রক্তে ভেজা রহস্য পুতুল

সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১ | ৩:৫০ অপরাহ্ণ | 275 বার

রক্তে ভেজা রহস্য পুতুল

বিনোদপুর, গারো পল্লী ছেড়ে যাবার আগে সোমারাই প্রথম আমাকে আগ্রহ ভরে ওর কাপড়ের পুতুল দেখিয়েছিল। লাল রক্ত রঙে ভিজে জবুথবু পুতুল! এই পুতুল দেখার পেছনে আমার সুদীর্ঘ কৌতহল জড়িত। তারপর সৌভাগ্য ক্রমে সে পুতুল দেখার সাধ মিটলো। আগেও একবার সোমারার কাপড়ের পুতুল দেখেছিলাম, ওর ভাষায় তখন সেগুলো ছিল মৃত! বিনোদপুর থেকে বিদায় মুহূর্তে যা দেখেছি তা জীবন্ত পুতুল! যে পুতুল রক্ত রঙের ঝর্ণায় লেপ্টে রয়েছে, তৃষ্ণা-বিতৃষ্ণার আজন্ম নিয়ামক হয়ে! এই জীবন্ত পুতুল দেখার সময় আমার মধ্যে আগের মতো সেই ভয় কাজ করেনি। বরং পুরোনো ইচ্ছেরা হু-হু করে কেঁদে উঠেছিল।

 

স্মৃতির মিনারে একগুচ্ছ কদম শ্রাবণ পূর্ণিমায় একলা একলা গুমরে মরার যন্ত্রণা হাজির করেছিল প্রকাশ্যে। আর অপূর্ণতায় খুঁজেছিল পূর্ণতা। পুতুল ধোঁয়াশা সৃষ্টির আগে আমাকে সোমারা সাবধান করে দিয়েছিল মুকুল থেকে অঙ্কুর হবার ভয় দেখিয়ে! এই সাবধানতা না মানলে নাকি দেবতারা রুষ্ট হবেন। তখন আমি ঠিক বুঝতে পারিনি মুকুল থেকে হুট করে অঙ্কুর হবে কীভাবে? প্রশ্নের সাথে শাণিত যুক্তিও কিলবিল করতো মাথার ভেতর। বিজ্ঞান বই থেকে জানতাম, মুকুল বা ফুল থেকে ফল, আর ফলের বীজ থেকে উপযুক্ত পরিবেশে অঙ্কুরোদগম হয়ে থাকে। আর সোমারার সাবধান বাণী ঘাঁটতে ঘাঁটতে কাটিয়ে দিয়েছি গোটা কয়েকটা বছর। এখানে-ওখানে কতশত স্থানে ঘুরে ফিরে এর উত্তর অনুসন্ধান করেছি। মোটাদাগে বীরদর্পে বলতে হয়, অবশেষে আমি উদ্ধার করেছি কাঙ্ক্ষিত উত্তর।

যাই হোক, সোমারার সেই পুতুলটা ছিল তুলো দিয়ে গড়া একটা সাধারণ পুতুল, তার উপরে কাপড়ের জালিকা জড়ানো, আঁটসাট করে বাঁধা। ছুঁয়ে দেখলে মনে হবে তুলতুলে নরম মায়া জড়ানো! তবে ওটাতে বিন্দুমাত্র কারুকাজ নেই, নেই জরির ছোঁয়া, নেই মুগ্ধতা সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটা, কেবল প্যাঁচানো, লম্বাটে ভাঁজে মিহি কাপড়ের স্তুপ! ওটা যে একটা পুতুল এই কথাটাই আমি বিশ্বাস করতে চাইতাম না, অথচ সোমারা আমাকে কথার বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে প্রমাণ করেছিল ওটা পুতুল। রহস্য পুতুল! সে ঐ পুতুলটাকে লাল রঙে স্নান করায়। রক্তের মতো টকটকে থেকে শুরু করে ফ্যাকাশে লালের সমুদ্রে সোমারা ডুবিয়ে রাখতো ওটাকে। না, ডুবিয়ে রাখতো বললে ভুল হবে। বলা চলে, পুতুলটাকে সে লাল রঙ খাইয়েই দিনের পর দিন লালন পালন করতো।

এই রহস্য পুতুলের ভাবনা আমাকে সেই সময় এমনভাবে জাপটে ধরেছিল, যে বছরের পর বছর মন বসতো না পড়াশোনায়। এক অজানা ভয় কাজ করতো ভেতরে। প্রায়ই আমি ভুগতাম মনোজ্বরে! আর মনে হতো দিন দিন আমার অতি কাছের বন্ধু সোমারা অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে। কোনো একটা দেয়াল গড়ে উঠেছে আমার আর ওর মধ্যে। ভাবতাম, কোনো জ্বীন, অপদেবতা বা অতিপ্রাকৃত কিছুতে সে আবিষ্ট! আমার ভেতরটা ভেঙে-চুড়ে খান খান হয়ে কান্না আসতো, খুব মনে পড়ত পুরনো সময়গুলো, যখন সোমারা ও আমি মুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে ঘুরে বেড়াতাম দূর দিগন্তে!

সে সময় সোমারার রহস্য পুতুল সম্পর্কে আবছা আবছা জ্ঞান অর্জন করছি মাত্র! তারও অনেকদিন পরের কথা, তখন ও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, অভাব, অনটন ও পারিবারিক চাপে। এক শেষ বিকেলে সোমারা আমাকে এমন ভীতিকর গল্প শুনিয়েছিল, যে গল্প শুনে আমি ভয়ে থমকে গিয়েছিলাম, আমার কণ্ঠরোধ হয়ে এসেছিল। কেবল গল্প শুনিয়ে সে ক্ষান্ত হয়নি, প্রমাণ দেখিয়ে আমার ভয়ার্ত জান বরবাদ করে দিচ্ছিল প্রায়। না, ওটা গল্প নয়, বাস্তব সত্যিই ছিল সবকিছু। সোমারা বলেছিল, ওর দিদার সাথে বসে প্রতি মাসেই একটি করে পুতুল তৈরি করে। সেই নতুন পুতুলকে রক্ত রঙ পান করানোটা বাধ্যতামূলক নিয়ম। এই পৃথিবীতে সোমারার নিজস্ব একটি রক্ত রঙের ঝর্ণা আছে। সেই ঝর্ণায় প্রতি মাসে সে ডাইনির মতো এক একটা পুতুলকে একটানা কয়েকদিন রক্ত খাইয়ে গলা টিপে মেরে ফেলে। আর মরা পুতুলকে সোমারা কবর দেয় দেবতার নামে। আরো জানায় বাঁশতলায় ওর নিজস্ব একটি কবরস্থানও রয়েছে। সেখানে কেবল পুতুলদের কবর! আমাকে বাঁশতলায় নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছোটো ছোটো অনেকগুলো কবরও দেখিয়েছিল। সারি সারি উঁচু ঢিবি, দেখতে মুসলিমদের কবরের মতো, কেবল আকৃতিতে ওগুলো ছোটো। সন্ধ্যা হয়ে আসার অজুহাত দেখিয়ে আমি ওকে হাত ধরে বড় রাস্তায় নিয়ে আসি। সোমারা আরেকটি ভয়ঙ্কর গল্প বলতে পা বাড়াচ্ছিল। আমি ওকে থামাতে ও নিজের ভেতরের ভয় রুখতে হাসার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম, ওসব মিথ্যে গল্প আমিও জানি। হরর মুভিতে কত দেখেছি!

ভেবেছিলাম গল্পের মোড় ঘুরে যাবে, কে কটা সিনেমা দেখেছে ওটা নিয়েই বক বক করা যাবে। তা আর হলো কই? আমার হাসির বিপরীতে সে ভীষণ চটে যায়। চোখ-মুখ হয়ে ওঠে রক্তাক্ত লাল! ছোটো কালে ওর রাগকে মহাবিপদ সংকেত মনে করতাম। এবেলা এসে ততোটা বিপদ মনে না হলেও প্যারানরমাল ভীতি, পরিশেষে ওর জন্য মায়া জাগে। আর সে মায়ার কারণেই পরক্ষণে ওর সবকথা বিশ্বাস করার ভান করলাম। কিন্তু সোমারা ধরে ফেলেছিল আমার ভেতরের সন্দেহটা। আর প্রমাণ দেখানোর জন্য, হাত ধরে আবার আমায় টেনে নিয়ে যায় বাঁশতলায়। তীব্র ক্ষোভ দেখিয়ে দুহাতে মাটি সরাতে থাকে। এক এক করে পাঁচটি গর্ত থেকে সে কাপড়ের পুতুল তুলে আনে। এসব দেখে আমার শরীর থরথর কাঁপতে থাকে! চোখের সামনে চারপাশটা ভয়ানক অন্ধকার ঘিরে ধরে। সন্ধ্যের আলোয় যা দেখলাম, পুতুলগুলোর মধ্যে চারটিই কম-বেশি পঁচে কালচে আছে। কেবল একটি শাদা কাপড়ের পুতুল তরতাজা রক্ত রঙে ভেজা! সোমারা ক্ষোভ মাখা কণ্ঠে বলে, এই নতুন পুতুলটাকে গতকাল কবর দিয়েছি!

ঘন অন্ধকার নামার আগেই সেদিন আমি বাঁশতলা থেকে দৌঁড়ে পালিয়ে এসেছি। পেছনে শুনতে পেয়েছিলাম, সোমারা তীব্র কর্কশ স্বরে খিলখিলিয়ে হাসছে!

রাতেই আক্রান্ত হলাম তীব্র জ্বরে। দুদিন পর সোমারা আমাকে দেখতে এসেছিল দুহাত ভর্তি আমলকি নিয়ে। সেইবার সে অনেকদিন পর আমাদের বাসায় আসার কারণে মা বেশ খুশি হয়। ওর জন্য নাস্তা সাজাতে রান্না ঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তখন বিছানায় শুয়ে ওর সাথে কথা বলছিলাম। কথার ফাঁকে সোমারা আমার জ্বরাক্রান্ত তেতো ঠোঁটে হঠাৎ চুমু বসিয়ে দেয়। আর হাসতে হাসতে বলে, একদিন তোকে এইসব পুতুলের আসল রহস্য দেখাব। সেদিন তোর ভয় কেটে যাবে।

সোমারার এই কথাটাতেও আমি কেঁপে উঠেছিলাম! যার নিজস্ব রক্ত রঙের ঝর্ণা ও করবস্থান আছে তাকে আমি ভয়ঙ্কর বিপদজ্জনক মনে না করার কারণ দেখি না।

প্রথমদিকে সোমারা একটি কাপড়ের পুতুলের কথা বলত। পরবর্তীতে অনেকগুলো পুতুলের প্রসঙ্গ উঠে আসে। মূলত, একটা স্পেশাল বা রানি পুতুলের আদলে অন্য পুতুলগুলো ও বানাতো। বানানো পুতুলগুলোকে প্রতি মাসে কবর দিলেও রানি পুতুলটা সে ঠিকই সাজিয়ে রাখতো। সোমারা এই রানি পুতুলটা পেয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে, ওর দিদার কাছ থেকে। ওর দিদা নাকি বলত, কুমারী কন্যাদের দেবতার সান্নিধ্য অর্জনের জন্য রানি পুতুলের আশির্বাদ জরুরি, আর এজন্যই প্রতিমাসে পুতুলদের রক্ত রঙ পান করাতে হবে। সোমারার কাছে পুতুলের কথা যত শুনতাম ততোই আমার বিস্ময় বেড়ে যেত। বার বার আবদার ধরতাম, প্লিজ, সোমারা ঐ রহস্যময় পুতুলটা আমাকে দ্যাখা। সোমারা সবসময়ই বলত, একদিন ঠিক দেখাব। সেদিন মন ভরে, প্রাণ ভরে দেখিস।

আমার মনে আনন্দ ঘুরপাক খেত, অপেক্ষা, ধৈর্য আর অজানা রোমাঞ্চ নিয়ে সময় কাটত, পড়ার টেবিলে কি খাটে শুয়ে সবখানে ওর পুতুল দেখার ঘোরে থাকতাম, স্বপ্ন সাজাতাম।

ওর মুখের গল্প শুনে শুনে সে পুতুলটাকে আমি কখনো ভেবেছি জাদুর পুতুল, কখনো ভেবেছি রূপকথার ছোট্ট পরী, কখনো ভেবেছি আলিফ লায়লার মায়া পুতুলের মতো কিছু একটা, আবার কখনো ভেবেছি হরর মুভিতে দেখা এক উপকারী পুতুল রূপে! তবে জাদুর রহস্যময় পুতুল ভাবতেই বেশি আনন্দ পেতাম। যেহেতু জেনেছি সোমারা ওটাকে লাল রক্তের শরবত খাইয়ে রাখে, আর পুতুলটাও রক্ত রঙের ঝর্ণায় লেপ্টে থাকতেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত।

সোমারা বলেছিল, সে রোজ ওই রানি পুতুলটার সাথে কথা বলে, আঁকাবাকা, সহজ-কঠিন সবধরনের কথা ওরা বলাবলি করতো। সে পুতুলটা নাকি ওকে বারণ করেছিল ছেলেদের সাথে মিশতে। এমন কি আমার সাথেও চলাফেরা করতে বাধা দিয়েছিল। সোমারা যেহেতু আমাকে খুব পছন্দ করে তাই বন্ধুত্বের বন্ধনটুকু ধরে রাখতে চেয়েছে। রানি পুতুলটাকে বুঝিয়েছে, যে অনী নামের ছেলেটি খুবই ভালো ও ভীতুর ডিম। অন্তত আট-দশটা ছেলের সাথে ওর তুলনা চলে না।

যেদিন আমি, সোমারার রানি পুতুলটা স্বচক্ষে দেখেছিলাম, সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, ওর গল্পের ফাঁদ, কী উপকরণ কী অবকাঠামোতে তৈরি। আর এসবের পেছনে ওর দিদার ভাবনা বিস্তার কত প্রকট! পুতুল বিষয়ক কথাগল্পে রূপক আশ্রিত সরঞ্জাম আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মুখে মুখে গড়া কথার ফুলঝুরি রূপকথার পরী, আলিফ লায়লার মায়া পুতুলের চেয়ে ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছিল আমার কাছে।

সোমারার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ওদের মেহগনি বাগানে, লুকোচুরি খেলার দলে হৈ হুল্লোরের মধ্যে। প্রথম দেখাতেই ধরতে পেরেছিলাম ও ভীষণ তেজী, রাগী, রগচটা আর সেরা দুষ্টু মেয়ে। খেলার মাঠে সোমারাই একমাত্র নেত্রী। লম্বা ও বয়সে ও ছিলো সবার চেয়ে বড়। জন্মসন হিসেবে ব্যবধান দু-আড়াই বছরের। আর ও ছিল গাছে চড়ার ওস্তাদ। দলের অন্য ছেলেমেয়েদের সাথে ঝগড়া হলে, ওকে সবাই গাছের বান্দর বলে রাগাতো।

সেদিন খেলার মাঠে ওদের কাছে আমি ছিলাম নতুন বন্ধু। প্রথম দিনেই সোমারা আমার অনীশ নামের শেষ প্রান্তে থাকা তালব্য-শ-টা এক লাথি দিয়ে কোথায় যে উড়িয়ে দিলো, তা আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন থেকে সবার মুখে মুখে আমি হয়ে গেলাম অনী। নতুন ও অপরিচিত হওয়ার পরও বিনোদপুরের এ তল্লাটে অল্প কদিনে আমার বন্ধু হয়ে গেল অনেকে। তবে সবচেয়ে মিশুক-রাগী-উদার বন্ধুটি সোমারা, আর সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডদের তালিকায় শীর্ষে উঠে এলো।

সোমারা ছিল গারো মেয়ে। তামাটে ফর্সা, মুখটা চ্যাপ্টাটে গোলগাল, নাক মানান সই, চুলগুলো ঝাঁকড়া, কোঁকড়ানো। বিনোদপুরে আসার আগে মনের ভেতর নানা দ্বন্দ ডানা ঝাপ্টাচ্ছিল অপরিচিত স্থান মানিয়ে নেবার ভাবনা নিয়ে। সোমারাকে পেয়ে দুদিনেই সবকিছু হয়ে গেল আপন। মজার বিষয় হলো, সোমারা আমার সহপাঠীও।

বলে রাখা প্রয়োজন, আমার বাবা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে খুব ছোটো পদে একটা চাকরি করতো। কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে মূলত আমাদের বিনোদপুরে আসা। আর সাড়ে ছয় বছর পর সেই একই কারণে আমরা সপরিবারে বিনোদপুর ছেড়ে খুলনা চলে এসেছিলাম। স্মৃতির পুরনো পাপড়ি থেকেই বহু-বছর পর এ গল্পের আবির্ভাব! যারা গল্পটা পড়ছেন, তাদের চোখে আমার কাঁচা ও অগোছালো ভাবরস নিশ্চয়ই ঠিক ঠিক ধরা পড়বে। স্মৃতির পরতে থাকা সব কথাই বলার চেষ্টা করেছি, কোথাও রাখ-ঢাক বা গোপনীয়তা বজায় রাখিনি। বাস্তব অন্তরঙ্গ ঘটনাকে যারা কটু চোখে দেখেন বা দেখবেন, তারা এ গল্প পড়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।

বিনোদপুরে এসে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলাম, আদর্শ কিন্ডার গার্টেনে। সোমারা আমাকে প্রথমত পছন্দ করেছিল সুন্দর হাতের লেখার কারণে। দ্বিতীয়ত, আমি গিটার বাজাতাম, ওটা সে খুব পছন্দ করতো। এছাড়া স্কুলে আমার গাণিতিক দক্ষতা নিয়ে একটা সুনাম তৈরি হয়েছিল। সোমারা ছিল গণিতে একেবারে কাঁচা, আর সে কারণেই দুবছর ধরে ও একই ক্লাসে বন্দি। তাই গণিতের প্রসঙ্গে ও আমার সাহায্য নিতো। তবে সোমারার বাংলা ও ইংরেজি সব কবিতা মুখস্ত ছিল এমনকি অনেক সিনেমার গানও। গিটারের সাথে গাইতে পারত ভালো।

প্রতিদিন দুপুর বা বিকেলে আমরা লুকোচুড়ি খেলায় মেতে উঠতাম, সোমারাদের বাড়ির পাশে মেহগনি বাগানে। এক দুপুরের কথা খুব মনে পড়ে, যে ঘটনা ঘিরে আমি ও সোমারা এক ভিন্ন অস্তিত্বে উদ্ভাসিত হয়েছিলাম। দুদলের মধ্যে লুকোচুড়ি খেলা হচ্ছে। এক দল প্রথমে লুকায়, অন্য দল ওদের খুঁজে বের করে। খুঁজে বের করতে না পারলে লুকানো দল পয়েন্ট লাভ করে। এভাবে খেলা কয়েক ধাপ পেরিয়ে গেল, আমাদের দল বার বার হেরে যাচ্ছিল। আর অপর দল পয়েন্টে অনেক এগিয়ে যায়। লুকানোর ভালো কোনো জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যেখানে লুকাচ্ছি সেখান থেকেই ধরা পড়ে যাচ্ছি। শেষে সোমারার বুদ্ধিতে আমরা দুজন ওদের বাড়ির গোয়াল ঘরের ভেতরে মাচায় লুকাতে যাই। বাইরে দাঁড় করানো মই বেয়ে অতিকষ্টে ও সাবধানে ছোট্ট জানালা পেরিয়ে মুলি বাঁশের মাচায় পৌঁছালাম, ওটাকে নড়বড়ে সিলিংও বলা চলে। লাকড়ি, পাটকাঠি ও মাটির হাড়ি-পাতিলের পাশে চুপচাপ বসে আছি। বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ চমকে উঠলাম মেয়েলি কণ্ঠের চাপা চিৎকারে। একটু পর পর থেমে থেমে কান্নাটা আসছে। কণ্ঠটা গারোদের মান্দি ভাষায় কেঁদে কিছু বলছে। খেয়াল করলাম শব্দের উৎস গোয়াল ঘরের ভেতরে। সিলিংয়ের একস্থানে বৃষ্টির পানি ঝরার কারণে ছিদ্র হয়েছিল আগে থেকেই, আমরা সেদিক দিয়ে নিচে তাকালাম। যা দেখলাম, তাতে পুরো গা শিউরে উঠল। গরুর খর-কুটোর উপর একজন মহিলা ও একজন পুরুষ শুয়ে আছে মানুষ উলঙ্গ হয়ে। ওরা যা করছিল, তা ছিল আমার কাছে একেবারে অপরিচিত। কোনোভাবেই ওটা সহ্য করতে পারিনি। পেটের ভেতর মোচড়াতে লাগলো, আর স্বশব্দে ওখানে বমি করে দিলাম। ঘরের ভেতরে থাকা দুজনই ঝটপট জামা পরে পালিয়ে গেল ভয়ে। কিছু সময় পর সোমারা আমাকে জড়িয়ে ধরে মই বেয়ে নেমে আসে নিচে। তারপর সোজা ভ্যানে চড়ে আমাদের বাসার পথ ধরে। মায়ের সামনেও আমি বমি করলাম। মা বার বার সোমারাকে প্রশ্ন করছিলেন, অনীশের কী হয়েছে? আমি কিংবা সোমারা কেউ সত্য জবাব দিতে পারলাম না। শুধু বলেছিলাম, এমনিতেই বমি হচ্ছে। আরেকটু বাড়িয়ে বলেছি, মাথা ঘোরাচ্ছে!

দুপুরে খেলতে যাওয়ায় মা ভীষণ রাগ করলেন। কড়াগলায় বললেন, গরমের মধ্যে লুকোচুরি খেলা, দৌঁড়ঝাঁপ একেবারে নিষেধ।

সে ঘটনার পর দুদিন আমাকে রেস্ট নিতে বাধ্য করা হলো, স্কুল গ্যাপ গেল। তৃতীয় দিন খেলার মাঠে গেলাম। সোমারার দিকে তাকিয়ে আমার মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। পরে জেনেছিলাম, ওই মহিলাটা ছিল সোমারার রণিতা কাকি, আর পুরুষ লোকটা ছিলো ওদের বাড়িতে বেড়াতে আসা দূরের আত্মীয় সম্পর্কের কেউ। সোমারা আমাকে সহজ ভাষায় বলেছিল, ভয় পাবার কিছু নেই, ওটা একটা খেলা। লুকোচুরির মতো ওটাও লুকিয়ে খেলতে হয়। ধরা পড়ে গেলে মুশকিল! আরো বলে, ঐ লোকটা একবার ধরে পড়ে গিয়েছিল। তখন সোমারার কাকা রামনাথ লোকটাকে বেজায় পিটিয়েছিল। এই বিপদজনক মসিবতের খেলা আমার দ্বারা সম্ভব নয় বলেই, ওসব নিয়ে আর সোমারার সাথে কথা বাড়াতে চাইনি।

গরমের দিনগুলোতে নারকোল ফুল কুড়ানো, বুনোফুল-ফলের পিছু ছোটা ও পাখির বাসার খোঁজ করা আমাদের নিত্য রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। সোমারা লুকিয়ে গেস্ট হাউজ এরিয়ায় বনবিভাগের ফলবাগানে ঢুকে গাছে চড়ে আমার জন্য চেনা-অচেনা নানা ফল পেড়ে আনতো। এছাড়া দূরের রেললাইনের পাশে বকুল ফুলের সন্ধানে কয়েকদিন পর পর ওদিকে পাড়ি দিতাম। পকেট ভরে নিতাম বকুল ফুল। সেখানে একবার সোমারার সাথে একদল দুষ্টু ছেলের ভীষণ লড়াই বাঁধে। যখন রেলগাড়ি আসত তখন ওই ছেলেগুলো রেলের যাত্রীদের দিকে ভেংচি কেটে, লুঙ্গি উঁচিয়ে প্রবাদ করত। এসব দেখে যাত্রীরা হাসত। আর ওরা দ্বিগুণ উৎসাহে লুঙ্গি মাথায় বেঁধে নাচতে থাকত। এটা সোমারার পছন্দ হতো না একদম। কয়েকদিন ছেলেগুলোকে নিষেধ করেছিল। ওরা সে নিষেধ করাটাকে মজা হিশেবে নিয়েছে। তারপর কথা কাটাকাটি থেকেই লেগে যায় মারামারি। ফাইটিং হিরোইনের মতো সোমারা সবকটাকে মেরেছিল, শেষে ওরা দৌঁড়ে পালায়।

ক্লাস ফাইভ পেরিয়ে আমরা ভর্তি হলাম বিনোদপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজে। শালবনের পথ পেরিয়ে সে স্কুলে যেতে হতো। বনের ভয়ানক অন্ধকার কাঁটাঝোপের পথে সোমারাই আমার একমাত্র সঙ্গী। নিরাপত্তার কথা ভেবে মা আমাকে ওই পথে একা যেতে নিষেধ করেছিলেন, তাই সোমারার সাথে স্কুলে যাওয়া-আসা ছিল মায়ের আদেশ। মা, দুঃখ করে বলতেন, বাবার স্বল্প বেতন ও সীমাবদ্ধতার কথা। বাবা আশা জাগিয়ে বলতেন, প্রমোশন হলে বেতন ভালো হবে, তখন স্কুলের পাশেই, আমরা ভালো একটি বাসা ভাড়া নেবো। অথচ, পরে জেনেছি বাবার ওই চাকরিতে প্রমোশনের কোনো অপশনই ছিল না। তবে বাবা যা বেতন পেত, তাতে আমাদের চলতে খুব বেশি অসুবিধে হতো না। কারণ, আমাদের বিলাসবহুল কোনো চাহিদা ছিল না, সাধারণ খাবার-পোশাকে স্বচ্ছন্দে চলে যেত দিনকাল।

বৃষ্টির দিনে আমরা দুজন একই ছাতার নিচে স্কুলে যেতাম, কারণ সোমারার কোনো ছাতা ছিলো না। ওরা ছিল অনেক গরীব। ওর মা সামান্য বর্গাচাষি! ওর বাবা পরের জমিতে মজুর খেটে যা পেত, তাতে সংসার চলত খুব কষ্টে। ওদের বিশেষ কোনো চালিকা সম্বল ছিল না! সোমারা তার দিদার মুখ থেকে শুনেছিল, সুসাইম দেবী ওদের উপর রুষ্ট, তাই ওরা দরিদ্র।

ওদের বাড়ির কাছে আমাদের বাসা হওয়াতে সোমারার মা আমাদের কাছে প্রায়ই আসত। আশ্বিন মাসে ওদের উৎসব হতো, তখন আমরাও ওদের ওখানে যেতাম। ঈদ-পুজো উৎসবে মা প্রায়ই সোমারার মাকে টাকা ও কাপড় দিত। এই বিশ্বস্থ ও প্রতিবেশী সুলভ দিকটা সোমারার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতে একধাপ এগিয়ে দেয়।

বর্ষা মওসুমে বনের ভেতরে বাইদ জমিতে প্রচুর পানি জমত। আর সে পানি ধীরে ধীরে নামতো পাশের নদীতে। একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা পানিতে হাবুডুবু খেলার ছক এঁকে ফেলি। কারণ আমি সাঁতার জানতাম না, সোমারার কাছ থেকে সাঁতার বিদ্যেটুকু শেখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করি। কেউ যাতে দেখতে না পায়, সেজন্য সোমারা আমাকে নিয়ে গভীর বনে ঢুকে পড়ে। বনের পথ-ঘাট সবকিছু ওর পরিচিত।

ভালো পরিষ্কার জলাভূমি দেখে আমি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সোমারাও পানিতে নেমে সাঁতার কাটতে থাকে। তবে ওই জমিগুলোতে খুব বেশি পানি ছিলো না, আমার কোমর অবধি, আর সোমারার উরু সমান। এর মধ্যেই কীভাবে সাঁতার কাটতে হবে তা ও ক্লাসের টিচারের মতো শেখাচ্ছিল। আমি ততোটা পেড়ে উঠতে পারিনি। বরাবরই আমার নাদুসনুদুস শরীরটা পানির নিচে চলে যেতে থাকে। কম পানি হওয়াতে ঘোলাটে হতে থাকে সবদিক। সোমারা বলে, সাঁতার শিখতে হলে ডুবে ডুবে কাঁদাজল খেতে হবে। পানি কম হওয়াতে আমি ডুবতে গিয়েও পুরোপুরি ডুবতে পারি না, আর কাঁদাজল খাব কোত্থেকে?

হঠাৎ সে ক্ষিপ্ত স্বরে বলে, তোকে দিয়ে এখানে হবে না। সাঁতার শিখতে একদিন গাঙে যেতে হবে। এসব কাঁদাজলে সাঁতার শেখা যায় না।

হতাশ না হয়ে নিজেই চেষ্টা করতে থাকি। সোমারা অন্যদিকে নিজের মতো মতো করে জলাভূমির এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত জুড়ে ডুবঝাঁপ দিতে থাকে। তখন আমি ছোটো ছোটো শাদা রঙের পানাফুল ছিঁড়ে জমাতে থাকি। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে যায়।

হঠাৎ দূর থেকে সোমারা ডাকে।

অনী..

তাকিয়ে দেখি ও গলা সমান পানিতে, দুটো নীল রঙের শাপলাফুল হাতে। ওইদিকে বেশি পানি এই ভেবে ওর দিকে এগোতে থাকি। একটু এগিয়ে যেতেই বুঝতে পারি, সোমারা পানিতে গুঁটিসুঁটি মেরে বসে আছে, তাই ওকে মনে হচ্ছে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে। কাছে যেতেই সোমারা আমাকে পানি ছিটিয়ে দিতে থাকে। আমিও ঠিক একইভাবে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছিলাম। সোমারা ক্লান্ত হয়ে ওঠে। বলে, থাম অনী, তোকে একটা কথা বলব..

আমি পানি দেয়া থামিয়ে দেই।
বল..
শোন অনী তোকে একটা জিনিস দেখাবো, ভয় পাবি না তো?
ভয় পাবো কেন?
তুই তো একটা ভীতুর ডিম, ঐদিনের কথা মনে আছে রণিতা কাকিকে দেখে তোর কী দশাটা হয়েছিল।
আমি কথা ঘুরিয়ে বললাম, ওসব পুরনো কথা বাদ দে। এখন কী বলবি বল।
সত্যি ভয় পাবি না তো। সোমারা হেসে বলল।
বললাম তো, না।
একটা কন্ডিশন আছে, কাউকে বলা যাবে না।
ঠিক আছে বলব না।

তৎক্ষণাৎ সোমারা জলের উপর দাঁড়িয়ে যায়। ওর অদ্ভুত সুন্দর রূপে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। এক অজানা অনুভূতি আমার ভেতর বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ে। চোখ ধাঁধানো স্বপ্নের মতো রমণীয় দৃশ্য। সে দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।

কী রে ঘুমিয়ে গেলি নাকি?

আচমকা হুশ ফিরে পেলাম। ততক্ষণে সোমারা নিজেকে আবার লুকিয়ে নিয়েছে জলাভূমিতে। এবার বাস্তবের পরিস্থিতি আমাকে ঘিরে ধরল।

কী খুব ভাল্লাগছিল? এমন পাথরের মতো কেউ তাকিয়ে থাকে?

