একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প

সংশপ্তক

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৭:৫০ অপরাহ্ণ | 704 বার

মাগো, বাড়িতে কেউ আছেন গো মা? আমারে একটু ভিক্ষা দিবেন গো মা?
একজন বৃদ্ধ মানুষের ডাক শুনে দরজা খোলে রতন। রতন এ বাড়ির ছোট ছেলে। বয়স দশ কী বারো বছর হবে। পড়ে ক্লাস সেভেনে। ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে।
কী চাই? রতন জিজ্ঞেস করে।
– একটু ভিক্ষা চাই বাজান।
– আপনি ফকির?
– হ বাজান, আমি ফকির।
– আপনি ভিক্ষা করেন কেন? আপনি জানেন না, ভিক্ষা করা মহাপাপ!
– হ বাজান, জানি।
– তাহলে?

– কী করুম কও? আমার যে একটা পা নাই।
– আপনার পা নাই কেন? রতন দুঃখী ভাবে বলে।
– কেটে ফেলতে হইছে বাজান।
– কেন কেটে ফেলতে হইচে আপনার পা? এ্যাক্সিডেন্ট হইছিল?
– হ বাজান এ্যাক্সিডেন্ট হইছিল!
বলতে বলতে দু’চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে আবদুর রহমানের। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভীষিকাময় সেদিনের দুঃসহ কিছু স্মৃতি।

আবদুর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে নিজের জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছিলেন দেশের জন্যে। যুদ্ধ তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ঘরবাড়ি, স্ত্রী-সন্তান সব। যুদ্ধ ধ্বংস ডেকে আনে সমাজে। আবদুর রহমান তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। আজও পাচ্ছে। সাজানো-গোছানো সুখের সংসার ছিল তার। হঠাৎ কালবোশেখীর কালোমেঘের ছোবলে সব লন্ডভন্ড হয়ে যায় এক নিমিষে।
সেদিন ছিল শুক্রবার। আবদুর রহমান জুমআর নামাজ পড়তে মসজিদে গেছে। এদিকে গ্রামে পাকিস্তানী সৈন্যরা আক্রমণ করে। মানুষজন হত্যা করে ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় হানাদার সৈন্যরা। আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে ঘর থেকে ঘরে, এ বাড়ী থেকে ও বাড়ী। আবদুর রহমানের গ্রাম শান্তিপুর অশান্তির কালোমেঘে ঢেকে যায় হঠাৎ। সবাই নিজের জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক পালাতে থাকে। কিন্তু অসীম সাহসী আবদুর রহমান পালায়নি। নিজের বাড়ির দিকে ছুটে যায় সে। নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় তার প্রিয়তমা স্ত্রী রহিমা আর একমাত্র শিশু সন্তানকে রেখে এসেছিল। ওরা নিশ্চয়ই বিপদের মধ্যে আছে। ওদের রেখে কিছুতেই পালাতে পারে  না সে। আবদুর রহমান ছুটছে, শুধু ছুটেই চলেছে উর্ধ্বশ্বাসে।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে নিজের সংসার পুড়ে যাওয়া দেখল সে। কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল আবদুর রহমান।
এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ। যুদ্ধ তখনো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েনি। কেবল ঢাকা ও এর আশেপাশে যুদ্ধ চলছে। ঠিক যুদ্ধ বললে ভুল হবে। চলছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা। গ্রামের পরে গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে ওরা। নিরীহ মানুষ হত্যা করছে নির্বিচারে।

