বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে ড. নজরুল ইসলামের দশদফা প্রস্তাব

বুধবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:০০ অপরাহ্ণ | 293 বার

বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে ড. নজরুল ইসলামের দশদফা প্রস্তাব

বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাম্প্রতিককালের বিদ্যায়তনগুলোর দিকে তাকালে লক্ষ করব যে সেখানে গবেষণা তেমন গুরুত্ব পায় না। উপরন্তু যে সব অর্জনের জন্য গবেষণার দরকার তার ভিন্ন বিকল্প আছে। দেশে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যস্থার এই পরিপ্রেক্ষিত মনে রাখলে আমরা অনুভব করব যে, ড. নজরুল ইসলাম একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। বহু বছর ধরে তিনি বিদেশে বসবাস করছেন। গবেষণাক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা না করে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ নিয়ে তিনি উচ্চতর গবেষণায় অক্লান্ত।

অর্থনীতির গবেষণায় ড. নজরুল ইসলামের আন্তর্জাতিক পরিচিতি সেই আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার সময় থেকে। বিশ্বখ্যাত ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। কিন্তু তাঁর গবেষণার শুরু তারও অনেক আগে, ১৯৮০ সালে নির্ধারিত সময়ের এক বছর আগেই মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করে ফিরে আসার পর থেকে। সে সময় লেখা তাঁর প্রথম বই জাসদের রাজনীতি: একটি নিকট বিশ্লেষণ (১৯৮১) প্রকাশের সময়ই তাঁর বক্তব্যের গবেষণা-ভিত্তি লক্ষ করা গিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শন কী হবে তা নিয়ে অনেকে ভেবেছেন। কিন্তু সে-সব ভাবনা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়েছে সামান্যই। একইভাবে ড. নজরুলের গবেষণাও রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিবেচিত ও পর্যালোচিত হয়নি। তা সত্ত্বেও ড. নজরুল গবেষণাকে পাশ কাটিয়ে যান নি। একের পর এক গবেষণা করে গেছেন।

নজরুল ইসলামের পূর্বোক্ত প্রথম বইয়েই দেখা যায় যে ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতির সংশ্লেষণ থেকে নিষ্কাশিত হয়ে আসে তাঁর উপলব্ধিজাত ভাষ্য। রাজনৈতিক সংগঠনের নির্দেশিত ভাষ্যে তিনি সন্তুষ্ট নন, তাঁর মত গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সম্পর্কিত মৌল তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে নিজস্ব চিন্তন ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। তাঁর বেড়ে ওঠার কালে বামপন্থি চিন্তাকে উন্নত চিন্তা বলে মনে করা হতো। তিনি নিজেও ছিলেন ঐ বলয়েরই বাসিন্দা। তা সত্ত্বেও তাঁর পূর্বোক্ত বইটিতে দেখা যায়, বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাম চিন্তার অনেকগুলো ভিত্তিকে প্রশ্ন করে তিনি গবেষণায় অগ্রসর হয়েছিলেন। একে একে তিনি লিখেছেন দশটি বই। সবগুলো বইয়েই গভীর গবেষণালব্ধ তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে অনেকগুলো মৌল প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেছেন।

বিদ্যায়তনিক শৃঙ্খলার দিক থেকে দেখলে তিনি অর্থনীতিশাস্ত্রের ছাত্র। কিন্তু তাঁর গবেষণার আওতায় প্রবল ভাবে চলে আসে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি প্রসঙ্গও। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সুশাসন খুবই গুরুত্বের দাবিদার। অথচ এটাই বাংলাদেশের সমস্যা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি অনেক সময়ই এমন পদক্ষেপ নেয় যে তা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার পথকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। তাঁর আলোচনার জ্ঞানভিত্তি পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী ধারণা। উচ্চতর বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডলের বিশিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্রের প্রয়োগকেও ( রাশিয়া চীন ও ভিয়েতনাম ) তিনি পরীক্ষা করেছেন। ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্যই নয় কেবল বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিবেচনাকেও উন্নয়ন পরিকল্পনায় যে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে তা নজরুল ইসলামের গবেষণায় উঠে এসেছে। সেই ভিত্তিতে তাঁর মূল সিদ্ধান্ত এই যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের অবিকল্প ভিত্তি হওয়া উচিত গ্রাম।

তাঁর লেখা যে দশটি বই বেরিয়েছে সেগুলো হচ্ছে: Resurgent Chaina: Issues for the Future (2009), বাংলাদেশের গ্রাম: অতীত ও ভবিষ্যৎ (২০১১), আগামী দিনের বাংলাদেশ (২০১২), আগামী দিনের বাংলাদেশ ও জাসদের রাজনীতি (২০১৩), Governance for Development: Political and Administrative Reforms in Bangladesh (2016) পুঁজিবাদের পর কী? (২০১৬), Economies In Transition: China Russia Vietnam (2016), Growth and Productivity Across Countries (2016), Let the Delta Be a Delta: The Way to Protect Bangladesh Rivers (2016), বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও বাংলাদেশের গ্রাম (২০১৭)।

উপর্যুক্ত সবগুলো বইয়ে তাঁর সুদীর্ঘ কালের গবেষণার ফল উল্লিখিত হয়েছে। আশির দশকে তিনি বিভিন্ন জার্নালে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে যেসব গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেগুলোকে পরিমার্জনার মাধ্যমে হাল নাগাদ করে এবং প্রয়োজনীয় সাম্প্রতিক ভাষ্য সংযোজন করে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের গ্রাম: অতীত ও ভবিষ্যৎ (প্রথমা প্রকাশন, ২০১১) নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ের কেন্দ্রীয় উপজীব্যই হলো বাংলাদেশের গ্রাম। গ্রামকে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাধান্য দেয়ার প্রশ্নে এখানে প্রধানত তিনি গ্রামের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এই বইয়ের বিস্তার সুদূর অতীত থেকে ভবিষ্যৎ অভিমুখে। ফলে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের গ্রামের ইতিহাস নিয়ে রচিত আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান পণ্ডিতদের গবেষণালব্ধ ফলকে – যেমন নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙ্গালীর ইতিহাস (১৯৪৯), রমেশচন্দ্র মজুমদারের History of Bengal (১৯৪৩) কিংবা ডি ডি কোসাম্বির An Introduction to the Study of Indian History (১৯৫৬) – বিবেচনা করে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল অবলম্বন করার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এই বইয়ে তিনি দেখিয়েছেন, নীহাররঞ্জন রায় ও রমেশচন্দ্র মজুমদারের রচনায় প্রাচীন বাংলার অনেক কিছুর বিস্তারিত পরিচয় থাকলেও এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আশির দশকের গোড়ার দিকে এ প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতেই দিনি দেখিয়েছিলেন গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। বেশ কয়েক বছর পরের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও যে কেন একই বিকল্পই সবচেয়ে বাস্তব তা তিনি এখানে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিকল্পনায় বাংলাদেশের মানুষের গ্রামীণ জীবনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, জনসংখ্যার আধিক্য এবং পরিবেশগত বাস্তবতাকে গভীরভাবে বিবেচনা করার দিকেই বার বার তিনি জোর দিয়েছেন তাঁর আলোচনায়।

“আগামী দিনের বাংলাদেশ” এই প্রপঞ্চকে তিনি আরো জোরদার করেন তাঁর পরের বই আগামী দিনের বাংলাদেশ-এ (প্রথমা প্রকাশন, ২০১২)। নজরুল ইসলাম মার্কসবাদী রচনাবলির গভীরতর পাঠ ও সমাজতান্ত্রিক দেশে দীর্ঘকাল বসবাসের সূত্রে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এমনটি অনুভব করেছেন যে, বাংলাদেশের সমাজের কল্যাণ মার্কসীয় বিপ্লবের পথেই হোক আর না হোক, সাধারণ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের যৌথ উদ্যোগের পথেই হতে হবে। বাংলাদেশের সাধারণ সমস্যা নিয়ে তিনি যেমন আলোচনা করেছেন, তেমনি আলোচনা করেছেন এর সমাধানের উপায় নিয়ে। উপায়গুলো সম্পর্কে তাঁর ভাবনার রয়েছে বাস্তব ভিত্তি। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা তাঁর উত্থাপিত প্রশ্ন ও বিতর্কগুলোকে বিবেচনায় আনলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো সুফল পাওয়াও সম্ভব। রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্ব, বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্র, বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারা, ইত্যাদি বিষয়ে গভীর আলোচনা এই বইয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি ইংরেজি ভাষায় পূর্বোল্লিখিত Governance for Development: Political and Administrative Reforms in Bangladesh (2016) বইটি লিখেছেন যার প্রকাশক আমেরিকার পলগ্রেভ ম্যাকমিলান।এই বইটিও অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সুগবেষিত রচনা। এই বইয়ে তিনি যেসব প্রস্তাব রেখেছেন সেগুলো বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ভিত্তিতে লেখা। এখানেও বাংলাদেশের গ্রামের চারিত্র্যকে বিবেচনায় সবচেয়ে অগ্রাধিকারে রেখেছেন তিনি। এই বইয়ে তিনি যে প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করেছেন সেগুলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক-রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিতে গভীর মনোযোগের দাবি রাখে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও বাংলাদেশের গ্রাম (২০১৭) নামের অতি সাম্প্রতিক বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন যে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তায়ও বাংলাদেশের গ্রাম ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বঙ্গবন্ধুর ঐ ধরনের উন্নয়নচিন্তার নিখাদ লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আর তিনিই সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষই বাস করেন গ্রামে। বাংলাদেশের মানবিকতার চিন্তাভিত্তিও গ্রামেই নিহিত। শেষের দিকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংস্কার যে অভিমুখ পাচ্ছিল তার ভিত্তি যে গ্রাম এবং তা যে যথার্থ ছিল তা ঐ বইয়ের গবেষণাভিত্তিক আলোচনায় দেখিয়েছেন নজরুল ইসলাম। বইটিকে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি, বর্তমান বাস্তবতায় ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গ্রাম ভাবনাকে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাভিত্তির আলোকে কীভাবে গুরুত্ব দিতে হবে তারও ইশারা দিয়েছেন।

এ ছাড়াও পুঁজিবাদের পর কী? (২০১৬), Economies In Transition: China Russia Vietnam (2016), Growth and Productivity Across Countries (2016) বইয়ে তাঁর হার্ভাডের গবেষণা ও পরের বিবর্তিত পরিস্থিতির বিবেচনা হাজির করেছেন। ঐ ধারার উচ্চতর গবেষকদের বিবেচনায় সেগুলো যে কতটা কাজে আসবে তার কিছুটা পরিচয় পাই প্রবৃদ্ধি বিষয়ক তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সোলোর ড. নজরুলকে তাঁর গবেষণার প্রশংসা করে লেখা চিঠিতে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ জার্নালগুলোতে যখন তাঁর একের পর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছিল তখনই ড. সোলোর দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় ড. নজরুলের গবেষণার প্রতি।

ড. নজরুলের পরিবেশ বিষয়ক চিন্তা-ভাবনাও যে কতটা গভীর তার পরিচয় পাওয়া যাবে বিশেষ করে Let the Delta Be a Delta: The Way to Protect Bangladesh Rivers (2016) বইটিতে। এখানে সে আলোচনা বিস্তৃত করার অবকাশ নেই। সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলা যায় যে, ভারতীয় উপমহাদেশের নদীর বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বদ্বীপ স্বভাবকে রক্ষা করেই প্রকৃতিসংগত ও স্বাভাবিক। কেন তা স্বাভাবিক তার বিজ্ঞানসম্মত পরিচয় তুলে ধরেছেন তিনি এই বইয়ে। বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এ কথাটি মনে রাখার পক্ষে তিনি জোর দেন এখানে। সে অর্থে এখানেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ অবকাঠামো নিয়ে পরিবেশ ও সামাজিক দৃষ্টিকোণের ভাবনাকেই প্রাধান্য দেন তিনি।

কারো কারো হয়তো মনে আছে যে, তরুণ ও নিবেদিত সংগঠক আহমেদ জাভেদ রনির উদ্যোগে বাংলার পাঠশালার আয়োজনে, অধ্যাপক এম এম আকাশের আহ্বায়কত্বে ও বর্তমান লেখকের যুগ্ম-আহ্বায়কত্বে এ বছর (২০১৭) ১২ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মোট ৬টি অধিবেশন জুড়ে ড.নজরুল ইসলামের বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ১০টি বইয়ে আগামী দিনের বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কিত যেসব প্রস্তাবাবলি উত্থাপিত হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। ঐ দিনের সিম্পোজিয়ামটিতে অংশ নিয়েছিলেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, রাজনীতিবিদ, পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী ও বাংলাদেশের বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ। দিনব্যাপী ঐ সিম্পোজিয়ামে মোট আটটি প্রবন্ধ পঠিত হয়েছিল ড. নজরুল ইসলামের প্রস্তাব সম্পর্কে। বিভিন্ন সেশনে সভাপতিত্ব করে, প্রবন্ধ পড়ে, আলোচনায় অংশ নিয়ে সিম্পোজিয়ামকে সফল করে তুলেছিলেন ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক রওনক জাহান, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা, ড. সুলতান হাফিজ রহমান, মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাজ্জাদ জহির, নূহ উল আলম লেনিন, ফজলে হোসেন বাদশা, রাজেকুজ্জামান রতন, অধ্যাপক মোফাখখারুল ইসলাম, অধ্যাপক দিলীপ কুমার নাথ, প্রকৌশলী আবুল কাশেম, অধ্যাপক সোনিয়া নিশাত আমিন, অধ্যাপক স্বপন আদনান, প্রকৌশলী এনামুল হক, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক আতিকুর রহমান ও অধ্যাপক শাহীনুর রহমান। বর্মান লেখকেরও নজরুল ইসলামের সামগ্রিক লেখালিখি নিয়ে একটি প্রবন্ধ ঐ সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধু ছয়দফা পেশ করেছিলেন। সেটা ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপরেখা। ড. নজরুল ইসলামের গবেষণালব্ধ চিন্তা নিয়ে প্রবীণ ও তরুণ মননশীল ব্যক্তিবর্গের সারাদিনব্যাপী ঐ আলোচনায় যে কথাগুলো বলেছেন তার ভিত্তিতে ড. নজরুলের বক্তব্যসমূহের সার-সংক্ষেপকেও সে ধারার অনুসরণে দশটি দফায় চিহ্নিত করা যায়। বলা যায় এই বইগুলো থেকে তাঁর দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য পরস্পর সম্পর্কিত দশটি মূল সুপারিশ ও প্রস্তাব উঠে এসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যাঁরা ভবিষ্যতের করণীয় খুঁজবেন তাদের কাছে এই দশদফা বিশেষ প্রায়েগিক ব্যপার বলে মনে হতে পারে। সেজন্য তাঁর দশদফায় বিবৃত চিন্তাসার তুলে দেয়া হলো:

১. বিদ্যমান ধনী-অভিমুখী, শহর-অভিমুখী, পর-নির্ভর, ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্যসম্পন্ন উন্নয়ন ধারার পরিবর্তে দরিদ্র-অভিমুখী, গ্রাম-অভিমুখী, আত্ম-নির্ভরশীল, এবং সমষ্টিস্বার্থের প্রাধান্যসম্পন্ন উন্নয়ন ধারার প্রবর্তন;
২. পরিবেশ রক্ষার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান এবং দেশের সকল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পূর্ণ জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় স্বার্থ এবং জাতীয় ব্যবস্থাপনায় এগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা;
৩. নদ-নদীর প্রতি বিদ্যমান “বাণিজ্যিক” এবং তদ্ভূত “অবরোধ” পন্থা পরিত্যাগ করে “প্রকৃতিসম্মত” এবং তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ “উন্মুক্ত” পন্থার অবলম্বন; আন্তর্জাতিক নদ-নদীতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে এ বিষয়ক জাতিসংঘের ১৯৯৭ সনের সনদ সাক্ষর করা; এবং প্রতিবেশী দেশসমূহের সাথে এ বিষয়ক দর কষাকষির ক্ষেত্রে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, বন্দর ব্যবহার, ইত্যাদি ইস্যুর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা;
৪. নির্বাচিত “গ্রাম পরিষদ” গঠনের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় সরকার কাঠামো বিস্তৃত করা এবং তার মাধ্যমে গ্রামকে সমবায়ী গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলে গ্রামের বস্তুগত এবং জন-সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার সুগম করা;
৫. গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল এবং আরও উন্নত করার লক্ষ্যে সরকারের মেয়াদ বর্তমানের পাঁচ বছর থেকে চার বছরে হ্রাস করা এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে বর্তমান “সংখ্যাগরিষ্ঠতা” পদ্ধতির পরিবর্তে “আনুপাতিক” পদ্ধতি অবলম্বন করা;
৬. প্রশাসনকে আরও দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রশাসনের আকার ও কাঠামোর এবং কর্মরত সকলের বেতন-ভাতার যৌক্তিকীকরণ;
৭. বিনিয়োগের, বিশেষত সরকারী খাতের বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ;
৮. আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনে দক্ষতার সাথে অংশগ্রহণ করা, সে উদ্দেশ্যে “গতিশীল আপেক্ষিক সুবিধা” গড়ে তোলা এবং তার সদ্ব্যবহার করা;
৯. অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের পাশাপাশি একটি স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বসম্পন্ন ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় খাত বজায় রাখা এবং গণকল্যাণের লক্ষ্যে এই খাতের কার্যাবলি পরিচালনা করা; এবং
১০. দরিদ্র-অভিমুখী, গ্রাম-অভিমুখী, আত্ম-নির্ভরশীল, এবং সমষ্টিস্বার্থের প্রাধান্যসম্পন্ন উন্নয়ন ধারা বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় খাতকে গণকল্যাণ অভিমুখী করার লক্ষ্যে গণস্বার্থসপক্ষ রাষ্ট্র নিশ্চিত করা।

আগামী দিনে একটি গণমুখী এবং পরিবেশের প্রতি যত্নশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য ড. নজরুলের এই দশ দফার প্রতি জাতীয় মনোযোগ আকর্ষিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এগুলো নিয়ে আলোচনায় আরো গভীরে প্রবেশ করতে সুবিধাজনক হবে বিবেচনা করে বাংলার পাঠশালা সেদিনের সিম্পোজিয়ামে উপস্থাপিত সবগুলো প্রবন্ধসহ সমুদয় আলোচনা আগামী দিনের বাংলাদেশ: ড. নজরুল ইসলামের গবেষণা ও প্রস্তাব বিষয়ক আলোচনা নামে [সম্পাদনা: এম এম আকাশ, আহমাদ মাযহার ও আহমেদ জাভেদ] গ্রন্থভুক্ত করে প্রকাশ করেছে।


  • দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com
Facebook Comments Box

দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় শওকত হোসেন লিটু