প্রযুক্তির ভয়

রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৯ | ৮:০৩ অপরাহ্ণ | 262 বার

প্রযুক্তির ভয়

॥ তানভীর আহমেদ সিডনী ॥


বর্তমান আমার ভয়ের কারণ, আমি বর্তমানকে ভয় পাই। আর না পেয়ে উপায় নেই। যন্ত্র আমাদের মস্তিষ্ককে হত্যা করেছে। প্রযুক্তি আমার প্রতিবাদের ভাষাও বদলে দিচ্ছে। আচ্ছা ভালোবাসার ভাষা সেও কি ঠিক আছে। না নেই। এখন আর প্রেমিকাকে কেউ দীর্ঘ চিঠি লেখার প্রয়োজন বোধ করে না। একখানি ‘এসএমএস’ পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। সেখানে বাক্যগঠন আর বানানের বালাই নেই। আবেগ সেও এক দুই শব্দেই যেন শেষ। আমি ভাবতে থাকি একখানি প্রেমপত্র লিখতে থাকবো। আমার পাশে থাকবেন কালিদাস, তাঁর কবিতা দিয়ে ভালোবাসার মানুষের মন ভরাবো। তাকে দেখবার আশায় বসে থাকতাম কতদিন বাড়ির বারান্দায়। কিংবা ঘুড়ির গায়ে তাঁর জন্য ভুল বানানে কতো না কথা! এসব চলে গেছে, প্রযুক্তির কল্যাণে যখন তখন তাঁকে দেখা যায়। হয়তো ছোঁয়া যায় না। দ্বিমাত্রিক মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর আমোদ থাকে। আমার মনে আছে স্কুলজীবনে একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম, কখনো তাঁকে কথা বলা হয়নি। ঝুঁটি করে স্কুলে আসতো, আর পায়ে মাঝে মাঝে থাকতো মেরুন জুতা। না দূর থেকেই তাকে দেখা। আজকাল যারা স্কুলে পড়ছে তাদের কাছে শুনি দূর থেকে দেখা হয়না। ভালো লাগলে সামনে গিয়ে ভিনদেশি ভাষায় বলে, ‘তোমার সনে বেঁধেছি প্রাণ’। আমি ভাবতে থাকি- বয়স বেড়েছে অনেক। তা না হলে চিন্তায় পিছিয়ে যাচ্ছি কেন? প্রযুক্তিকে বকতে বকতে আবার ভালো দিকও খুঁজে পাই। আমি একজনের কথা জানি সে অনলাইনে বই পড়ে। বই কেনার এবং রাখার জায়গা নেই। তাই ‘ট্যাব’ই ভরসা। ওর বন্ধুরা যখন ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত, তখন সে পড়ছে ‘শাহনামা’। ওকে দেখে নিজেই বলি- জয় প্রযুক্তি। তোমার পাঠ থেকে দূরে যেও না বালক।
আবার উল্টোপিঠে তাকাই- অন্তর্জালে যে কোনো সময় যা ইচ্ছে লেখা যায়। কেউ আমাকে কিছু বলবে না। আমি তো জানিই এটা আমার দ্রোহের ভূমি। আসলেই কী তাই? একদম না। আমি যেমন সকলের সামনে বস্ত্রহীন কিংবা স্বল্প বসনে হাঁটতে পারি না। তেমন অন্তর্জালে যা ইচ্ছে তাই লিখতে পারি না। আমার চিন্তন তো কারো কাছে বন্ধক দেওয়া নেই। চিন্তায় স্বাধীন, কল্পনায় আমি হিমালয়ের চূড়ায় বসে নলখাগড়ার সঙ্গে মাটি মিশিয়ে বাড়ি বানাতে পারি। যেমন বাড়ি বানিয়েছিলেন আমাদের পূর্বজরা। কিন্তু ত্রিমাত্রিক পৃথিবীতে যা ইচ্ছে তাই করতে পারি না। ঢাকায় এখন আর দ্রোহের মিছিল দেখি না। আগে যেমন দেখতাম, ঘামে ভেজা শার্টে মুষ্টিবদ্ধ হাতের যুবক স্বপ্নের বীজ বুনছে। তাই আমি বর্তমানকে ভয় পাই- নুর হোসেনের মতো সাহসী সংগ্রামীর অপেক্ষায় থাকি। পলান সরকারের মতো বই হাতে ঘুরে বেড়ানো মানুষ চাই।