লাবণ্য দাশের মানুষ জীবনানন্দ

সোমবার, ১৮ মে ২০২০ | ৫:০১ অপরাহ্ণ | 222 বার

লাবণ্য দাশের মানুষ জীবনানন্দ

॥ অগ্নি কল্লোল রিয়াজ ॥

 

 

নাটোরের বনলতা সেন-এর নাম শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সেই বনলতা, সুরঞ্জনা, শ্যামলী, সবিতা, সুচেতনা’র কবি যিনি শীতের রাতে একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে অথবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে আবার ফিরে আসতে চেয়েছেন ধানসিঁড়ি কিংবা জলসিড়ি নদীর তীরে, নরম ঘাসের পথে হাঁটতে চেয়েছেন হাজার বছর ধরে, সোনার ডিমের মতো ফাল্গুনের চাঁদ অথবা অসংখ্য নক্ষত্রের রাত কাটাতে চেয়েছেন ভোরের কাক কিংবা অন্ধকারে নীড়ে ফেরা ধবল বক হয়ে। অস্তচাঁদ-ক্লান্ত শেষ প্রহরের শশী অথবা শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যায় কবি কি ফিরেছেন তাঁর বাংলায়?
কবি জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় অক্ষরের ধাঁধায় ফেলে যেমন ভাবিয়ে তোলে পাঠক হৃদয় তেমনিভাবে মানুষ জীবনানন্দও আমাদের ভাবায়। কেন এত অল্প বয়সে কবি চলে গেলেন? সেটা কি নিছক দূর্ঘটনা ছিল, নাকি আত্মহত্যা? কেন তিনি মৃত্যুর পর শঙ্খচিল শালিকের বেশে ফিরে আসতে চেয়েছেন? মানুষ জন্মে এত অভিমান কেন কবির? এরকম অনেক প্রশ্ন ঘড়ির কাঁটার মতে ঘুরতে থাকে আমাদের মনে, যার উত্তর পেন্ডুলামের মতো ঝুলে আছে। কবি জায়া লাবণ্য দাশের লেখায় এসবের উত্তর কি লুকিয়ে আছে? উত্তর খুঁজতে পড়ুন ‘মানুষ জীবনানন্দ’ বইটি।

বইয়ের ভূমিকা
বইটির ভূমিকা লিখেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন। তিনি বিশদভাবে মানুষ জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণার চিত্র একত্রিত করেছেন। খোঁজার চেষ্টা করেছেন কবির মৃত্যুর কারণ। আজকে যে জীবনানন্দ নন্দিত হয়ে আছেন পাঠক হৃদয়ে সেই জীবনানন্দ তাঁর জীবদ্দশায় ছিলেন অবহেলিত। ফারুক মঈনউদ্দীন লিখেছেন, ” জীবনানন্দের জীবনের সবচাইতে বেদনাদায়ক দিকটি হচ্ছে কবিজীবনে তাঁর আত্মপ্রকাশের সময় থেকেই একশ্রেণির লেখক-সম্পাদকের উপহাস ও ব্যাঙ্গের পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি, অতিরক্ষণশীল সমাজের ভ্রূকুটির শিকার হয়ে অপদস্থ ও চাকরিচ্যুতর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, বেকারত্বের গ্লানিতে হয়েছেন রক্তাক্ত, দারিদ্র্যের হীনম্মন্যতা ও উপযাচনায় বিক্ষত হয়েছে তাঁর বিবেক- অথচ দাম্পত্য জীবনেও তাঁর জন্য ছিল না ‘পাখির নীড়ের মতো’ কোন আশ্রয়।” যার কবিতা মুগ্ধ করে রাখে আমাদের সেই কবির তাঁর কবিতা নিয়ে ছিল সংশয় এবং অতৃপ্তি যার কারণে আমরা দেখি যে কবির বিশাল ভান্ডার থেকে মাত্র কিছু সংখ্যক প্রকাশিত হয়েছে তাঁর জীবদ্দশায়। ফারুক মঈনউদ্দীন জীবনানন্দের লেখা “মাল্যবান” উপন্যাসের প্রসঙ্গ এখানে টেনে আনেন। যার প্রকাশক এবং সম্পাদক অশোকানন্দ দাশ মনে করেন, উপন্যাসটি সূক্ষ্ম ছদ্মবেশে আত্মজীবনীমূলক। যার মূল বিষয় ছিল দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন। উপন্যাসটি কবির মৃত্যুর ঊনিশ বছর পর প্রকাশিত হয় যা প্রকাশ করতে দিতে অসম্মতি জানান কবিপত্নী লাবণ্য দাশ। জীবনানন্দ গবেষকরা মাল্যবান উপন্যাসের চরিত্র, কাহিনি ইত্যকার বিষয় বিশ্লেষণ করে তার সাথে কবির জীবনের যৌক্তিক মিল খুঁজে পান যা ফারুক মঈনউদ্দীন তাঁর লেখনীতে উপস্থাপন করেছেন। ভাবছেন ধান ভানতে শিবের গীত কেন? এর উত্তরও ভূমিকা লেখক দিয়েছেন, মানুষ জীবনানন্দ বইটিতে জীবনানন্দ দাশের সাথে লাবণ্য দাশের বিয়ে হওয়া থেকে শুরু করে কবির মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের স্মৃতিকথা বর্ণিত হয়েছে। ধারণা করা হয় কবিপত্নী তাঁর অনিচ্ছায় বরং বিভিন্ন মহল থেকে অনুরুদ্ধ হয়ে এসব লিখেছেন। যেখানে সবার কাছে কবির জীবনের টানাপোড়েনগুলো চাঁদনি পসর রাতের মতো পরিষ্কার সেখানে কবিপত্নী অতি সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে গেছেন সেসব। কেন লিখলেন না তিনি এসব? তাই খোঁজার চেষ্টা করেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন। কবি পত্নীর ভূমেন্দ্র গুহর সামনে করা সেই আক্ষেপ, ” বাংলা সাহিত্যের জন্য তিনি অনেক কিছু রেখে গেলেন হয়তো, আমার জন্য কি রেখে গেলেন বলো তো!” এটি কি নিছক কোন বুলি, না’কি এর পেছনে গভীর গোপন কোন কারণ লুকিয়ে আছে? জানতে পড়ুন “মানুষ জীবনানন্দ” বইটি।

 

মানুষ জীবনানন্দ
লাবণ্য সবেমাত্র ইডেন কলেজে আই এ তে ভর্তি হয়েছে। হঠাৎ একদিন জেঠামশাই ডেকে পাঠালেন তার বাড়িতে। জরুরি তলব তামিল করবার জন্য কর্দমাক্ত রাস্তায় হেঁটে এসে উপস্থিত হলো জেঠামশাইয়ের বাড়িতে। দিল্লি থেকে রামযশ কলেজের একজন অধ্যাপক এসেছেন তাঁকে দেখতে। কাঁদা মাখা শাড়িতে ভদ্রলোকের সামনে আসলো লাবণ্য। জেঠামশাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, এঁর নাম জীবনানন্দ দাশগুপ্ত। ২৬ শে বৈশাখ (৯ই মে) শুক্রবার লাবণ্য হয়ে গেলেন লাবণ্য দাশ। খ্যাতনামা মহিলা কবি কুসুমকুমারী দাশের পুত্রবধূ। ফুলশয্যার রাতে তাঁদের প্রথম কথা, প্রথম কথাতেই কবি লাবণ্যের কণ্ঠে গান শুনতে চাইলেন। লাবণ্য গাইলেন দ্বিধাহীনভাবে। বইটি কবিজায়া লাবণ্য দাশের জবানিতে রচিত একটি জীবনী গ্রন্থ যা আমাদের একজন মানুষ জীবনানন্দ’র খোঁজ দেয়। কবির কবিতার খাতা ছিল তাঁর প্রাণ। জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি কাটিয়েছেন কবিতার খাতার সাথে। কবিপত্নী তাঁদের দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বইয়ে। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই সূক্ষ্ম টানাপোড়েন কিংবা ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে উঠবে আমাদের সামনে। কবিজায়া একে একে অক্ষরের তুলিতে আঁকতে থাকেন কবির সাংসারিক উদাসীনতা, ছেলে-মেয়েদের প্রতি কবির ভালোবাসা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দরদ, মাতৃসমা জেঠিমার প্রতি শ্রদ্ধা, মায়ের প্রতি টানে’র বিভিন্ন চিত্র। গম্ভীর প্রকৃতির কবির গাম্ভীর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকতো কৌতুকপ্রিয়তা। লেখক জীবনানন্দ দাশের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মানুষ জীবনানন্দ দাশ। সেই মানুষ জীবনানন্দ দাশ আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে লাবণ্য দাশের লেখায়।

পাঠপ্রতিক্রিয়া
কবিপত্নী লাবণ্য দাশ লেখক ছিলেন না, ছিলেন না কোনো সমালোচক বরং এসব বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল নিতান্ত গৌণ যা তাঁর লেখা থেকেই জানতে পাওয়া যায়। তবে কবিজায়া যতটা সম্ভব গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করেছেন। চেষ্টা করেছেন জীবনানন্দ সম্পর্কে পাঠকের তেষ্টা মেটানোর। আমাদের লক্ষ্য হলো মানুষ জীবনানন্দ কে জানা, লাবণ্য দাশের লেখার মান বিশ্লেষণ করা নয়। বরং আমাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা উচিত লাবণ্য দাশের কাছে যিনি মানুষ জীবনানন্দকে তুলে ধরেছেন আমাদের সামনে। কবিপত্নী তাঁদের দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেননি। তুলে ধরেননি পারিবারিক অভাব অনটন, কবির হতাশার চিত্রগুলো। কবি কি আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন খুব বেশি? একজন বাঙালি নারীর পক্ষে নিজের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে, নিজের পরিবার সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি বলা কি সম্ভব ছিল? কবিপত্নীর লেখায় বারবার উঠে আসে স্বামী জীবনানন্দকে হারানোর বেদনা। তিনি যে জীবনানন্দকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন এর জন্য বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে আজীবন ঋণী হয়ে থাকবে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা আমাদের কাছে যেমন রহস্যময় হয়ে আছে তেমনি রহস্যময় হয়ে আছে তাঁর মৃত্যু। ” সব কিছুই তার কাছে ব্যর্থ বলে মনে হয় কেন? জীবনকে বোঝা মনে করে তাকে দূরে ফেলে দেবার জন্য কেন সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে?”, যুগ যুগ ধরে লাবণ্য দাশের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে যাচ্ছে জীবনানন্দ গবেষকেরা হয়তো আরও যুগ যুগ ধরে উত্তর খুঁজবে বাংলা সাহিত্য। ঠোঁটের কোণে একটা আফসোস থেকেই যাবে, বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে তিনি কি পারতেন না আরেকটু রত্ন ঢেলে দিতে?

বই : মানুষ জীবনানন্দ
লেখক : লাবণ্য দাশ
ধরন : জীবনী গ্রন্থ
প্রকাশনী : ভাষাচিত্র
প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা
পৃষ্ঠা : ৭২
মুদ্রিত মূল্য : ১৫০টাকা


প্রিয় লেখক-পাঠক-প্রকাশক

আপনার ভালোলাগা যে কোনো বইয়ের রিভিউ পাঠাতে পারেন আমাদের। বইয়ের একটি ভালো ছবিসহ আপনার লেখা ইমেইল করুন এই ঠিকানায় : desherboi@gmail.com

Facebook Comments