স্বরণ কুমার বার্মা’র গল্প

বালির নদী

বুধবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৩:৩৯ অপরাহ্ণ | 294 বার

বালির নদী

আমি হাসপাতালের রুম নম্বর ১৪’র বিছানয় শুয়ে চিন্তার সাগরে ডুবে আছি। স্যলাইনের খালি বোতল উল্টা করে স্ট্যান্ডের সাথে ঝুলে রয়েছে। দেয়ালগুলো মনে হচ্ছে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আগামীকাল আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আমার স্ত্রী বাসায় গিয়েছে।

আমার রুমের পাশে নার্সদের স্টেশান। আমার রুমের ঠিক উলটো দিকে রুম নম্বর ৫’এর দরজা খুলে বন্ধ হলো। কিছুক্ষণ আগে ড. সাঞ্জানা এসেছিল, সেই জানালো যে সামনের রুমের রোগী এখন বিপদ মুক্ত, তার বেশ বড় ধরণের হার্ট এট্যাক হয়ে ছিল। দুই দিন সে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করেছে। ড. সাঞ্জানাও বেশ বিচলিত ছিল আমি তার বিচলিত কণ্ঠস্বর শুনে ছিলাম। সে ড. বিষ্ণুকে বলছিল, ‘ডাক্তার শি ইজ সিংকিং’। তখন জানি না কেন আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম সে যেন সুস্থ হয়ে নিজের বাসায় ফিরে যায়। আমি জানতাম না সে কে? আমি তাকে চিনিও না, তাকে দেখিও নাই। আমার এই সহানুভূতি আমাকে টেনে ওর রুমে নিয়ে গেল সে। এটা কেমন সাক্ষাৎ! একদম আমার প্রত্যাশার বিপরীত… ষাট বছর আগে… যুগ বদলে গেছে। কিন্তু আমার কাছে তো এটা গতকালকের কথা মনে হয়। কুসুম আমার সামনের দাঁড়িয় আছে। মাঝারি গড়ন, ফর্সা রঙ, কোমল শরীর, কাটা কাটা চেহারা, লজ্জা আর চঞ্চলতার মিশ্রণ। ফর্সা বাহুতে কাঁচের সবুজ চুড়ি। সে তার মুঠি খুলে দিল তার হাতে সবুজ এলাচি। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কিন্তু তার চোখ বলছে নিয়ে নাও।

তখন হোলির সময়। মৌসুম পরিবর্তন হচ্ছে। আকাশ খালি খালি আর বিষণ্ন। সময় থেমে গেছে। প্রত্যেকটি জিনিস রঙে ডুবে যাচ্ছে। বিষণ্নতা আর রঙ দুটাই ছিল। কি অদ্ভুত কথা তাই না? মৌসুম আর কুসুম একে অন্যের সাথে মিশে নি। এই রঙটি কুসুমের অস্তিত্ব থেকে ছড়াচ্ছে আর বিষণ্নতা আমার ভিতরে বিরাজমান রয়েছে। আমি এলাচি নেয়ার সময় আমার নখ দিয়ে তার হাতের নরম তালুতে একটু চাপ দিলাম। সে উফ্ বলে তার হাতটা টেনে নিল। তার মুখে রাগ আর চোখে নির্মম হুমকি, মার দিব তোমায়।

এলাচির স্বাদ আমার মুখটা তিতা করে দিল। সে মুচকি হেসে বলল, “হোলি হ্যায়”, এটা যেন সে একটি অধিকারের রেষ নিয়ে বলল। আমি জানি না এটা আমার বিষণ্নতা ছিল, না কি মৌসুমের পরিবর্তন অথবা তার অস্তিত্ব থেকে ছড়িয়ে পড়া সুগন্ধি যে আমি তাকে টেনে তার লাল ঠোঁট থেকে একটি চুমু চুরি করে নিলাম। সে একটু ঘাবড়ে গেল। এটা তার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল, রাগ করলো তার পর তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে হেসে দিল। আমি তারই ভঙ্গিতে বললাম, “হোলি হ্যায়”। সে দ্রুত সিঁড়ির দিকে গেল, একটু থামলো, আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে মুখ ভেঙ্গালো আর “বদমাইশ” বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেল। সে দিন থেকে, সেই মুহূর্ত থেকে সে আমার আত্মার মাঝে রয়ে গেল। ষাট বছর হতে চলেছে সেই মুহূর্ত বিগত হয়েছে, কতো সময় কেটে গেছে।
ও আমার ছোট বোনের বান্ধবী আর সহপাঠিও ছিল। আমাদের বাসার উলটো দিকে তার দাদা’র বড় একটা পাকা বাসা ছিল। পণ্ডিত ব্রাহ্ম দত্ত শাস্ত্রি, তিনি জ্যোতিষী, বৈদ্য আর না জানি কি কি ছিলেন। পণ্ডিতজি আমাদের পারিবারিক পুরহিত ছেলেন। দুইজন দশম ক্লাসের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কুসুম “ডাফোডিলজ, ওয়ার্ডস ওয়রথ আর শিক্ষকের সম্পর্কের জালে আটকে পড়েছে। আমরা সেই তিক্ততা বোধহয় ভোলার জন্য অজান্তে মিষ্টি স্বাদে পরিবর্তন করতে ব্যস্ত ছিলাম। ওয়ার্ড ওয়ারথস আমার ভিতরেও ছিল। মৌসুম বদলে যাওয়া সত্বেও আমার ভিতরে এক অন্যরকম কোলাহল ছিল। কখনো মনে হতো হৃদয়ের কম্পন বন্ধ হয়ে গেছে, কখনো মনে হতো হৃদয়ের কম্পন বেড়ে গেছে। আমি কাউকে কিছু বলতেও পারছি না, একদম নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম।

ও একদিন আমার রুমে এলো চার্লস ল্যাম্বের সরল ভাষায় শেক্সপিয়ারের গল্পগুচ্ছো নিয়ে। “ল্যাম্ব” কোন নাম হল? সে গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞাসা করলো। তুমি “ওলফ”এর নাম শুনেছো, ইংরেজদের মধ্যে তো মেয়েরাও “ওলফ” হয় যেমন “ওয়রজিনিয়া ওলফ” আমি হেসে বললাম। সে বুকশেলফ থেকে আমার ডায়েরি বের করলো এমন ভাবে যেন এই রমে সব জিনিষ তার নিজের এবং ওই ডায়েরিতে যেন সব জিনিষের উত্তর আছে। ওই ডায়েরিতে আমার হিন্দি কবিতাগুলো লিপিবদ্ধ ছিল, অপরিপক্ব ভাবনা, দুর্বল ভাষা, আর খুব এলো মেলো কল্পনা।

ওটা ওখানেই রাখো।
আমি নিয়ে যাচ্ছি, পড়বো।
ওখানে কিছুই নেই, এমনি লিখেছি।
ঠিক আছে এমনি হোক, তো তুমি এমনি লেখো কেন?

ডায়েরি সে বুকের সাথে লাগিয়ে নিয়ে গেল। রমটা মনে হল কিছুক্ষণ গরম তার পর হঠাৎ শীতল হয়ে গেল। আমার ভিতরে যে প্রদীপ ছিল সেটা নিভে গেল। সেই এলাচি তার তিক্ততা, সেই মিষ্টি স্বাদ, আমার ডায়েরি, কিটস, তার অস্তিত্ব থেকে ছড়ানো রঙ আর সুগন্ধি এইসব ষাট বছরের ধুলর মধ্যে চাঁপা পড়ে গেছে।

কয়েক দিন পরে সে এসেছিলো। আমি তার থেকে ডায়েরি চাইলাম, “দিয়ে দিব”, সে এমন ভাবে বলল যেন মনে হয় বলছে, “তুমি কে হে ডায়েরি চাওয়ার?” আমি তাগিদা দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেলাম, সে হেসে আমার কথা উড়িয়ে দিল। আমি বললাম, “আমার কাছে এসে কথা বলো”, সে বলে, “তুমি একটা বদমাইশ”।

মৌসুম দ্রুত পরিবর্তত হতে থাকলো। সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করে নিল। ওর দাদা তার জন্মকুণ্ডলি দেখলো। এক সন্ধ্যায় সে তারার ছায়ায় আর ব্যান্ড-বাজার ধ্বনির ভিতরে পালকিতে বসে অন্য কোন শহরে চলে গেল। আর আমাকে এলাচি খাবার রোগ দিয়ে গেল। মা জিজ্ঞাসা করতেন তোমার এলাচি এতো ভাল লাগে। আমি একটি এলাচি মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিতাম। সে বিস্ময়ের সাথে আমাকে দেখতেন। কতো হোলী এলো আর চলে গেল, আর কোন দিন রঙে ভেজার ইচ্ছে হলো না। দেখেই শুধু খুশি হতাম। কবিতা আমি আর লিখি নাই। সেই তারার ছায়া, বাদ্যযন্ত্রের সুর, সেই হাসি, সেই কান্না আমার ভিতরে কোথাও স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। পন্ডিতজি পরলোক গমন করলেন, পরিবার ভাগ হয়ে গেল, সেই বাসাটা বিক্রি হয়ে গেল, আমরাও সেই মহল্লা ছেড়ে দিলাম। সব স্মৃতি, সব সম্পর্ক অতীতের পুরো মাটিতে চাঁপা পড়লো। আমার মা একটি সুন্দর, সুশীল মেয়ে এনে আমাকে তার কাছে দিয়ে নিজে আকাশে হারিয়ে গেল।

হৃদয়ের এলো মেলো স্পন্দন এই তৃতীয়বার আমাকে হাসপাতালে নিয়ে এলো। রম নম্বর ২৩, তার পর ৪১ আর এখন ১৪ আর অপর দিকে রম নম্বর ৫। দুইদিন ওই রুম অনেক অশান্ত রইল, দরজা খুলতো আর বন্ধ হতো, নার্স, ডাক্তার, ওয়ার্ড বয়, আক্সিজেন সিলিন্ডার। তারপর সব শান্ত হয়ে গেল। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্লান্ত হয়ে বাহিরে বারান্দায় আসলাম। নার্সদের কেবিন খালি, বারান্দা খালি। কোন রুমে কেউ হাসল, হাসপাতালের বিষণ্ন আর নিঃশব্দ পরিবেশে এই হাসিটা খুব ভাল লাগলো। আমি বাহিরে ক্যান্টিন, মেডিকাল ষ্টোর, আর গেট পর্যন্ত ঘুরে এসে আমার রুুমের বাহিরে রাখা বেঞ্চে বসে নিঃসঙ্গতা উপভোগ করছি। রুম নম্বর ৫’এর দরজা খুলল আর একটি দশ-এগারো বছরের সুন্দর মেয়ে অভিমান করে বেরিয়ে এলো, পিছনে তার মা। সে তাকে ভুলানোর চেষ্টা করছে। আমি খুব মনযোগ সহকার তাদের দেখছি আর তাদের কথা শুনছি। হঠাৎ আমার মনে একটি অদ্ভুত অনুভূতি জাগল, ওদের দুইজনের চেহারা মিলে একটি চেহারায় পরিবর্তিত হচ্ছে। আমার চেনা চেহারা। আমি আমার ভিতরে কিছু খুঁজার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। কয়েকটা স্তর সরিয়ে, কয়েটা পর্দা সরিয়ে দেখি হোলির রঙ ছিটানো হচ্ছে, ডাফোডিলজ ফুটছে, এলাচির গন্ধ আসছে। আমি ওই মা-মেয়ের সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। আমার মনের ভিতরে কেমন উথাল পাথাল ভাব।

“এখানে আসো মা, আমাকে বল তোমার কি চাই?” আমি মেয়েকে বললাম, সে লজ্জা পেয়ে তার মা’এর পিছনে লুকিয়ে যায়। “কে অসুস্থ, আপনারা দুইদিন বেশ কষ্টে কাটিয়েছেন”।
“জ্বি আমার মা, এখন বিপদমুক্ত”, মহিলাটা আমাকে জানালো।
“আপনাদের কি উদয়নগরে সাথে কোন সম্পর্ক ছিল?” সে আমার দিকে চুপচাপ অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। “আমাদের কোন দিন দেখা হয় নাই, আমরা একে অন্যের জন্য অচেনা, কিন্তু আপনাকে আমার মনে হয় না চিনলেও চিনি। আমার এইসব কথা শুনে কিছু মনে তো করেন নি তো, একজন বুড় অসুস্থ লোকের কথা”, আমি তাকে বললাম।
“না অঙ্কেল, ওই মহল্লায় আমার নানাবাড়ি ছিল”।
“পণ্ডিত”
“ঠিক, কিন্তু আপনি এইসব কি ভাবে জানেন”।
“আমার বাসাও একই মহল্লায় ছিল, আপনার মা আর আমার ছোট বোন বান্ধবী ছিলেন, আপনার মা’এর নাম, কুসুম তাই না”। সে অবাক হয়ে আমার দিকে দেখছে।
“যদি কিছু মনে না করেন তা হলে কি আমি একটু রোগীকে দেখতে পারি?”
“অবশ্যই আঙ্কেল, আসেন প্লীজ” সে দরজা খুলে আমাকে ভিতরে নিয়ে আসে।
কুসুম বেডে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রয়েছে। পাশে একজন লোক আর দুই মহিলা চুপচাপ বসে রয়েছে। কুসুমের হাতে বাটারফ্লাই ইঞ্জেকশান লাগানো আর ফোঁটা ফোঁটা ওষুধ তার শিরায় প্রবেশ করছে। তার সাদা-কাল চুল বালিশের উপর ছড়িয়ে রয়েছে। তার মুখে হলুদ রঙের মধ্যেও একটু লালচে ভাব আছে।
“মামা, দেখো কে এসেছে?”
কুসুম চোখ খুলে এদিক ওদিক তাকালো তার পর তার দৃষ্টি আমার চেহারায় এসে থেমে গেল। আমার “হার্ট বিট” বেড়ে গেল মনে হল হার্ট বুকের খাঁচা ভেঙে বের হয়ে আসবে। সে একটু মুচকি হাসল যেন নিজেকে সামলিয়ে নিচ্ছে। তার পর সে নিজের মেয়েকে বলল, “আঙ্কেলকে কফি দাও”। আমি চিন্তা করলাম, তার এখনো মনে আছে আমার কফি পছন্দ। ও আমাকে সময়ের ধুলো থেকে খুঁজে বের করে নিয়েছে।
কেমন আছো?
ভাল।
তুমি সুস্থ হয়ে বাসায় চলে যাবে। এখন আর কোন বিপদ নেই, ড. সাঞ্জানা আমাকে বলেছে।
তুমি এখানে কেন? কি হয়েছে?
একই অবস্থা যেমন তোমার, আমি হেসে বললাম।
ডাক্তার উনাকে বেশি কথা বলতে নিষেধ করেছে, পাশে বসা পুরষ আমাকে বলল।
এলাচি সে মুঠো খুলে দিল।
আমি তার তালুতে এলাচি রেখে যখন ফেরত আসছি তখন তার বালিশের তলা থেকে উঁকি দেয়া ডায়রির উপর আমার চোখ গেল। যার ভিতরে আমার কাঁচা হাতের লেখা কবিতা নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ফেরত নিই, চিন্তা করলাম। না থাক, আমার ভিতরে কেউ বলল, এটার মালিক এখন কুসুম।

আমি বারান্দায় চলে এসেছি। একটা রোগী সুস্থ হয়ে বাসায় চলে যাচ্ছে, তার আত্মীয় স্বজন সবাই খুব খুশি। কুসুমও তার বাসায় ফিরে যাবে, আমি ও আমার বউ’এর গলা শুনতে পারছি। সে ডাক্তার সাঞ্জানাকে বাসা থেকে আনা মিষ্টি খেতে বলছে। আমি রুমের ভিতরে চলে এসেছি। বেডের উপর বসে চিন্তা করছি কুসুম নিজের বাসার লোকদের কি বলবে আমার সম্বন্ধে। বলার জন্য কি বা আছে। আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে চোখের সামনে ডাফোডিলজ নাচতে শুর করে দিল। রাস্তা দিয়ে কোন বারাত যাচ্ছে ঢাক-ঢোলের সাথে। তারার ছায়ায় পালকি করে কনে যাবে। কি জানি কনের কি নাম।
কি চিন্তা করছো? আমার বউ জিজ্ঞাসা করলো।
কিছু না, এই মিথ্যা কথা কতো যে সত্য।

 

চিত্রকর্ম : ‍সমর মজুমদার


  • দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com
Facebook Comments Box