প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল আগেই। এবার তা আরও বেড়ে গেলো।  বিশেষ করে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ায় দেশের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করল।
শান্তিপুরে কোনো অশান্তি ছিল না। যুদ্ধের আঁচ তখনো লাগে নি সেখানে। কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিল না এ গাঁয়ে। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের রক্তপিপাসা মেটাতে গ্রামের পরে গ্রাম ধ্বংস করছে। শান্তিপুর তাদের সেই লোলুপ দৃষ্টি থেকে  রেহাই পেলো না।
স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে আবদুর রহমানের মনে হলো বেঁচে থাকাটাই বৃথা। একই গ্রামের জব্বার মন্ডলের সাথে দেখা হয় তার। জব্বার মন্ডল শিক্ষিত লোক। ঢাকায় থাকেন। তিনি একটু-আধটু রাজনীতির সাথেও জড়িত। তিনি আবদুর রহমানকে বললেন, ‘সবই তো গেছে রহমান ভাই। এখন বাঁচতে হলে লড়াই করেই বাঁচতে হবে। এর প্রতিশোধ নিতে হবে আমাদের।’
জব্বার মন্ডল নিজেও সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। তারও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার ও আলবদররা।
জব্বার মন্ডল ও আবদুর রহমান পরামর্শ করে রাতের অন্ধকারে বর্ডার পার হয়ে ভারতে চলে গেলো। তারা যুদ্ধের ট্রেনিং নিল আগরতলা ক্যাম্পে। সেখান থেকে তারা চলে আসে জয়পুরহাটে। বেশ কটি সফল গেরিলা যুদ্ধ করে তারা। যুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহিদ হয় জব্বার মন্ডল। প্রাণে বেঁচে গেলেও আবদুর রহমানকে একটি পা হারাতে হয়।
ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হয়। আবদুর রহমান আর গাঁয়ে ফিরে আসেনি।  কেন ফিরবে সে, কার কাছে ফিরে আসবে সে! বন্ধনহীন আবদুর রহমানের যেখানে দৃষ্টি যায়, সেখানেই ক্রাচে ভর করে চলে যায় সে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকেই ব্যস্ত দেশ পুর্নগঠনে। আবার কেউবা ব্যস্ত নিজের আখের গোছাতে! আর একজন মুক্তিযোদ্ধা জাতির অকুতোভয় নির্ভিক সৈনিক আবদুর রহমান জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন সংস্থানের জন্য দ্বারে দ্বারে ধর্ণা দেয়!

হঠাৎ রতনের ডাকে সম্বিত ফিরে পায় সে। কিছু সময়ের জন্যে সে হারিয়ে গিয়েছিলো অতীত দিনগুলোতে, যেখানে তার স্ত্রী-সন্তানকে রেখে গিয়েছিলো। স্বজনের কথা মনে পড়তেই দু’চোখ অশ্রুসজল হয় তার।
– কী ব্যাপার? আপনি কাঁদছেন?
– ও কিছু না বাবা, চোখে কী যেন একটা পড়েছে।
– আপনার ছেলেমেয়ে নেই?
– আমার কেউ নাই বাবা। আমি একা।
– কেন, নেই কেন?
আবদুর রহমান কী করে এই ছেলেটিকে বুঝাবে তার তার কষ্টের কথা। ছোট্ট রতনের প্রশ্নের কোনো জবাব নেই আজ তার কাছে।
রতন তবু আবার প্রশ্ন কওে, ‘কী হলো বললেন না যে?’
– কী বলব বাবা?
– আপনার কেউ নেই কেন?
– সে অনেক কথা বাজান।
– তবু বলেন, আমি শুনব।
রতন নাছোরবান্দা। কিছুতেই ছাড়তে চায় না সে। যে প্রশ্ন এতোদিন আবদুর রহমান এড়িয়ে চলেছে, ছোট্ট রতনের কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে আজ-কী করে  সে একা হলো, আর কী করেই বা পা হারিয়েছে, সেসব কাহিনী।
মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমানের সেই কাহিনী শুনতে শুনতে রাতনের মনে হতে লাগলো রূপকথার কোনো গল্প শুনছে সে। রূপকথার সে গল্পে পাকিস্তানী সৈন্যরা রাক্ষস-খোক্কস আর আবদুর রহমান সাহসী রাজপুত্র!  আবদুর রহমান কাছ থেকে রতনের শোনা রূপকথার সে গল্পে চারদিক থমথমে। পরবর্তী মুহূর্তেই কী ঘটবে, কেউ তা বলতে পারে না। ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো বালাই নেই। ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন নেই। বেঁচে থাকাটাই যেন এক স্বপ্ন তখন। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ।
বাতাসে লাশের গন্ধ। পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মমতার বিষবাষ্পে বাঙালি জাতি তখন নিষ্পেষিত। বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত! অসহায় নারী-পুরুষ-শিশুরা বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটছে তো ছুটছে! শহর থেকে গ্রামে- গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
সেদিন পাকিস্তানী বাহিনীর এই ধ্বংসাত্মক কাজে যারা সাহায্য করেছিল, তারা এদেশেরই সন্তান আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা
পাকিস্তানী সৈন্যদের সহায়তা করেছিল এ দেশের মানুষকে হত্যা করতে, ধর্ষণ করতে! সেদিন যদি রাজাকাররা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে না যেত, হয়তোবা দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত হারাতে হতো না। এতো এতো মুক্তিযোদ্ধাকে জীবন দিতে হতো না। স্বার্থলোভী ওই দেশের শত্রুরা নিরীহ জনগণকে হত্যা করে তাদের ধন-সম্পদ লুট করতো। আর ঘর থেকে মা-বোনদের ধরে নিয়ে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিতো! আর ক্যাম্পে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো তাদের। এক সময় বাংলার আপামর জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সে কী তুমুল যুদ্ধ! চারদিকেযুদ্ধ। তখন অস্থির এক সময়।
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে এদেশ শত্রুমুক্ত হয়।
মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহমানের গল্প শুনে রতন প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধ করার ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে সে! আজ তো আর পাকিস্তানী সৈন্যরা নেই। তবে রাজাকার আছে, আলবদর আছে। তাদের বিচার চায় রতন।
হঠাৎ রতন বলে ওঠে, ‘আপনি বুঝি মুক্তিযোদ্ধা? মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কতো পড়েছি বই পুস্তকে! আজ আপনাকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে কী যে ভাল লাগছে আমার। কিন্তু সেই সাথে ভীষণ দুঃখও হচ্ছে। আপনারা দেশের একজন শ্রেষ্ঠ সন্তান। অথচ আপনাকে আজ ভিক্ষা করতে হচ্ছে! আমরা শিশুরা কেউ আপনাদের এই অবস্থায় দেখতে চাই না। আপনারা হলেন আমাদের স্বপ্নের মানুষ। আমরা চাই আপনাদের যোগ্য সম্মান দিতে।’
এক কিশোরের মুখে এমন কথা শুনে আবদুর রহমানের বুক গর্বে ভরে ওঠে। দু’চোখ আবার সজল হয়ে ওঠে। এ তার দুঃখের অশ্রু নয়, আনন্দের কান্না। অনেক হতাশার মাঝে একবিন্দু আশার বারি।
মনে নতুন করে বল পান তিনি। বর্তমানের কাছে না হোক, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এক প্রতিনিধির কাছে মুক্তিযোদ্ধারা এখন অপাংক্তেয় নন। তাদের মূল্য আছে,- এ কথা ভেবে ভালো লাগে তার। কতদিন পরে এমন ভাল লাগছে তারঠিক মনে নেই। তবে এখনো  সে স্বপ্ন দেখে, একদিন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সবাই জানবে। মানুষ জানতে পারবে মুক্তিযোদ্ধাদের সেই সব কষ্টের দিনলিপির কথা। রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার একদিন এই বাংলার মাটিতে হবে, সেই আশাতেই এখনো বেঁচে আছে সে। এখনো সে স্বপ্ন দেখে শোষণমুক্ত বাংলাদেশের।
আজ ১৬ ডিসেম্বর। শহর জুড়ে বিজয়ের গান বাজছে। বিজয়মেলা চলছে গ্রামে-গঞ্জে সবখানে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চলছে নানা অনুষ্ঠানমালা। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছে হুরমত উল্লাহ। একাত্তরে  সেআঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। তার মুক্তিযোদ্ধার একটি সার্টিফিকেট আছে। নিজেকে সে মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দিয়ে বেড়ায়। হুরমত উল্লাহ কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছে সেকথা কেউ জানে না। আজ বাড়ি-গাড়ি কী নেই তার! ভুয়া একটি সার্টিফিকেটের জোরে তার দুই ছেলে সরকারি চাকরি করছে! অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আজ পথে পথে ঘুরে মরছে। তিনবেলা ঠিকমত খেতে পারেন না তারা। অথচ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে কত সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে! তবে সেসব সুযোগ-সুবিধা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ক’জনেই বা ভোগ করতে পারছেন, সে হিসাব কারও কাছে নেই।
হুরমত উল্লাহর ভাষণ শুনে সবাই হাততালি দিচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে দূর থেকে আবদুর রহমানের কষ্ট বাড়ে, যন্ত্রণার আগুনে পুড়ে ছারখার হয় সে। মানুষের নৈতিক অবক্ষয় আর অধপতনের মধ্যেও  হতাশ হয় না আবদুর রহমান। সে নতুন করে স্বপ্ন দেখে । শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার মুক্তি সংগ্রামে নিজেকে আবারও উৎসর্গ করার দৃঢ় সংকল্প নেয় আবদুর রহমান।

 

আহমেদ রব্বানী,জয়পুরহাট

Facebook Comments