জন্মদিন

প্রগতির সাধক যতীন সরকার-এর ৮৫তম জন্মদিন আজ

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২০ | ১১:৫৭ অপরাহ্ণ | 126 বার

প্রগতির সাধক যতীন সরকার-এর ৮৫তম জন্মদিন আজ

॥ দেশের বই প্রতিবেদক ॥

যতীন সরকার। শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সাম্যবাদী দার্শনিক।

 

নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রামপুর বাজার সংলগ্ন চন্দপাড়া গ্রামে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট, বাংলা ১৩৪৩ সনের ২ ভাদ্র যতীন সরকার-এর জন্ম। বাবা জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র সরকার। মা বিমলা বালা সরকার। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে রামপুর ফ্রি বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার মধ্যদিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার শুরু। এ স্কুলে তিন বছর অধ্যয়ন করে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে চলে যান ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় মামার বাড়ি-পারুলতলা গ্রামে। সেখান গৃহশিক্ষক যতীন চক্রবর্তীর কাছে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ শেষ করেন।
মুক্তাগাছা থেকে ফিরে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোণা সদরের পুখুরিয়া গ্রামে বাবার জ্যাঠাতুতো বোনের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে ভর্তি হন তৎকালীন নেত্রকোণার সবচেয়ে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চন্দ্রনাথ হাইস্কুলে। এই স্কুলেও বেশিদিন পড়তে পারেননি। দেশভাগের কারণে রাজনৈতিক অবস্থায় বীতস্পৃহ হয়ে পিসিমার ছেলেরা ভারতের কুচবিহার চলে গেলে যতীন সরকার তাঁর পাশের গ্রামের বেখৈরহাটি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন। এ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৫০ সালে দাঙ্গার কারণে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ১৯৫১ সালে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন রামপুর থেকে আড়াই মাইল দূরে আশুজিয়া স্কুল হিসেবে পরিচিত ‘জয়নাথ চক্রবর্তী ইনস্টিটিউশন’-এ। ১৯৫৩ খ্রীস্টাব্দে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও দুরারোগ্য পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ায় ১৯৫৪ সালে মেট্রিক পাশ করেন যতীন সরকার।

অভাব-অনটনের সংসারে প্রতিদিনের খরচের কিছুটা যোগান দিতে চৌদ্দ বছর বয়সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন রামপুর বাজারের চৌরাস্তার মোড়ে চাটাই বিছিয়ে ডাল, ম্যাচ-বিড়ি, বিস্কুট ইত্যাদির দোকানদারীও করেছেন যতীন সরকার।

১৯৫৪ সালে মেট্রিক পাশ করলেও অর্থ সংকটের জন্যে টিউশনি করে টাকা জমিয়ে একবছর পর অর্থাৎ ১৯৫৫ সালে যতীন সরকার আই.এ ভর্তি হন নেত্রকোনা কলেজে। শহরে এক বাড়িতে লজিং থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যান। যে পরিবারে লজিং থাকতেন, ১৯৫৬ সালে দুর্ভিক্ষের সময় সে পরিবারের অভাবের সংসারে অর্থের যোগান দেওয়ার পাশাপাশি সবার সংগে তাঁকেও অনাহারে থাকতে হয়েছে মাঝেমধ্যে। এর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছিলেন কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক এবং নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি।

আই.এ পাশ করার পর ১৯৫৭ সালে আনন্দমোহন কলেজে বি.এ-তে ভর্তি হন যতীন সরকার। ময়মনসিংহ শহরেও তাঁকে লজিং থেকেই লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৫৯ সালে বি.এ পরীক্ষা দিয়েই আশুজিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু সরকার সেই স্কুলের অনুমোদন কেটে দিলে জীবিকার জন্যে তিনি বি.এ’র রেজাল্ট হবার পর পরই বারহাট্টা সিকেপি হাই স্কুলে যোগ দেন এবং ১৯৬১ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এখানে শিক্ষকতা করার সময় ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুনকে।

দুই বছর শিক্ষকতার টাকা জমিয়ে যতীন সরকার বাংলা সাহিত্যে এম.এ ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে এম.এ পাশ করেন। রাজশাহীতেও পেয়িং গেস্ট হিসেবে থেকেই লেখাপড়া করেছেন তিনি। ১৯৬৩ সালেই বাংলার শিক্ষক হিসেবে গৌরীপুর হাই স্কুলে যোগদান করেন। এর পরের বছর ১৯৬৪ সালে যোগ দেন ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে এবং দীর্ঘ ৩৮ বছর পর ২০০২ সালে সেখান থেকেই চাকরি তথা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নেন যতীন সরকার।

 

১৯৬৭ সালে তিনি কানন আইচ-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ছেলে সুমন সরকার চেকোশ্লাভাকিয়া প্রবাসী, কন্যা সুদীপ্তা সরকার বিচারক হিসেবে কর্মরত। একমাত্র ভাই অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপনা শেষে বানপ্রস্থেই অবসর জীবনযাপন করছেন।

১৯৫৭ সালে ছাত্রজীবনেই দীক্ষা নেন কম্যুনিজমের। চন্দ্রকান্ত ঘোষ রোডের নয়াজামানা পুথিঘরই তাঁকে চিনিয়েছিল নয়া জামানার পথ। দীক্ষিত হয়েছিলেন দ্বান্দিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদে। এর পরবর্তী জীবনে কর্মে চিন্তায় এবং সকল প্রকাশে দ্বান্দিক বস্তুবাদই ছিল তাঁর একমাত্র পথ। যতীন সরকার বলেন, ‘কোন পার্টি করতাম সেটা বড়াে কথা নয়, বড়াে কথা হচ্ছে দর্শনটাই। সেই দর্শনটা আমি গ্রহণ করেছি।’

অজপাড়াগাঁ হওয়া সত্ত্বেও রামপুর বাজার ছিল তাঁর কাছে ‘দুনিয়ার জানালা’। পোস্ট অফিসে তখন দুই তিনটি পত্রিকা তো আসতোই, এছাড়াও আধামাইল দূরের কবিরাজ জগদীশচন্দ্র নাগ ছিল ‘বসুমতী’, ‘প্রবাসী’, ‘দেশ’সহ কয়েকটি পত্রিকার গ্রাহক। যতীন সরকার সেই ছোটােবেলাতেই এগুলোর নিয়মিত পাঠক হয়ে গিয়েছিলেন। ঠাকুরদা রামদয়াল সরকার পড়ে শোনাতেন রামায়ন, মহাভারত রামকৃষ্ণ কথামৃত, বিবেকানন্দের জীবনী। বাংলার পাশাপাশি সংস্কৃতপাঠের শুরু পারিবারিকভাবেই। এভাবেই সেই শৈশবকাল থেকেই একটা ভিত গড়ে উঠে একজন যতীন সরকারের।

 

পারিবারিক বলয়ের বাইরে মামার বাড়ি মুক্তাগাছার গাবতলী বাজারে কবি ইউনুস আলীর কবিতা পাঠ, জামালপুরের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসী নাসির আলী, যুক্তিনিষ্ঠ পবিত্র দাশ, কলকাতার প্রগতি-বলয় থেকে বের হয়ে মফস্বল শহর নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ হাইস্কুলের রেক্টর রবীন্দ্রসাহিত্যের শক্তিশালী সমালোচক সুখরঞ্জন রায়, নেত্রকোনা কালেক্টোরেটের কেরানী হরেন্দ্র চন্দ্র দাশ, বাউল কবি জালাল উদ্দীন খাঁ, তাঁর পুত্র খান মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম, বন্ধু শচীন আইচ যতীন সরকারের জীবন-ভাবনা তৈরিতে রেখেছেন গভীর প্রভাব। এছাড়াও পার্টিতে যুক্ত হবার পর তালিম পেয়েছিলেন অজয় রায়, জ্যোতিষ বসু, কাজী আব্দুল বারী, মহাদেব স্যানাল, কফিলউদ্দিন লালমিয়া, আলতাব আলীসহ আরও অনেক কম্যুনিস্ট নেতার কাছ থেকে।

১৯৪৮ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই মিছিল করেছিলেন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে।
কোনাে রঙিন কাঁচের ভেতর দিয়ে নয়, যতীন সরকার মানুষের জীবনকে দেখেছেন প্রতিদিনের রক্ত ঘাম ঝরানো অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। জাতপাত, বংশ, ধর্ম, শিক্ষা আত্মাভিমান কোনোকিছুই তাঁর এই দেখার চোখকে এক নিমিষের জন্যও থামিয়ে দিতে পারেনি। এই দেখাই তাঁর লেখার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।

যতীন সরকার নিজেকে ‘কষ্ট-লেখক’ বলেই পরিচয় দেন। সারাজীবন মেনে চলেছেন ম্যাকলে’র সেই কথা ‘ছয় লাইন লিখতে হলে ছয়’শ লাইন পড়তে হয়।’ লেখালেখির ব্যাপারে তিনি নিজেকে একটি প্রশ্ন করতেন সবসময়। ‘এই যে এত লিখা, তাঁর পরে আমি কেন লিখবো?’ তাই তিনি মনে করেন কোনো বিষয়ে লিখতে হলে আগে জেনে নিতে হবে এই বিষয়ে ইতোমধ্যে কী লেখা হয়েছে, যদি নতুন কিছু লেখার থাকে তবেই লিখতে হবে। তাই কি আনন্দমোহন কলেজ বার্ষিকীতে প্রথম প্রকাশিত লেখার শিরোনাম দিয়েছিলেন, ‘আপনি কি লিখিয়ে?’

যতীন সরকার বাঙালি বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ১৯৬৭ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসের ধারা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে। এজন্য বাংলা একাডেমি থেকে ‘ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হক’ স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। দৈনিক পত্রিকায় ও সাহিত্যপত্রে গভীরতাস্পর্শী প্রবন্ধ নিয়মিত লিখে চললেও তাঁর প্রথম বই সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা মুক্তধারা থেকে প্রকাশিত হয় বেশ বিলম্বে, ১৯৮৫ সালে, যখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেধাবী সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে তিনি দুই বাংলাতেই খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর আর থামেননি। একে একে প্রকাশিত হয় তাঁর মূল্যবান প্রবন্ধ ও সম্পাদিত বই। বিরামহীন লিখে চলেছেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো,
সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা; বাঙ্গালির সমাজতান্ত্রিক ঐতিহ্য; সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবি সমাচার; সংস্কৃতির সংগ্রাম; ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদের ভূত ভবিষ্যৎ, আমাদের চিন্তা চর্চার দিকদিগন্ত, ভাষা সংস্কৃতি উৎসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা, প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন, দ্বি-জাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞান চেতনা, বাংলাদেশের কবিগান, ভাবনার মুক্ত বাতায়ন, বাংলা কবিতার মূলধারা ও নজরুল, বরণীয় জনের স্মৃতি, কৃতি, নীতি, বিনষ্ট রাজনীতি ও সংস্কৃতি, গল্পে গল্পে ব্যাকরণ, রাজনীতি ও দুর্নীতি বিষয়ক কথাবার্তা, আমার যেটুকু সাধ্য, আমার রবীন্দ্র অবলোকন, মানব মন, মানব ধর্ম ও সমাজ বিপ্লব, মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা, বিচিত্রবিধ বিচার বিবেচনা, সমকালের দর্পণে প্রবন্ধ, ব্যাকরণের ভয় অকারণ, যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক ও বাংলাদেশের উপন্যাস, ভাষা বিষয়ক নির্বাচিত প্রবন্ধ, শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ, আমার নজরুল অবলোকন, প্রত্যয় প্রতিজ্ঞা প্রতিভা, রবীন্দ্রনাথের গদ্য : প্রথম চল্লিশ বছর, রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী, প্রসঙ্গ : মৌলবাদ, সাঁকো বাঁধার প্রত্যয়, প্রান্তিক ভাবনাপুঞ্জ, সত্য যে কঠিন, নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধাবলী, সাহিত্য নিয়ে নানাকথা, সংস্কৃতি ভাবনা, ইতিহাসের দর্শন ও বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে, দর্শনের গল্প, কালের কপোল তলে।

 

‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ ও ‘পাকিস্তানের ভূত দর্শন’ যতীন সরকারের আত্মজীবনীমূলক রচনা। একই সাথে আমাদের ইতিহাসের অপরিহার্য স্বাক্ষর এই বই।
চন্দ্রকুমার দে, কেদারনাথ মজুমদার, সিরাজ উদ্দিন কাশিমপুরী এবং হরিচরণ আচার্য-এর জীবনী গ্রন্থ লিখেছেন তিনি। সম্পাদনা করেছেন জালাল গীতিকা সমগ্র, বিপিন চন্দ্র পাল এর ‘সত্তর বছর’, শ্রীনাথ চন্দ-এর ‘বাহ্মসমাজের চল্লিশ বছর’। এছাড়াও রাহুল সাংকৃত্যায়ন-এর অনেক বই তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে।
‘সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র’ নামে একটি তাত্ত্বিক ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন যতীন সরকার।
এছাড়াও নির্বাচিত প্রবন্ধ, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ সংকলনসহ চার খন্ডের যতীন সরকার রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে।
মূলধারার লেখক যতীন সরকার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১০)সহ অনেক পুরস্কার ও পদক পেয়েছেন। ১৯৬৭ সালে ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক দিয়ে তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির শুরু। এরপর পেয়েছেন ‘খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৯৭), শ্রুতি স্বর্ণপদক (২০০৮), ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব সাহিত্য পুরস্কার (২০০১), ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা বই ১৪১১ পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৭), ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা (২০০৮), জেমকন সাহিত্য পুরস্কার, আমরা সূর্যমূখী সম্মাননা (২০০৮), ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু পুরস্কার (২০০৯) এবং ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭।
২০১৩ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা কল্যাণ সমিতি কর্তৃক বরেণ্য শিক্ষক সম্মাননা পান তিনি। বইমেলা ২০১৭-তে প্রকাশিত হয়েছে ‘যতীন সরকার রচনা সমগ্র’।

রাজনীতি সচেতন যতীন সরকার ভাষা আন্দোলনের সময় অজপাড়াগাঁয় থেকে যেমন মাতৃভাষা রক্ষায় মিছিল-মিটিং-এ অংশ নিয়েছিলেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে ময়মনসিংহে বুদ্ধিজীবী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে সংগঠিত করেছেন পাড়া-মহল্লার মানুষদের। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রতিক্রিয়াশীল রাজাকার-আলবদর গোষ্ঠী তাঁর পরিবারের উপর চালিয়েছে অমানবিক নিপীড়ন। ইতিহাসের নৃশংসতম ঘটনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তাঁকেও দীর্ঘ ১৮ মাস জেল খাটতে হয়েছিল।
যতীন সরকার উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন দু’বার। বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য তিনি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। মুক্ত বাতায়ন পাঠকচক্রের উদ্যোক্তা ও সংগঠক তিনি। এছাড়াও যুক্ত আছেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে।

ভ্রমণ করেছেন জার্মানি, ইংল্যান্ড, ভারত, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ।
অবসর গ্রহণের পর নেত্রকোনায় ফিরে আসেন তিনি। রাজধানী থেকে অনেক দূরের শহর নেত্রকোনার সাতপাই এলাকায় অবস্থিত ‘বানপ্রস্থ’ নামে বাড়িটি এখন তাঁর ছাত্র এবং শিষ্য-শিষ্যাদের জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র। পঁচাশিতেও ক্লান্তিহীন যতীন সরকার। নিজের জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন নবীন লেখক এবং প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মীদের। বহুপথ হেঁটে বহু আঙিনা আলোকিত করে ঠাঁই নিয়েছেন নেত্রকোনার বানপ্রস্থে। না, থামেননি। এখনও রাঙিয়ে যাচ্ছেন, এখনও চিৎকার করে বলেন, ‘এখানে থেমো না, যেতে হবে বহুদূর।’ এখনও অবিচল আস্থায় বলেন, ‘ন্যায্যতার এবং সমতার পৃথিবী হবেই, মুক্তি ঘটবে মানুষের, মানুষ গাইবে ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’।

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments