিচলিত ভঙ্গীতে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বললেন, ‘আপনে আমার কাছে কী চান খালা?’
‘আপনার কাছে চা চাই’। অনু হাসলো। ‘চা ছাড়া আর কিছু কি চাওয়ার আছে আপনার কাছে? থাকলে বলেন?’
আছমত আলী কথা বাড়ালেন না। তিনি ব্যস্ত হাতে চা বানিয়ে দিলেন। অনু বলল, ‘আপনার কী হয়েছে চাচা?’
‘কী হইবো? আছমত আলীর গলায় সন্ত্রস্ত ভাব।
‘মনে হচ্ছে কোনো কারণে আপনি ভয় পাচ্ছেন? আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই’।
‘আপনারে আমি ভয় পামু কেন? আমি কী চোর না ডাকাইত? আর কলোনীতে আমি একলা থাহি না, আরো অনেকেই থাহে। ভাড়া দিয়া থাহি। কেউ কোনোদিন কইতে পারবো না এক টাকাও বাকি…’। কথাটা শেষ করলেন না আছমত আলী। যেন আচমকা মনে হলো তিনি এই বিষয়ে কোনো কথাই বলতে চান না। সামান্য থেমে বললেন, ‘আপনের চা খাওয়া হইলে যান খালা। আমার কাছের তন বাউক্কা প্যাঁচাল শুইন্যা আপনের কোনো লাভ নাই। সাংবাদিকগো লগে কথা কওনে মানা আছে’।
‘কে মানা করেছে?’
আছমত আলী কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। মাঝপথে থেমে গেলেন। তার চোখে ভীতি। দূরে রাস্তার শেষ মাথায় একটা পুলিশ ভ্যান দেখেত পেলো অনু।

ফেরার পথে বিপু বলল, ‘আছমতকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে কে মানা করছে?’
‘পুলিশ’।
‘পুলিশ? কেন?’
‘ওই যে পুলিশ চাচ্ছে না যে এটা নিয়ে মিডিয়াতে কোনাে শোরগোল উঠুক’।
‘তাহলে কি তারা সবাইকেই মানা করে দিচ্ছে?’
‘সেটা জানি না। তবে এমন হতে পারে যে আছমত আলীদের মতো যারা ভাড়া থাকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। আর তখন হয়তো বলেছে এই বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে যেন কোনো কথা তারা না বলে’।
‘এমন কি হতে পারে যে আছমত নিজেই পুলিশের কাছে বলেছে যে সেদিন তার সাথে আমাদের কথা হয়েছে। আর তখনই পুশির তাদের আরো সতর্ক করে দিয়েছে?’
‘হুম। এটার ভালো সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বিপু একটা কথা…’।
‘কী?’
‘স্রেফ একজন প্রস্টিটিউট বলেই পুলিশ বিষয়টাকে আড়াল করতে চাইছে বলে তোমার মনে হয়? অন্য কোনো কারণ নেই?’
‘কী কারণ থাকবে বলে তোমার মনে হয়?’
‘আমি জানি না। তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে অন্য কোনো কারণও আছে’।
বিপু কথা বলল না। তবে একটা লোক যে তাদের আড়াল থেকে অনুসরণ করছে সেটি হঠাৎই তারা বুঝতে পারলো।

 

চার.
বিপু ফিস ফিস করে বলল, ‘লোকটা কে হতে পারে? পুলিশের কেউ?’
‘যে-ই হোক, পাত্তা দিস না। নরমাল থাক’। অনু অনুচ্চ কণ্ঠে বলল।
তারা দুজন হেঁটে কলোনীর কাছে এলো। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। গেটের কাছে খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো অনু। তার চোখে সতর্ক দৃষ্টি। সে সামনের গেট থেকে হেঁটে সোজাসুজি পেছনের দিকটাতে গেল। আবার ফিরে এলো আগের জায়গায়। মাথা উঁচু করে তীক্ষ্ণ চোখে কী দেখলো। তারপর আবারও বারদুয়েক চক্কর মারলো জায়গাটা। পেছনের দিকের গেটের পাশের ল্যাম্পপোস্টটার নিচে ঘন ঘাস। সেই ঘাসের ভেতর থেকে নিচু হয়ে কিছু একটা তুলে নিলো সে। তারপর বিপুকে বলল, ‘চল’।
অনুর গলায় চাপা উত্তেজনা। বিষয়টা নজর এড়ালো না বিপুর। বিপু বলল, ‘কী হয়েছে?’
‘ল্যাম্পপোস্ট দুটা খেয়াল কর’।
বিপু ভালো করে তাকিয়ে খেয়াল করার চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুই বুঝলো না। সে হতাশ চোখে অনুর দিকে তাকালো। অনু বলল, ‘গাড়িতে চল, বলছি’।
গাড়িতে উঠেই নিজের হ্যান্ডব্যাগ থেকে চকচকে একটা ধারালো কাচের ছোট্ট টুকরো বের করলো অনু। তারপর বিপুর হাতে দিয়ে বলল, ‘দেখ?’
‘কী এটা?’
‘কাচ ভাঙা’।
‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি’। বিভ্রান্ত চোখে তাকালো বিপু।
অনু নিজের হাতের তালু থেকে আরো একটা টুকরো তুলে দিলো বিপুর হাতে। তারপর বলল, ‘এটা?’
‘এটাও’।
‘কী মনে হচ্ছে? একই কাচ ভাঙা টুকরো না এই দুটো?’
বিপু খানিক দেখে বলল, ‘একদম। কিন্তু এর মানে কী?’
‘এই টুকরোটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম প্রথম যেদিন এখানে আসি, সেদিন’। বলে ব্যাগ থেকে বের করা টুকরোটাকে দেখায় অনু। তারপর বলল, ‘আর আজ এই টুকরোটা। খেয়াল কর, দুটোই মূলত একটা ভাঙা লাইটের টুকরো, তাই না?’
‘হুম’। বিপু আবারো ভালো করে দেখে বলল। ‘তার মানে কেউ পেছনের গেটের পাশের ল্যাম্পপোস্টের লাইট ভেঙেছিল ঘটনার আগে আগে?’
‘উহু। ল্যাম্পপোস্টের না। কারণ ল্যাম্পপোস্টে তো কোনো লাইটই নেই। দেখিসনি? অকেজো হয়ে আছে পুরো সিস্টেম। বহুদিন কোনো লাইটই লাগানো হয়নি ওখানে?’
‘সেটাই তো! সেদিন দিনের আলোতেও দেখলাম, ল্যাম্পপোস্টে কোনো আলোর ব্যবস্থাই নেই। সিস্টেমও অকেজো। আজ রাতেও তুই বলার পর ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, একটাতেও কোনো লাইট নেই’।
‘কিন্তু জায়গাটা তাহলে অন্ধকার থাকার কথা ছিল না?’
‘হুম, ছিল’।
‘তাহলে? জায়গাটা কি অন্ধকার ছিল?’
বিপু আচমকা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেল। তার এখন মনে হচ্ছে ওখানে অন্ধকার ছিল না, বরং পেছনের গেটটাতে আলোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সেই আলোর উৎস সম্পর্কে সে নিশ্চিত নয়। সে বলল, ‘তা ছিল না। কিন্তু বিভিন্ন বাসা থেকে তো আলো আসতে পারে?’
‘উহু, ওপাশের জায়গাটা একটু ঘুপচি মতোন। একটা গাছও আছে। ফলে ওখানে বাইরে থেকে আলো আসার সুযোগ কম। আর যেহেতু ল্যাম্পপোস্টগুলোও অব্যবহৃত, সেহেতু সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে গাছের ডালে একটা বাল্ব ঝোলানো হয়েছিল। সেই বাল্বটার আলোই আমরা আজ দেখেছি। কিন্তু ঘটনার দিন এই বাল্বটা ছিল না। এটা কেউ ভেঙে ফেলেছিল। সে সতর্কতা হিসেবে ভাঙা টুকরোগুলোও কুড়িয়ে নিয়েছিল। কিন্তু দুয়েকটা টুকরো পড়েছিল এখানে-সেখানে’।
বিপু হতভম্ব চোখে তাকালো অনুর দিকে, ‘তার মানে ওই রাতেই লোকটা পেছনের গেট থেকে মেয়েটাকে নিয়ে ঢুকেছিল?’
‘হ্যাঁ’।
‘কিন্তু পেছনের গেট দিয়ে এত ঝুঁকি নিয়ে লাইট ভেঙে অন্ধকার করে কেন ঢুকতে যাবে সে? সামনের গেটে তো কোনো আলোই নেই’।
‘কারণ সামনের গেট দিয়ে ঢুকতে হলে তাকে খোলা বাজার পেরিয়ে আসতে হবে। সেটা রিস্কি। তাকে হয়তো কেউ দেখে ফেলতে পারতো! পেছনের গেট দিয়ে এলে সেই সম্ভাবনা নেই। ওদিকটা নির্জন। কেবল গাছের ডালের লাইটটা অন্ধকার করে ফেলতে পারলে সামান্য ঝুঁকিটুকুও আর থাকে না’।
বিপু চুপ করে রইলো। অনুও। অন্ধকারের বুক চিরে গাড়ির হেডলাইট এগুচ্ছে। পেছনে তাদের অনুসরণ করে আসছে আরো একটি গাড়ি।

[আগামীকাল শেষ হবে]


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments