বিদায় ছড়াবন্ধু আলম তালুকদার

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | ২:০৪ অপরাহ্ণ | 172 বার

বিদায় ছড়াবন্ধু আলম তালুকদার

॥ লুৎফর রহমান রিটন ॥

আমি কখনোই তাঁকে মন খারাপ করে থাকতে দেখিনি। সারাক্ষণ হাসতে পারতেন মানুষটা। তাঁর কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো তাঁর হাসিমুখটা। তিনি আলম তালুকদার। কিছুকাল আগে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব। আমার ছড়াবন্ধু। মুখে মুখে ছড়া বানাতেন। কয়েক ঘণ্টা আগে চলে গেলেন তিনি। করোনা তাঁকে কেড়ে নিয়েছে।
নিয়মিতই কথা হতো তাঁর সঙ্গে, টেলিফোনে। আমার কল পেলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন আলম ভাই। আমি তাঁকে সম্বোধন করতাম ছড়ার তালুকদার বলে। তিনি বলতেন ছড়াসম্রাট। আমি হাসতাম, ধুর্মিয়া! তিনি বলতেন–ভাই, আমি একজন আমলা। আমার কলিগ কিংবা উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাদের, ইউএনও, ডিসি কিংবা সচিবদের যখনই আমার লেখা ছড়ার বই প্রেজেন্ট করতে গেছি খুশি হয়ে তাঁরা অধিকাংশই বলেছেন আপনার কথা। বলেছেন, লুৎফর রহমান রিটনের ছড়া পড়েছেন?

 

আমি হাসতে হাসতে বলেছি, আমার বন্ধু স্যার। তাঁদের কারো সঙ্গেই আপনার এমনকি ব্যক্তিগত পরিচয়ও নেই। আমি আপনাকে নিয়ে খুবই প্রাউড ফিল করি।
একবার কানাডায় আমাকে ফোন করলেন মধ্যরাতে, ভাই, আমি এখন টাঙ্গাইলে একটা অনুষ্ঠানে। বাচ্চাদের অনুষ্ঠান। আমি প্রধান অতিথি। কিন্তু বাচ্চারা তো খালি আপনের ছড়া পড়তাছে হেহ হেহ হেহ। কই যাই!
আলম তালুকদার ছিলেন ছড়াঅন্তপ্রাণ। আমার যে কোনো সাফল্যে আনন্দিত হতেন। বলতেন, আপনার সাফল্য মানে তো আমাদেরও সাফল্য। আমরা অনেক জায়গায় পৌঁছাতে পারি না। কিন্তু আপনি পারেন। আপ্নারে দেখলে শান্তি লাগে। মনে হয় অন্তত একজন আছে আমাদের ছড়ার জগতে, শিশুসাহিত্যের জগতে যাঁর ব্যক্তিত্ব আছে, গ্রহণযোগ্যতা আছে সর্বত্র। আপনে আমাদের এম্বাসেডার।
আমি তাঁর এরকম ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি বরাবরই। খালি আফসোস করতেন, আপনে দেশে নাই। আপ্নের দেশে থাকাটা খুব জরুরি ছিল।
বাংলাদেশে টেলিফোনে আমার সবচে বেশি কথা হতো আলম তালুকদারের সঙ্গে।
তিনি কখনোই কারো বিরুদ্ধে আড়ালে কিছু বলতেন না। কারো পেছনে লাগতেন না। জীবনে একবার শুধু একবার দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষ একজন সম্পর্কে আমাকে বলেছেন কিছু গভীর গোপন কথা। বলেছেন ওরা আপনার ইমেজ ধ্বংস করতে চায়। ওরা আপনার বন্ধুবেশি শত্রু। আপনার প্রতি চরম ঈর্ষাকাতর। পদবী আর টাকার শক্তির জোরে ওরা আপনের ক্ষতি করতে চায়। আপ্নের প্রতিভাই আপ্নের শত্রু ভাই। কিন্তু আপনে দমবেন না। চালাইয়া যান। আপ্নের সঙ্গে পাঠক আছে। ওদের সেটা নাই। ওরা নিজের বই নিজেরা কিনে। আপ্নেরটা কিনে পাঠকেরা। দিনশেষে ওরা পরাজিত হবেই।
প্রিয় আলম ভাই, প্রিয় ছড়াবন্ধু, আপনার মতো একজন বন্ধুকে হারিয়ে আমি ভীষণ একাকিত্ব অনুভব করছি। আপনি আমার সত্যিকারের শুভাকাঙ্খী ছিলেন। আপনার মতো একজন দেশপ্রেমিক মুজিবপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু থাকাটাও গৌরবের। ভাগ্যের। আমার প্রতি আপনার শর্তহীন ভালোবাসার কথা কোনোদিন ভুলবো না।
কানাডা সময় সকাল আটটায় ঘুম ভাঙতেই মোবাইল অন করে দেখি স্ক্রিনে কার যেন একটা পোস্ট ভেসে উঠলো আপনার ছবিসহ, আলম তালুকদার আর নেই।
আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ফোন এলো মাযহারের, শুনছো নাকি আলম তালুকদার মারা গেছে। খানিক পরেই চট্টগ্রাম থেকে উৎপলকান্তি বড়ুয়ার কল। আপনার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেললো উৎপল। আপনি নাকি খুব ভালো মানুষ ছিলেন আলম ভাই।
ঝাপসা চোখে ল্যাপটপ অন করে আপনার সঙ্গে স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে একটা ছবিতে এসে থেমে গেলাম। স্ক্রিনজুড়ে এনলার্জ করে এখন আমি আপনার সঙ্গে আমার ছবিটা দেখছি।
এই ছবিটা তেইশ বছর আগের, ১৯৯৭ সালের। শাহবাগ আজিজ মার্কেটের তিনতলায় আমার ছোটদের কাগজের অফিস। এক প্রশান্ত বিকেলে সেখান থেকে নিচে নামতেই পান খাওয়া লাল মুখে হাত বাড়িয়ে দিলেন আপনি, আরে কই যান? আমি তো আইলাম আপ্নের কাছে!
আমি বললাম, একটা জরুরি কাজ আছে বাসায়। এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় যেতে হবে। আপনি আমাকে রিকশা নিতে দিলেন না। বললেন, চলেন ছড়াকার আপ্নেরে বাটা সিগনাল পর্যন্ত আগাইয়া দিয়া আসি হাঁটতে হাঁটতে। সেদিনও আপনি খুবই উচ্ছ্বল ছিলেন কিন্তু সেটা বরাবরের চাইতে খানিকটা বেশিই ছিল।
বাটা সিগনাল মোড়ে আমি বাঁয়ে টার্ণ নেবো। কিন্তু তার আগেই আপনি বললেন, আসেন ছড়াকার আপ্নের সাথে একটা ছবি তুলি। আমরা তখন ফুজি কালার স্টুডিওর সামনে। আমার কিছুটা তাড়া থাকলেও আপনার ভালোবাসার কাছে তাড়াটা পরাজিত হলো। আপনার সঙ্গে ফুজিকালার স্টুডিয়োতে পাশাপাশি বসে মফস্বল মার্কা বেকায়দা একটা পোজে একটা ছবি তুললাম। যদিও আমি বলেছিলাম, আমার কোনো আলোকচিত্রী বন্ধুকে দিয়ে তুলতে পারতাম আলম ভাই। আপনি বলেছিলেন, কেন জানি আমার আজকেই তুলতে মন চাইলো। ছড়াকার আপ্নের সঙ্গে আমার একটা ঘনিষ্ঠ ছবি থাকা দরকার। আজকেই তুইলা রাখলাম। একদিন কাজে দিবো।
দু’দিন পরে আমার অফিসে এসে মহা উৎফুল্ল আপনি সেই ছবির একটা কপি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, দেখেন দেখেন কী সুন্দর একটা ছবি। রাইখ্যা দেন। একদিন কাজে দিবো।
প্রিয় আলম ভাই, আপনার সঙ্গে আমার সেই ছবিটা যে তেইশ বছর পরে এভাবে ‘কাজে দিবো’ সেটা কি ঘূণাক্ষরেও ভেবেছিলাম! আমার অশ্রুসজল চোখ আপনাকে বিদায় জানাতে গিয়ে অদম্য আকুলতায় আরও বেশি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
ভালো থাকবেন ছড়াবন্ধু…

[লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে। অটোয়া, ০৮ জুলাই ২০২০]

 

প্রিয় লেখক-পাঠক-প্রকাশক


লেখক, লেখালেখি, বই-প্রকাশনা জগতের যেকোনো লেখা ইমেইল করুন এই ঠিকানায় : desherboi@gmail.com

Facebook Comments