বুক রিভিউ

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান-এর গ্রন্থ ‘অবর্ণনীয় নির্মমতার চিত্র একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য’

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২০ | ২:২৬ পূর্বাহ্ণ | 132 বার

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান-এর গ্রন্থ ‘অবর্ণনীয় নির্মমতার চিত্র একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য’

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান-এর গ্রন্থ ‘অবর্ণনীয় নির্মমতার চিত্র একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য’ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়দৃপ্ত উচ্চারণমালা
লিখেছেন স্বপন পাল

 

 

‘চিন্তা করলাম, যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছন সেই চেতনার উপর আমার নিজ ভাবনা প্রকাশ করব’ -লেখক ওবায়দুল হাসান তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায় এভাবেই বলেছেন। জনাব ওবায়দুল হাসান পেশাগতভাবে বিচার বিভাগের মানুষ। সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে। সেদিকটাতে আমি খুব একটা যাব না। যেহেতু তাঁর গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা, সেই সূত্রে যতটুকু এসে যায় সেটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চেষ্টা করবো। শুরুতে তাঁর যে কথাগুলো উল্লেখ করেছি, কথাগুলো গত ফেব্রুয়ারিতে (২০২০) প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অবর্ণনীয় নির্মমতার চিত্র একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য’ এর ভূমিকাতে লিখেছেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। বইয়ের ভূমিকাটি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলেই একটা ধারণা মোটামুটি দাঁড়িয়ে যায় পুরো বইয়ের মধ্য দিয়ে কী বলতে চেয়েছেন লেখক। যদিও তিনি ভূমিকাতে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলা বা ইংরেজি কোনো ভাষাতেই আমার তেমন কোনাে দখল নেই’। কিন্তু গ্রন্থটি পাঠে একবারও আমার তেমনটি মনে হয়নি বরং পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে প্রায় ৩৫ বছর ধরে আইনের মতো জটিল শাস্ত্রের চর্চা যিনি করেন, তাঁর লেখা এত প্রাঞ্জল হয় কী করে! লেখককে ব্যক্তিগতভাবে যতটা জানি, ভূমিকাতে যা বলেছেন, সেটিকে তাঁর বিনয়-ভাষণের অংশ বলেই ধরে নিতে পারি।

 

প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে যায় রবি ঠাকুরের কয়েকটি কথা। তিনি বলেন, ‘মানুষ অন্য বস্ত্র সংগ্রহ করেছে, মানুষ বাসা বাঁধছে, তার সঙ্গে-সঙ্গেই কেবলমাত্র সত্তার গভীর টানে আত্মা দিয়ে দেখার দ্বারা বিশ্বকে আপন করে চলছে। তাকে জানার দ্বারা নয়, ব্যবহারের দ্বারা নয়, সম্পূর্ণ করে দেখার দ্বারা; ভোগের দ্বারা নয়, যোগের দ্বারা’।
শুরুতেই লেখকের যে বক্তব্য উল্লেখ করেছি, এর মধ্যে দিয়ে এটি বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধকে তিনি আপন করে নিয়েছেন ‘সম্পূর্ণ করে দেখার দ্বারা’, আপন সত্তায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেছেন ‘যোগের দ্বারা’। গ্রন্থটির পরতে পরতে এর ছাপ তিনি রেখেছেন। পনেরটি প্রবন্ধ আছে বইটিতে। প্রথম এবং মূল প্রবন্ধটি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের উপর লিখাটি সাক্ষ্যভিত্তিক। এটি বুদ্ধিজীবীদের সন্তান ও নিকটাত্মীয়দের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে লেখা।’ হ্যাঁ অনেকটাই তাই। কিন্তু প্রতিটি সাক্ষ্য কিংবা জবানবন্দির পর লেখক যে মন্তব্য জুড়ে দিয়েছেন, তা যেমন আমাদের ভাবনা-চিন্তায় একটা আলোড়ন তৈরি করে, তেমনি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপটি পরিষ্কার হয়ে যায়। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমরা পত্র-পত্রিকায় নানা সময়ে পড়েছি এবং ইতোমধ্যে এ সম্পর্কে একটা ধারণা আমাদের গড়ে উঠেছে। কিন্তু লেখক তাঁর বর্ণন-শৈলীর দ্বারা এ গ্রন্থটির মাধ্যমে পাঠকের মননে একটা অনুরণন তৈরি করেছেন, যেটার মধ্যে দিয়ে লেখকের নৈপুণ্যতার পাশাপাশি তাঁর আন্তরিকতার বিষয়টিও ফুটে উঠেছে।

এই নিবন্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন, সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুল হক, সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা, সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন, সাংবাদিক সেলিনা পারভিন, অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন, ডাক্তার সিরাজুল হক খান, ডাক্তার মর্তুজা, ডক্টর আবুল খায়ের, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, সাংবাদিক-সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সার, ড. ফজলে রাব্বী, ড. আলীম চৌধুরীর অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের নির্মম চিত্র উঠে এসেছে সাক্ষীর বয়ানে। পড়তে পড়তে পাঠক উপলব্ধি করতে পারবেন স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করতে কতটা দাম দিতে হয়েছে আমাদের! পড়ছি আর মনে হয়েছে আব্দুল লতিফের সেই গান ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা কারোর দানে পাওয়া নয়’। এসবের পাশাপাশি যে সাক্ষ্যটি পড়তে গিয়ে প্রতিটি পাঠক শিহরিত হবেন, সেটি হলো বধ্যভূমি থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসা দেলোয়ার হোসেনের সাক্ষ্য।

এ কথা আমরা জানি, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানের নীলনকশা অনুযায়ী তাদের এদেশীয় দোসর আলবদররা ঘটিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের যারা নেতৃত্ব দিয়েছে- আশরাফুজ্জামান খান ওরফে নায়েব আলী খান এবং চৌধুরী মঈনুদ্দীন-এরা দুজনেই তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। ছাত্র হয়েও শিক্ষক হত্যায় নেতৃত্ব দিতে এতটুকুও বুক কাঁপেনি তাদের।
সাক্ষীদের সাক্ষ্যকে লেখক ‘তাদের বুকে বয়ে বেড়ানো নিরন্তর কান্না’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কান্না বলেই থেমে যাননি, শহিদদের সন্তানেরা যে সমাজে শিক্ষা-দীক্ষায়-চেতনায় মাথা উঁচু করে পথ হাঁটছেন সেটাও উল্লেখ করেছেন গর্বের সাথে। তিনি বলেছেন, ‘তাদের কান্না থেকে এটিও বেরিয়ে এসেছে কীভাবে এই শহিদ পরিবারগুলো এমনকি ছোট ছোট সন্তান বুকে নিয়ে সামনের পথে হেঁটেছেন। কীভাবে তারা বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেছেন এবং বর্তমানে তারা কেমন আছেন’ এটি আমাদের জানতে হবে আর লেখক সেটিই আমাদেরকে জানিয়েছেন তাঁর প্রথম নিবন্ধটির মধ্য দিয়ে।
সাংবাদিক সেলিনা পারভিন হত্যাকাণ্ডকে ট্রাইবুনাল আখ্যা দিয়েছে মাতৃকুলের উপর নির্মম আগাত অর্থাৎ মাতৃহত্যা (ম্যাট্রিসাইড) হিসেবে।
গ্রন্থের দ্বিতীয় নিবন্ধের শিরোনাম ‘ফিরে দেখা ইতিহাস : তেলিয়াপাড়া চা বাগান ম্যানেজার’স বাংলো’। এর মধ্যে দিয়ে লেখক তুলে এনেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অন্যতম দু’টি অধ্যায়, যা সময়ের প্রবাহে অনেকটাই দৃষ্টির অন্তরালে চলে গিয়েছে। এর একটি হল দেশের উত্তর-পূর্ব জোনের তদানীন্তন ১১টি থানার সম্পূর্ণ বা মুক্তাঞ্চল নিয়ে গঠিত ‘জোনাল কাউন্সিল ফর সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’,-যার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন লেখকের পিতা ডাক্তার আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। কিন্তু ইতিহাসে এটি অনুল্লেখিত রয়ে গিয়েছে। অন্যটি নিবন্ধের শিরোনামেই অনেকটা বোঝা যায়। বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দের প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল। ইতিহাসের এ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিশদ বর্ণনা করেছেন লেখক, পাশাপাশি আকাঙ্ক্ষা করেছেন, এ ঘটনা দু’টি ইতিহাসের আলোতে আসবে এবং তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার’স বাংলোটি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষিত হবে।

 

এরপরের নিবন্ধের মাধ্যমে লেখক পাঠককে নিয়ে গিয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভূমিতে। সেখানে ভ্রমণের প্রসঙ্গ টেনে কবির জন্মভূমির অবহেলিত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ব্যথিত হয়েছেন, আক্ষেপ করেছেন। কবির উদ্দেশ্যে মনের ভেতর থেকে উচ্চারণ করেছেন, ‘আপনার স্মৃতি মুছে যায়নি মুছে যেতে পারে না। বাংলাদেশ ও বাঙালিরা তা ধারণ করে রেখেছে পরম মমতায়।’ স্মরণ করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে কবিকে নিয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা কবির ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী রেজাউল করিমের একটি পত্র বহন করে এনেছেন এবং তা তাঁর অনুজ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব জনাব সাজ্জাদুল হাসান-এর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। যে চিঠিতে কবির জন্মভিটা উন্নয়নের জন্যে আবেদন ছিল। এমন আবেদনে সাড়া দেওয়াই প্রয়োজন। যে কবি প্রথম তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন ‘জয় বাংলা’, যা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকে অদ্যাবধি আমাদের জেগে ওঠার মন্ত্র। যিনি উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বাংলা বাঙালির হোক, বাংলার জয় হোক, বাঙালির জয় হোক।’
‘প্রতিরোধ যোদ্ধা’ হিসেবেই বেশি পরিচিত ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদী যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রসঙ্গে’ও লিখেছেন ওবায়দুল হাসান। একজন আইনজ্ঞ হিসেবে তিনি যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন প্রতিরোধযোদ্ধারা কেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে পারেন। গত কয়েক বছরে এই বিষয়টি নানা প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে এবং নেত্রকোনায় শহীদ প্রতিরোধ যোদ্ধা ঝান্টু রায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশিত স্মারক সংকলন ‘প্রবর’-এ স্মৃতিকথায় আমি নিজেও এ বিষয়ে লিখেছি। আমার লেখার মধ্যে আইনগত ব্যাখ্যার চেয়ে চেতনাগত আকাঙ্ক্ষাই বেশি উঠে এসেছে। কিন্তু ওবায়দুল হাসানের লেখায় আবেগ, আইন ও চেতনার সমন্বয়ে দাবিটির যৌক্তিকতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। কেন এটি প্রয়োজন এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘এই স্বীকৃতি জাতিকে এবং সব প্রজন্মকে জানতে সাহায্য করবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর কার কী ভূমিকা ছিল। কে বা কারা কীভাবে প্রতিরোধে উদ্যোগী হয়েছিলেন।… সত্য প্রতিষ্ঠায় এই স্বীকৃতি ভূমিকা রাখবে।’ হ্যাঁ, এই সত্যকে সামনে আনা খুব প্রয়োজন। কারণ ১৫ আগস্ট এর মধ্য দিয়ে পুরো দেশকে পিছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নির্মিত-প্রতিষ্ঠিত সংবিধানকে করা হয়েছিল তছনছ। লেখক তাঁর এই নিবন্ধের মাধ্যমে জাতির এক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় দিকটিই পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

সত্তরের নির্বাচনী প্রচারে বঙ্গবন্ধু মোহনগঞ্জে এসেছিলেন। লেখকের পিতা মোহনগঞ্জ-বারহাট্টা আসনে প্রাদেশিক পরিষদের প্রার্থী ছিলেন। শিশু ওবায়দুল হাসান মোহনগঞ্জে লোহিয়ার মাঠে (বর্তমান শহীদ আলী ওসমান পার্ক) বঙ্গবন্ধুকে দেখেছিলেন। শুনেছিলেন তাঁর অমিয় বাণী। আরও একবার দেখেছিলেন নাখালপাড়াস্থ পুরাতন সংসদ ভবনে-স্বাধীন বাংলাদেশে। এটি নিয়েই লিখেছেন ‘এক কিশোরের দেখা বঙ্গবন্ধু’।
‘বাংলা নববর্ষ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও হাজী মহসিন’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনটি প্রসঙ্গকে একসূত্রে গেঁথেছেন নিপুণ মালাকারের মতো। যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা স্বাধীন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি, সেটিকে বাংলা নববর্ষের আলোকে দেখেছেন, এটি হয়তো আমরা অনেকেই মিলিয়ে নিই। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন হাজী মহসিনকে। যাঁকে আমরা দানবীর বলেই বেশিরভাগ মানুষ জানি এবং এটি সত্যও। এর সাথে অন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ সত্যকে লেখক সামনে নিয়ে এসেছেন, আর তা হলো অসাম্প্রদায়িক হাজী মহম্মদ মহসিন। হাজী মহসিন তাঁর বিপুল সম্পদের ৩৩.৩% রেখে গিয়েছেন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য, আর বাকি ৬৭.৭% নির্ধারিত করে গেছেন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির সঙ্গে সম্পর্কহীন জনহিতকর সেকুলার কাজের জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী হুগলি চুঁচুড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হুগলি মহসিন কলেজ’। এর পূর্বে যে সকল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় সেগুলো ছিল বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ভিত্তিক। সকল বর্ণ বা সকল সম্প্রদায়ের জন্য হয়নি। কিন্তু এই কলেজটির দ্বার সকল সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীর জন্য ছিল উন্মুক্ত।
লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও প্রথাবিরোধী সাহিত্যিক মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে। ব্যারিস্টার হওয়া সত্ত্বেও আইন ব্যবসায় সফল ছিলেন না, কিন্তু কবি হিসেবে থেকে গেছেন অবিস্মরণীয় হয়ে। তাঁকে নিয়ে আরও গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক। কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোডের সেমেট্রিতে কবির সমাধিস্থল পরিদর্শনের কথা উল্লেখ করে আক্ষেপের সাথে এ তথ্যও জানিয়েছেন যে, খুব মানুষই বিশেষত বাংলাদেশ থেকে খুব কম লোকই সমাধি স্থল পরিদর্শন করতে যান।

মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করা পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্র-সান্নিধ্য-ধন্য রবীন্দ্র সঙ্গীত ভুবনের তারকা শৈলজারঞ্জন মজুমদার কীভাবে লেখকের পরিবারের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন, এর এক নিটোল এবং প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন ‘শৈলজারঞ্জন মজুমদার-আত্মার আত্মীয়’ শীর্ষক প্রবন্ধে। চুয়াত্তর বছর বয়সে ১৯৭৪ সালে নিজ জন্মভিটা বাহাম গ্রামে এসেও নিজের বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারেননি বন্যাজনিত কারণে। এরপর ‘৭৫-এ আবার আসেন। তখনই লেখকের পিতার সাথে পরিচয়, আন্তরিকতা এবং আত্মার আত্মীয়তা। তাঁকে থেকে যেতে বলেছিলেন লেখকের পিতা ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। এর প্রাসঙ্গিকতায় যখন তিনি বলেন, কোথায় থাকবো? উত্তরে ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ আপনজনের মতোই বলেছিলেন, ‘আমি আপনারে বাড়ি দিমু, গাড়ি দিমু, ডেমিসিল দিমু।’ উল্লেখ্য যে, তাঁর জন্মভিটায় লেখকের অনুজ বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব জনাব সাজ্জাদুল হাসান এর আন্তরিক প্রয়াসে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে গড়ে উঠছে ‘শৈলজারঞ্জন সংস্কৃতি কেন্দ্র’।
আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছেন ওবায়দুল হাসান। এরই এক পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারি আইন কর্মকর্তা সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে। ধানমন্ডি ল’ কলেজ এর খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন তিনি। এরপর নিযুক্ত হয়েছেন হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে। পর্যায়ক্রমে হাইকোর্ট এর বিচারক, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদস্য এবং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর লেখায় আইনের বিষয় আসবেই এবং যেখানে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি, সেখানেই দিয়েছেন। লিখেছেন ‘বিচারক এবং একজন আইনজীবী নৈতিকতার মানদণ্ড’ নিয়ে। লেখার শুরুতেই একজন আইনজীবীকে ‘কোর্ট অফিসার’ আখ্যায়িত করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন একজন বিচারপ্রার্থীকে (মোয়াক্কেল) কোনো বিষয়ে সঠিক পরামর্শ প্রদান একজন আইনজীবির প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টি যদি কোনাে আইনজীবীর’ জন্য মুখ্য বিষয় হয়ে যায়, তবেই তা হবে একজন আইনজীবীর ‘নৈতিকতার পরাজয়’। এ প্রসঙ্গে বিচার বিভাগে কাজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর প্রজ্ঞার আলোকে আইনজীবীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ যথাযথ কথাগুলো বলে দিয়েছেন এই নিবন্ধে। সাথে বিচারকদের নৈতিকতার উঁচু মানদন্ডের অনস্বীকার্যতার কথা বলতে একটুও কার্পণ্য করেননি।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। এটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা কবে থেকে শুরু সেটি অবশ্যই জাতির জানা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন এ নিয়ে কেউ উদ্যোগী হননি। বিচারক হিসেবে যোগ দিয়ে অন্য আরও বিচারপতিদের সাথে নিয়ে সেই ঐতিহাসিক কাজটি করেছেন লেখক। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের গণপরিষদ (বর্তমান জাতীয় সংসদ) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করে, যা ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে প্রবর্তিত হয়। এর দু’দিন পর ১৮ ডিসেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুপ্রিমকোর্টের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। সেদিন থেকেই শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। সেই ১৮ ডিসেম্বর এখন পালিত হয় ‘সুপ্রিম কোর্ট দিবস’ হিসেবে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ। যথাঃ নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের একজন মানুষ হিসেবে লেখক চেতনাগত উৎকর্ষতায় ‘মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস, বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি’ শীর্ষক নিবন্ধে বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। নিবন্ধটি শেষ করেছেন যে কথা কয়টি বলে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সবাই স্মরণ রাখলে আমাদের প্রত্যাশিত ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে একটু তাড়াতাড়িই এগিয়ে যেতে পারবো। তিনি বলেছেন ‘মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ থেকে নম্র ও শোভনীয় আচরণের মধ্য দিয়ে দৃঢ়তার সাথে ধীর স্থিরভাবে বিচার কার্য পরিচালনা করতে পারলে সেই বিচারকের প্রতি প্রত্যেক বিচার প্রার্থীর আস্থা ও বিশ্বাস অনেক অনেক বেড়ে যাবে, যা স্বাধীন ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত’।
অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে মুক্তবুদ্ধি চর্চা জরুরি। আর মুক্তবুদ্ধির চর্চায় পাঠাগারের বিকল্প নেই। তাই ওবায়দুল হাসান জোর দিয়েছেন গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উপর এবং বলেছেন, ‘রেনেসাঁ বা নবজাগরণের মধ্যে দিয়ে বিকশিত চেতনাকে মূর্ত করে তুলতে অবদান রেখেছে… শতবর্ষের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থকারগুলো’। তাই নব নব জাগরণের জন্য, মানুষের আত্মিক মুক্তির জন্য গ্রন্থাগারের আবশ্যকতার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক প্রবন্ধে। তিনি বলেন ‘সমাজে সভ্যতা, মানবিকতা, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সাম্য অনিবার্য। এটি নিজ মনন ও চেতনায় ধারণ করতে বারবার ফিরে যেতে হবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের অনিন্দ্য মানবিক সাহিত্য কর্মে। এজন্য প্রয়োজন তাঁদের অমর কীর্তির সংগ্রহশালাগুলোর সাথে বন্ধন সৃষ্টি’। আর তা করতে পারে একমাত্র গ্রন্থাগার। তিনি আস্থা রেখেছেন বাংলার প্রতি গ্রামে গ্রন্থাগার গড়ে উঠবে এবং এর আলোকে আলোকিত হয়ে ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন এ দেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলায় পরিণত করতে পারবে।’

মুক্তিযুদ্ধকালে কিশোর ওবায়দুল হাসান থেকেছেন ভারতের মেঘালয় প্রদেশের মহেশখোলা গ্রামে, পরিবারের সাথে। সে সময়ে ভারতের তুরা জেলার বাগমারা থানার (বর্তমান জেলা) মহেশখোলা গ্রামে স্থাপিত ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন লেখকের পিতা। ২০১৬ সালে তিনি অনুজকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন মহেশখোলায়- স্মৃতিময় কৈশোরকে খুঁজতে। সেই ভ্রমণের বর্ণনার সাথে সাথে তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের অবস্থা। এর মধ্য দিয়ে ভারতে শরণার্থী হওয়া পরিবারগুলোর সংকট ও সংগ্রামের একটা চিত্র পাওয়া যায়।
লিখেছেন ‘দুর্গোৎসব’ শীর্ষক প্রবন্ধ। দুর্গাপূজার ইতিহাস উপস্থাপন করার পাশাপাশি সকল ধর্মের মধ্যে দিয়ে যে মঙ্গলবার্তা ঘোষিত হয়েছে, সেটিই লেখক তুলে ধরেছেন তাঁর লিখন-শৈলীর মাধ্যমে।
গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধ লিখেছেন তাঁকে নিয়ে, যারা আদর্শিক ছায়ায় এবং প্রেরণায় গড়ে উঠেছে লেখকের চৈতন্য, বেড়ে উঠেছেন আজকের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এটির শিরোনাম ‘আমার বাবা-আমার পথ চলার প্রেরণা।’ লেখকের পিতা ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ-মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর সহচর, রাজনীতিবিদ; ছিলেন সত্তরে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদ সদস্য, স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান স্বাক্ষরকারীদের একজন। লেখক আলোচ্য বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর পিতাকে। আপাদমস্তক একজন অসম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যে সমস্ত জায়গায় প্রতিবাদ হয়েছিল- গড়ে উঠেছিল প্রতিরোধ তার মধ্যে অন্যতম ছিল মোহনগঞ্জ এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এবং এজন্য অমানুষিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছিল তাঁকে। পূর্বে উল্লেখিত শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সাথে ‘আত্মার আত্মীয়ের’ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি এবং আজীবন রক্ষা করেছেন সেই সম্পর্ক। পিতা সম্পর্কে লেখক যথার্থই বলেছেন, ‘বাবা ছিলেন ধর্মীয় সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমাজে সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টিতে সচেষ্ট একজন মানুষ’।

বঙ্গবন্ধু’র সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ যেন কলুষিত না হয়, সেই লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ঢাকায় এক সুধী সমাবেশে বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেন, ‘কয়েক শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদী এবং অভিশপ্ত সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ হিসেবেই স্বাধীন জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের অভ্যুদয়। আমরা যদি সকল প্রতিকূলতার মধ্যে সেক্যুলার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারি তাহলে এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সফল হবে।’
গ্রন্থের সবগুলো লেখার মধ্য দিয়ে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান অনেক কথাই বলেছেন; কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটিই সুর-একটি স্রোতই বহমান ছিল, তা হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেতনা।
রবীন্দ্রনাথ অনেকবারই বলেছেন যে, একজন লেখককে চেনা যায় তার লেখার মাধ্যমে, তার সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। এই গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে একজন লেখক ওবায়দুল হাসান, একজন বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে ছাড়িয়ে একজন মানুষ ওবায়দুল হাসানকে দেখি, যিনি তাঁর চৈতন্যে ধারণ করেছেন মুক্তবুদ্ধির অসাম্প্রদায়িক মানুষ হয়ে উঠার বীজমন্ত্র এবং এই গ্রন্থের সকল লেখার মধ্য দিয়ে সেই মন্ত্রই আমাদেরকে শুনিয়েছেন।
দীর্ঘজীবী হোন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, তাঁর চলমান প্রয়াসে আলোকের পথে এগিয়ে যাক প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
বইটি প্রকাশের জন্যে অশেষ ধন্যবাদ ‘মাওলা ব্রাদার্স’এর স্বত্ত্বাধিকারী জনাব আহমেদ মাহমুদুল হককে।

পুনশ্চঃ অকপটে কৃতজ্ঞতা জানাই সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবী প্রিয়জন জনাব মুসফিকুল হক মহোদয়কে। তিনি আমাকে গ্রন্থটি উপহার দিয়ে এমন একজন মানুষ ও তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে বিশদ জানার সুযোগ করে দিয়ে ঋদ্ধ করেছেন, আবদ্ধ করেছেন ভালোবাসার অপার আলিঙ্গনে।

 


[ বই-পুস্তক-প্রকাশনা এবং বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের যে কোনো সংবাদ প্রকাশের জন্য আমাদের ই-মেইল করতে পারেন : desherboi@gmail.com ]

Facebook Comments