বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জন্মেরও আগে থেকে

বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ | ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ | 438 বার

বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জন্মেরও আগে থেকে

আমার মা-বাবা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। দুজনই বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। শুনেছি, বিয়ের আগে মায়ের মন জয় করতে বাবা তাঁকে বই উপহার দিতেন। মা এতই বইয়ের পোকা, আমার ডাকনামটা তিনি ধার করেছিলেন একটা বই থেকে। আমি যখন মায়ের পেটে, মা তখন ফরাসি কবিতার বই পড়ছিলেন। বইতে একটা ছোট্ট ছেলের কথা ছিল, নাম রিভা। ছেলেটা খুব দুষ্টু, কারও কথা শোনে না, কিন্তু সবাই তাকে ভালোবাসে। মা তখনই ঠিক করে ফেলেছিলেন, ছেলে হোক মেয়ে হোক তিনি তাঁর সন্তানের নাম রিভা রাখবেন। শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তাই। জানিয়ে রাখি, আমার ডাকনাম রিভা। অতএব বলা যায়, বইয়ের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল জন্মেরও আগে। যখন পড়তে শিখেছি, হাতের কাছে যা পেয়েছি, তা-ই পড়েছি।

পছন্দের হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে মাত্র পাঁচটা বই নিয়ে কিছু লিখতে হবে ভেবে বেশ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, যে বইগুলো পড়ে ভালো লেগেছে, শুধু সেগুলোর কথা আমি লিখব না। আমি বলব সেই বইগুলোর কথা, যেগুলো আমার ভাবনার জগতে একটা বড় পরিবর্তন এনেছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার প্রিয় লেখকদের একজন। আমার মনে হয় তাঁর সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে তাঁর লেখনীই সবচেয়ে সাবলীল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা জননী আমার প্রিয় উপন্যাস। এর অন্যতম কারণ হলো, উপন্যাসের মূল চরিত্র একজন নারী। তা ছাড়া গল্পের একটি চরিত্র বিধানচন্দ্র বা বিধু, আমার মনে হয় যেকোনো মেয়ে এই বইটা পড়লে বিধুর প্রেমে পড়ে যাবে। চরিত্রটার মধ্যে একটা আকর্ষণ আছে। আমার চোখে দ্বিতীয় সেরা বইয়ের নামেও কাকতালীয়ভাবে ‘জননী’ শব্দটা আছে। জোছনা ও জননীর গল্প। লেখক হুমায়ূন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের সত্য ঘটনা ও কল্পনাকে তিনি এত সুন্দর করে ভাঁজে ভাঁজে সাজিয়েছেন, বইটা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখবে এটা নিশ্চিত। আমার বাসায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র আছে। আমি তৃতীয় খণ্ড পর্যন্ত পড়েছি। তবে মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি জোছনা ও জননীর গল্প পড়ার পর।

ভ্লাদিমির বইকোর লেখা ইউক্রেনের লোককথা আমার প্রিয়পাঠ্য থেকে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। সাহিত্য সমালোচকেরা এই বইটিকে কতটুকু গুরুত্ব দেবেন জানি না। তবে এই বইয়ের পাতায় পাতায় আমার ছেলেবেলার অসম্ভব ভালো কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যখন মন খারাপ হয়, এই বইটা আমাকে একরকম শান্তি দেয়।

ছেলেবেলার আরও স্মৃতি জড়িয়ে আছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর সঙ্গে। আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, বাসায় একজন শিক্ষক আমাকে পড়াতেন। তিনি বইটা উপহার দিয়েছিলেন। আমার একটা অভ্যাস, খাওয়ার সময় বই খুলে বসি। পড়া বইটাই আবার পড়ি। পথের পাঁচালী যে কতবার পড়েছি তার হিসাব নেই। অপু-দুর্গার ভাই-বোনের মিষ্টি সম্পর্কটা ভীষণ ভালো লেগেছে। এই বই পড়ে একটা তৃতীয় চোখ থেকে মানুষকে বুঝতে শিখেছি। শেষে দুর্গা যখন মারা যায়, সেই অংশটা পড়তে গিয়ে কেঁদেছি বারবার।

স্টিফেন কিংয়ের দ্য শাইনিং আরেকটি ভালো লাগার বই। হরর, রহস্যের দুনিয়ায় কিংই তো ‘রাজা’! এই বইয়ের মাধ্যমে একজন অনবদ্য লেখকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। আমার পরিচিত সবাই জানেন, আমি যদি দুইটা বই কিনি, তার মধ্যে একটা হবে কিংয়ের।