শাহরিয়ার কবিরের একাত্তরের যীশু : মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান

শনিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ২:০০ অপরাহ্ণ | 67 বার

শাহরিয়ার কবিরের একাত্তরের যীশু : মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান

শাহরিয়ার কবির বাংলাদেশের একজন খ্যাতিনামা লেখক, সাংবাদিক, ডকুমেন্টরী চলচ্চিত্র নির্মাতা। লেখক হিসাবে তার প্রধান পরিচয় তিনি একজন শিশুসাহিত্যিক।

‘একাত্তরের যীশু’ তার কয়েকটি গল্পের সমষ্টি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য শিশুতোষ গল্প থেকে এটি ভিন্ন, কারণ এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী তুলে ধরা হয় নি। বরং এখানে বলা হয়েছে নানা ধরনের মানুষ সম্পর্কে। গল্পের মাধ্যমে একদিক দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে যুদ্ধকালীন সমাজের চিত্র আবার অন্যদিক দিয়ে দেওয়া হয়েছে নানা ধরনের উপদেশ, উঠে এসেছে ভাবনার নানা বিষয়।

বইয়ের প্রথম গল্প ‘একাত্তরের যীশু’তে বলা হয়েছে গীর্জায় থাকা বিরাশি বছরের এক বৃদ্ধ ডেসমন্ড সম্পর্কে। যুদ্ধের সময় গ্রামের সবাই অন্যত্র পালিয়ে গেলেও ডেসমন্ড পালিয়ে যায় নি গীর্জা ছেড়ে। সে তার ঈশ্বরকে ছেড়ে কোথাও যেতে চায় নি। জনবিরান গ্রামে থাকতে থাকতে বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছিল সে। একদিন রাতের বেলা গীর্জায় তার কাছে এলো তিনজন মুক্তিযোদ্ধা, যাদের তার মনে হয়েছিল তিনজন স্বর্গের দেবদূত।

কিন্তু একদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের ধরে ফেলে। গীর্জার বাইরে ক্রুশবিদ্ধ করে তিনজনকে। ডেসমন্ড কল্পনা করে যে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা গতরাতেও বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পাকিস্তানিদের বিপক্ষে, তারা সকাল হতেই যীশুখ্রিষ্ট হয়ে গেছে। যীশুখ্রিষ্ট যেভাবে ক্রুশের উপর থেকে বলেছিলেন ‘ঈশ্বর আমার ঈশ্বর’ এ তিন মুক্তিযোদ্ধা বলেছেন, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’। ডেসমন্ড কল্পনা করেন যীশুখ্রীষ্টের যেমন পুনরুত্থান হয়েছিল তেমনিভাবে সব মুক্তিযোদ্ধারাও আবার ফিরে আসছে।

‘জয় পরাজয়’ গল্পটি হয়ত লেখকের জীবন থেকেই নেওয়া। কারণ এতে চরিত্রের নাম শাহরিয়ার। শাহরিয়ার যে মিশনারী স্কুলে পড়ত, সেখানকার ব্রাদার ডিক একবার বাংলাকে চামারের ভাষা বলেন, শাহরিয়ারকে অপমান করেন। এর বিরুদ্ধে শাহরিয়ার এবং তার সহপাঠীরা প্রতিবাদ করে। স্কুল ব্রাদার ডিকের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিলে শাহরিয়ার তার সহপাঠীদের নিয়ে চলে যায় পাশের কলেজে, সেখানে আলী ভাইকে সব জানায়। আলী ভাই প্রতিবাদ করে ব্রাদার ডিকের বিরুদ্ধে এবং বাংলা ভাষাকে অপমান করার জন্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি করেন।

‘দেয়াল’ গল্পে লেখক তুলে ধরেছেন আমরা কি করে আমাদের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে ধরছি। নিজেদের চার দেয়ালে বন্দি করে আমরা ভুলতে বসেছি হিমালয়ের সৌন্দর্য, আকাশের মহানতা।

‘নতুন বছরের ছন্দ’ গল্পটি ছন্দ নামক এক অনাথ ছেলের গল্প। ছেলেটি মৃত্যুর সময় বুঝতে পারে জীবনের আসল সৌন্দর্য আছে প্রকৃতির মাঝে।

‘পল গোমেজের বাবা’ গল্পে কিছু ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলজীবনের নানা ঘটনা উঠে এসেছে। ‘পিয়ানো ভূতের গল্প’ নিছকই শিশুতোষ একটি গল্প।

‘বেনুর সুখ দুঃখ’ গল্পের চরিত্র বেনু, মাটির পুতুল তৈরি করে মেলায় বিক্রি করে। কিন্তু সিরামিকের চাকচমকের মাঝে তার মাটির পুতুলগুলো নেহায়েতই ম্লান মনে হয়। মাটির তৈরি জিনিসগুলোর দাম কমে গেলেও বেনুর বাবার মতো অনেক কুমারেরাই এ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকেন, বেঁচে আছেন আজো। তারা আজো লড়াই করে যাচ্ছেন মাটির এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে।

‘রাজুর পৃথিবী’তে লেখক তুলে ধরেছেন কি করে রাজুর পারিবারিক জীবন হুট করেই পালটে গেল। রাজুর বড় দুইভাই মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু যুদ্ধের পরের সময়ে তারা আয় রোজগারের জন্যে কিছুই করতে পারেনি। একদিন রাজুর বড়ভাইকে রাস্তার লোকেরা হাইজ্যাকার সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তারপর পরিবার আস্তে আস্তে আরো ভাঙতে থাকে। শেষমেশ রাজুর বাবা সিদ্ধান্ত নেন তারা ফিরে যাবেন তাদের গ্রামের বাড়িতে।

‘লাল সূর্য’ গল্পের চরিত্র শমির মা মারা গেছেন, বাবাও তাকে দেখতে পারেন না। সে স্কুল পালিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এবং পাকিস্তানিদের বর্বরতার বিভিন্ন চিত্র দেখতে পায়। পাকিস্তানি বাহিনির হাতে মারা যাওয়া শহীদদের রক্ত তার কাছে মনে হয় লাল সূর্যের মতো। এছাড়াও আরো দুইটি গল্প হলো- ‘শয়তান ও একটি চারাগাছ’ এবং ‘শহুরে সকল সুখ’।

‘একাত্তরের যীশু’র উপর ভিত্তি করে ১৯৯৩ সালে মুক্তি পায় একটি চলচ্চিত্র। অনেকে শিশুদের পড়ানোর জন্যে বই খুঁজেন তারা এই বইটি পড়াতে পারেন তাদের বাচ্চাদের। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বাচ্চারা জানলে তারা ছেলেবেলা থেকেই বুঝে যাবে এ দেশের প্রতি আমাদের কত দায়িত্ব!


বই : একাত্তরের যীশু
লেখক : শাহরিয়ার কবির
প্রকাশক : চারুলিপি প্রকাশন
মূল্য : ১৫০/-


দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments