যা লিখি, বড় আনন্দ নিয়েই লিখি : গিয়াস আহমেদ

বুধবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২১ | ৯:০৪ অপরাহ্ণ | 515 বার

যা লিখি, বড় আনন্দ নিয়েই লিখি : গিয়াস আহমেদ

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা। আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি লেখক গিয়াস আহমেদ-এর

 

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

একটা জীবন সাংবাদিকতায় কাটিয়ে দিলাম, এখনো কাটছে। মিডিয়ায় কাজ করি তো― অনেক মানুষ, অনেক পেশার মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে যায়। কারো কারো সাথে বন্ধুত্বও হয়ে যায়, আমার পেশার কারণেই। সাংবাদিকতা পেশাটাই আসলে এমন। সে কারণেই দেশের কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত প্রকাশকের সঙ্গে পরিচয় রয়েছে, তারা কেউ কেউ বন্ধুজনও। তারা বই চাইতেন।

আমি ভোরের কাগজ ‘পাঠক ফোরাম’-এর বিভাগীয় সম্পাদক ছিলাম, প্রথম আলো ‘বন্ধুসভা’ প্রতিষ্ঠা করেছি। সে কারণেও সবার সাথে আমার যোগাযোগটা অনেক ভালো। সেই ভোরের কাগজের যুগ থেকে প্রকাশক বন্ধুরা বই চাইতেন। দিতে পারিনি। লিখিইনি তো, দেব কী!

‘এবারও লিখলেন না’― এই অনুযোগের মুখে প্রতি বইমেলায় অপরাধীর মতো মুখ কালো করে ঘুরে বেড়াতাম। প্রকাশক ও বন্ধুদের কাছে অপরাধী, নিজের কাছে অপরাধী…। অতঃপর গতবার যখন লিখছি, সেই গোপন সংবাদে তিন প্রকাশক বন্ধু বললেন, ‘তোমার বই দাও, আমি ছাপব।’

গিয়াস আহমেদ’র প্রথম বই

ভাষাচিত্রের খন্দকার সোহেল মেসবাহ য়াযাদের বন্ধু, ঘনিষ্টজন। মেসবাহ ভাইয়ের প্রথম বই তিনি প্রকাশ করেছেন। সোহেল আমার বই প্রকাশে খুবই আগ্রহ দেখালেন। তিনি মেসবাহ ভাইয়ের কাছে হয়তো শুনে থাকবেন যে আমার একটি পাণ্ডুলিপি অবশেষে শেষের পথে। মেসবাহ ভাইও চাচ্ছিলেন, ভাষাচিত্র থেকে আমার প্রথম গ্রন্থ অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আসুক। এরই মাঝে অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলাম, পৃথিবীর সব বড় বড় বইমেলায় খন্দকার সোহেল যাচ্ছেন। ফিরে এসে এই তরুণ প্রকাশক তার অভিজ্ঞতা লিখছেন, প্রকাশনা শিল্প নিয়ে তার ভাবনার কথা, তার স্বপ্নের কথা লিখছেন। আমি মুগ্ধ!

তার সঙ্গে আড্ডা, কথাবার্তায় মুগ্ধতা আরও বাড়ল, বাড়তেই থাকল। সোহেল একদিন বললেন, ‘চলেন, একটা জার্নি শুরু করি।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে… মোরা যাত্রী তরণীর… চলেন, সহযাত্রী হলাম।’ ২০২০ সালের বইমেলায় ভাষাচিত্র থেকে প্রকাশিত হলো আমার প্রথম গ্রন্থ ‘চন্দ্রযান: দ্য লুনাটিক এক্সপ্রেস’। সেই থেকে আমি ভাষাচিত্র পরিবারের একজন। আমরা একটি দূরপাল্লার যাত্রাকে মাথায় নিয়ে চলছি। বিশ্বাস, ভালোবাসা, স্বপ্ন এবং আশা আমাদের সঙ্গী।

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?

এক অর্থে তো আমি পেশাজীবী লেখকই। দলিল লেখক বলেন আর সাংবাদিক, প্রতিদিন তো লেখাটাই তাদের কাজ, তাই না! এক জীবনে কত কী লিখছি― পাতার পর পাতা ফিচার, রিপোর্ট, এটা সেটা! তবে সাহিত্য রচনাকে যদি ‘লেখালেখি’ বলে মানে করে থাকেন, তাহলে বলি― সিরিয়াসলি লেখালেখির কথা ভাবিনি তেমন করে। অস্বীকার করব না― আমার ‘বিখ্যাত অলসতা’ও না লেখালেখির বড় কারণ!

