দেশের বই ঈদ সাময়িকী

মুন্নি রহমান-এর ছোটগল্প ‘অবহেলা’

বৃহস্পতিবার, ২০ মে ২০২১ | ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ | 91 বার

মুন্নি রহমান-এর ছোটগল্প ‘অবহেলা’

অবহেলা
।। মুন্নি রহমান ।।


 

‘তোমাকে কতবার বলছি যখন তখন আমাকে ফোন করবে না?’
‘আসলে দুদিন হয়ে গেল, তুমি ফোন দেও না তাই।’
‘তুমি জানো না ব্যস্ত থাকি? এখানে আমাকে বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেয় না।’
‘আমি কখন বললাম তুমি বসো থাকো?’
‘মুখে মুখে কথা বলবা না তিথি। আমি ব্যস্ত আছি।’
খট করে ফোন কেটে দেয় কিরন। ফোনের ওপাশে তিথির দীর্ঘশ্বাস হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কিছুদিন ধরেই এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কিরন। তিথি ভেবে পায় না কিরনের এমন আচরণের কারণ কী? কিরন তো এমন ছিল না।

সেদিন সন্ধ্যায় তিথি আবার ফোন করল কিরনকে।
‘এখন তো তোমার অফিস ছুটি। এখন একটু কথা তো বলতেই পারো।’
‘এখন বাহিরে আছি। আড্ডা দিচ্ছি। পরে ফোন করবো কেমন পাখি?’
‘একটু কথা বলি প্লিজ।’ অনুনয়ের সুরে বলল তিথি।
‘কথা কি আমি ইংলিশে বলি হ্যাঁ? বুঝতে পারছ না কী বলছি?’
‘তুমিই তো বলছিলে অনেক কথা জমা আছে। তারপর তো আর বললে না। একদিন আড্ডা না দিলে কী হয়?’
কথার উত্তর না দিয়েই লাইন কাটল কিরন। হতাশ হয়ে ফোন রেখে দেয় তিথি। সব কিছুর জন্য তার সময় আছে শুধু তিথির জন্যই সময় নেই।

সম্পর্কের শুরুর দিকটা মনে পড়ে তিথির। তখন সময়গুলো কতটা ভালো ছিল। ভালোবাসাময় ছিল জীবন। আগে যতটা কাছাকাছি ছিল এখন ঠিক ততটাই দূরে। কেঁদে কেঁদে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে তিথি তার হিসেব নেই। আগে কিরনের কাছে এসব নিয়ে খুব অভিযোগ করতো। অভিমান করে কখনও কখনও কথা বলতো না। কিন্তু তাতে নিজেই কষ্ট পেত সে। কিরন কখনোই ওর অভিমান ভাঙ্গাতো না। থাকতে না পেরে নির্লজ্জের মতো নিজেই আবার ফোন করতো কথা বলতো। তিথি ভাবতো ‘একটু নির্লজ্জতা যদি তাকে আমার করে দেয়, তাহলে ততটুকু নির্লজ্জ হতে দোষ কোথায়?’

কতদিন হয়ে গেছে বৃষ্টির মধ্যে হাতে হাত রেখে রিকশায় ঘোরা হয় না। অথচ দুজনেরই বৃষ্টি পছন্দ। এখন আর নিয়ম করে বলা হয় না ‘নিজের যত্ন নিও’। তিথিও এখন আর জোর করে না। এখন আর কথা বলার বায়না করে না। যে যেমন থাকতে চায় তাকে তেমন থাকতে দেওয়া উচিত। সে যদি থাকতে পারে আমিও থাকতে পারবো- এটা ভেবেই কেটে যায় তিথির দিন।

সন্ধ্যায় তিথির ঘুম ভাঙল মানুষের কথার গুঞ্জনে। বিকেলে বই পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে নেই। আগে বিকেলে ঘুমানোটা তিথির বিরক্ত লাগতো। এখন তা ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। কারণ একমাত্র ঘুম ছাড়া কিরনকে মন থেকে সরাতে পারে না।
ড্রয়িংরুমে আসতেই অপরিচিত কয়েকটা মুখ চোখে পড়লো। মায়ের হাসি হাসি মুখ দেখে একটু অবাকই হলো তিথি। মা হাসি মুখেই বলল, ‘আরিফের বাড়ি থেকে সবাই এসেছে তোকে দেখতে। আজকেই আকদ করতে চান তারা।’
‘তুমি কার কথা বলছো মা?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো তিথি। মা অবাক চোখে তিথির দিকে তাকালো, ‘হায় হায় কী বলিস? ভুলে গেছিস? সেদিন বললাম না তোকে। তোর আফজাল আংকেলের ছেলে আরিফ। অনেক বড় চাকরি করে। তাছাড়া তোকে খুব পছন্দ করে আরিফ।’
অস্পষ্টভাবে সেদিনের কথা মনে পড়লো তিথির। তিথি তখন মায়ের কথা ততটা গায়ে মাখেনি। কারণ এর আগেও মা এমন কথা বলেছে।

দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে ফোন হাতে নেয় তিথি। ব্যস্ত হাতে কিরনের নাম্বারে ডায়াল করে। রিং হয়।
একবার…
দুবার…
তিনবার…
ফোন রিসিভ হয় না। হতাশায় ভেঙে পড়ে তিথি। অসংখ্যবার ডায়াল করার পরে ফোন রিসিভ করলো কিরন। রিসিভ করেই ধমকে উঠল, ‘উফফফ আমাকে কি একটু শান্তিতে থাকতে দিবা না তুমি? সমস্যা কি তোমার? দেখছো ফোন রিসিভ করছি না। তবুও কেন বারবার কল করছো?’
‘আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। প্লিজ তুমি কিছু করো।’
কিরন যথেষ্ট বিরক্ত হলো। এতদিন পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে আর মেয়েটা ওকে জ্বালিয়ে মারছে। তাই বিরক্ত হয়েই কিরন উত্তর দিলো, ‘বিয়ে ঠিক হলে বিয়ে করে নাও। আমাকে বলছো কেন?’
তিথির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কান্নাভেজা কণ্ঠে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলো তিথি। ‘কী বলছো এসব? অন্য কাউকে বিয়ে করবো মানে? বিয়ে হয়ে গেলে আমি অন্য কারো হয়ে যাব। বুঝতে পারছো তুমি?’
‘তিথি প্লিজ ডিস্টার্ব করো না। অনেকদিন পর বন্ধুরা একসাথে হয়েছি। একটু চিল করতে দেও।’
ফোন কাটতেই আবার ফোন দেয় তিথি। কিন্তু ফোন বন্ধ কিরনের। ফোন বন্ধ করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় কিরন।

আয়নায় শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিলো তিথি। বিয়ের সাজে তাকে অপূর্ব লাগছে। সবার খুশি দেখে নিজেকে সুখী সুখী লাগছে তিথির। যে মানুষটার কাছে ওর কোনো
মূল্য নেই, তার কথা ভেবে নিজেকে আর কষ্ট পেতে দেবে না। বরং যে মানুষটা সব কিছু জানার পরেও তাকে আপন করে নিচ্ছে, তাকে ফেরানোর সাধ্য তার নেই। মহা ধুমধামে বিয়ে হয় তিথির। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন আর কিরনের প্রতি একরাশ অভিমান নিয়ে তিথি চলে যায় তার নতুন ঠিকানায়। সাথে নিয়ে যায় কিছু স্মৃতি যা প্রতিনিয়ত তাকে পোড়াবে।

প্রায় সপ্তাহখানেক পরে কিরনের খেয়াল হলো তিথি এখন আর ফোন করে না। ওকে বিরক্ত করে না। খুশি হওয়ার বদলে একটু মন খারাপ হলো তার। হঠাৎ বুকের বাঁ পাশটায় শূন্যতা অনুভব করলো। এমন তো হওয়ার কথা না। তার তিথি তো তার সাথে কথা না বলে থাকতেই পারে না। তবে কি সেদিন একটু বেশিই বকে দিয়েছিল তিথিকে?

মেয়েরা বড় বেশি অভিমানী হয়। তারা সবসময় চায় প্রিয় মানুষটা তাদের বুঝুক। মন খারাপের সঙ্গী হোক। সবসময় তাদের খোঁজখবর নিক।

কিরনের একটু খারাপ লাগলো তিথির জন্য। অস্থিরতায় ছেয়ে গেল মন। কোথায় যেন একটা বিষণ্নতার ছাপ। আজ না হয় ওকে একটু টাইম দেওয়া যাক। এই ভেবে ডায়াল করলো তিথির নাম্বারে। সম্পর্ক শুরুর পর থেকে আজ এই প্রথম একটা বিশ্রি মেয়ে কণ্ঠ বারবার ঘ্যান ঘ্যান করে বলছে, ‘আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তা এই মুহূর্তে বন্ধ আছে‌ অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ পর চেষ্টা করুন।’ কিরনের দম বন্ধ হওয়ার যোগাড়। দুই বছরে আজ প্রথম তিথির ফোন বন্ধ বলছে‌‌। কিরন বুঝতে পারে আর কখনোই তিথি তাকে বিরক্ত করতে আসবে না। তিথি তার থেকে অনেক দূরে এখন।

এখন কিরন মস্ত বড় চাকরিজীবী। গাড়ি-বাড়ি সব আছে। তবুও জীবনটা বড্ড বেশি ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আজ সে একা। একাকীত্বটা তাকে খুব পোড়ায়। একটা মেয়ের স্বপ্ন ভাঙার অপরাধে আজ সে অভিযুক্ত। আজ নিজের কাছে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হয়। যার জন্য একসময় ভালো ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত ছিল, আজ সে নেই। ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে ছুটতে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে তার ভালোবাসা।
এখনও তিথিকে মনে করে ঘুম ভেঙে যায়। আলতো পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করতে গিয়ে শূন্য জীবনটাই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কখনও কখনও একরাশ অভিমান এসে ভিড় করে মনের আঙিনায়। অভিমানগুলো কান্না হয়ে ঝড়ে পড়ে। দীর্ঘশ্বাসগুলো মিশে যায় রাতের কালিঘোলা অন্ধকারে। মানুষ ভাবে সত্যিকারের ভালোবাসা নাকি হারিয়ে যায় না। কিন্তু কিরন এখন বোঝে ‘দুটো মানুষের গল্প যেমন হঠাৎ করেই শুরু হয়, তেমনি আবার সেই গল্পটা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়।’ শুধু রয়ে যায় স্মৃতি, বয়ে যায় সময়।

Facebook Comments Box