মিন্নাত আলী ও কিছু কথা

বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৬:২২ অপরাহ্ণ | 214 বার

মিন্নাত আলী ও কিছু কথা

আরেকজন সাহিত্যিকের কথা কই, উনার নাম – মিন্নাত আলী। অধ্যক্ষ মিন্নাত আলী নাম দিয়া সার্চ দিলে গুগুলে কিছু জিনিস পাইবেন। উনার বাড়ি ভৈরবে, কিন্তু চাকরি করছেন, থাকছেন বাওনবাইড়ায় (ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বি.বাড়িয়া)। আল মাহমুদের দেশি লোক। সরকারি মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরষ্কার পাইছেন, সাহিত্যে। উনার দুয়েকটা বইয়ের কথাও কয়েকজন শুইনা থাকতে পারেন – মফস্বল সংবাদ (১৯৫৮), আমি দালাল বলছি (১৯৭৪)।

১৯৯১ সালে আমরা যখন সাহিত্য পত্রিকা করি ভৈরবে, তখন উনার একটা ইন্টারভিউ ছাপাইছিলাম। অই সংখ্যাটা আছে আমার কাছে, পরে কোন সময় টেক্সটটা দিবো নে। উনি মারা গেছেন ২০০৮ সালে। মানুশ হিসাবে খুবই ভদ্রলোক ছিলেন।

তো, যেই ঘটনাটার কথা বলতে চাইতেছি, আমার ধারণা, অনেকেই জানেন সেইটা, কিন্তু বলেন না। সেইটা হইতেছে, উনি যেই গল্প লেইখা বাংলা একাডেমি প্রাইজ পাইছিলেন সেইটা আসলে আরেকজন রাইটারের লেখা। আহমদ ছফার মেবি। এখন পুরাপুরি রি-কল করতে পারতেছি না। তো, অই লেখক এইটা নিয়া লিখছিলেনও যে, উনি খুব খেইপা-টেইপা বাওনবাইড়ায় উনার বাসায় গেছিলেন যে, উনার মতন মুরব্বি মানুশ (উনার জন্ম ১৯২৭ সালে) তার মতো ইয়াং রাইটারের লেখা মাইরা দিলেন, তারপরে আবার প্রাইজও নিলেন, কোনকিছু স্বীকারও করলেন না! তো, গিয়া দেখেন মিন্নাত আলী সাহেবের অবস্থা খুবই খারাপ। নামেই উনি প্রিন্সিপাল, নিয়মিত বেতন পান না। বাড়িঘর ভাইঙ্গা পড়ে পড়ে অবস্থা। ঘরে তিন-চারজন মেয়ে, টাকার অভাবে বিয়া দিতে পারতেছেন না। মিন্নাত আলী সাহেব অই রাইটার’রে কইলেন, চাইলে উনি প্রাইজের ক্রেস্ট’টা নিয়া যাইতে পারেন। প্রাইজের যে কিছু টাকা পাইছিলেন, সেইটা ফেরত দেয়ার মতো অবস্থা তার নাই। এইরকমের মর্মান্তিক একটা ব্যাপার।…

আমার ধারণা, একটু খোঁজ-খবর করলে একচুয়াল ঘটনাটা এবং লেখাটা বাইর করা যাবে। কিন্তু আমরা যারা টুকটাক জানি, তারাও এইটা নিয়া কখনো কথা বলি না।

২.

এইখানে আমার দুইটা কথা বলার আছে। যে, কেন বলি না? একটা তো অবশ্যই যে, মানী লোকের বদনাম করাটা ঠিক না। বদনামও না ঠিক, ছোটখাট ভুল-ক্রুটি গোপন রাখাই নিয়ম। অনেক বড় বড় লোকের বড় বড় দুর্নামও আছে। তলস্তয়রে নিয়া একটা সিনেমাতে দেখাইতেছিল, উনি যেই ধর্মীয় মঠ বানাইছিলেন সেইখানে একটা ইয়াং সুন্দরী মেয়ে সকালবেলা উইঠা তার প্রেমিকরে ছাইড়া তলস্তয় ডাকছে বইলা দেখা করতে যাইতেছে; শে তার প্রেমিকরে বলতেছিল, তোমার কি মনেহয় সকালবেলা আমারে উনি প্রেয়ার করার জন্য ডাকছেন!

তো, এইগুলা সর্ট অফ ওপেন-সিক্রেট। আশে-পাশের বা অই সময়ের লোকজন কম-বেশি জানে, কিন্তু বলে না। এই কারণে না যে, উনি এইগুলা করেন নাই, বরং এইগুলা হইতেছে পাবলিকের মাফ কইরা দেয়ার ঘটনা। (ব্যক্তির মতোই সমাজেরও সাইকোলজি আছে, বরং সামাজিক সাইকোলজির বাইরে গিয়া ব্যক্তির মন-মানসিকতার কোন এভিডেন্স পাওয়া টাফ হওয়ার কথা।…) তবে সবার সবকিছু মাফ হয় না। যদি আমরা ভাবতে পারি, লোকটা ‘ট্যালেন্টেড’, ‘মন থিকা ভালো’, এই সেই… তাইলে মাফ করাটা সহজ হয়; যে, আরে, ট্যালেন্টেড লোকের কিছু সমস্যা থাকেই! মানে, রাইটার, রাজনীতিবিদ কেউ-ই ফেরেশতা না, এমনকি ‘ভালো মানুশ’ও না, কিন্তু উনাদের দোষ-ক্রুটি নৈতিকতার জায়গা থিকা না, বরং সোসাইটিতে উনার সিগনিফিকেন্স, কন্ট্রিবিউশনের কথা মাফ কইরা দেয়ার নজির চালু আছে।

আমার সেকেন্ড কথাটা এইখানেই, যে, মাফ কইরা দেয়া আর না-বলা দুইটা একই ঘটনা না, বরং বেশিরভাগ সময়ই ব্যাপারগুলারে আমরা বলতে পারার একটা জায়গাতে নিয়া যাইতে পারি না, ঠিকমতো আর্টিকুলেট করতে পারি না বইলা বলি না।

মিন্নাত আলী সাহেব অন্য আরেকজন রাইটারের লেখা চুরি কইরা ছাপাইছিলেন বললে মনে হইতে পারে যে, উনি যেন উনার অন্য লেখাগুলা লেখেন নাই! একবার আপনি কইলেন কৃষ্ণচূড়া সুন্দর, তো, কৃষ্ণচূড়ার ডাল ভাইঙ্গা পইড়া মইরা গেলেও তারে খারাপ কইতে পারবেন না! মানে, কাউরে একবার চুতমারানি বইলা গাইল দেয়ার পরে আপনি যেন খালি গাইল-ই দিয়া যাইতেছেন! মানে, ঘটনা তো এইরকম লিনিয়ার না, মানুশও না, সমাজও না। এখন অবশ্যই ডিফাইনিং ইভেন্টস আছে লাইফে। যেই লোক খুনের কথা ভাবছে আর যে খুন করছে, দুইজন একই লোক না।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়া যখন ছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন ছিল তখনকার রিয়ালিটি আর এখনকার রিয়ালিটি একইরকম না; একটা সার্টেন ইভেন্টের আগে ও পরে জিনিসগুলা একইরকম না।… তো, এইখানে আমার কথা হইতেছে, আমরা আমাদের বলাবলির ভিতরে একটা জেনারেল রুল’রে সেন্টার না কইরা যতো বেশি মাল্টিপ্লিসিটিরে জায়গা দিতে পারি, ততো ভালো। সেইটা আন-এথিক্যাল ঘটনাগুলারে স্পেইস দেয়া না, বরং বলাবলির জায়গাটারে ব্লার কইরা দেয়ার যে একটা স্পিরিট এইখানে কাজ করে, সেইটারে কম ইম্পর্টেন্ট ভাবতে পারা। যেন কারো পাদ দেয়ার গন্ধ যদি কোনদিন আপনার নাকে ঢুকে তার শরীরের ঘ্রাণ কোনদিন নিতে পারবেন না আর! কিন্তু ঘটনাগুলা এইরকম না। আর এইটাও আমরা জানি। কিন্তু জানা কথাগুলারে কেমনে বলতে হবে, কেমনে শুনতে হবে – এই জায়গাগুলা ক্লিয়ার না এতোটা। আমাদের কনশাসনেসরে ভিজিবল কইরা তোলার জায়গাগুলাতে আমরা মনেহয় আরো কথা বলতে পারি।


দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments Box