প্রচলিত একটি কথা আছে― ব্যর্থ প্লেয়াররা ভালো কোচ হয়। সততার সঙ্গে আমি বিশ্বাস করি, আমি সম্পাদনায় ভালো। সে কারণে লেখক হওয়া আমার আর হবে না, এমনই মনে হতো। চেষ্টা-টেষ্টাও করিনি তেমন করে। সত্যি বলতে, এখন লিখছি চাপে পড়ে। পরিবারের মানুষরা চায় আমি লিখি, বন্ধুরা চায় লিখি। তাদের প্রত্যাশা সুতীব্র ভালোবাসা থেকে। ভালোবাসা এড়ানোর সাধ্য তো মানুষের নেই! তারাই আমার প্রাণ ও প্রেরণা। তাদের ধাক্কায় আমার ‘চন্দ্রযান’ শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছে, গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আমি আমার বন্ধু-স্বজনদের এই ভালোবাসার পীড়নের কাছে কৃতজ্ঞ।

প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ কথাটি খুব বলতেন, ‘তিনি নিজের আনন্দে লেখেন।’ আমি ক্ষুদ্র মানুষ, লেখক হিসেবে তুচ্ছ, তবু বিনীতভাবে বলি― এখন যা লিখি, বড় আনন্দ নিয়েই লিখি, আমি নিজের আনন্দে লিখি। কিছু লেখার পর যখন মনে শান্তি নেমে আসে, সে অনুভূতি অপার্থিব…

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

মজা এবং আনন্দ কি সমার্থক? আসলে আমি অল্পে বিস্মিত হওয়া মানুষ। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০-এ ‘চন্দ্রযান: দ্য লুনাটিক এক্সপ্রেস’ বেরোল। এরপর থেকে যেভাবে একের পর এক পাঠপ্রতিক্রিয়া পেতে লাগলাম― এককথায় তা বিস্ময়কর, অভাবনীয় এবং অবিস্মরণীয়! আমি যারপরনাই মুগ্ধ এবং কৃতজ্ঞ। আমি ছোট লেখক তো, মানুষের ভালোবাসা তুমুল স্পর্শ করে আমাকে।

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশে সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

বড় বিস্ময় ও আনন্দ নিয়ে দেখছি, অনেক ভালো লেখক আসছেন। অনেকের লেখাতেই আমি মুগ্ধ। ইন্টারনেটের বিশাল জগত পড়াশোনা ও লেখলেখির খোলা দুয়ার হয়ে উঠেছে, এটি সুলক্ষণ। সাহিত্য এক সময় তথাকথিত পরাক্রমশালী সাহিত্য সম্পাদকদের থাবায় গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কে লেখক হবেন, কে কত বড় কবি হবেন বা আদৌ হবেন কিনা― তা নির্ধারণ করে দেবেন পত্রিকার ওই সাহিত্য সম্পাদকরা! তাদের আবার আলাদা আলাদা খুপরি ছিল, কোনো একটা খোপের মুরগি না হলে কারো আর লেখক হয়ে ওঠা হতো না! কী সাংঘাতিক দিনই না গিয়েছে! খেয়াল করেছেন, এই বাক্যটি লিখলাম পাস্ট টেন্সে? সেই কাল আজ অতীত কাল বলে, সংবাদ মাধ্যমের একজন হয়েও, বড় প্রশান্তি এবং প্রত্যাশা খুঁজে পাই। যে সময়ের কথা বলছি, তখন বিদ্রোহীরা লিটল ম্যাগের ছোট্ট মলাটে হাঁসফাঁস করতেন। সেই অচলায়তন থেকে মুক্তি মিলেছে…। অন্তর্জালের বিশাল জগত পুরো পৃথিবীকে নিজের জানান দেওয়ার অধিকার দিয়েছে। আমি আশাবাদি মানুষ। তবে আমার দুটো কথা― এক. বিশ্বসাহিত্যকে জানতে হবে, দুই. বিশ্বসাহিত্যের দরবারে আমাদের সৃষ্টিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় তুলে ধরার পথ বের করতেই হবে।

প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?

পড়া পড়া পড়া এবং লিখে যাওয়া…। “যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল…”। জঞ্জাল যেন সৃষ্টি না করি। নতুন ভাবনা, নতুন প্লট, নিরীক্ষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নবতর উপস্থাপনার নিরন্তর চেষ্টা করে যেতে চাই। “এসো করো স্নান নবধারাজলে…” এই শুচিসঙ্গীত যেন সত্য হয় এ ক্ষুদ্র জীবনে।

Facebook Comments Box