লুৎফর ভাই নেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না

রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২০ | ২:২০ পূর্বাহ্ণ | 133 বার

লুৎফর ভাই নেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না

॥ মারুফ হোসেন ॥

আষাঢ়ের মেঘ দুপুরের আলো কমিয়ে দিয়েছে অনেকখানি। আকাশের অনেক অনেক উপর থেকে একটা বিমান চলে যাওয়ার মৃদু শব্দ। একরাশ মনখারাপ নিয়ে বসে আছি। লুৎফর ভাই নেই এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। খুবই সামান্য দিনের আলাপ। অথচ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠেছিল সেই সম্পর্ক।
গতবছর দিল্লি বাংলা বইমেলায় লুৎফর ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ। বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রকাশনা সন্দেশ-এর কর্ণধার। সারা পৃথিবীর নামিদামি লেখকদের বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করে সন্দেশ এবং তার বেশিরভাগই লেখকদের অনুমতি নিয়ে। বলতেন, কারও বই চুরি করে ছাপতে আমার ইচ্ছা করে না। লুৎফর ভাই আমাকে ওরহান পামুকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন বলেছিলেন। জানিয়েছিলেন, ওরহান পামুকের কলকাতায় আসার খুব ইচ্ছে। আমি লুৎফর ভাইকে কথা দিয়েছিলাম তিনি মধ্যস্থতা করলে কলকাতায় ওরহান পামুককে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করব।

 

গতবছর যখন মালয়েশিয়া গেলাম তার আগে কোথায় থাকব, কোথায় ঘুরব, আমার ফোন নম্বর কোথায় জোগাড় করব এইসব নিয়ে খুব চিন্তিত, তখন উদ্ধারকর্তা হয়ে এগিয়ে এলেন লুৎফর ভাই। নিজের মালয়েশিয়ান মোবাইল সিম আমাকে দিলেন, খুব কম পয়সায় সুন্দর একটা থাকার জায়গা ব্যবস্থা করে দিলেন।
লুৎফর ভাই কলকাতায় আসতেন খুব ঘন ঘন। কলকাতায় এলে উঠতেন বন্ধুর এক ফ্ল্যাটে। সারাদিন কলেজ স্ট্রিটে নানারকম কাজ মিটিয়ে শেষবেলায় আসতেন অভিযানে, তারপর আমরা একসঙ্গে বার হতাম তার ফ্ল্যাটের উদ্দেশে। আসলে সেই বন্ধুর ফ্ল্যাট আমার বাড়ি ফেরার পথেই। বাংলা প্রকাশনা, বাংলাদেশ ও কলকাতার লেখক-পাঠকদের সঙ্গে অন্যান্য দেশের লেখক-পাঠকদের তুলনামূলক আলোচনা, ইউরোপ-আমেরিকার বইয়ের দোকান এইসব ছিল আমাদের আলোচনার মূল বিষয়।
লুৎফর ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা ঢাকা বইমেলায়। আগরতলা বইমেলা করে ফিরেছেন তিনি। আমাকে দাওয়াত দিলেন নৈশভোজের। খেতে খেতে কথা হচ্ছিল তার আগের দিন তিনি ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। এতটাই অসুস্থ যে শেষ পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে না পেরে তাকে একা একাই নার্সিংহোমে যেতে হয়েছিল। শুনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। জানতাম লুৎফর ভাই ঢাকায় একা একাই থাকেন, পরিবারের একটা অংশ মালয়েশিয়ায় এবং আরেকটি অংশ থাকে কানাডায়।
কিছুক্ষণ আগে যখন জানলাম লুৎফর ভাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে, প্রথমেই মনে এলো সেই একা একা হাসপাতালে চলে যাওয়ার ঘটনার কথা। না-জানি মৃত্যুর আগে কতটা কষ্ট পেয়েছেন তিনি।
লুৎফর ভাই মূলত একলা একলাই পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে বেড়াতেন। বিভিন্ন লেখক-প্রকাশকদের সঙ্গে আলাপ করতেন। বইমেলা সংগঠিত করতে পারে এমন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করতেন। চেষ্টা করতেন সেখানে একটি বইমেলা করার। চেষ্টা করতেন বাংলা বই প্রচার ও প্রসারের।
লুৎফর ভাইয়ের এই অকাল মৃত্যু দুই বাংলার বাংলা প্রকাশনার জন্য এক বিরাট বড়ো ক্ষতি।
বেলা পড়ে আসছে, আজ আর সূর্যের দেখা পাওয়া যাবে না। চারদিক কেমন থম মেরে আছে। চুপচাপ। না-ফেরার দেশে ভালো থাকুন লুৎফর ভাই।

[ফেসবুক পোস্ট থেকে]


মারুফ হোসেন
স্বত্বাধিকারী ও প্রকাশক, অভিযান পাবলিশার্স, কলকাতা

Facebook Comments