ঈদ সাময়িকী ॥ প্রবন্ধ/নিবন্ধ

বাংলাদেশে বইয়ের সংস্কৃতি

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ | ৩:১৭ অপরাহ্ণ | 555 বার

বাংলাদেশে বইয়ের সংস্কৃতি

বাংলাদেশে বইয়ের সংস্কৃতি
॥ আহমাদ মাযহার ॥

ইংরেজিতে কালচার শব্দটির মাধ্যমে সাধারণ অর্থে বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ও জ্ঞানের পরিচয় বোঝায়; বাংলা পরিভাষায় তাকেই বলা হয় সংস্কৃতি। বর্তমান রচনায় বইয়ের সংস্কৃতি কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে সেই অর্থে; অর্থাৎ মুদ্রিত বাংলা বইয়ের ইতিহাসের কালক্রম অনুসারে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত, প্রচ্ছদ প্রণয়ন, হরফ বিন্যাস, বাঁধাই, বিক্রি–এইসব নানা স্তর অতিক্রমের প্রক্রিয়াসূত্রে যে সংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে উঠেছে তা-ই বাংলাদেশের বইয়ের সংস্কৃতি।

 

 

সংস্কৃতি সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানী টেইলরের সারকথা অনুসরণে আরেকটু স্পষ্ট করে বলা যায়, বাংলাদেশের পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমাজের মানুষের অর্জিত বই সম্পর্কিত আচরণ, যোগ্যতা, জ্ঞান, বিশ্বাস বা উপলব্ধি, শৈল্পিকতা সম্পর্কে ধারণা, নীতি, আদর্শ, প্রথা বা রীতি, আইন ইত্যাদি এই রচনার উপজীব্য বিষয়।
এন.বি. হ্যালেদের A Grammar of the Bengali Language (১৭৭৮) বইটি মুদ্রণের মধ্য দিয়ে বাংলা বই হাতের লেখা বই থেকে ছাপার জগতে প্রবেশ করে। শুরু হয়ে যায় কলকাতাকেন্দ্রিক মুদ্রণ যুগের বাংলা বইয়ের যাত্রা। পূর্ববঙ্গেও এর ঢেউ আসতে বেশি সময় লাগেনি। ফলে বাংলা বইয়ের সংস্কৃতির কথা মনে করলে অখণ্ড বাংলার মুদ্রণ যুগের বই-সংস্কৃতির কথাই মনে করতে হবে। যদিও উৎকর্ষে ও বিস্তারে চল্লিশের দশক পর্যন্ত কলকাতাই ছিল এর কেন্দ্র।
ইয়োরোপের ছাপা বইয়ের সংস্কৃতি অনুসরণেই বাংলা ছাপা বইয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে! বাংলা অঞ্চলে মুদ্রণযন্ত্রের প্রতিষ্ঠাও হয় বই ছাপার সূত্রেই। ১৯৪৭ সালের পর ঢাকা হয়ে ওঠে ছাপা বাংলা বইয়ের নতুন কেন্দ্র। ঐ সময় থেকে এই কেন্দ্র যে কেবল নতুন তা-ই নয়, কেন্দ্র হয়ে ওঠে নতুন জীবনদৃষ্টিরও। উনিশ শতকে কলকাতায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে উনিশ ও বিশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের জোয়ারের মাধ্যমে ও বহু কৃতি মনীষীর তৎপরতায় যে জীবনদৃষ্টির সূচনা ঘটেছিল তার দ্বিতীয় তরঙ্গ ওঠে এই অঞ্চলের প্রধানত বাঙালি মুসলমান সমাজে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় জীবনযাত্রাকে ভিত্তি করে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মধ্যেই নতুন বই বের হতে থাকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। বিদ্যায়তনিক লেখাপড়া অভিমুখী যে তরুণেরা ‘উচ্চতর’ জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে তাদের পাঠতৃষ্ণা নিবারণের জন্য একসময় সারা বাংলায় কেবল কলকাতাই ছিল যেখানে একমাত্র কেন্দ্র সেখানে নতুন ভরসাস্থল ঢাকাকে কেন্দ্র করে বই ছাপার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

সেই সূত্রে ঢাকায় পুস্তক-প্রকাশনার উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটতে শুরু করলেও বইয়ের প্রকাশনা বিবেচিত হতো ছোট ব্যবসা বলে। বই প্রকাশ করে পুরোপুরি জীবিকা অর্জন করা যায় এমন দৃষ্টান্ত তখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দেখা যায়নি। ফলে বই-প্রকাশনা কেন্দ্রিক ব্যবসাকে ঠিক আর দশটা অর্থকরী ব্যবসায়ের সঙ্গে তুলনা করে বিবেচনা করা হতো না। বইয়ের ব্যবসায় বলতে বই বিক্রি ও প্রকাশনা একত্রে বোঝাত। এখন যেমন প্রায় প্রতিটি পুস্তক প্রকাশকের অন্তত একটি করে প্রদর্শনী কেন্দ্র আছে এবং সেখানে কেবল নিজে সংস্থার প্রকাশিত বই-ই সাজানো থাকে তখন তেমনটি ছিল না। সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা বইয়ের দোকানগুলোর প্রতিনিধি ঢাকার বাংলাবাজারের বিভিন্ন দোকান থেকে বই সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন দোকানে রাখবার জন্য। বাংলাবাজারের প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা ও বিপণন সংস্থার নাম পরিবেশক হিসেবে মুদ্রণ করে সেই প্রদর্শনী কেন্দ্রে বই রেখে বিপণন করা যেত। এর বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বই পৌঁছত ডাক বিভাগের মাধ্যমে, ভিপিপি যোগে। মফস্বলের বইয়ের দোকানগুলো এখনকার মতো কেবল নোট-গাইডে বা কেবল দু-একজন জনপ্রিয় লেখকের বইয়ে ঠাসা থাকত না, বরং বইয়ের দোকানগুলো ছিল স্থানীয় সারস্বত সমাজের মানুষের আনাগোণায় ঋদ্ধ! এখনও কোনো কোনো বইয়ের দোকানে এই বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে বইয়ের দোকান-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অর্থোপার্জন-অতিরিক্ত সুবেদী ব্যক্তিত্বের জন্য।
পাঠকদের রুচি ও আগ্রহের ভেদ থাকা স্বাভাবিক। তখন পুস্তক-প্রকাশকেরা এই সক্রিয় ও সচেতন পাঠকদের উদ্দেশেই তাদের বই নিবেদন করতেন। অল্পস্বল্প বই যেত লাইব্রেরিতেও। স্বল্পসংখ্যক হলেও পাঠক হিসেবে তাঁরা ছিলেন অগ্রসর। বাংলা বইয়ের সংস্কৃতির এটা ছিল এক দিক।

 

গত শতাব্দীতে মুদ্রণ ব্যবসায়কে বোধ হয় অভিজাত ব্যবসা মনে করা হতো। আধাসামন্ত পুঁজির প্রতিনিধিদের বুর্জোয়া পুঁজিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় মুদ্রণ-ব্যবসা কিছুটা ভূমিকাও রাখতে শুরু করেছিল বলে মনে হয়। তাই তখন বই-ছাপা হয়ে উঠেছিল এর উপজাত একটি ব্যবসা। মুদ্রণালয়ে বই-ছাপার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত থাকতেন তাঁরা ছিলেন সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের দিক থেকে অগ্রসর মানুষ। যিনি হাতে টাইপ সেটিং করতেন তাঁরও থাকতে হতো অগ্রসর ভাষাজ্ঞান, তাদের অর্জন করতে হতো হাতের লেখা অনুধাবনের দক্ষতা। বই-প্রকাশনার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে থাকল এ ধরনের অগ্রসর সাংস্কৃতিকতার অনুশীলনের মধ্যদিয়ে। প্রকাশের জন্য একটি পাণ্ডুলিপি কাগজের এক পৃষ্ঠায় পরিচ্ছন্নভাবে লিখে প্রেসকপি তৈরি করে তারপর দিতে হতো। পাণ্ডুলিপিকে সিসার টাইপে যাঁর বর্ণবিন্যাস করবার কথা তাঁর জন্য টাইপের আকার ও প্রকারের নির্দেশনা লিখে তারপর দিতে হতো প্রেসে। বইটা কী আকারের ও প্রকারের কাগজে ছাপা হবে তার নির্দেশনা প্রেসকপিতে লিখে দিতে হতো আগেই। প্রেসে দেয়ার আগেই এত কিছু করে নিতে হলে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন ছিল। তাই প্রেসগুলোতে কর্তৃপক্ষ এসব কাজ ভালো বোঝেন এমন কর্মী যেমন রাখার চেষ্টা করতেন লেখকেরাও তেমনি পুরো ব্যাপার নিজেরা ভালো করে না বুঝে নিয়ে বই প্রকাশের জন্য যেতেন না। ফলে দেখতে সাধারণ হলেও নির্ভুলতার দিক থেকে যেমন সাংস্কৃতিক দিক থেকেও তেমনই বই-প্রকাশনার গড় একটা সাংস্কৃতিক রুচি ছিল।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বই-সংস্কৃতিতে অনেক কারিগরি সুবিধা যোগ হয়েছে। এই অন্তর্ভুক্তিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশনা মানের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতিও পরিলক্ষিত হয়; কিন্তু এর মধ্যেও প্রায়শই এমন বই আমাদের কাছে আসে যা বাহ্যত সুদৃশ্য হলেও এই তা বইয়ের অন্তর্বস্তুর অনুকূল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরকমটি হতে পারে এর সাধারণ সাংস্কৃতিকতার দীনতার সূত্রে।
বাংলাদেশের যে দু-একটা গ্রন্থপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে তাতে চোখ বোলালে লক্ষ করা যায় বই ছাপা ১৯৪৭ পূর্ব ও উত্তর উভয়কালেই কেবল ঢাকায়ই সীমিত থাকেনি, অন্যান্য মফস্বল শহর থেকেও বই প্রকাশিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। এখনকার তুলনায় অনেক শ্লথ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলেও তখন সারা দেশেই বই ছড়িয়ে পড়ত ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে। সাপ্তাহিক, মাসিক বা পাক্ষিক পত্রিকাতে বইয়ের বিজ্ঞাপন দেয়া হতো গুরুত্বের সঙ্গে। এর মাধ্যমে সারা দেশের সারস্বত সমাজ সেসব খবর পেয়ে যেত। ফলে ঢাকা নগরীর বাইরে অজ পাড়াগাঁয়ে বসবাসকারীও পারতেন বিশ্বদৃষ্টিসম্পন্ন মুক্ত পাঠক সমাজের অংশ হতে। সামান্য বিদ্যায়তনিক বা আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার বাইরের জ্ঞানাগ্রহীরাও ছিলেন সেই পাঠক সমাজেরই অংশ। সংখ্যায় কম হলেও তাঁরা প্রধানত ছিল উদার জ্ঞানাগ্রহী বা আনন্দপিপাসু পাঠক সমাজ। কারণ আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার সুযোগ কম থাকলেও এখনকার তুলনায় মনে করা হতো লেখাপড়া জানা মানুষ বিত্তশালীদের চেয়ে উৎকৃষ্ট ও সম্মাননীয়। সেই সূত্রেই হয়তো বিত্তশালীরা লেখাপড়া জানা মানুষের স্বতন্ত্র আভিজাত্যকে কিছুটা মান্য করতেন। বিত্তে ও বিদ্যায় যাঁরা উচ্চতর তাঁদের প্রতি মান্যতা ছিল আরো বেশি। এমনকি সাধারণ লেখাপড়া-জানা মানুষের চেয়ে লেখকেরা ছিলেন বেশি সম্মাননীয়। কিন্তু এখন বিত্তশালীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা কাঠামোতে এতটাই প্রতাপশালী যে বিদ্বানেরা এখন আর তাঁদের কাছে অান্তরিক সম্মান পান না। এর প্রভাব এসে পড়েছে বাংলা বইয়ের সংস্কৃতিতেও। আগেও বিদ্বানেরা বিত্তশালীদের পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন সম্মাননীয় বলে; আর এখন তাঁরা পৃষ্ঠপোষকতা পান প্রায় কেনা গোলাম হলে।

 

স্বাধীনতা লাভের পরে বাংলাদেশের জীবনযাত্রায় বিত্তের প্রসার ঘটলেও সামগ্রিকভাবে উৎকর্ষমুখী রুচিশীলতার চর্চা হয়নি। বইপুস্তকের জগত রুচিগত চর্চার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকার কথা থাকলেও রুচি ও পরিশীলনের চেয়ে সামগ্রিক মূল্যে বলপ্রয়োগ, দুর্নীতি ও নানা ধরনের প্রভাবশালিতা অগ্রাধিকার পাওয়ায় বইপুস্তকের জগতের ক্ষেত্রেও অন্যান্য অগ্রসর সাংস্কৃতিকতার মতোই সূক্ষ্ম রুচিমানতার বিপুল অবক্ষয় ঘটেছে।
বিত্তশালীরা আগের মতোই লেখক-সাহিত্যিকদের এখনো নানাভাবে পুরস্কৃত করেন, কিন্তু এ পুরস্কারে সম্মানের চেয়ে করুণার ভাগ বেশি থাকে। অনেকেই উন্নত দেশের মতোই লেখকদের পারিশ্রমিক দিয়ে সম্পাদনায় বা অনুলেখনে নিয়োজিত করে নিজেদের প্রতিভাকে বিকশিত করতে চান, কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য প্রকৃত বিকাশের চেয়ে সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি; ফলে যাঁর পরিশ্রমে কাজ সম্পাদিত হয় তাঁকে দেয়া হয় ঊন মর্যাদা। এতে লেখক-সম্পাদকেরাও নিজেদের আন্তরিকতার প্রয়োগ ঘটাতে পারেন না। আর এই প্রক্রিয়াতে বেশিরভাগ পুস্তকই প্রকাশিত হয় বলে প্রকৃত পাঠকের কাছে বাহ্যত প্রকৃত ও যশোপ্রার্থীর পার্থক্য ধরা পড়ে না। সব ধরনের লেখকের বইকেই সন্দেহের চোখে দেখতে হয় বলে পাঠকেরা ক্রেতা হন তুলনায় কম। পুস্তক প্রকাশকদেরও একটি পাণ্ডুলিপিকে বই পর্যায়ে নিয়ে যেতে যে পরিশীলন করতে হয় তা করেন না বলে প্রকৃত পাঠক সে বইয়ের ক্রেতা হতে চান না। অনেক খ্যাতিমান লেখকের নাম দেখে বই কিনেও পাঠক হন প্রতারিত। তা ছাড়া পুস্তক-প্রকাশকেরা পুস্তক নির্মাণ-সংস্কৃতি চর্চার দ্বারা পরিচালিত তাঁদের ব্যবসাকে যেহেতু অগ্রাধিকার দেন না সেহেতু তাঁরা যেনতেন প্রকারে অর্থ-সংগ্রকেই গণ্য করেন ব্যবসা বলে। ফলে তাদের পাঠক-ক্রেতা দরকার পড়ে না; নানা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার সন্ধানে থেকে তাঁরা দরকারি অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। ব্যবসার লক্ষ্য যেহেতু মূলত মুনাফা অর্জন এবং অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমেই আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব অর্জন করতে সমর্থ হন সেহেতু মুনাফা প্রাপ্তির সন্তষ্টি ঘটে নিজেদের মধ্যে। এই ধরনের পরিস্থিতির বাইরে থেকে যাঁরা কার্য নির্বাহ করে থাকেন তাঁর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থাকে সমানুভূতির নয়, করুণার! ফলে বই-সংস্কৃতির উৎকর্ষ প্রয়াসে সামগ্রিক অগ্রাধিকার থাকে না। যটুকু উৎকর্ষের পরিচয় পাওয়া যায় তা নিছক ব্যতিক্রম হিসেবেই বিরাজ করে!
বাংলা বই আশির দশক থেকে মুদ্রণের অগ্রসর কারিগরি যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু দীর্ঘকালের বই-সংস্কৃতি বিবেচনায় নিলে অনুভব করা যাবে যে এর সঙ্গত উত্তরণ ঘটেনি।
বিগত তিরিশ-চল্লিশ বছরে আমাদের দেশে জীবনযাত্রায় বৈচিত্র্য এসেছে। সুতরাং সম্প্রসারণ ঘটেছে অভিজ্ঞতার। এর প্রভাবে বেড়েছে বইয়ের বিষয়বৈচিত্র্যও। কিন্তু একটি অভিজ্ঞতার আলোকে পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন করা ও পাণ্ডুলিপিকে বইয়ে রূপান্তর করার জন্য বই-সংস্কৃতি অনুধাবনের ন্যূনতম যেটুকু সামর্থ্য কাঙ্ক্ষিত তার অনুশীলন কমে গেছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ বিত্তের উন্নতি যেভাবে নানা রকম দুর্নীতির মাধ্যমে করা যায় সেরকমটা বইপুস্তকের ক্ষেত্রে পারা সম্ভব নয়। রুচিশীলের কাছে তা আগেই ধরা পড়ে। ফলে রুচিশীলের ভানকারীর সমর্থন আদায় করতে হয় বিত্তের ও ক্ষমতার প্রভাব দিয়ে, প্রকৃত রুচিশীলের সাড়া তা থেকে পাওয়া যায় না!

লেখকদের তো লিখবার কথা সেই সুবদী পাঠকের জন্য যে পাঠক লেখকের পাঠ্যবস্তুর কাছ থেকে কিছু পেতে চান। কিন্তু আজকাল যে পাঠকের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা না করে কেবল অর্থের বিনিময়ে কাগজে ছাপা ও বাঁধাই করা কিছু একটা গছিয়ে দিয়ে অর্থ আহরণ করা পুস্তক-প্রকাশনা ব্যবসার উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছে তা বই-সংস্কৃতির অনুকূল নয়! অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশমান পরিস্থিতিতে বিচিত্র বইপুস্তকের প্রয়োজনীয়তা সমাজে অনুভূত হওয়া সত্ত্বেও এর সাধারণ রুচিগত উন্নতি হচ্ছে না। বাণ্যিজের বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকেও তা অন্য আর দশটা পণ্যের সঙ্গে পার্থক্য করতে পারছে না। এভাবে চলতে পারে না বইপুস্তকের জগত। এমন কি একটি বইয়ের মাধ্যমে লেখক ও প্রকাশক যদি কেবল পাঠককে ওপরিতলের বিনোদনও দিতে চান তাহলেও পুস্তক প্রকাশককে ন্যূনতম বই-সংস্কৃতির পরিচয় দিতে হবে; সে রকম পরিচয় দিতে পারার আন্তরিক প্রয়াসের এতটা ন্যূনতার মধ্যে এখনই খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যায় না! কারণ আমাদের পুস্তক-প্রকাশকেরা যখন বই বের করেন তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাঠকদের খোঁজ করেন না। একটা বইকে প্রকাশের জন্য প্রস্তুত করার সময়ই যে ভাবতে হয় পাঠকের কাছে পৌঁছবার উপায় নিয়ে সে সচেতনতাই বা কটি প্রকাশনা সংস্থার অছে? প্রত্যেক প্রকাশনাসংস্থার যে একটা আত্মচারিত্র্য থাকা জরুরি সে কথা কটি পুস্তক-প্রকাশকের মনে থাকে? প্রতি বছর অমর একুশে বইমেলাকে সামনে রেখে যে এত এত বই বের হয় তার কটি বইয়ের খোঁজ বইমেলার পর পাওয়া যায়? বইমলাকে প্রবঞ্চনাময় আনুষ্ঠানিকতার অতিরিক্ত বই-সংস্কৃতির উন্নত চর্চার মাধ্যম হিসেবে কতটা ব্যবহার করার প্রয়াস সংশ্লিষ্ট সকলের আছে তা নিয়ে গভীরভাবে ভাববার সময় এসে গেছে!

আমাদের ভাবতে হবে এত এত পুস্তক প্রকাশক আছেন আমাদের, অথচ পুস্তক বিপণন-ব্যবস্থা এতদিনেও গড়ে ওঠেনি কেন? পুস্তক প্রকাশনা আর পুস্তক বিপণন আলাদা ব্যাপার; কিন্তু বিপণন-ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হলে যেসব দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, তার অভাব দূর করতে হলে রাষ্ট্রসমাজের যেসব সংস্কার করতে হবে তা নিয়ে আমরা এখনও কেন ভেবে উঠতে পারি না! আমাদের সমাজে তা সম্ভব হয় না বাংলাদেশের বাস্তবতাকে বিবেচনা করে উন্নত বই-সংস্কৃতির মর্মগত অনুশীলন নেই বলে। উন্নত বই-সংস্কৃতির অনেক কিছুই এখনই হয়তো আমাদের অনুসরণীয় হয়ে-ওঠা সম্ভব নয়, কিন্তু এর অন্তরঙ্গ খোঁজ রেখে এর মর্মকে বাংলাদশের বাস্তবতায় প্রয়োগের মধ্য দিয়ে আমাদের নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে প্রয়াসী হতে হবে। যারা সেই মর্মকে অনুধাবন ও অনুশীলনে এগিয়ে থাকবেন তাঁদের প্রাথমিকভাবে কখনো কখনো সফল মনে না হলেও দেখা যাবে প্রয়োজনের সময় তাঁরাই থাকবেন এগিয়ে। কারণ বাংলাদেশে যে সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতি ঘটছে তাকে এগিয়ে নিতে স্বাভাবিকভাবেই যে বাস্তববোধসম্পন্ন, উন্নত, সতৃষ্ণ ও সক্রিয় পাঠক সমাজের বিস্তার ঘটতে থাকবে তার চাহিদা মেটানোর জন্যও উন্নত বই-সংস্কৃতির পরিশীলনের মধ্যে বিবর্তিত হওয়া বইয়ের বিকল্প নেই!


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments