তারুণ্যের গল্প

ভাঙন

সোমবার, ১১ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:২০ অপরাহ্ণ | 193 বার

ভাঙন

তখন চৈত্রের রোদ, নিষ্ঠুর রোদ মাথায় নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। এমন সময় পিছন থেকে একজন মেয়ে ডাক দিয়ে বলছে- এভাবে রোদে না পুড়ে একটা ছাতা নিলেই তো পারেন। আমি থমকে দাঁড়ালে মেয়েটি আমার দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এলো। মেয়েটার চোখে-মুখে ভিষণ মায়া। এক পৃথিবী মায়া নিয়ে আমাকে তার হাতের ছাতাটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল- নিন ধরুন। দারুণ রোদ পড়েছে।

মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম- আমার ছাতা লাগবে না।
লাগবে না কেন? অবশ্যই লাগবে। আর আমি তো সারাজীবনের জন্য আমার এই অতি সুন্দর ছাতাটা আপনাকে দিচ্ছি না। এটা আমার বাসা, আজকের মতো ছাতাটা আর কোনো কাজে লাগবে না আমার। আপনি ছাতাটা নিয়ে যান, কাল না হয় ফিরিয়ে দিবেন।
আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটি হাত বাড়িয়ে বলল, আমি প্রিয়তা, পারমিতা ম্যাডামের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনি মেঘ। এভাবেই আমাদের প্রথম পরিচয়। পরিচয়সূত্রে বন্ধুত্ব শুরু।

ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ পারমিতা ম্যাডম পিছন থেকে ডাক দিলেন-
মেঘ..
জ্বী ম্যাম।
কোথায় যাচ্ছো?
ম্যাম একটু লাইব্রেরিতে যাচ্ছি।
ওহ আচ্ছা।
কেনো ম্যাম, কিছু বলবেন?
না মানে, প্রিয়তাকে দেখেছ? ওর একটা নোটস আমার কাছে। কিন্তু ওকে তো কোথাও দেখছি না।
ম্যাম প্রিয়তা আজ ভার্সিটি আসেনি।
ওহ… হো, তাহলে তো সমস্যা হয়ে গেল।
কেনো ম্যাম?
না মানে, আমি কাল এক জরুরী কাজে সিলেট যাব, ফিরব দুদিন পর। এই নোট টা…
আচ্ছা ম্যাম, আমাকে দিন আমি প্রিয়তাকে দিয়ে দিব।
আমি জানতাম মেঘ, তোমাকে দিলেই হবে, তাই প্রিয়তাকে খুঁজে না পেয়ে তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম। থ্যাঙ্কস মেঘ।
ঠিক আছে ম্যাম। আমি দিয়ে দিব।

আমি লাইব্রেরি থেকে মাসুদ স্যারের আর্টিকেলটা নিয়ে বাসায় ফেরার জন্য বাসে উঠলাম। একটু এগুতেই বিরাট জটলা, রাস্তার দুপাশ বন্ধ করে রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে। তাই না বসে বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম।

প্রিয়তা, এখন কটা বাজে?
বলো, ডাকছিলে কেন?
এখন কটা বাজে?
এগারোটা বাজে প্রায়। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, টেবিলে খাবার রাখা আছে, খেয়ে নিও। আমি ভার্সিটি গেলাম…
প্রিয়তা চলে যাবার পর প্রিয়তার বর অর্ক ঘড়িটার দিকে তাঁকিয়ে কি যেন ভাবছিল আর এদিক-সেদিক দেখছিল। আজকাল তার সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। কিছুই মনে রাখতে পারছে না, পথ ভুলে যাচ্ছে। তবে কি ডক্টর যা বলেছিল, তাই হতে যাচ্ছে!
সে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। নিজেকে তার একটা অসমাপ্ত ছবির মতো মনে হলো। যে পোট্রেট কেউ আঁকবে বলে একদিন রঙ মাখিয়েছিল সাদা পাতায়, কিন্তু আঁকা হয়নি আর…।

আমার ফোন বাজছে।
হ্যালো… মেঘ?
হ্যাঁ, প্রিয়তা বল।
কোথায় তুমি?
দোকানে চা খাচ্ছি। কেনো?
না মানে, একটু বাসায় আসবে প্লিজ?
কোনো সমস্যা?
না, সমস্যা না। এসো না প্লিজ।
আচ্ছা, আসছি…
দ্রুত চা শেষ করে একটা রিক্সায় উঠলাম আমি। রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন-
মামা কোথায় যাবেন?
উত্তরা, সেক্টর ৬। মামা দ্রুত যান।
আইচ্ছা মামা।
ঠিক পনের মিনিটের মাথায় প্রিয়তার বাসায় পৌঁছলাম। উৎকন্ঠায় নিয়ে দরজা খুলে দিল প্রিয়তা। প্রিয়তার চোখে-মুখে তখন জ্বলজ্বল করছিল ভাঙনের ছাপ।
প্রিয়তা এক গ্লাস পানি এনে দিয়ে বলল, নাও তোমাকে তৃষ্ণার্ত মনে হচ্ছে।
আমি পানির গ্লাস শেষ করতে না করতেই প্রিয়তা বলল, এদিকে এসো।
আমি প্রিয়তার পিছন পিছন গেলাম।
তালাবন্ধ একটি ঘর, সফেদ সাদা দেয়াল, দেয়ালে চিত্রকর্ম নদী আর নারীর।
আমরা দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলাম, বিছানার একপাশে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে প্রিয়তার স্বামী অর্ক।
তিনি আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন- কে তুমি?
ভাইয়া আমি মেঘ, প্রিয়তার বন্ধু।
মেঘ, কে মেঘ? এখানে কি চাও? বেড়িয়ে যাও বলছি।
আমার খুব রাগ হচ্ছিলো। প্রিয়তা ভেজা স্বরে বলল- ওর ডিমেনশিয়া।
তুমি ও ঘরে যাও, আমি আসছি। এ কথা শুনে আমার ঘনঘন শ্বাস পড়ছিল, চোখের কোণায় জল নেমে এসেছিল তাৎক্ষণাত।
ব্যথিত হৃদয়ে দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি ধীরে-ধীরে চাঁদটা ডুবে যাচ্ছে, পৃথিবীতে নামছে অন্ধকার ।

প্রিয়তা এসে জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়ালো, সেখানে একটি নীল অপরাজিতা ও একটি মৃত ক্যাকটাস। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর প্রিয়তা বলল, মেঘ, আমাদের বাসা ছিল সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়ার তিস্তা নদীর পাড়ে। নদী বিধৌত কাপাসিয়ায় দুঃখ দারিদ্রতার মধ্য দিয়েই বড় হয়েছি আমরা। শৈশবে তিস্তা নদীতে কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে সারাদিন আমরা ভেসে বেড়াতাম এপাড়-ওপাড়। ছেলে -বুড়োরা নদীতে জাল ফেলে বড় বড় মাছ ধরত। আমরাও ধরতাম। মা সেই মাছ রান্না করে দিত আমাদের, আহ্ কি স্বাদ। প্রতিদিন ভোরে নদীর জলে সূর্যোদয় দেখতাম আর সূর্যের মতো দীপ্ত স্বপ্ন আঁকতাম। আমাদের গ্রামে তখন স্কুল ছিল না। নদী পেরিয়ে আরো কিলো দুই দূরে একটি স্কুল- আমিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্ষায় কাদামাটি জল, আর চৈত্রের রোদে তপ্ত বালুতে হাঁটতে পা পুড়ে যেত আমাদের। বিদ্যুৎও ছিল না গ্রামে। হারিকেনের আলোয় এখানেই মা-বাবা আর ভাইবোনের সংসার সুখেই কাটছিল।

২০১৪ সাল, দেশজুড়ে ভয়াবহ বন্যা। সুন্দরগঞ্জের বুক দিয়ে বয়ে চলা চারটি নদীর পানিই তখন বিপদসীমার উপরে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গিয়ে পুরো সুন্দরগঞ্জ তখন পানিবন্দি। ঘরে এক কোমড় পানি, বাবা আমাদের দুই ভাইবোনকে একটা মাচানের উপর তুলে দিয়ে বেধে রেখেছিলেন, যাতে আমরা পানিতে পড়ে না যাই। এক সপ্তাহ আমরা এক বেলা মুড়ি আর চিড়া খেয়ে দিন কাটিয়েছি। আট দিন পর পানি নেমে গেল, মনে হলো প্রাণে বাঁচলাম; কিন্তু না, শুরু হলো নদী ভাঙণ। ভাটিতে যখন পানির টান পড়লো, উজানে তখন ভাঙণের সুর।

এক রাতে আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভাঙলো। বাবা আমাকে আর আমার ভাইকে পাশের ফটিক দাদুর বাসায় রেখে বলে এলেন, সকালে এসে নিয়ে যাবেন। সকাল হলেও বাবা আর আসেন নি।
ফটিক দাদু আমাদেরকে আমাদের বাসায় নিয়ে গেলেন। কিন্তু আমাদের বাড়ির আর কোনো চিহ্নই তখন অবশেষ ছিল না। তীব্র ভাঙণে সেখানে তখন খরস্রোতা তিস্তার নির্লজ্জ বয়ে চলা। ভঙনের মুখে দাঁড়িয়ে তখন আরো অনেক পরিবার। বেলা বাড়ার সাথে সাথে চিহ্নহীন হয়ে গেল পূজা দিদির ঘর। পূজা দিদিকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। প্রত্যেকদিন অপেক্ষায় থাকতাম বাবা আমাদের নিতে আসবেন, বাবা আসেন নি। আশাহত হয়ে হৃদয় ভেজাতাম চোখের জলে।

অর্ক ফটিক দাদুর বন্ধুর ছেলে। ঢাকায় সেটেল, ভালো জব করে, অনেক টাকা বেতন। মহা ধুমধামে আমাদের বিয়ে হলো…
কথাগুলো বলার সময় প্রিয়তার চোখে জল চিকচিক করছিল। আমি প্রিয়তার সামনে দাঁড়ালাম। প্রিয়তা আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল। আমি জানতাম সর্বহারা মানুষকে সান্তনা দেয়া যায় না, চোখের জলই তাদের বাঁচিয়ে রাখে, সান্তনা দেয়।

প্রিয়তার বর অর্ক দারুণ ছবি আঁকে। আজ তার ছবির এক্সিবিউশনের জন্য চিঠি এসেছে। যে মানুষটা স্বপ্ন দেখতো তার আঁকা ছবি একদিন বিশ্বের দরবারে সর্বাধিক পরিচিতি পাবে, ইতিহাসে জায়গা করে নেবে, আজ সে থেকেও আমাদের মাঝে নেই! গত রাত থেকে অর্ককে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আর প্রিয়তা সব জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। আশেপাশের সবগুলো হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছি, সড়ক এক্সিডেন্টের প্রত্যেকটি ডেডবডি প্রত্যক্ষ করেছি, তাকে পাই নি। ফেরার পথে থানায় একটা সাধারণ ডায়েরি করে এসেছি।

দুদিন পর প্রদর্শনী শুরু হবে। অনেক ক্লান্তি নিয়ে প্রিয়তা ঘুমিয়ে পড়লে আমিও বাসায় ফিরে এলাম। এক্সিবিউশনের আগের দিন সন্ধ্যায় আমরা দু’জনে অর্ক ভাইয়ার ছবি আঁকার ঘরে প্রবেশ করলাম। ছবিগুলো সব এলোমেলো মাটিতে পড়েছিল। আমরা ছবিগুলো একটি ব্যাগে ভরিয়ে প্রদর্শনীর জন্য জমা দিয়ে থানায় খোঁজ নিতে গেলাম এবং যথারিতি আশাহত হয়ে বাড়ি ফিরলাম। তুমুল অস্থিরতায় রাত কেটে গেল।

খুব ভোরে রিক্সা নিয়ে আমরা প্রথমে সূর্যোদয় দেখতে গেলাম শহর থেকে কিছুটা দূরে, পরে প্রদর্শনী দেখতে গেলাম। তখন দু’একজন করে ছবিগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিল। আমাদের দু’জনকে একটি রুমে বসিয়ে চা দেয়া হয়েছে, পাশে আরো একজন সাদা চুলের মানুষ শব্দ করে চা’য়ে চুমুক দিচ্ছিলো। এমন সময় শুনতে পেলাম, কে যেন বলছে- একটা ছবির দাম উঠেছে দশ লাখ টাকা। আমরা দ্রুত চা শেষ করে সেখানে পৌঁছলাম, সেখানে অনেক মানুষের জটলা। আমরা জটলা ঠেলে ছবিটির দিকে তাকালাম।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভাঙণের মুখে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে দুই হাত উচিয়ে নিজেকে বিসর্জন দিচ্ছে। ক্ষয়ে যাওয়া মাটির সাথে মেয়েটিও ধীরে-ধীরে পতিত হচ্ছে নদীর বুকে। আমার গা শিউরে উঠলো, আমি প্রিয়তার হাত চেপে ধরলাম। মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, এ বারের সেরা ছবি ‘ভাঙণ’ শিল্পী জনাব অর্ক।


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments Box