রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতার আখ্যান ‘হত্যার শিল্পকলা’

শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১ | ৭:৪৮ অপরাহ্ণ | 107 বার

রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতার আখ্যান ‘হত্যার শিল্পকলা’

আহমদ ছফা’র ‘গাভী বিত্তান্ত’র পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি, প্রশাসনের দুর্বলতা
ও ছাত্রদের আত্ম-অহমিকায় হারিয়ে যাওয়া নিয়ে লেখা সবচেয়ে ভালো উপন্যাস- ‘হত্যার শিল্পকলা’।

হত্যার শিল্পকলা উপন্যাসটি রচিত হয়েছে কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের মমিন নামের এক ছাত্রের
হত্যাকে কেন্দ্র করে। মমিনকে হত্যা ও হত্যা পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি ও হত্যাকে
ধামাচাপা দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নানাবিধ কার্যক্রম নিয়ে স্তরে স্তরে সজ্জিত হয়েছে
উপন্যাসের প্রতিটা অধ্যায়।

মমিন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়? জাহাঙ্গীরনগর?
জগন্নাথ? বুয়েট? নাকি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি? নাকি সদ্য গড়ে ওঠা কবি নজরুল
বিশ্ববিদ্যালয়ের? না কোনটিই নয়! আবার প্রত্যেকটি। লেখক এখানে নির্দিষ্ট কোনো
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেননি। তবে পাঠক এখানে অনায়াসে যেকোন বিশ্ববিদ্যালয় নাম জুড়ে দিতে
পারেন। যে কোনো একটা নাম দিলেই তার সাথে মিলে যাবে উপন্যাসের ঘটনা। মমিন এখানে প্রতিটা
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বলির শিকার হওয়া প্রতিটা ছাত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

প্রায় প্রতি বছরই আমাদের দেশে কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটে। এই
হত্যাকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো দল নিজেদের সুবিধা আদায় করে নেয়, কোনো কোনো দল লাশ হয়ে
যাওয়া ছাত্রটিকে নিজেদের কর্মী হিসেবে প্রকাশ করতে উঠে পড়ে লাগে। কারো কারো ক্ষমতার গদি
নড়ে ওঠে, কেউ বা আবার অন্য একজনকে হটিয়ে বসে পড়ে ক্ষমতার চেয়ারে। আর সাধারণ ছাত্ররা
দু’একদিন ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’ আওয়াজ তুলে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যায় বিসিএসের টেবিলে।
কেবল রাজ্যের নিঃসঙ্গতা নিয়ে কবরে শুয়ে থাকে বিনা অপরাধে খুন হওয়া লাশ নামের মানুষটি।

এই তো কদিন আগেই খুন হয়েছিল বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ। কেমন হয়েছিলো সে সময় বুয়েটের
পরিস্থিতি? টিভি চ্যানেলগুলোর টকশো? কিংবা বুয়েট প্রশাসনই বা কেমন আচরণ করেছিলো? দেশের
বিভিন্ন ঘটন-অঘটন নিয়ে যারা সামান্যতম খোঁজ খবর রাখে তারা প্রত্যেকেই সে সম্পর্কে অবগত
আছেন।

লেখক কেনো লিখলেন হত্যার শিল্পকলা? অনেকেই বলবে মানবিক দায় থেকে। তবে আমার ধারণা মানবিক দায়ের চেয়েও বেশী কাজ করেছে রাজনৈতিক দায়। কেননা, শুধু মানবিক দায় হলে টকশোবিদদের মতো দু’একদিন কথা বলে, তথাকথিত
সেলিব্রেটিদের মতো দু’একটা ফেবু স্ট্যাটাস দিয়ে, বড়জোর অতি প্রগতিশীল চামবাজ বুদ্ধিজীবীদের
মতো একটা দুটো কলাম লিখে ক্ষান্ত দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেনি। তিনি বইয়ের পাতায়
এঁকেছেন সময়। সময়ের ভাঁজে ভাঁজে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
আমার ধারণা, আমার মতো তিনিও জানেন এই উপন্যাস আলোচনায় এলে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক
মহল থেকে হুমকি ধামকি ও বিড়ম্বনার শিকার হবেন। তবুও তিনি কলম ধরেছেন, লিখেছেন সময়ের
সাহসী এক লেখা।

হত্যার শিল্পকলা উপন্যাসে আমাদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হচ্ছে এর শেষ চ্যাপ্টার। আমরা যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখি তার একটি অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে হত্যার শিল্পকলার শেষ চ্যাপ্টারে। আচ্ছা এই স্বপ্নের বয়ান কি লেখক শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে মাথায় রেখে লিখেছেন? দেশের স্বপ্ন কি কোথাও নেই? আমার তা মনে হয় না। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় দেশ নিয়ে
কল্পনা করতেই বেশী ভাল লাগে আমার। একটা স্বপ্নের দেশ, সোনার বাংলাদেশ।


বই : হত্যার শিল্পকলা
লেখক : রবিউল করিম মৃদুল
প্রকাশক : বায়ান্ন
প্রচ্ছদ : রাজীব দত্ত
প্রকাশকাল : নভেম্বর, ২০২০
পৃষ্ঠা : ১৫২
মূল্য : ২৯৯ টাকা


  • দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com
Facebook Comments