বই কেনা-বেচা নিয়ে কিছু কথা

সোমবার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৪:৩৬ অপরাহ্ণ | 257 বার

বই কেনা-বেচা নিয়ে কিছু কথা

বইয়ের দাম বিষয়ে একটা অদ্ভূত বিষয়ের প্রচলন আছে। লেখা হবে যে দাম, সে দামে বিক্রি হবে না। তাতে সবসময়ই ছাড় দিয়ে বিক্রি করা হবে। বইমেলায় বাংলা একাডেমি বলে দিবে সকল প্রকাশককে ২৫% ছাড়ে বই বিক্রি করতে হবে।

 

সাধারণ বইয়ের দোকান থেকে শুরু করে বই বিক্রির সকল মাধ্যমেই ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়েই এই মানসিকতা নিয়েই থাকবেন যে ছাড় দিয়েই বই কেনা-বেচা হবে। মুদ্রিত দামে হবে না। অথচ আর কোনো জিনিসের বেলায় এই রীতি নাই। কেনো বইয়ের বেলায় এমন রীতি তা আমি কখনোই বুঝি না। অনেক বছর ধরেই এই প্রশ্ন নিয়ে লিখেছিও টুকটাক। মেলেনি উত্তর।

একটা চকলেট হোক বা এক বোতল পানি হোক, তার গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা থাকে। অর্থাৎ তার কমেও বিক্রির সুযোগ থাকে বিক্রেতার। সেসব জিনিস গায়ের দামে, কখনো সুপার শপ থেকে তার চেয়েও বেশি দামে (মূল দাম ঢেকে দিয়ে বেশি দামের স্টিকার লাগানো হয়) কিনে নেয়ার সময় ক্রেতা কখনো বলেন না যে ২০% বা ২৫% ছাড় দেন। কিন্তু বই কিনতে গেলেই আগে প্রশ্ন করা হয় ছাড় কত %! দায়টা কেবল ক্রেতারই না। পুরো ব্যবস্থাটাই এইভাবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু কেনো?

বইয়ের দামের বিষয়ে আরেকটা বিষয় প্রচলিত। বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা। এও এক বাজে প্রচলন। একই সমান পৃষ্ঠা সংখ্যার সব বইয়ের দাম একই হওয়ার কথা না। বরং দামের ক্ষেত্রে আরো অনেকগুলি বিষয় বিবেচনার থাকে। এমনকি বইটার বাজার চাহিদা কেমন হতে পারে তার সাথেও দাম নির্ধারণের সম্পর্ক থাকার কথা। যে বইতে বিনিয়োগ করে প্রকাশকের টাকা আটকে থাকার সম্ভবনা থাকে, তার দাম একটু বেশিই হবার কথা। সব ভালো বই-ই জনপ্রিয় বই হবে বা বাজারে উচ্চ চাহিদা থাকবে, তা কিন্তু না। এখানে সেসব বিষয় বিবেচনার সুযোগ নাই বললেই চলে।

বইয়ের প্রি-অর্ডার নিয়ে আগেও বলছি। প্রি-অর্ডার বিষয়টাই সেই পণ্যের প্রতিযোগিতায় থাকতে পারে যার বিকল্প আছে। একাধিক কোম্পানি একইরকম পণ্য বিক্রির প্রতিযোগিতার জন্য এই প্রতিযোগিতা মানায়। কিন্তু বই তো গতানুগতিক পণ্য না। যে বইয়ের প্রকাশক যে, সেটা কেবল তার কাছেই আছে। আমার বই অন্য কারো কাছ থেকে তো কারো কিনে ফেলার সম্ভাবনা নাই। তাহলে কেনো এই প্রি-অর্ডারের প্রতিযোগিতায় নামা? প্রি-অর্ডারের অতিরিক্ত প্রচারণা বইমেলায় এসে বা বইয়ের দোকানে যেয়ে হাজারো বইয়ের পাতা উল্টে দেখে পছন্দের বই কেনার প্রবণতা নষ্ট করছে বলে আমি মনে করি।

বইয়ের ক্রেতা-পাঠকের রুচিও বদলেছে। একসময় বই বিক্রি তালিকায় থাকতো সাহিত্য। এখন সে জায়গা দখল করে নিয়েছে ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি আর ক্যারিয়ার প্রস্তুতির চটকদার প্রচারণা নির্ভর বই। সবচেয়ে বেশি বিক্রির তালিকায় অধিকাংশই সাহিত্য না, তেমন বই। প্রকাশকরাও টিকে থাকতে এই পথেই চলছেন এবং বলছেন পাঠক যা চায়, তাই তো করা উচিত। বইমেলার আকর্ষণ বলে যাদের যেসব বইয়ের প্রচারণা চলছে, তার ভেতর সাহিত্য খুবই কম। জীবন যাপনের অন্যান্য পণ্যের বেলায় এই যুক্তি দেয়া গেলেও বইয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়ে আমি এক মত না। প্রকাশকের কেবল পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করার কথা না। চাহিদা এবং রুচি তৈরিতেও ভূমিকার রাখবার কথা। সেখানে আমাদের নজর নাই বললেই চলে।

লেখক : প্রকাশক, পাললিক সৌরভ


দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments Box