শুভ জন্মদিন সত্যজিৎ রায়

বৃহস্পতিবার, ০২ মে ২০১৯ | ১০:২৫ অপরাহ্ণ | 195 বার

শুভ জন্মদিন সত্যজিৎ রায়

ভারত তথা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের এবং বাংলা সাহিত্য জগতের অতি পরিচিত একটি নাম হল সত্যজিৎ রায়। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, দার্শনিক, প্রকাশক এবং শখের জ্যোতির্বিদ। পিতা সুকুমার রায়ের পারদর্শিতা ছিল বাংলা সাহিত্যের ননসেন্স ও শিশু সাহিত্যে। দক্ষ চিত্রকর ও সমালোচক হিসেবেও সুকুমার রায়ের খ্যাতি ছিল।

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সত্যজিৎ রায় মাত্র ৩ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মা সুপ্রভা দেবীর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন মামাবাড়িতে। আট বছর বয়সে বালিগঞ্জ গভঃ স্কুলে ভর্তি হন। তারপর প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম দুই বছর বিজ্ঞান নিয়ে ও শেষ এক বছর অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। সত্যজিৎ-এর প্রধান আগ্রহ ছিল চারুকলায়।

ছাত্র থাকাকালীন সময়ে থেকেই তিনি পাশ্চাত্য সংগীত ও চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে পড়েন। ১৯৩৯ সালে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মায়ের কথায় শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১৯৪০ সালে। সেখানে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে অঙ্কন শিক্ষা সত্যজিৎ রায়ের পরবর্তী জীবনে বিশেষ কাজে লাগে।

১৯৪৩ সালে সত্যজিৎ রায় কলকাতায় ফিরে আসেন এবং মাত্র ৮০ টাকা মাসিক বেতনে ‘জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার’ পদে যোগ দেন ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ‘ডি জে কিমার’-এ। এরপর তিনি ডিকে গুপ্তের প্রকাশনা সংস্থা ‘সিগনেট প্রেস’-এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।

সত্যজিৎ সিগনেট প্রেস থেকে ছাপা বইগুলোর প্রচ্ছদ আঁকতেন স্বাধীনভাবে। এখানে সত্যজিৎ-এর আঁকা প্রচুর বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জিম করবেট-এর ‘ম্যানইটার্স অব কুমায়ুন’ ও ও জওহরলাল নেহেরু’র ‘দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’, বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কালজয়ী বাংলা উপন্যাস ‘পথের পাচালি’র একটি শিশুতোষ সংস্করণ আম আঁটির ভেপু’।

১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত ও অন্যান্য কিছু ব্যক্তি একসাথে প্রতিষ্ঠা করেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি। এই সময় থেকেই সত্যজিৎ-এর বিদেশী চলচ্চিত্র দেখার মুল সুত্রপাত ঘটে। এই সবের মধ্যেই জঁ রেনোয়া তার ‘দ্য রিভার’ চলচ্চিত্রটির শুটিং করতে কলকাতায় আসেন এবং আলাপ হয় সত্যজিৎ রায়ের সাথে। তার মানসিক সন্মতি সত্যজিৎকে ‘পথের পাঁচালী’র চলচ্চিত্রায়ণ করতে উৎসাহ দেয়।

ডি জে কিমার ১৯৫০ সালে সত্যজিৎকে লন্ডনে পাঠান তাদের প্রধান কার্যালয়ে। এই সময়ে ইতালীয় নব্য বাস্তবতাবাদী ছবি ‘লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে’ (ইতালীয় Ladri di biciclette ‘সাইকেল চোর’) দেখেই সত্যজিৎ তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি একজন চলচ্চিত্রকার হবেন।

১৯৫২ সালের শেষের দিকে সত্যজিৎ তাঁর নিজের জমানো পয়সা খরচ করে শুরু করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’র দৃশ্যগ্রহণ। টাকার অভাবে দৃশ্যগ্রহণ প্রায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলতে থাকে। অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৫৫ সালে ছবিটি নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ছবিটি মুক্তিলাভের সাথে সাথেই প্রচুর প্রশংসা লাভ করে দেশে ও বিদেশে। এরপর একের পর এক ছবি বানাতে শুরু করেন সত্যজিৎ রায়।

চলচ্চিত্র নির্মানের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় চালিয়ে গিয়েছেন তার সাহিত্যকর্ম। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি চরিত্র ‘গোয়েন্দা ফেলুদা’ এবং অন্যটি বিজ্ঞানী ‘প্রফেসর শঙ্কু’র স্রষ্টা হলেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ তাঁর ছেলেবেলা নিয়ে লিখেছেন ‘যখন ছোট ছিলাম’ (১৯৮২)।

চলচ্চিত্রের ওপর লেখা প্রবন্ধগুলি হল: ‘আওয়ার ফিল্মসঃ দেয়ার ফিল্মস’, ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ এবং ‘একেই বলে শুটিং’।

৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সত্যজিতের চলচ্চিত্র বিষয়ক নিবন্ধের একটি সঙ্কলন পশ্চিমে প্রকাশিত হয় (Our Films, Their Films)। বইটির প্রথম অংশে সত্যজিৎ ভারতীয় চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেন এবং দ্বিতীয় অংশে হলিউড, কিছু পছন্দের চিত্রনির্মাতা ও ইতালীয় নব্যবাস্তবতাবাদের ওপর আলোচনা করেন। এছাড়াও সত্যজিৎ ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ নামে একটি ননসেন্স ছড়ার বই এবং ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিন’-এর বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে একটি হাসির বই লেখেন।

সত্যজিৎ রায় প্রচুর পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন। তিনিই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব- যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি প্রদান করে (প্রথম চার্লি চ্যাপলিন)। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাঁকে সেদেশের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার ‘লেজিওঁ দনরে’ প্রদান করে।

১৯৮৫ সালে ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে ‘অস্কার’ তাঁকে একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার প্রদান করে এবং ভারত সরকার তাঁকে প্রদান করেন দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’। মৃত্যুর পরে তাঁকে মরণোত্তর ‘আকিরা কুরোসাওয়া’ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের আজকের দিনে (২ মে) কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।