এভাবে স্তব্ধ হয়ে কেন তাকিয়েছিলাম তা আমি জানিনে। লজ্জ্বায় নিজের ভেতরটা পিষে যাচ্ছিল, তবু ভালোলাগাকে দূরে ঠেলে দিতে পারলাম না। কৌতূহলী মনের ভেতর থেকে ডানা ঝাপটে কণ্ঠস্বরে একটা প্রশ্ন প্রকাশ পেল।

সোমারা, তোর জামা-কাপড় হারিয়ে ফেলেছিস?
না রে বোকা। ওই যে তাকিয়ে দ্যাখ, রোদে শুকাতে দিয়েছি। ভেজা কাপড়ে বাড়িতে ঢুকলে শাস্তিটা কে ভোগ করবে শুনি? তোর প্যান্টটাও রোদে দিতে পারিস। তারপর আমার মতো জলের তলে লুকিয়ে থাকিস। আমি কাউকে কিচ্ছুটি বলব না। তোর মতো হাঁদারামের মতো তাকিয়েও থাকব না।

লজ্জ্বা আমার চারপাশটা আঠার মতো ঘিরে রাখে। সোমারার কথা শুনে মনের ভেতর তখন ইচ্ছা ও অনিচ্ছার প্রতিযোগিতা চলমান। ও আবারও হেসে বলে, কী ভাবছিস? জলের তলে ভাল লাগবে, মজা হবে… আয়।

মজা ও ভালোলাগাটুকু বুঝতে পারি বেশ, আর ইচ্ছে থাকলেও সোমারার মতো জামা বিহীন হতে পারিনি। কারণ, তখন আমার ভেতরে প্রবেশ ঘটেছিল এক অজানা শক্তির। ঐ শক্তির প্রভাবে জলের তলে থাকা আমার পুরুষাঙ্গ শক্ত বিদঘুটে আকার ধারণ করে। এই আকস্মিক পরিবর্তন সহ্য করার মতো ছিলো না। ভয়ে ভেতরটা কুঁকড়ে আসে, নিজেকে রক্ষা করতে আমি অন্য দিকে ছুটে যাই। তাছাড়া ভাবনার ভেতর ভয়ও উঁকি দেয়, সোমারা আমার এই শক্ত হওয়া জিনিসটা নিয়ে নতুন কোনো হাসি-তামাশা করা শুরু করবে।

ফেরার সময় সোমারা অনেকগুলো কচুরিপানা ফুল তুলল। বলল, আজ রাতে ওদের মিসি দেবতার পুজো। তাই ওরা আতপ চালের গুঁড়ো মিশিয়ে কচুরি ফুলের বড়া বানিয়ে খাবে। সেদিন ওর সাথে আমিও ময়ূরের পাখার মতো আলপনা আঁকা একঝাঁক বেগুনি রঙের কচুরিপানা ফুল নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম। সেই সাথে মায়ের বকুনি ছিল অবধারিত পুরস্কার!

আরেকদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে, সোমারা আমার কানের কাছে এসে বলেছিল,অনী.. রণিতা কাকিমার মতো ওসব খেলবি?
আমি চমকে ওঠি। শুধু উচ্চারণ করি, না। ধরা পড়লে মার খেতে হয় যে খেলায়, ওসব আমি খেলব না।
ধুর বোকা! কাকিমার মতো কি আমার স্বামী আছে নাকি যে তোকে মারবে। আসলে ওটা ছিল আলাদা ঘটনা… ওসব তোকে অন্যদিন বলব।

এরপর সোমারাকে আর কিছু বলিনি। ওর চোখে-মুখে থাকা আগ্রহ আমার ভালো লাগত। ভীষণ টানত, কিন্তু ভয় হতো, মাচা থেকে দেখা গোহাল ঘরের বীভৎস ঘটনাটার স্মৃতি মনে হতেই।

মিজান শেখের বাগানে সোমারার একটা প্রিয় লিচু গাছ ছিল। ওর হাত ধরেই একদিন আমি সে লিচু গাছে চড়তে শিখি। গাছের একবারে উপরে মগডালে কয়েকটা ডাল এমনভাবে জড়াজড়ি করে বিছানো ছিল, যে অনায়াসে আরাম কেদারার মতো বসা যেত, আর পেছনে হেলান দেবার মতো একটা শক্ত ডালও ছিল। মগডালের সে বসার স্থানটার সন্ধান সোমারাই আমাকে দেয়, কারোর কাছে প্রকাশ না করার শর্তে। একটা সময় নিজেকে সোমারার ইচ্ছের কাছে মুক্ত করে দিই। অজানা আকর্ষণের যন্ত্রণা আমাকে সোমারার প্রতি বিমোহিত করে তুলেছিল। তখনো আমার বাল্যকাল, কিন্তু জন্মসূত্রের এ খেলার নেশা আমার মনের দুয়ারে ঠিকই টোকা দিতে থাকে। হ্যাঁ, বালিকাবন্ধু সোমারার কাছেই প্রথম আমি সন্ধান পাই যৌন রহস্যের। সেখানে আনারি পথিকের মতো হোঁচট খাই বার বার! বোকাটে কামুক হয়ে বালিকার দেহে সুখ অনুভবের চেষ্টা করি। আর সে সুখ রহস্য-ধোঁয়াচ্ছন্ন কাঁচা রসে সিক্ত! আর তখন বুঝতে পারি, পরিণত হিসেবে সোমারা আমার চেয়ে একটু হলেও এগিয়ে। ওর শরীরের প্রতিটি প্রান্তে আমি হাতের স্পর্শে আলপনা আঁকি, হাতের মুঠিতে ছোটো স্তন আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি রণিতা কাকির পাশে দেখা ঐ লোকটার মতো। কখনো সোমারাদের সেই পাটকাঠি বোঝাই গোয়ালের মাচা আবার কখনো লিচুগাছের মগডালের আসনে বসে আমি ওর সৌন্দর্য খুঁজে বেরিয়েছি।

স্তন জোড়ায় আমার মুখ-মাথা জড়িয়ে সোমারা অনবরত ঘষতে চাইতো! দুহাতে ঝাপটে ধরা আনন্দে, অনেক সময় আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। তবু মায়াবী সুখ পায়রা থামতে চাইতো না। রেলগাড়ির মতো ছুটতে চাইতো ঝক ঝকা ঝক ঝক…! কাঁচা-পথ, কাঁচা নিশ্বাসের সীমারেখা কেবল এইরূপ স্পর্শ সুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল!

সোমারা একদিন বিকেলে আমাকে ওর কাকিমার আরেকটি দৃশ্যের মুখোমুখি করে। ওটা আমরা দেখেছিলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘরের বেড়ার ছিদ্র দিয়ে। সেদিনের লোকটা অন্য কেউ। দেখতে ফর্সা ও কিছুটা মোটাসোটা।

পরে সোমারার কাছে জেনেছি এই লোকটা আসলে এনজিও কর্মকর্তা! কয়েকবছর আগে সোমারার কাকা রামনাথ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিল। চাষে ক্ষতিগ্রস্থ হবার ফলে ঋণের টাকা পরিশোধ করার কোনো পথ ছিলো না। আর এ জন্য রামনাথের বিরুদ্ধে দেওয়া হয় মামলার হুমকি। স্বামীর মুক্তির পথ খুঁজতেই রণিতা কাকি অফিসারের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। করুণা ভিক্ষের মতো ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি ও মামলা ভীতি থেকে অব্যাহতি আদায় করে! রামনাথকে বাঁচাতে এছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। আর এ বিষয়টা বাড়ির সবাই জানতো, দেখেও চুপচাপ এড়িয়ে যেত, অন্ধ-বধিরের মতো। সোমারা আরো জানায়, গোয়াল ঘরে দেখা ঐ দিনের লোকটা ওদের কোনো আত্মীয় ছিল না, ওর কাকিমার খদ্দের ছিলো, অভাবের সংসারে এছাড়া কোনো উপায় নেই। ঐ মুহূর্তে এসব শোনার পর, অন্তত এতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম অভাব দরিদ্রতাই সোমারার কাকিমাকে এসবের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

সোমারা আরো একটি ঘটনা বলে, যে ঘটনা সে শুনেছে ওর দিদার কাছ থেকে। সোমারার জন্মেরও আগে ওর বাবা একবার গ্রাম কল্যাণ সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আর পরিশোধ করতে পারেনি। আর সে জন্য সোমারার মাকেও ঠিক একই ভাবে অনেকবার দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল, ঐ সমিতির প্রেসিডেন্ট অশোক সরকারের হাতে। দুর্ভোগের বিনিময়ে একদিন ওদের ঋণ মাফ করে দেওয়া হয়। আমার মনের ভেতরেও প্রশ্ন জেগে ওঠে সোমারাও কি আমার কাছে কোনোভাবে ঋণগ্রস্থ? ও কি সেই ঋণ পরিশোধ করতে চাইছে?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্দরের দৃশ্য পুরো সময়টা ধরে আমরা অবলোকন করলাম। সোমারা চাইতো ঐ এনজিও অফিসারের মতো আমিও ওর সাথে দক্ষতার পরিচয় দিই। কিন্তু, বালকত্ব আমাকে পিছিয়ে দিতো বার বার। বড়দের সাথে ছোটোদের অপরিণত ব্যবধান বুঝতে শিখি ভালোভাবে। নিজের মধ্যে বড় হবার ইচ্ছে জেগে উঠত বার বার। একদিন লিচু গাছের উপর বসে গিটার বাজানোর সময় সোমারা আমাকে বলেছিল, আমার শরীরেও পুরুষের মতো পরিবর্তন আসবে। আমি শৌর্যে-বীর্যে সিংহের মতো গর্জে উঠবো একদিন। ওর কথা শুনে আমি অজানা আনন্দে মনকে ভরিয়ে তুলতাম।

হ্যাঁ, কৈশোরের প্রথম প্রহরে সেদিনটা যখন এলো তখন আমি ক্লাস নাইনে। আর কিশোরী সোমারা ততোদিনে আমার থেকে অনেক দূরে, এক অদৃশ্য দেয়ালের ব্যবধানে। ওকে স্পর্শ করার ইচ্ছে জাগত, কিন্তু আমার সাহস নিঃশেষ হয়ে যেত একমুহূর্তে। সোমারা আমাকে রক্ত খেকো কাপড়ের পুতুল নিয়ে গল্প শুনাতে শুনাতে, প্যারানরমাল ভয়ের অতলে ডুবিয়ে দিতে থাকে। আমি পাগলের মতো বার বার চাইতাম, সোমারাকে কাছে টানতে। কিন্তু, সে তার দিদার শেখানো গল্পে এতটাই মগ্ন হয়েছিল যে, সে গল্প আমাকেও বিশ্বাস করতে হয়েছে, ভয়ে কাঁপতে হয়েছে। ক্লাস এইটের পরীক্ষার পর সোমারা স্কুলে যাওয়া একেবারে বন্ধ করে দেয়। একটা সময় এলো ও আমার চেয়ে খাটো হয়ে গেল, আমি হয়ে উঠলাম নবীন কিশোর, পা বাড়ালাম পূর্ণ পুরুষ হিসেবে আরম্ভ পর্বে!

তখন থেকে স্কুলে ও খেলার মাঠে কখনো ওকে দেখা যেত না। তবে মাঝে-মধ্যে সে আমাদের বাসায় আসতো, মায়ের সাথে গল্প করত, মাকে রান্নার কাজে সাহায্য করতো। সুযোগ পেলে আমার পড়ার রুমে আসতো। কখনো কখনো শরীর লেপ্টে জড়িয়ে ধরতো, কাঁদতো অজানা কারণে। ওর শরীরের ব্যাপক পরিবর্তন দিন দিন আমার কাছে অচেনা হতে থাকে। ঘন লম্বা চুল, কিছুটা মোটা হয়ে ওঠে দেহ, বুকের স্তন জোড়া স্ফীত ভাব নিয়ে বোঝাতে থাকে ও কতটা পরিণত। আমি চাইতাম, ওকে জড়িয়ে ধরে ঐ অদ্ভুত লুকোচুরি খেলতে। কিন্তু, সোমারা আমাকে মুকুল থেকে অঙ্কুরের ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দিতো।

একদিন বিকেলে সোমারা আমাদের বাসায় এসে বলেছিল, ওর বিয়ে হবে। আমরা যেন বেড়াতে যাই। তখন আমার এসএসসি পরীক্ষা চলছে, বিয়েতে যাওয়া হলো না। সোমারা এ জন্য কষ্ট পেয়েছে ভেবে বার বার প্রস্তুতি নিতে থাকি কীভাবে ওকে সরি বলব। পরীক্ষা শেষ হবার পরপরই বাবার বদলি হয় খুলনাতে। মা আর আমি বিনোদপুরে থেকে যাই, বাবা ওখানে বাসা ঠিক করার পরপরই যাব এই ভেবে।

একদিন গারো পাড়ার এক ছেলের কাছে জানতে পারি, সেদিন সোমারার বিয়ে হয়নি, যৌতুক দিতে না পারার কারণে বিয়ে ভেঙে গেছে। আমি চলে যাবার আগে সোমারার কাছে ছুটে যাই শেষবারের মতো দেখা করার জন্য। সেদিনই প্রথম সোমারা আমাকে ওদের ঘরে নিয়ে যায়। একটা বেতের মোড়া টেনে বসতে দেয়। দরোজাটা বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে, জানিস অনী, আমাকেও কাকিমার মতো হতে হবে। নয়তো এই ঋণের বোঝা আমাদের মাথা নামবে না।

তোর আবার কিসের ঋণ?
তুই কি ভুলে গেলি, কদিন আগে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। যৌতুক দিতে না পারার কারণে বর পক্ষ চলে গেছে। এই বাড়িটা বন্ধক দিয়ে আমার বিয়ে আয়োজনে খরচার জন্য বাবা ত্রিশ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছে ব্যাংক থেকে। যদি অর্চনাদের মতো ঋণের দায়ে আমাদের বাড়িটাও খোঁয়া যায়, তখন থাকব কই?

সোমারার দিদার ধারণা ছিল, এ বাড়ির নারীরা অপবিত্র, তাই সাংসারিক প্রধান দেবতা তাতারা রাবুগা ওদের প্রতি প্রসন্ন নয়। সোমারার মা-কাকিমা সকাল-সন্ধ্যা পুজো দিলেও সে পুজোতে দেবতাদের সন্তুষ্ট করা যাবে না। তাই পবিত্র কুমারী সোমারা প্রতিদিন পুজো দিয়ে দেবতাদের মন ভরিয়ে সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনবে। আর সোমারা অতিসাবধানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে কুমারিত্ব বজায় রেখে চলবে।

সোমারার দিদার ইচ্ছে থাকলেই কি আর পূরণ হতে যাবে? শান্তির সন্ধানে ওরা ছুটছে, কিন্তু পুঁজিবাদী পশুদের দৌরাত্মে সে শান্তির কপালে কাঠ-কয়লা ছাড়া আর কিছু জুটেনি। পণ-যৌতুক কখনো ধর্মীয় রীতি, বা সামাজিক প্রথা হতে পারে না। যৌতুক সমাজের মানসিক ব্যাধি ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়।

সোমারা আবারো কান্নাভরা কণ্ঠে বলে, দিদার স্বপ্ন ছিলো আমি পাপীনি হবো না। আমি হবো পবিত্র কুমারী। আর দেবতারা আমাকে মূল্যবান বর দিবে, ভালো লোকের বউ হবো, স্বামীর ঘরে সুখ পাব। তাই তোকে এতোটা ভালোবেসেও তোর কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। ভয় ছিল, মুকুল থেকে অঙ্কুর হবার!

কান্না থামিয়ে সোমারা বলে জাদুর পুতুল দেখবি?
প্রায় ভুলে যাওয়া স্মৃতি হঠাৎ উতরে উঠল। বললাম, সত্যি দেখাবি?

কাপড়ের বাক্স থেকে একটা প্যাঁচানো কাপড় বের করে দেখিয়ে বলে এটা রানি পুতুল। এটাই দিদা প্রথম আমাকে বানিয়ে দিয়েছিল, তারপর নিজে নিজে অনেক পুতুল বানিয়েছি আর কবর দিয়েছি। একটু হেসে সোমারা বলে, দেবতার ইচ্ছায় তুই আজ ভালো সময়ে এসেছিস, রক্ত রঙের ঝর্ণা থেকে পুতুল কীভাবে রঙ খায় দেখবি? গতকাল থেকে পুতুলটা রক্ত রঙ খাওয়া শুরু করেছে।

মাথা নেড়ে বলেছিলাম, চল, দেখতে যাব, কতদূর?
চোখ বন্ধ কর।
চোখ বন্ধ করার পর সোমারা ওর স্কার্ট সরিয়ে যোনি মেলে ধরে। চোখের সামনে দেখতে পাই মানব পৃথিবীর অতিগোপন কুঠুরি। আর ওখানে তুলো-কাপড়ের সেই পুতুল বাধা, লাল রঙ খেয়ে জোঁকের মতো ফুলেফেঁপে উঠেছে।

সোমারা বলল, ছুঁয়ে দেখবি?

জানিনা কোথা থেকে প্রচণ্ড সাহস পেলাম। ওর কথায় ছুঁয়েও দেখি। হেঁচকা টানে পুতুলটা সরিয়ে আনলাম। ঝর্ণা থেকে ঝিরিঝিরি মন্থর গতিতে রক্ত গঙ্গা নেমে আসছে। যে রক্তকে সোমারা রক্ত রঙ বলে ডাকে।

ইচ্ছে করে না?

কিছু বলতে পারছিলাম না। হ্যাঁ, ইচ্ছে করেছিল। তবু ইচ্ছেকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিলাম। শেষে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে বলেছিলাম, কিছু ইচ্ছে অপূর্ণ থাকার মধ্যেই পূর্ণতা নিহিত। এখন আমাকে শহরে যেতে হবে, বিকেলের ট্রেনে খুলনা যাচ্ছি! বাবা মা চলে গেছে আগেই..।

সোমারাদের ঘর থেকে বেরুবার সময় খেয়াল হলো আমার হাতে ওর রহস্য পুতুল। ওর হাতে ওটা ফিরিয়ে দিলাম। আবারো তাকিয়ে দেখলাম পুতুলটা রক্তে ভিজে টইটম্বুর হয়ে আছে। দু-এক দিন পরেই নতুন কবর খোঁড়া হবে, এই পুতুলকে সোমারা দেবতার নামে কবর দিবে। আর দেবতারা ওকে ঠেলে দিতে থাকবে খেটে খাওয়ার পথে। আর পুঁজিবাদী পশুরা ওর শরীর খুবলে খুবলে খাবে।


  • দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

 

Facebook Comments Box