মা হারানোর অশেষ শূন্যতার ভেতর দিয়ে প্রবহমান জীবনের প্রতিচ্ছবি

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০ | ১০:৩৬ অপরাহ্ণ | 120 বার

মা হারানোর অশেষ শূন্যতার ভেতর দিয়ে প্রবহমান জীবনের প্রতিচ্ছবি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক-এ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ভাষাচিত্র’ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দেশের বই’ যৌথভাবে ভাষাচিত্রের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ ‘ভাষাচিত্র বুক ক্লাব’-এ নিয়মিত বুক রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
আয়োজনের অংশ হিসেবে বাছাইকৃত ও নির্বাচিত বুক রিভিউ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে আমাদের পোর্টালে। আজ প্রকাশিত হলো মফিজুল হক-এর কবিতার বই ‘নিঃসঙ্গ জংশনে মা’-এর রিভিউ।

রিভিউ করেছেন পার্থ দা

॥ পার্থ দা ॥

বইয়ের নাম : নিঃসঙ্গ জংশনে মা
লেখক : মফিজুল হক
প্রকাশক : বেহুলা বাংলা
ধরণ : কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশকাল : ২০১৯
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ৮০
মুদ্রিত মূল্য : ২০০

‘মা’- পৃথিবীর সবচেয়ে ছোটাে শব্দগুলোর একটি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দগুলোর একটি ‘মা’। মা’কে নিয়ে এই পর্যন্ত রচিত গ্রন্থ, রচনা, কবিতা কিংবা উপন্যাসের সংখ্যাটাও নেহাৎ কম নয়। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ থেকে নিয়ে আনিসুল হকের ‘মা’ পর্যন্ত শত শত রচনার জন্ম দিয়ে গেছে এই একটি ছোট্ট শব্দ। এখনও কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের চিন্তা চেতনায় মা’কে ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ‘মা’ যে সবার পরম আরাধ্য, সবার প্রথম এবং শেষ আশ্রয়। কবি মফিজুল হক তাঁর “নিঃসঙ্গ জংশনে মা” কাব্য গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন সেই সকল মানুষদের যাদের জীবনের সবচেয়ে বড়াে সম্পদ তাঁদের সাথে নেই; কবির উৎসর্গপত্রে লিখেছেন-
“মা ছাড়া শূন্য ঘরে বসত যাদের
মা হারা শূন্য মন কাঁদে যাদের।”

 

 

বইয়ের ফ্ল্যাপে কবি লিখেছেন,
“একসময় সবাই চলে যাবে, চলে যাবে সময়। কিছু চলে যাওয়া বহু কষ্টে মেনে নিতে পারলেও হারানোর বেদনা একমুহুর্তের জন্যও ম্লান হয় না। সারাজীবন এই ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়। হারানোর মিছিলে যোগ হয় অসংখ্য পরিচিত মুখ। তবুও জীবন সামনে এগিয়ে চলে।
মা হারানোর অশেষ শূন্যতার ভেতর দিয়ে প্রবহমান জীবনের প্রতিচ্ছবি ‘নিঃসঙ্গ জংশনে মা’।”

কবির এই ভাব যথার্থই প্রকাশ করতে পেরেছেন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থে। মা’কে আমরা যেভাবে চিনি ঠিক সেভাবেই এই বইতে খুঁজে পাবেন তবে একটু কাব্যিক ভাষায়। কয়েকটা কবিতার পঙক্তি উল্লেখ করলাম।
প্রথম কবিতা “আমার মা”র প্রথম স্তবক-
“আমার মা একটা নদীর মতো,
দু’ধার ফুলে ফলে ভরিয়ে দেন ভালোবাসায়,
উর্বর করে, ফসলে রাঙিয়ে দেন পতিত জমি!
ফুল ফসলের আশির্বাদের ছোঁয়ায় আমার মা টিকে আছেন,
এই ধরায়।”

মা যে আছেন আজও জগতের আলো হয়ে মাটির সাথে মিশে আছেন। ভালােবেসে সন্তানের জন্য উর্বর করেছেন জমিন, ফুল-ফসলের বন্যায় যে আজও সন্তানদের আশির্বাদ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত, তাই হয়ত কবি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর কলমের ডগায়।

মা যেন আমাদের প্রথম শিক্ষক তাই তো কবিকে মা বলেছেন-
“জীবনটাকে উপভোগ করো বাপ,
জীবন তো ফুলের মতাে, নয় তো অভিশাপ।”

কবি লিখেছেন-
মা বলতেন, মানুষকে ভালোবাসলে নাকি বড়াে হওয়া যায়,
তাই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মানুষ ভালোবাসি,
নতুন কারও প্রেমে পড়ি রোজ,
প্রতিদিন এক ইঞ্চি করে বেড়ে উঠি।
এক ভোরে জেগে দেখি,
মাথা ছুঁয়েছে সিলিং,
পা ছুঁয়েছে জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব জলরাশি!

মা ছাড়া কি আমাদের জীবন আলোয় ভরে থাকতে পারে? অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়; তবুও তো জীবনে এগিয়ে যেতে হয় হাসি মুখেই, শত কষ্ট বুকে চেপে। কবির ভাষায়-
“মা ছাড়া অন্ধ জীবন,
বন্ধ সব অলিগলি, রাজপথ
দেখেও দেখে না পথভোলা পথিক জীবন।
অদ্যকার সমাবেশে, সে জীবনের কাণ্ডারী
হাসিখুশি মুখ করে সুখে থাকার ভান করি।”

কী অসাধারণ উপস্থাপনা কবির! মা’কে আমরা হৃদমাঝারে বন্দি করে রাখি। হঠাৎ খাঁচা শূন্য হলে মন যে খাঁ খাঁ করে ওঠে মায়ের অভাবে। কবির অসংখ্য পঙক্তি পাঠককে এক নিমেষেই মা’র কোলে পৌঁছে দেবে।

 

 

মা হারানোর বেদনা কি অন্য কোনাে বেদনার সাথে তুলনা করা চলে; নিশ্চয় না। কবিও একজন মাহারা সন্তান। তাই এই বইয়ের প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে যেন তিনি ঢেলে দিয়েছেন মা’র প্রতি পরম ভালােবাসা। মা’র সান্নিধ্য বঞ্চিত হওয়ার আর্তি যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল কবিতার পরতে পরতে। এই কবিতা পাঠে যে অজান্তেই চোখে বরষার ধারা প্রবাহিত হয়েছে সেটা সত্যিই অমূল্য। কী না ছিল এই কবিতায়, মা’র মমতা, মা’র হাসি, মায়ের জন্য কান্না, মায়ের চাঁদের মতাে মুখখানার বর্ণনা, মায়ের যুদ্ধ, মা’র নক্ষত্র হয়ে ওঠা আরও কত কী! আমি বিস্মিত আমি অভিভূত!

অনেকেই টাকা খরচ করে কবিতার বই কিনতে চান না। অনেকেই কিনলেও বইয়ের শেল্ফে ফেলে রাখে চরম অবহেলায়। এই বইটা কিনে আমি একটি দুইটি করে কখন যে পুরো বইটাই শেষ করেছি নিজেই বুঝতে পারিনি। কবিতা পড়ার ক্ষেত্রে কবির ভাব বোঝা অত্যন্ত জরুরি, আর মা’কে নিয়ে লেখা কবিতার ভাব অতি সহজে যে কেউ আয়ত্ত করতে পারবে। ভালাে লেগেছে, ভীষণ ভালাে লেগেছে।
বইটি পড়লে পাঠক মনের অজান্তে কান্না করবেন; এটি ভালাে না খারাপ বলতে পারব না।

সাহিত্যের লালনভুমি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় ১৯৮২ সালে লেখকের জন্ম। কবিতার মতো এক সুন্দর পৃথিবী গড়ার নেশাগ্রস্ত যাযাবর এই কবি। ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত থাকলেও সাহিত্য সৃষ্টিতে কখনােই কার্পণ্য করেননি। এই পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বই : বিমূর্ত শিলালিপি (কবিতা), যেখানে মেঘ কখনো বৃষ্টি হয়ে ঝরে না (গল্প), অসম ক্ষতের বিলাপ (গল্প), সায়াহ্নের ডাক (পত্রোপন্যাস), আমি কিন্তু আমি নই (কবিতা)।


প্রিয় লেখক-পাঠক-প্রকাশক

আপনার ভালোলাগা যে কোনো বইয়ের রিভিউ পাঠাতে পারেন আমাদের। বইয়ের একটি ভালো ছবিসহ আপনার লেখা ইমেইল করুন এই ঠিকানায় : desherboi@gmail.com

Facebook Comments