শিল্পী বীরেন সোমের চিত্রকলায় মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেম

শুক্রবার, ০৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:০৬ অপরাহ্ণ | 274 বার

শিল্পী বীরেন সোমের চিত্রকলায় মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেম

বাঙালি স্বাধীন হয়েছে, পেয়েছে স্বাধীন ভূখণ্ড। স্বাধীনতার জন্য এদেশের চারুশিল্পীরা রং তুলিতে যুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন আন্দোলনে শিল্পীদের ভূমিকা যতটা না প্রতিবাদমুখর ততোধিক উদ্বুদ্ধ করেছে সারা বাংলার মানুষের চেতনা জাগাতে। দেয়াল লিখন, পোস্টার, ফেস্টুন, ক্যারিকেচারে ধ্বনিত হয়েছে প্রতিবাদের সুর। ঊনসত্তরের গণ আন্দোলনকে বেগবান করেছিল চারুশিল্পীদের পোস্টার মিছল। ছয়দফা ও এগারো দফা দাবির আন্দোলনে রাজপথের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন আঁকিয়েদের মধ্যে বীরেন সোম ছিলেন অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বর অত্যাচার, ধর্ষণ ও গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল। গেল বছর নভেম্বরে গ্যালারি চিত্রকে ‘মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ শীর্ষক চিত্রপ্রদর্শনী ছিল মূলত তাঁর সাম্প্রতিক সময়ে শৈল্পিক চোখে ফিরে দেখা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিপট; কিংবা বলা যায়, একান্তই স্মৃতি রোমন্থন। এই স্মৃতি শুধু তাঁর শিল্পকর্মেই নয় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শিল্পীসমাজ’ গ্রন্থের লেখনীতে প্রকাশ করেছেন। প্রদর্শনী উপলক্ষে এই গ্রন্থের চন্দ্রাবতী একাডেমি কর্তৃক পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশনা উৎসব হয়েছে গ্যালারি চিত্রকে। গ্রন্থে বিভিন্ন আন্দোলনের আলোকচিত্র সমন্বিত ঐতিহাসিক সত্য উঠে এসেছে তা স্বাধীনতার দলিলপত্রে এক নতুন অধ্যায় সংযোজন বলা যায়।

১৯৭১ সালে কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ চিন্তামণি কর এবং কামরুল হাসানের নেতৃত্বে চারুশিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়ে যে প্রদর্শনী প্রথমে কলকাতায়, পরে দিল্লি বোম্বাইয়ে হয়েছিল সে প্রদর্শনীতে মুস্তফা মনোয়ার, কামরুল হাসান, নিতুন কুন্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, স্বপন চৌধুরী প্রমুখ শিল্পীদের সাথে শিল্পী বীরেন সোম সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই সময়ে তার আঁকা ‘নাইটমেয়ার’ ছবিটি উল্লেখযোগ্য।

‘মাদারল্যান্ড’ বা ‘মাতৃভূমি’ শীর্ষক সিরিজের কাজগুলোর কোনোটি প্রতিচ্ছায়াবাদী ধারায়, কোনোটি অর্ধ-বিমুর্ত ধারায় আবার কোনোটি বিমুর্ত ধারায় এঁকেছেন। যে ধারায়ই এঁকেছেন না কেন, এর মূল ভাব ও ভাবনায় বাংলার মাটি, আকাশ, নদীর-জলের রূপ-রস-গন্ধ। যে মাটির জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছিল, সেই মাটিতে যেন আজও মিশে আছে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ছাপ। তাই ভূমিদৃশ্যের প্রায় প্রতিটি ছবিতেই রয়েছে লাল রঙের বিস্তরণ ।

একই সাথে বন্দনা করা হয়েছে রুপসী বাংলার নয়নাভিরাম রূপকে। ‘মাদারল্যান্ড ২২’ চিত্রে বৃহদাকৃতির ক্যানভাসে শিল্পী নীল ও সাদা মেঘের আকাশের বিশালতা দেখিয়েছেন। বাদ পরেনি বিশাল আকাশের নিচে সবুজের হাতছানি। যা মূলত আবহমান বাংলা ভূখণ্ডের রূপ-বৈভব। এই চিত্রজমিনে গড়িয়ে পড়া রঙের ধারা যেমন রেখার সৃষ্টি করেছে, তেমনি ফ্ল্যাট ব্রাশের গতিময় আঁচড় বায়বীয় গতি সৃষ্টি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন নিসর্গবেষ্টিত স্থাপনাকে তিনি একাত্তরের সময়ের রঙে মিলিয়ে দেখেছেন। তাইতো ‘মাদারল্যান্ড সিরিজের কয়েকটি কাজে ধানমন্ডি লেকসহ বিভিন্ন স্থানের ল্যান্ডস্কেপ চিত্র পাওয়া যায়। বাদ পড়েনি সেন্টমার্টিন, বুড়িগঙ্গা এবং অতিক্রান্ত বাল্যস্মৃতি-নির্ভর গ্রামের বাড়ির রুপসী বাংলার দৃশ্য। চিত্রজমিনে অয়েল প্যাস্টেলের গতিময় রেখা তাঁর সৃজন-কৌশলের বৈশিষ্ট্য। এই রেখাগুলোই ভূমিরূপের দূর-নৈকট্যৈর আদল তৈরিতে সাহায্য করেছে।


২৫শে মার্চের ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড আজও শিল্পীর চেতনাকে উদ্বেলিত করে। সেজন্যই ‘ডিভাস্টেশন-৭১’ , ‘কিলিং ফিল্ড-৭১’ এবং ‘লিবারেশন ওয়ার’ চিত্রগুলোতে একাত্তরের গণহত্যা, নৃশংসতা, মাতৃভূমি রক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার বলিষ্ঠ আবয়ব উঠে এসেছে। এ ছাড়া,’বঙ্গবন্ধু’ সিরিজচিত্রে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং সংগ্রামী নেতার বলিষ্ঠ ভূমিকা দৃশ্যায়িত হয়েছে। বিষয়ে বর্ণনে ‘বঙ্গবন্ধু ২’ ও ‘বঙ্গবন্ধু ৭’ চিত্রের কম্পোজিশন নান্দনিক। তবে বঙ্গবন্ধু সিরিজের অধিকাংশ কাজে রয়েছে পোস্টারের আদল। অর্থাৎ শিল্পী পোস্টারের শিল্পগুণ কাটিয়ে পেইন্টিংয়ের গুণাবলি বা মায়া সৃষ্টি করেননি। এই সিরিজে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিপ্রধান ও টেক্সটনির্ভর কাজগুলো দেখলে অন্তত এমনটি মনেে হয়।

কালো রঙে আঁকা গণহত্যা ও ধ্বংসের চিত্রগুলো শোকের প্রতীকী আবহ অনুমেয় হলেও ‘মাদার ল্যান্ড’ সিরিজচিত্রগুলোর রং প্রক্ষেপণ অনেকটাই মনোটোনাস অর্থাৎ এসব ছবিতে বিভিন্ন রংয়ের কম্পোজিশনে তিনি যে বাংলার সামগ্রিক রূপ ধরতে চেয়েছেন তা একান্তই কল্পনাপ্রসূত।তবুও বলা যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী বাঙালির সোচ্চার প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ইতিহাসকেন্দ্রিক এই প্রদর্শনী শিল্পীর দেশাত্মবোধের পরিচয় বহন করেছে।গ্যালারি চিত্রকে প্রদর্শনীটি ১৫ নভেম্বর শুরু হয়ে দর্শকদের জন্য খোলা ছিলো ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত।


বিভিন্ন শিল্পীর শিল্পকর্মে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধ পরিলক্ষিত হয় । কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পীর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং সেই চেতনা বহন করে নিজের শিল্পকর্মে চর্চা করায় বীরেন সোমের কাজে অনন্য মাত্রা পেয়েছে। শুধু তাই নয়, শিল্পীরা তাঁদের কাজ ও অভিজ্ঞতা ডকুমেন্টেশন বা লেখনীতে লিপিবদ্ধ করতে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেন না বা হয়ে ওঠে না। সে ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অলিখিত বিরাট এক অধ্যায় লিপিবদ্ধ হয়েছে তাঁর এই গ্রন্থে। নিঃসন্দেহে এটি শ্রমসাধ্য এবং গবেষণামূলক।গ্রন্থে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চিত্রমালা সংযোজিত হয়েছে যেখানে জয়নুল আবেদিনের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ চিত্রসহ পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের আঁকা কাজগুলো স্থান পেয়েছে। এখানে চিত্রভাষায় সহজপাঠ হয়েছে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ।

 

Facebook Comments Box