বাংলা ভ্রমণ-সাহিত্য : কিছু কথা

সোমবার, ০৭ জানুয়ারি ২০১৯ | ২:১০ অপরাহ্ণ | 751 বার

ভ্রমন থেকেই হয় ভ্রমণ কাহিনী। কিন্তু ভ্রমণকারীদের সকলের হাত দিয়ে নয়।’ অন্নদাশঙ্করের এই কথা টেনে বলি ভ্রমণসাহিত্য সবাই হাজির করতে পারে না। সাহিত্য যেমন নানা অর্থ প্রকাশক (ওষুধের বিবরণও literature) ভ্রমণ রচনাও নানা ধাঁচের। বলতে পারি, যে-ভ্রমণরচনা আকর্ষণীয় পাঠযোগ্যতায়, জীবন পর্যবেক্ষণে, প্রকৃতি অবলোকনে, এবং বারংবার পড়ার কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, সেটিকেই বলা চলে ভ্রমণ-সাহিত্য। বেড়ানোর প্রসঙ্গকথা হলেই চলবে না, সাহিত্যের স্বাদ চাই, তবেই আসে বেড়ানোর মতো, সাহিত্যপাঠে হাওয়াবদলের স্বাদ। ভ্রমণ-তথ্য সর্বস্ব হলে রচনা ঝোঁকে গাইডবুকের দিকে, চরিত্র ও কাহিনী-বর্ণনা যদি বড়ো হয়ে ওঠে তাহলে তা হয়ে ওঠে ভ্রমণ-উপন্যাস। প্রবোধ সান্যালের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’, অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ভ্রমণ-উপন্যাস। এ প্রসঙ্গে বলা চলে উপন্যাসের নামকরণে ‘ভ্রমণ’ কথাটি বহু ব্যবহৃত। যেমন – জোনাথন সুইফট এর ‘Gulliver’s Travels’, স্টিভেনসন এর ‘Travels with a Donkey’ বানিয়ান এর ‘Pilgrim’s Progress’ (১৬৭৮), গ্রাহাম গ্রীন-এর ‘Travels with my Aunt’ (১৯৬৯) প্রভৃতি। বাংলায় কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য রচিত ‘দুরাকাঙ্খের বৃথা ভ্রমণ’ (১৮৫৮) কিন্তু উপন্যাস। অনেকেই জানেন শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ বইটি ধারাবাহিক বার হবার সময় নাম ছিল— ‘শ্রীকান্তের ভ্রমণ কাহিনী’। এ দুটি বই কিন্তু ভ্রমণসাহিত্য নয়। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া যাক, অনেকে সাহিত্যিক হতে ভ্রমণকথা লিখেছেন কিন্তু ভ্রমণ-সাহিত্য লিখে স্বীকৃতি পেতে হলে সাহিত্যিক হতে হবে এমন কথা নেই। জলধর সেন, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতি বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর, মুজতবা প্রভৃতি জনপ্রিয় ভ্রমণসাহিত্য উপহার দিয়েছেন। কিন্তু জগদীশচন্দ্র, বিবেকানন্দ, রামনাথ বিশ্বাস, প্রভৃতির ভ্রমণসাহিত্য, আমাদের সাহিত্য পাঠের অনুভব, জীবন ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের মন্তব্যে বারংবার পাঠে আগ্রহী করে তোলে। ভ্রমণ-সাহিত্য, সে সাহিত্যিক লিখুন আর অন্য কেউ লিখুন সে লেখাকে হতে হবে ভ্রমণ-কাহিনী, কিন্তু সাহিত্য গুণান্বিত।

ভ্রমণকথা সব সাহিত্যেই সুপ্রাচীন, অনেক সাহিত্যে ভ্রমণ মোটিফ থাকে – এ দুটো আলাদা প্রসঙ্গে আমরা যাচ্ছি না। কালানুক্রমিক ভ্রমণসাহিত্য আলোচনায় যাব না, কয়েকটিমাত্র ভ্রমণ-সাহিত্যের কথাই বলব।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যুবক বয়সে পালামৌ গিয়েছিলেন যা ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ১৮৮০-৮২ সালে ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। পাহাড়ের বর্ণনা, কোল পুরুষ ও নারীর বর্ণনা, লাতেহার পাহাড়ের কিছু অভিজ্ঞতা উপস্থাপন থেকে তাঁর দেখার চোখ, তীক্ষ্ণ, কাব্যময়, ভাবনাবাহী মনের পরিচয় মেলে। কেউ কেউ (যেমন শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়) অবশ্য এ বইতে উপন্যাস ও প্রবন্ধের কিছু উপাদান লক্ষ্য করেছেন। এবং অন্য কেউ (প্রমথ বিশী) চিত্তের গতিশীলতার অভাব দেখেছেন। কিন্তু ভ্রমণ-সাহিত্য হিসেবে এর পাঠযোগ্যতা আজও বহমান। জলধর সেনের ভ্রমণ বিষয়ক বই দশটি, তার মধ্যে ‘হিমালয়’ বইটি (১৯০০) অতি জনপ্রিয়। কন্যা ও স্ত্রীর অল্পদিন ব্যবধানে মৃত্যুর পর ১৮৯০ নাগাদ তিনি বদরিকাশ্রম অভিমুখে রওনা হন। তিনি ও মহেন্দ্র দত্ত যে হিমালয় দেখেছেন (১৮৯৪) তা আজ বদলে গেছে। কিন্তু দেবপ্রয়াগের শোভা, রুদ্রপ্রয়াগ থেকে পিপল চটির তৎকালীন দুর্গমতা, বদরিগামী পথবৈচিত্র্য, বরফ কেটে রাস্তা তৈরি, যোশীমঠের পথের অলৌকিক সৌন্দর্য, ব্যাসগুহায় তুষারাচ্ছন্ন নদীপরিসর ইত্যাদির বর্ণনা একালীন পাঠককে নানা ঔৎসুক্যে প্রাণিত করবে। বইটিতে আছে বানিয়ানের পিলগ্রিমস্‌ প্রগ্রেস, একাধিক রবীন্দ্রসঙ্গীত, আনন্দমঠ, বিবর্তনবাদ, মেসমেরিজম, থিয়োসফি শঙ্করাচার্যের উল্লেখ যেমন, তেমনি স্বর্ণলতা উপন্যাসের কথা, বদরির পাণ্ডা প্রসঙ্গে বা ঈশ্বর গুপ্তের পাঁঠা বিষয়ক কবিতা, শেক্সপীয়র, মীরাবাঈ-এর উল্লেখ মননশীল পাঠককেও আগ্রহী করে তুলবে। মাঝে মাঝে আছে তুলনা – (যেমন শিক্ষিত বাঙালি ও অশিক্ষিত গাড়োয়ালি) আছে অজস্র সরসতার অন্তর্ভুক্তি – যেমন গজানন কে নিরীহ কেরানী রূপে দেখা, দ্রৌপদী ও বৃকোদর নিয়ে রঙ্গ, এবং বেশ কয়েকটি সহযাত্রী প্রসঙ্গায়নে নৈপুণ্য। বইটি আমার কেদার-বদরী সাহিত্যের অজস্রতার মধ্যে বিশিষ্ট বলে মনে হয়েছে।

বরাহনগর মঠের ঘরে বসে নরেন তাঁর গুরুভাইদের বলেছিলেন – এই শেষ আর ফিরছি না। ১৮৯০-এর জুলাই সারদা মা’কে প্রণাম করে কলকাতা ছাড়লেন বিবেকানন্দ, ফিরলেন সাত বছর পর ২০ ফেব্রুয়ারী ১৮৯৭ বিশ্ববিজয়ী বিবেকানন্দ হয়ে। তিনি বলেছিলেন – ‘আমাদিগকে ভ্রমণ করিতেই হইবে, আমাদিগকে বিদেশ যাইতেই হইবে ….. যদি আমাদিগকে যথার্থই পুনরায় একটি জাতিরূপে গঠিত হইতে হয়, তবে অপর জাতির চিন্তার সহিত আমাদের অবাধ সংস্রব রাখিতেই হইবে।’ (শঙ্করলালকে ২০ সেপ্টেম্বর, ১৮৯২, স্বামীজীর বাণী ও রচনা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৩৪২) তাঁর ভ্রমণের ১ম পর্ব জুলাই ১৮৯০ থেকে জানুয়ারী ১৮৯১: সাতমাস গুরুভাইদের সঙ্গে হিমালয়ে সাধনা ও তীর্থ ভ্রমণ। ইচ্ছে ছিল নেপাল হয়ে তিব্বত যাবার, কিন্তু অসুস্থতায় তা হয় নি। এর পর জানুয়ারী ১৮৯১ থেকে ৩১ মে ১৮৯৩ এই দুবছর চারমাস নিঃসঙ্গ একক ভ্রমণ – উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের রাজ্যগুলো, তারপর পুনা, গোয়া, ব্যাঙ্গালোর, মহীশূর, ত্রিবান্দ্রাম, কন্যাকুমারিকা, রামেশ্বর, রামনাদ, মাদুরাই, পণ্ডিচেরী, মাদ্রাজ, হায়দ্রাবাদ, তারপর বোম্বাই থেকে জাহাজে বিদেশ ৩১ মে ১৮৯৩, শেষ ৩০ জুলাই ১৮৯৩ শিকাগো পৌঁছে। ৩য় পর্ব – বিশ্ব ধর্মসম্মেলনে বক্তৃতা দিয়ে খ্যাতির পর সারা আমেরিকা ও ইউরোপ তোলপাড়-করা ভ্রমণ এবং ২১ ফেব্রুয়ারী ১৮৯৭ কলকাতা ফেরা ছবছর সাত মাস পর। এই তিন পর্বের মধ্যে তৃতীয় পর্বের ভ্রমণ কথা পাওয়া যায় পাশ্চাত্ত্য শিষ্য ও অনুরাগীদের লেখা থেকে। কিন্তু ১ম ও ২য় পর্বের অনেক কথাই জানা যায় না। শুধু কয়েকটি চিঠিতে কিছু কথা আছে।

‘পরিব্রাজক’ বইটি ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার ১ম বর্ষের পঞ্চদশ থেকে ত্রয়োবিংশ সংখ্যায় প্রকাশ পায় ‘বিলাত যাত্রীর পত্র’ নামে, ৩য় বর্ষে এর নাম বদলে করা হয় – ‘পরিব্রাজক’। ১৮৯৯, ২০ জুন স্বামীজী গোলকোণ্ডা জাহাজে যাত্রা করেন ইউরোপের উদ্দেশে, এ তাঁর ২য় বার ইউরোপ যাত্রা। স্বামী সারদানন্দ সংকলিত এই বইটির দুটি ভাগ – প্রথম অংশে সমুদ্রযাত্রার বর্ণনা, দ্বিতীয় অংশে ইউরোপ ভ্রমণ কথা। এখানে আছে শিল্পীর তুলিতে আঁকা নানা চিত্র। প্রাণবন্ত কথ্যভাষা এর সম্পদ। পরিশিষ্ট সংযুক্ত ডায়েরীর কিছু অংশ – যাতে কনস্টানটিনোপলে স্বামীজির অবস্থান বর্ণনা, সেখানের রাজনীতি ও ইতিহাস আলোচনা, তারপর এথেন্স – সেখানে প্রাচীন মন্দিরের পরিচয়। তার পর লুভর মিউজিয়াম ও গ্রীক শিল্পকলার কথা।

স্বামীজির প্রাণবন্ত ভাষারীতিতে যেমন প্রকৃতি, তেমন মানবজীবন দীপ্তিতে সমুজ্জ্বল হয়েছে। একটি দুটি উদাহরণ দিই। মার্কিনী বর্ণ বিদ্বেষের স্বরূপ: অন্তর্নিহিত বেদনাকে সরস ব্যঙ্গে পরিণত করা — “যা কিছু সাহেব হবার সাধ ছিল, মিটিয়ে দিল মার্কিন-ঠাকুর। দাড়ির জ্বালায় অস্থির কিন্তু নাপিতের দোকানে ঢোকবামাত্রই বললে, “‘ও চেহারা এখানে চলবে না।’ মনে করলুম, বুঝি পাগড়ি মাথায় গেরুয়া রঙের বিচিত্র ধোকড়ামাত্র গায়, অপরূপ দেখে নাপিতের পছন্দ হল না, তা একটা ইংরেজি কোট আর টোপা কিনে আনি। আনি আর কি – ভাগ্যিস একটি ভদ্র মার্কিনের সঙ্গে দেখা, সে বুঝিয়ে দিলে যে বরং ধোকড়া আছে ভাল, ভদ্রলোকে কিছু বলবে না, কিন্তু ইউরোপি পোষাক পরলেই মুস্কিল, সকলেই তাড়া দেবে।”

“… খিদেয় পেট জ্বলে যায়, আবার দোকানে গেলুম, ‘অমুক জিনিষটা দাও।’ বললে, ‘নেই’। ‘ঐ যে রয়েছে।’ ‘ওহে বাপু সাদা ভাষা হচ্ছে, তোমার এখানে বসে খাবার জায়গা নেই।’ ‘কেন হে বাপু?’ ‘তোমার সঙ্গে যে খাবে তার জাত যাবে।’ তখন অনেকটা মার্কিন মুলুককে দেশের মত ভাল লাগতে লাগলো।”

এছাড়া আছে সমুদ্রযাত্রায় রঙের পরিবর্তনের খেলার কথা, ফরাসী ও জার্মান শিল্পচেতনার তুলনা, সমুদ্রপীড়ার কথা। মানবচরিত্র বিশ্লেষণ-নৈপুণ্য ফুটেছে সুন্দরভাবে সিংহলীদের বর্ণনায় — “ওদের না কথায় ঝাল, না প্রকৃতিতে ঝাল!! রাম বলো – ঘাঘরা পরা, খোঁপা বাঁধা, আবার খোঁপায় মস্ত একখানা চিরুনি দেওয়া মেয়েমানুষি চেহারা।”

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপরিভ্রমণ করেছেন, কয়েকটি দেশ বারংবার। জাপান যাত্রার আগে কথা দিয়েছিলেন ভ্রমণকথা লিখবেন, যা ধারাবাহিক প্রকাশিত হবে সবুজপত্রে। প্রমথ চৌধুরীকে লেখেন – লেখায় ভ্রমণকথা কতোটা ধৃত হবে জানেন না, হয়তো তা হবে খেয়ালি মনের কয়েকটি অধ্যায়। চিঠি, ডায়েরী ইত্যাদি পরে সংকলিত হয়েছে বিশ্বভারতী প্রকাশিত ‘বিশ্বযাত্রী রবীন্দ্রনাথ’ বইটিতে। তাঁর ভ্রমণকথার বই আটটি — ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’ (১৮৭৮ এর প্রথম ইংল্যাণ্ড যাত্রা), ‘য়ুরোপ যাত্রীর ডায়েরী’ (১৮৯০ এ দ্বিতীয় ইংল্যাণ্ড যাত্রা), ‘পথের সঞ্চয়’ (১৯১২-১৩ তে তৃতীয় ইংল্যাণ্ড যাত্রা), ‘জাপান যাত্রী’ (১৯১৬ তে প্রথম জাপান যাত্রা), ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়েরী’ (১৯২৪-২৫ দক্ষিণ আমেরিকা যাত্রা), ‘জাভা যাত্রীর পত্র’ (১৯২৭-এ জাভা ও বালি যাত্রা), ‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩০ এ রাশিয়া ভ্রমণ), ‘পারস্য যাত্রী’ (১৯৩২ এ পারস্য ও ইরাক ভ্রমণ)। ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ বইতেও ভ্রমণ আছে। এ ছাড়াও নানা দেশজ ভ্রমণের পরিচয়ও মেলে রবীন্দ্রজীবনী ও স্মৃতিকথা পড়লে। নোবেল পুরস্কার পাবার আগের কিছু ভ্রমণে দেশ ও মানুষ দেখার কৌতূহল ও লেখকস্বভাব ফুটেছে। পরে আমন্ত্রিত ভ্রমণ, রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ। কিন্তু সর্বত্রই এসেছে রবীন্দ্রনাথের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, শাণিত উপলব্ধি, স্বদেশকে কেন্দ্রে রেখে সেই দেশ জাতি প্রকৃতি সম্পর্কে তুলনামনস্কতা, রঙ্গ রসিকতা বিবরণকে করে তুলেছে উপভোগ্য। ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’ সম্পর্কে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলেছিলেন – ‘একজন বাঙালি ইংলণ্ডে গেলে কিরূপে তাহার মত গঠিত ও পরিবর্তিত হয় তাহার একটা ইতিহাস পাওয়া যায়।’ রবীন্দ্রনাথ চারুচন্দ্র দত্তকে অনেক পরে বলেন – ‘সেই প্রথম বয়সে যখন ইংলণ্ডে গিয়েছিলুম, ঠিক মুসাফেরের মতো যাই নি। অর্থাৎ রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে বাহির থেকে চোখ বুলিয়ে যাওয়া বরাদ্দ ছিল না – ছিলেম অতিথির মতো, ঘরের মধ্যে প্রবেশ পেয়েছিলুম।’ (‘রবীন্দ্র রচনাবলী’, ১০ম, জন্ম শতবার্ষিক সংস্করণ, পৃ. ৩৪০) অর্থাৎ শুধু চোখ বোলানো নয়, ভেতরে এসে বোঝার পরিচয় থাকছে এসব লেখায়। বিচিত্র অনুভূতি ও বিচার মনস্কতার এবং তীক্ষ্ণ অবলোকনের পরিচয় মিলবে এই সব ভ্রমণগ্রন্থে। ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্রে’ পাই সমুদ্র বর্ণনা, জাহাজের নানা প্রকার যাত্রী, গ্রন্থপ্রসঙ্গ, প্যারিস দেখা, ইংরেজ জনজীবন, ইংরেজ বিবিরা, ফ্যান্সি বল, আবহাওয়া, হাউস অফ কমন্স, রামপ্রসাদের ও দ্বিজেন্দ্রনাথের গানে ইংরেজ, থ্যাকারের রচনায় ইংরেজ সমাজ ও ভ্রমণপ্রসঙ্গ, স্ত্রী স্বাধীনতার কথা। ‘য়ুরোপ যাত্রীর ডায়ারী’ বইতে আছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্ত্যজীবন, য়ুরোপীয় ও ভারতীয় স্ত্রীলোক, সূর্যাস্ত বর্ণনা, সঙ্গীত কথা, সমুদ্রপীড়া, ফরাসী চিত্র প্রদর্শনী, ম্যাথু আর্নল্ড ও আলফঁস দোদের রচনা কথা। আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের এই ইংল্যাণ্ড ভ্রমণ বিষয়ক বই দুটি সমসাময়িক বাঙালির লেখা ইংল্যাণ্ড ও ইউরোপ ভ্রমণ বিষয়ক রচনার সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে তুলনামূলক পর্যবেক্ষণের নানাত্ব প্রকাশ পাবে। যেমন – শিবনাথ শাস্ত্রীর ইংলণ্ডের ডায়েরী, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের A Visit to Europe (১৮৮৯), কৃষ্ণভাবিনী দাসের ‘ইংলণ্ডে বঙ্গমহিলা’ (১৮৯১) রমেশচন্দ্র দত্তের Three Years in Europe (১৮৯৬), কেশব সেনের Diary in England প্রভৃতি। অনুরূপ ভাবে ‘জাপান যাত্রী’ পড়তে হবে হরিপ্রভার ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’, অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘জাপানে’, বুদ্ধদেব বসুর ‘জাপানি জর্নাল’ (১৯৬২) প্রভৃতি বইয়ের সঙ্গে।

‘জাপান যাত্রী’ বইতে পাই এডেন বন্দর, সে দেশের প্রকৃতি, জাপানী মাল্লা, জাপানী মেয়েদের জীবন, চীনের নৌকা, জাপানে পাশ্চাত্ত্য সভ্যতা, হাইকু, সাইক্লোন, জাপানী নাচ, প্রাচীন চীনা চিত্রকলা প্রভৃতি প্রসঙ্গ। ‘জাভাযাত্রীর পত্র’ বইতে বিবরণ অপেক্ষা সমাজ বিশ্লেষণ এবং স্বরচিত কবিতা আছে। এখানে মেলে প্রকৃতি বর্ণনা, মালয় উপদ্বীপের বিবরণ, রাজ পরিবেশ, বালীদ্বীপ, নাচ ও নৃত্যনাট্য, রামায়ণ মহাভারতের প্রভাব কথা।

‘রাশিয়ার চিঠি’তে আছে ভারত ও ইংলণ্ড, শ্রীনিকেতন ও রাশিয়ার তুলনা, মস্কো, রুশ বিপ্লব, রাশিয়া দেখে ভারতীয়দের দুঃখ, বিদ্যাশিক্ষা, চাষীদের উন্নতি চেষ্টা, শিক্ষা কৃষি যন্ত্র বিষয়ে গুরুত্ব, পল্লীভ্রমণ, থিয়েটার সিনেমা হাসপাতাল, শ্রমিকদের জন্য ব্যবস্থা, সমবায় প্রণালী কথা। এই তাৎপর্যপূর্ণ বইটির পর্যালোচনা দরকার মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মহাসোভিয়েত’, সেরিনা জাহানের ‘ধূসর মস্কো’, প্রবোধ সান্যালের ‘রাশিয়ার ডায়েরী’ প্রভৃতি বইয়ের সঙ্গে।

‘পারস্যযাত্রী’ বইতে পাই বুশেয়ারে সরকারী আতিথ্য, বোগদাদ, শিরাজ, কবি সাদির সমাধি, ইস্পাহান, তেহেরান, কির্মানাশার কথা, সঙ্গে পাহাড়ী পথ, দেশী ভোজ্য, মরুর মানুষ ও বাংলা মানুষের তুলনা এবং অনেক টুকরো ছবি।

রবীন্দ্র ভ্রমণ সাহিত্যের কিছু বারবার পাঠযোগ্য পংক্তি সন্নিবেশ করা যাক —

(ক) কিন্তু যখন সমুদ্রের মধ্যে এসে পড়ি তখন মনে হয় যে, জাহাজ যেন চলছে না, কেবল একটি দিগন্তের গণ্ডির মধ্যে বসে আছে। আমাদের কল্পনার পক্ষে সে দিগন্তের সীমা এত সংকীর্ণ যে মন কেমন তৃপ্ত হয় না। ….. বাল্মীকি থেকে বায়রন পর্যন্ত সকলেরই যদি এই সমুদ্র দেখে ভাব লেগে থাকে, তবে আমার না লাগলে দশজনে যে হেসে উঠবে; গ্যালিলিওর সময়ে একথা বললে হয়তো আমাকে কয়েদ যেতে হত। (‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’)(খ) কুসংস্কার মানুষকে কতদূর অন্ধ করে তোলে তা বাঙলার অশিক্ষিত কৃষীদের মধ্যে অনুসন্ধান করবার আবশ্যক করে না, ঘোরতর সভ্যতাভিমানী বিলিতি বাঙালিদের মধ্যে তা দেখতে পাবে। হঠাৎ বিলেতের আলো লেগে তাঁদের চোখ একেবারে অন্ধ হয়ে যায়। (ঐ)

(গ) যদি বা স্ত্রী স্বাধীনতার সময় আমাদের দেশে এখনও না এসে থাকে তবে সেই সময় যত শীঘ্র আসে আমাদের তার চেষ্টা করা উচিত। (ঐ)

(ঘ) য়ুরোপীয়ের গৃহবন্ধন অপেক্ষাকৃত শিথিল বলে তাঁদের মধ্যে অনেকে যেমন সমস্ত ক্ষমতা স্বজাতি কিম্বা মানব-হিতব্রতে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন তেমনি আর এক দিকে অনেকেই সংসারের মধ্যে কেবলমাত্র নিজেকেই লালন পালন পোষণ করবার সুদীর্ঘ অবসর এবং সুযোগ পাচ্ছেন। (‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারী’)

(ঙ) ছলনাপ্রিয় ললনার মতো তাঁর সিগারেট মুহুর্মুহু কেবলই লুকোচ্ছে এবং ধরা দিচ্ছে এবং তাঁর চিত্তকে অহর্নিশি উদভ্রান্ত করে তুলছে। (ঐ)

(চ) আমি ইবসেন এর নাটক পড়ছিলুম, তাতে একটা এই আশ্চর্য ব্যাপার দেখলুম – যত সব স্ত্রীলোকেরাই সমাজবিপ্লবের জন্যে ব্যাকুল। (ঐ)

(ছ) হোলির রাত্রে হিন্দুস্থানি দরোয়ানদের খচমচির মতো বাতাসের লয়টা ক্রমেই দ্রুত হয়ে উঠল। (‘জাপান যাত্রী’)

(জ) সমুদ্র হচ্ছে নৃত্যলোক, আর পৃথিবী হচ্ছে শব্দলোক। (ঐ)

(ঝ) আমার পরম সৌভাগ্য এই যে, কদর্যতার লৌহবন্যা যখন কলকাতার কাছাকাছি দুই তীরকে, মেটেবুরুজ থেকে হুগলী পর্যন্ত গ্রাস করবার জন্যে ছুটে আসছিল আমি তার আগেই জন্মেছি। (ঐ)

(ঞ) এই প্রকাশের জগৎ, (সমুদ্র আলো-অন্ধকার প্রসঙ্গে) এই গৌরাঙ্গী, তার বিচিত্র রঙের সাজ পরে অভিসারে চলেছে — ওই কালোর দিকে, ঐ অনির্বচনীয় অব্যক্তর দিকে। (ঐ)

(ট) জাপান যে নতুন মদ পান করেছে এই খবরের কাগজের ফেনিলতা তারই একটা অঙ্গ। এত ফেনা আমেরিকাতেও দেখি নি। (ঐ)

(ঠ) মানুষের মধ্যে যার বিদ্রোহশক্তি যত প্রবল, যত দুর্দমনীয়, ইতিহাসকে ততই সে যুগ হতে যুগান্তরে অধিকার করছে শুধু সত্তার ব্যাপ্ত দ্বারা নয়, সত্তার ঐশ্বর্য দ্বারা। (‘জাভা যাত্রীর পত্র’)

(ড) মহাভারতে খাণ্ডববন-দাহনের মধ্যেও এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের (অরণ্যের সঙ্গে কৃষি ক্ষেত্রের) আভাস পাই। (ঐ)

(ঢ) রেলগাড়ি এখানে নেই, কিন্তু আধুনিক কালের ভবঘুরে যারা এখানে আসে তাদের জন্যে আছে মোটর গাড়ি। অতি অল্পকালের মধ্যেই তাদের দেখাশুনো ভোগ-করা শেষ করা চাই। তারা আঁটকালের মানুষ এসে পড়েছে অপর্যাপ্ত কালের দেশে। (ঐ)

(ণ) তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে – উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গড়িয়ে পড়ে। (তারা = পরিশ্রমজীবী) (‘রাশিয়ার চিঠি’)

(ত) রাশিয়া যে কাজে লেগেছে এ হচ্ছে যুগান্তরের পথ বানানো; পুরাতন বিধি বিশ্বাসের শিকড়গুলোকে তার সাবেক জমি থেকে উপড়ে দেওয়া; চিরাভ্যাসের আরামকে তিরস্কৃত করা। (ঐ)

এই সব উদাহরণ আমাদের অনুভবকে উদ্দীপ্ত করে, আমাদের বিচার-মনস্কতাকে উসকে দেয়, তাই তার পাঠযোগ্যতা আজও বহমান।

সম্প্রতি আমাদের দৃষ্টিগোচরে এসেছে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর তিব্বত প্রসঙ্গ সহ দার্জিলিং ভ্রমণ কথা, যেগুলি ‘সখা’ ‘সাথী’ ‘সন্দেশ’ ‘মুকুল’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। উপেন্দ্রকিশোরের আঁকা ছবি, আলোকচিত্র বইটির মনোহরণ করেছে। তাঁর রচনার সুখপাঠ্যতার নমুনা পেশ করি —

‘পর্বতের কোলে মেঘের নিদ্রা দেখিতে বড়ই সুন্দর। চঞ্চল মেঘ সমস্ত দিন ধরিয়া ছুটাছুটি করে। তাই কি সন্ধ্যাকালে তাহার ঘুম পায়? ওই দ্যাখো, তাহারা কেমন শান্ত হইয়া পর্বতের গায়ে শুইয়া পড়িয়াছে। সমস্ত রাত্রি তাহারা ওই রূপ ভাবে কাটায়। সকালবেলা সূর্যের আলো তাহাদের গায়ে পড়িবামাত্র তাহাদের ঘুম ভাঙিয়া যায়।’

কবি-কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক বুদ্ধদেব বসুর বেশ কয়েকটি ভ্রমণ গ্রন্থ আছে। সেগুলি হল – ‘আমি চঞ্চল হে’ (১৯৩৭, বিয়ের পর সস্ত্রীক ভুবনেশ্বর, পুরী, কোনারক, চিল্কা ভ্রমণ), ‘সমুদ্রতীর’ (১৩৪৪, ক্রিসমাসে স্ত্রী ও শিশুকন্যাসহ গোপালপুর ও ওয়ালটেয়ার ভ্রমণ), ‘সব-পেয়েছির দেশে’ (১৯৪১, রবীন্দ্র-সকাশে শান্তিনিকেতন ভ্রমণ), ‘দেশান্তর’ (১৯৬৬, অধ্যাপনা, বক্তৃতা উপলক্ষে পিটসবার্গ, জাপান, হনলুলু, আমেরিকা, ইউরোপ, মিশর ভ্রমণ)। প্রথম দুটি বই প্রসঙ্গে চঞ্চলকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন – বুদ্ধদেবের সূক্ষ্মদৃষ্টিভঙ্গি, সরস সাহিত্যের আমেজ তাঁর লেখনীকে করে তুলেছে অনন্য। পাঠকের ইচ্ছে হবে সমুদ্র তীরের দেশগুলোতে পুনর্বার নতুন চোখে বেড়িয়ে আসতে। ধরা পড়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের স্বরূপ। (‘পরিচয়’, পৌষ ১৩৪৪) রবীন্দ্রনাথ ও সেই পরিবেষ্টনীর উপস্থাপন উজ্জ্বল, ঝরঝরে ভাষায় বইটিকে করে তুলেছে সরস সুখপাঠ্য। সেই সঙ্গে আছে সাহিত্য ও সমাজ, স্বদেশ ও বিদেশ সম্বন্ধে লেখকের মতামত। (‘চতুরঙ্গ’, আশ্বিন ১৩৪৮) অন্যদিকে প্রতীচ্য ভ্রমণ বিচিত্রতা যথেষ্ট সুখপাঠ্য, চিন্তাপ্রদ ও তুলনাপ্রবণ। যেমন – বুদ্ধদেবের জাপান বৃত্তান্ত পড়া উচিত, অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘জাপানে’, নারায়ণ সান্যালের ‘জাপান থেকে ফিরে’, বিকাশ বিশ্বাসের ‘উদিত ভানুর দেশ জাপান’, প্রভৃতি বইয়ের সঙ্গে। বুদ্ধদেব ‘দেশান্তর’ প্রসঙ্গে নরেশ গুহকে যথার্থই বলেছিলেন – ‘আমার ভ্রমণ কাহিনীতে ভ্রমণের অংশটা অনেক দূরে এগিয়ে গেলো, কাহিনী রইল পিছনে পড়ে।’ বুদ্ধদেব যুবক বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন – ‘সমস্ত জীবনটার উপর যেন অভ্যাসের ঢাকনা পড়ে যায়, উপভোগের সূক্ষ্ম মুখগুলো সেই পুরু খোলশ ফুঁড়ে পৌঁছতে পারে না। তখন, যে করেই হোক, জীবনটাকে নতুন করে নিতে হয়। এবং সকলেই জানে, এই নতুন করে নেয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে —ভ্রমণ। কিছুদিন বাইরে ঘুরে ফিরে এলেই পুরোনো জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করি, নতুন — এবং দ্বিগুণ-উৎসাহ নিয়ে তাকে ভালবাসি।’ (‘আমি চঞ্চল হে’) তাঁর পর্যবেক্ষণের দু একটি নমুনা —

(ক) জাপান পৃথিবীর একটি দেশ যেখানে পকেট থেকে কার্ড বের করতে না পারলে বর্বর প্রতিপন্ন হতে হয়। (‘দেশান্তর’)(খ) ভোজনশালার কাচের দরজা খুলে দেবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে দুটি রাফায়েলের দেবদূত, আর ভিতরে এক রুবেন্সীয় জগৎ ঐশ্বর্যে ও ইন্দ্রিয়বিলাসে উদ্বেল। (‘দেশান্তর’)

(গ) সারা দেশটা পারিতোষিকের উৎপাতরহিত। (‘দেশান্তর’)

(ঘ) আজকাল যাকে বলা হচ্ছে meritocracy বা গুণতন্ত্র, এই দেশ (আমেরিকা) তার এক পীঠস্থান। (‘দেশান্তর’)

(ঙ) যাকে বলছি যৌবনোচিত মনোভাব তারই সঙ্গে সম্পৃক্ত এদের তৃপ্তিহীন নতুনত্ব প্রীতি। (‘দেশান্তর’)

(চ) বীট কবিদের ঘোষণাও তাই; সমাজ তাঁদের মতে এতই ঘৃণ্য যে তার সঙ্গে বৈরিতার সম্বন্ধ স্থাপনও অসম্ভব; শুধু বিশেষ কোনো দেশকালের নয়, যে-কোনো সমাজই পরিত্যাজ্য। (‘দেশান্তর’)

জাপান ভ্রমণবর্ণনায় মেলে জাপানী চরিত্র, ভোজনপ্রথা, আত্মমর্যাদাবোধ, জাপানী ও ভারতীয় মেয়ের তুলনা, জেন মঠ ও ধর্মকথা, প্রাচীন জাপ সাহিত্য, গেইশা ভবন, ভিজিটিং কার্ডে আগ্রহ, ফুজিয়ামা, কাবুকি নৃত্য, স্নানঘর কথা। আমেরিকা প্রসঙ্গে পাব — বরফাবৃত রাস্তা, য়ুরোপীয় শ্রেণীভেদ, জনস্বভাবের তুলনা, গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতা কথা, হলিউড প্রসঙ্গ ইত্যাদি।

এককথায় তাঁর সমগ্র ভ্রমণ রচনায় অনেক কিছু মন্তব্যই আছে যা পছন্দ হতে পারে, না পারে, কিন্তু thought provoking সন্দেহ নেই।

অন্নদাশঙ্কর রায় ইউরোপ গিয়েছিলেন ১৯২৬-এ, পরীক্ষা দেওয়া ছিল লক্ষ্য। তিনি বলেন – ‘যেদিন আমি বিদেশ যাত্রা করেছিলুম সেদিন শুধু দেশ দেখতে যাইনি। গেছলুম মানুষকেও দেখতে। মানুষের সঙ্গে মিলতে, মানুষের সঙ্গে নানা সম্বন্ধ পাতাতে।’ তাঁর ইউরোপ দেখা শুরু লণ্ডন থেকেই। পরে পারি, জার্মানি, সুইজারল্যাণ্ড ইত্যাদি। ভ্রমণরসিকের মতই লণ্ডনকে তুলনা রেখে বলেন পারির গরিবিয়ানা, বাড়িঘর সাজানোর দীনতা, প্রশস্ত রাজপথের সৌন্দর্য, পারির গলিতে গলিতে কাফে ও সেখানে অফুরান আড্ডা, পারির থিয়েটার, ক্যাবারে, লুভর মিউজিয়ামের কিছু উল্লেখ্য চিত্র ভাস্কর্য সম্পদের কথা। তাঁর শাণিত গদ্যভাষা পাঠকের বুদ্ধি বিচারকে উদ্দীপ্ত করে যায়। অন্নদাশঙ্করের বিশের দশকের মাঝামাঝি এই ভ্রমণ আলেখ্য অবশ্য তাঁর চিন্তার ধরণ ও সীমাবদ্ধতা আজকের পাঠে প্রকট করে তোলে। যেমন – যুদ্ধ সম্পর্কে মনোভাব (যুদ্ধ যদি উঠে যায় তবে যৌবনের পক্ষে সে বড় দুর্দিন) কিংবা জার্মানি সম্পর্কে ধারণা (জার্মানিতে এসে দেখতে পাচ্ছি জাতির জীবনে বসন্ত এসেছে) অথবা ভারতীয় কলা-ঐতিহ্য প্রসঙ্গ (ভাস্কর্য আমাদের নেই) বইটির জনপ্রিয়তা বহমান বলেই প্রমথ চৌধুরীর সার্টিফিকেট স্মরণ করা চলে। তা হল — ‘এই নবীন লেখকের ইন্দ্রিয় ও মন দুই সমান সজাগ, আর তাঁর চোখে ও মনে যখন যা ধরা পড়ে তখনই তা ভাষাতে ফুটে ওঠে।’ একালের কোনো কোনো সমালোচক বইটি সম্পর্কে তির্যক মন্তব্য করলেও প্রমথবাবুর মনে হয়েছে — ‘এ শুধু ভ্রমণ-বৃত্তান্ত নয়, একখানি যথার্থ সাহিত্যগ্রন্থ।’

সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ (১৯৪৯) ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশের সময়ই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে প্রধানতঃ দুটি কারণে – (ক) এক অজানিত জগতে যাত্রার পরিচয় (খ) দীপ্তোজ্জ্বল কথনশৈলী। এ-বই আড্ডাধারীদের মধ্যে গল্প জমানোর ভঙ্গিতে বলা, পরিহাস ও বক্রোক্তিতে খুব উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এ বইয়ের প্রথম অংশ — হাওড়া স্টেশন থেকে লেখকের কাবুল যাত্রা; দ্বিতীয় অংশ — লেখকের কাবুল জীবন; তৃতীয় অংশ — শিনওয়ারীদের বিদ্রোহ ও লেখকের কাবুল ছেড়ে স্বদেশে চলে আসা। পাঠক পাবেন — বিচিত্র চরিত্রসমূহ, উপস্থাপনার অভিনবত্বে অনুপম — যেমন — পেশোয়ারের পাঠান বন্ধু আহমদ আলী, যে লেখকের মাথায় দশগজী পাগড়ী বেঁধে কাবুলের বাসে তুলে দেয়। রাতকানা ড্রাইভার, তার পাশে লেখক ও রেডিও কেন্দ্রের কর্মচারী – বেতার ওয়ালা। এছাড়া রুশ অধ্যাপক বাগদানফ, অধ্যাপক দোস্ত মহম্মদ, ফারসী শিক্ষা সহায়ক মীর আসলাম প্রভৃতি। চরিত্রায়নের পাশে উল্লেখ্য – পরিস্থিতির বর্ণনা। যেমন – ‘গাড়ি যেন কালোয়াৎ। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে, কোনো গতিকে রোদ্দুরের তবলচীকে হার মানিয়ে যেন কোথাও গিয়ে ঠাণ্ডায় জিরোবে। আর রোদ্দুরও চলেছে সঙ্গে সঙ্গে ততোধিক ঊর্ধ্বশ্বাসে। সে পাল্লায় প্যাসেঞ্জারের প্রাণ যায়।’ পাহাড়ী চড়াই, আতঙ্কবিস্তারী পথ, মরুপ্রান্তর প্রভৃতি বর্ণনায় বিরূপ পরিস্থিতি থেকে মজা বার করার প্রয়াস। টুকরো বর্ণনা উপমার অভিনবত্বে হয়ে ওঠে অনন্য — যেমন – ‘পয়লা সিলেবলে অ্যাকসেন্ট দেওয়া খারাপ রান্নায় লঙ্কা ঠেস দেওয়ার মতো – সব পাপ ‘ঢাকা’ পড়ে যায়। সোজা বাঙলায় এরি নাম গাঁকগাঁক করে ইংরিজি বলা।’ কিংবা – ‘সব কিছু পণ্ড না হলে পণ্ডিত হয় না।’ অথবা – ‘অরক্ষণীয়া কন্যার যেরকম বিয়ে হয় নি, আফগানিস্তানেরও ইতিহাস তেমনি লেখা হয় নি।’ অথবা – ‘সেদিনের রান্না হয়েছিল যেন হাফিজের একখানা উৎকৃষ্ট গজল।’ মুজতবার বৈশিষ্ট্য – মননকে বৈঠকী রীতিতে, রসালো চুটকিতে প্রকাশ। বইটিতে আছে নানা জটিল সমস্যা, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কথা, সাংস্কৃতিক বিচার – কিন্তু সব সিরিয়স বিষয়ই তিনি গাম্ভীর্য পরিহার করে রঙ্গরসের ভঙ্গিতে হাজির করার দুর্লভ ক্ষমতা রাখেন।

সতীনাথ ভাদুড়ী ১৯৪৯, ২৭ সেপ্টেম্বর প্যারিস যাত্রা করেন। ২রা জুন, ভারতের উদ্দেশে জাহাজযাত্রা মারফত ফিরে আসেন। এটি নিজব্যয়ে দেশভ্রমণ – খরচে সতর্কতা অবশ্য ছিল। লেখাটি ‘দেশ’ ১৩৫৭ চৈত্র – ১৩৫৮ শ্রাবণ ধারাবাহিক প্রকাশ হয়। ‘পথে প্রবাসে’ প্রসঙ্গে প্রমথ চৌধুরী – ‘এ শুধু ভ্রমণ বৃত্তান্ত নয়, একখানি যথার্থ সাহিত্যগ্রন্থ।’ এ কথা সতীনাথের বই সম্পর্কেও বলা চলে। বইটি প্রচলিত ভ্রমণ বৃত্তান্তের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত এক আশ্চর্য রসসাহিত্য কখনো ডায়েরি, কখনও আত্মরসের সঙ্গে কাহিনীরসের মিশ্রণ কৌতুকস্নিগ্ধ মনের প্রীতিরসে সিঞ্চিত। গোপাল হালদারের ভাষায় – বইটি A Passage to France একথা মানা যায়। অ্যানি-লেখক অধ্যায় বইটির অনেকখানি জুড়ে আছে, এতে ব্যক্তিস্পর্শ মেলে। বইটিতে ইউরোপীয় শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি মানুষের জীবনধারা প্রসঙ্গে লেখকের সত্যি অভিজ্ঞতার স্বাদ আছে। ফরাসী সভ্যতা সাধারণ মানুষ সংস্কৃতি সম্পন্ন জাতির পছন্দ অপছন্দ আন্তরিকতা অনুরাগী স্বভাবের কথা জানা যাবে। আর আছে ফরাসীরা কি ধরনের বই পড়তে ভালোবাসে। খেলাধূলা আমোদ বৈশিষ্ট্য বাঙালি স্বভাবের সঙ্গে সাদৃশ্য কথা। ফরাসী অন্তরঙ্গ মনের গভীর চেহারা — তাদের বিশ্বমানসিকতা বোধ এখানে পাই। এ বইটি পড়তে পড়তে আমরা পাই উপন্যাসের আখ্যানরস এবং ভ্রমণকাহিনীর ভ্রমণ রসের অপূর্ব রসালেখ্য। অন্য ফরাসী দেশ ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে নানা কারণেই বইটির স্বাতন্ত্র্য চোখে পড়ে যায়।

‘অর্ধেক জীবন’ বইতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন – ‘যে পৃথিবীতে জন্মেছি তাকে পুরোপুরি দেখব না?’ প্রকৃতি, মানুষ, বিভিন্ন জায়গায় বিচিত্র ইতিহাস সুনীলকে বারবার টেনে নিয়ে গেছে। নিজের রাজ্য আর দেশকেও সে চিনত হাতের তালুর মতো। তাঁর ‘ভ্রমণ সমগ্র’ বেরিয়েছে যাতে অনেকগুলি বই আছে। ‘তিন সমুদ্র সাতাশ নদী’, ‘কবিতার জন্য সারা পৃথিবী’, ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ এই তিনটি বইয়ের মধ্যে শেষেরটি মাঝে মধ্যে পড়ি। পাঁচবারের ফ্রান্স দেখা, মানুষজন, প্রকৃতি ও আবহ চিত্রশিল্প আন্দোলন প্রভৃতির সঙ্গে মিশে আছে আমেরিকার বিট সম্প্রদায় ও গ্রিনিচ গ্রামের কবিদের সঙ্গে আড্ডার কথা। মার্গারেট-এর সঙ্গে প্রেম বইটিকে এক স্বর্গস্বাদের আনন্দ ও বিষাদে পূর্ণ করেছে। কবিতাপ্রিয় মানুষের বাড়তি পাওনা প্রতি অধ্যায়ের শুরুতে বিশ্বখ্যাত ফরাসী কবিদের কবিতাংশের অনুবাদ। নানা ধরনের উদ্বোধন ঘটে যায় হৃদয়ে – এ এক বিরল ভ্রমণসাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা। ‘কবিতার জন্য সারা পৃথিবী’ বইতে অভিজ্ঞতার এলাকা আফ্রিকা, জাপান, নিউইয়র্ক, নিউজিল্যাণ্ড, ম্যাসিডোনিয়া প্রভৃতি দেশে কবিতা সম্মেলনে যাওয়ার গল্পে আছে সে দেশ ঘুরে দেখার টুকরো কথা।

সুনীলেরই সমসাময়িক নবনীতা দেবসেন যার ভ্রমণও বহুধা বিস্তৃত – ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, চীন পর্যন্ত। তাঁর ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’ (কুম্ভস্নান), ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমোহনে’, ‘হে পূর্ণ তব চরণের কাছে’ প্রভৃতি অতীব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এক রম্য দৃষ্টিতে, জগৎসংসার নিয়ে মজা করতে করতে এগোন তিনি। কৌতুক তাঁর রচনায় নিজেকে নিয়েও অথচ দৃষ্টি জাগর সিরিয়াস থেকে যাবতীয় নন সিরিয়াসেও। ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’ বইয়ের আত্মকৌতুকের একটি অংশ – ‘এদিকে বুড়োদের যাবতীয় রোগটোগ, বাত হাঁপানি-প্রেসার, আবার ওদিকে যৌবন টৌবন – বেচারী মা একা কতদিক সামলাবেন? তাঁর গুণবতী কন্যেটি যেন সেই মেঘদূতের যক্ষপুরী, যেখানে সব ঋতুর ফুল এক সঙ্গে ফুটেছে। এ কী দুর্দৈব বল দেখি!’ তাঁর সমকালীন বাঙালী মহিলা লেখিকাদের রচনায় এই পাণ্ডিত্য ও সরসতার, আত্ম ও বিশ্ববোধের ভ্রাম্যমানতা চোখে পড়ে না।

আর একজনের কথা বলি। ইনি অকালপ্রয়াত সাংবাদিক বিক্রমন নায়ার, যিনি জন্মসূত্রে কেরলীয়, কিন্তু শিক্ষা কর্ম সাহচর্য সূত্রে এক্কেবারে বাঙালি। তাঁর দুটি ভ্রমণকাহিনী – ‘দুই ইউরোপের দিনলিপি’ (১৯৯১) এবং ‘পশ্চিম দিগন্তে, প্রদোষকালে’ (১৯৯৪)। এই দুটি ভ্রমণকাহিণী আমি কেনার পর থেকে প্রায় প্রতিবছরই পড়ি আর আনন্দ পাই। প্রথম বইটিতে আছে নয়ের দশকে সুইডেন থেকে পোলাণ্ড, সেখান থেকে হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত দেশ ভ্রমণ, যখন লক্ষ্য করেন জনজীবনের এক অভিজ্ঞতা, ভাঙনের প্রাক্কালে তীরের দিকে ধাবমান তরঙ্গপ্রবাহ, সঙ্গে সাহিত্য সংস্কৃতিতে এই মনোচাঞ্চল্যের টুকরো কথা। দ্বিতীয় বইটির কেন্দ্রে আছে স্পেন, কথায় কথায় চলে আসে সূর্য সেনের অনুগামী কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী, কেরল সমুদ্রতীরের ধীবর, পশ্চিম বাংলার আশ্রয়দাতা গরীব শিক্ষক, জার্মান প্রবাসী সোভিয়েত বন্দিশিবিরে নির্বাসিত কেপেলভ। এ বইতেও জনমনস্কতার পাশে পাশে আছে সাহিত্য সংস্কৃতিকথা – ওই জনমনস্ক দৃষ্টিকোণে। বইটির ভাষা, উপমা ব্যবহার আমাকে বারংবার চমৎকৃত করে। ‘পশ্চিম দিগন্তে, প্রদোষকালে’ বইটির শুরুটাই অবাক করে দেয়। একমাস তিন দিনের এই ইউরোপ ভ্রমণ প্রসঙ্গে তিনি দস্তয়ভস্কির ‘কারামাজভ ভ্রাতা’র মেজভাই ইভানের খেদোক্তি দিয়ে শুরু করেন — ‘আলোশা, আমি ইউরোপ যাব। অথচ জানি আমি সেইখানে দেখতে যাচ্ছি শুধু এক শ্মশান, কিন্তু জান সে শ্মশানটি মহামূল্যবান। সেই শ্মশানে শায়িত যাঁরা তাঁদের অনেক মূল্য।’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ মনে পড়া স্বাভাবিক, তবে স্বাদ আলাদা। জাত ভ্রামণিকের মতো বিক্রমণ বলেন – নতুন অজানা অঞ্চলের সঙ্গে পরিচয় করতে প্রথমেই করণীয় পায়ে হেঁটে এবং উদ্দেশ্যহীন ভাবে পথেঘাটে একটু ঘুরে বেড়ানো, তারপর তৈরি হবে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের প্রকল্প। দেশ ও বিদেশের সমাজ, সংস্কৃতির কতো যে কথা ছড়িয়ে আছে এ দুটি বইতে তা বলে শেষ করা যাবে না।

খুব হাল আমলে সাহিত্য গুণান্বিত ভ্রমণ কাহিনী বেশী চোখে পড়ে না। দু একটি লিটল ম্যাগাজিনে দু একটি লেখা অবশ্য পেয়েছি। এই স্বল্পতার কারণ সম্ভবত: ব্যাপক ট্যুরিস্ট মাইণ্ডেডনেস এবং প্যাকেজ নিয়ন্ত্রিত ট্যুর – এ দুটিই ভ্রমণ সাহিত্য রচনার অন্তরায় বলে মনে হয়।

 

Facebook Comments