ঈদ সাময়িকী ॥ কবিতা

পাবলো নেরুদার এক ডজন কবিতা

রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০ | ২:১৬ পূর্বাহ্ণ | 430 বার

পাবলো নেরুদার এক ডজন কবিতা

পাবলো নেরুদার এক ডজন কবিতা
ভাবানুবাদ : সুমন টিংকু

 

 

১।
ভালোবাসার খোল নলচে

ভালোবাসি, তোমাকে।
কারণ, তোমাকে ভালো না বাসার কোনাে কারণই নেই আমার।
ভালোবাসা থেকে ভালো না বাসার দিকে
প্রতীক্ষা থেকে উপেক্ষার দিকে ধেয়ে চলে
চিরকালের এই বাউন্ডুলে অবাধ্য মন, নিয়ন্ত্রণহীন।

এই মন, ভবঘুরে এই মনটা
কখনো শীতলতাকে বুকে জড়িয়ে লিখে বরফ যুগের কামিনী কাঞ্চন কথা
আবার, কখনো আগুনের স্নানঘরে ভিজে ওঠে মিহি কলরবে।
এ তো তুমিই, যাকে ভালোবাসব বলে মথুরায় চাঁদ যৌবনবতী হয়,
আবার কখনো প্রতিমা তোমার ঠোঁটে লেপটে যায় ঘৃণার চুম্বন,
পালটে যায় প্রেমের সাতকাহন, একেবারে যাচ্ছে তাই।

এইতো তুমি, যে আমার দৃষ্টির সীমানারও বাইরে
অথচ তারে দেখতে পাই আয়নাজলে, নিত্য সহবাসে।
ভালোবাসি তারে, ভালো না বাসার দেয়াল ভেঙ্গে চুরে।
একেই কি তবে বিদ্রুপচ্ছটায় পুরান কবি বলেছিলেন, অন্ধ প্রেম?
প্রথম মাসের তীব্র উষ্ণতা যেমন শুষে নেয় সূর্যের সবটুকু নিষ্ঠুর তাপ
ঠিক তেমনভাবেই আমার হৃদয় চুরি করে নেয় সত্যের অপলাপ যত।

শুনে যাও তবে থিতু হয়ে-
এই কাহনের প্রতিটি ছত্রে একমাত্র আমিই সেইজন
যে তোমাকে ভালোবেসে মরেছি বহুবার কারবালায়
মরে যাচ্ছি ক্রমাগত এই বিরান শহরের পথে
এবং মরে যেতে যেতে
মরেই যাব তোমাকে ভালোবেসে।
কারণ,
রক্ত উনুনে পুড়ছে হৃদয় কোষ
হচ্ছে খাঁটি ভালোবাসার আঁচে।
জেনো তবে, জীবনটা তো ভালোবাসাতেই বাঁচে।

 

২।
বিষাদের পঙক্তিমালা

আজ রাতে আমি লিখতে পারি বিষাদের পঙক্তিমালা
বলতে পারি, ভেঙ্গে গেছে খানখান হয়ে এই রাতের সুঠাম শরীর
দূরবর্তী তারাগুলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে নীলাভ আলোয়। আর,
নিশীথের হাওয়া আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে দুঃখের সঙ্গীত।
তাই আজ রাতেই আমি লিখতে পারি বিষাদের পঙক্তিমালা।

তাকেই ভালােবেসেছিলাম মাতালের মতাে,
আর কখনো বা সেও আমাকে।
রাতের গন্ধের মতাে তাকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম আদরে-আদরে।
সীমাহীন আকাশের নীচে বাতাসও কি হারিয়েছিল দিক
দেখে পাগল আমাকে, চুম্বন মগ্ন এই প্রেমিক আমাকে।
জানি আমি, সে ভালােবেসেছিলে মাতালের মতাে
আর, নিশ্চিতভাবে আমিও তাকে।

দৃষ্টি ছিল তার অতল গভীর। সেই তাকে
ভরপুর ভালো না বেসে, ভিন্ন কোনাে পথ ছিলই না আমার।
কাছে নেই সে, অজান্তে হারিয়েছি তাকে কখন কোন অবেলায়
তাই, লিখতেই পারি বিষাদের পঙক্তি আছে যত। আজ এই রাতে।
তার অস্তিত্ববিহীন রাতগুলো ক্রমশ বড়াে হতে হতে
হা করে গিলে খায় এই পুরো আমাকে, একাকী আমাকে।
আর, কান্নার শব্দমালা ঝরে পড়ে এই মরু বুকে,
যেমন করে শিশির ভিজিয়ে দেয় বহুদিন শুকনো পড়ে থাকা ঘাসের শরীর।
অক্ষমতার আবর্তে আমি কেবলই পীড়িত হই,
তাকে ধরে রাখতে না পারার রক্তাক্ত ব্যাকুল যন্ত্রণায়।
দেখতে পাই, ভেঙ্গে যাচ্ছে খানখান হয়ে এই রাতের সুঠাম শরীর।

দূরে, বহু দূরে কেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে দুঃখের সুর।
আর, আমার ভেতরে আমি তুমুল ভেঙ্গে চুরে যাই
পড়ে থাকে ছাই ওড়া পথে প্রাণহীন হৃদয়ের শব।
সে নেই। সে নেই। অবাধ্য মন শোনে না সে কথা
ছুটে যায় পথের সেই বাঁকে যেখানে রেখেছিল পদচিহ্ন হারিয়ে যাবার আগে।
রাতগুলো আছে তেমনই জ্যোৎস্না ধবল
গাছগুলোও আছে তেমন সজীব,
শুধু আমরাই নেই আমাদের মতাে, যেমন ছিলাম একদিন।

এটাই সত্যি, তার জন্য ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই আর।
অবশ্য থাকার মতাে কারণও খুঁজে পাই না তেমন।
উচ্চারিত ভালোবাসার ধ্বনি সকল উড়িয়ে দিয়েছিলাম হাওয়ায়
যদি তারা খুঁজে পায় তেমনি তাকে, ঠিক আগেরই মতােন।
বদলে যাওয়া সময়ের দরজায় কড়া নেড়েছিল তারা, বারকয়েক।
কিন্তু, ওপাশ থেকে সাড়া দেয়ার মতাে ফুরসৎ ছিল না তার।
বরং, সে নাইছিল তখন অন্য কারও চুম্বন ঝর্ণায়,
তার কণ্ঠ মগ্ন ছিল অন্য সুরের পাঠ নিতে
তার উজ্জ্বল দেহ মেখে নিচ্ছিল অন্য পূর্ণিমার আলো
আর, তার চোখজোড়া নতুন স্বপ্নের আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল লাগামহীন।

তাকে ভালোবাসি না। এটি আমার পৃথিবীর একমাত্র সত্য।
হয়তাে তাকে ভালোবাসি, এটিও কি সত্য তবে? জানি না।
অথবা অনন্তকাল ভুলে থাকা, ভুলে যাওয়াটাই চিরসত্য।
অভ্যস্ত হতে চায় না এ মন, সে নেই।
সে চলে গেছে এ বাহু ছিন্ন করে,
আর ফিরবে না বলে।
সেই রাতগুলো, দ্রুত শেষ হয়ে হয়ে যাওয়া রাতগুলো
মরে গেছে আর বেঁচে উঠবে না বলে।
তাই এ রাতেই লিখে যাব দুঃখের বর্ণমালা যত
কারণ, এগুলোই তার জন্য আমার লেখা শেষ পঙক্তিমালা।

 

৩।
বিজয়ী চুম্বন

ধরণীর ঠিক মাঝখানে চিকচিক করে ওঠা
পান্নাটিকে সরিয়ে দিচ্ছি অবলীলায়
প্রিয়তমা, তোমাকে দেখব বলে।
দেখছি, জলকলম হাতে তোমাকে
যে তুমি, অতি সন্তর্পণে লিখছ রেখে
সবুজ বৃক্ষ আর বসন্তের কথকথা যত।

এ এক অদ্ভূত পৃথিবী!
কী গভীর তৃণাভ তার মন!
আর, তার বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া সাগরের
মিষ্টি জলে ভেসে যায় জাহাজ, আপন গন্তব্যে।
এবং তুমি আর আমি, আমরা দুজন, সেই ছবিরই
অংশ হয়ে থেকে যাই। বিবর্ণ কোনাে পাথরের মতাে নয়, বরং
জীবনের সব রং মেখেই বেজে উঠবে প্রেমের ঐকতান ভয়ডরহীন।

কিছুই থাকবে না সেখানে।
থাকবে কেবল তাজা বাতাসের কোমল প্রাণ।
থাকবে শুধু হাওয়ায় উড়ে আসা আপেল কিছু;
আর, থাকবে কেবল জীবনের সুন্দর পাঠ
যা কাঠনিঃসৃত রসের মতােই অকৃত্রিম ও উদার।

যেখানে সমন্বিত নিঃশ্বাস নেয় দ্বৈত ফুলেরা ভেদাভেদ ভুলে
সেখানে শুরু করব তেমনই কোনাে পোশাকের ব্যবহার,
যা ভেদাভেদহীন সাম্যের এবং প্রতীক ভালোবাসার;
যেন আমাদের প্রেম টিকে থাকে অনাগতকাল ধরে
আমাদের বিজয়ী চুম্বন যেন কখনো না হয় ফিকে।

 

৪।
নিরুদ্দেশ কথা

গন্তব্য জানা নেই। তবু অপেক্ষা করে আছি এই ভাঙ্গাচোরা দিনে,
একটি নিশ্চিত উড়ানের ডাক শুনব বলে।
উড়োজাহাজ নয়, নয় বোশেখের গাছ উপড়ে নেয়া হাওয়ার বাঁক,
কারো ওপর ভর করে নয়, বরং অনিশ্চিত গন্তব্যই যেন এ যাত্রার বাহন।
পুরনো পায়ের ছাপ জীবাশ্মের মতাে ছায়া ফেলে ফেলে জেগে থাকে পথে
আমাকেও ডেকে নেয় সেই অনন্তের মিছিলে, কিন্তু জীর্ণ পা জোড়া আমার,
অনড় অচলায়তনে অভ্যস্ত হয়ে জবুথবু পড়ে আছে ক্লান্তি ভালোবেসে।

প্রতিটি মুহূর্তের যাত্রা যেন হয় ঈগলের ক্ষিপ্রতায়
দেয়ালে লেপটে থাকা মাছির আটপৌরে উড়ান
কিংবা পুরো একটা দিন যেমন করে মিলিয়ে যায় রাত্রির বুকে
তেমন করেই ছুটে যেতে হয় শনির বলয় ভেদ করে, তাকে জয় করে নিতে;

জুতো কিংবা পৃথিবীর এই ত্রস্ত পথ, কোনােটাই যথেষ্ট নয়;
ধরণীও হারিয়েছে নতুন করে অবাক হবার দিন,
বরং সভ্যতা পেরিয়েছে তার দীর্ঘতম রাত মোড়ান সময়ের চৌকাঠ।

এবং, তুমিও দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছুবে নতুন কোনাে গ্রহের পিঠে
সম্মোহন এবং আহ্বানের অমোঘ আলোয় মিশে যেতে যেতে
তোমার আলোর বিচ্ছুরণ ক্রমশ বিলীন হয়ে যাবে
ফুলের রেনুবিন্দুর সুবাস গায়ে মেখে।

 

৫।
অন্য কোনােদিন

প্রায়ই মনে হয়, এই স্বার্থপীড়িত ভালোবাসাবাসির দিন
একদিন বিলীন হবে নিয়তি নিয়ন্ত্রিত শীত গুহায়।
অন্য কোনাে নীলিমা লিখবে একদিন, ‘ভালোবাসি’
পুরনো অস্তি কঙ্কাল অন্য কোনাে ত্বকের চাদরে ঢেকে নেবে নিজেদের,
অন্য কোনাে চোখ নিজেকে রাঙবে বাসন্তি প্রেমের জলছোঁয়ায়।

যারা একদিন সময়কে বাঁধতে চেয়েছিল খেয়াল খুশিমতাে
ধোঁয়া ঢাকা নিজেদের রুটিন দিনযাপনে,
আমলা, পণ্য বিপননজীবি অথবা নেহায়েত একজন ভবঘুরে
তারা কেউই যেন আর জড়াবে না নিয়মতান্ত্রিক জীবনজালে,
যেমন তারা ছিল একদিন অভ্যস্ততার চৌকাঠ না পেরোনো ভূতগ্রস্থতায়।

কালো চশমায় চোখ ঢাকা নিষ্ঠুর ঈশ্বর,
যে কি না ক্ষমতাধর, দাম্ভিক অথচ জন্মান্ধ।
রোমশ সর্বভূক, অথবা
রক্তচোষা ছাপোষা মাছিটা কিংবা ভরদুপুরে
ক্লান্তি তাড়ানো গাতক পাখিটা, সেও একদিন সওয়ার হবে অন্তিম রথে।

এবং সেই দিন এই মৃত্তিকা ধুয়ে দেবে অন্য বর্ষার জল,
সেই জলধারায় পাঠ হবে হবে নতুন দৃষ্টির জন্মকাহন,
আর, পুরনো শস্যক্ষেতে রোদ পোহাবে অশ্রুবিহীন যৌথ খামার।

 

৬।
সমুদ্র গন্ধা

তথাসভ্য সকলেই সেখানে ছিল,
যখন সে পদচিহ্ন এঁকেছিল ভ্রান্ত কোলাহলে;
তার দেহে তখনও স্বর্গের আভা লেগেছিল,
যখন তথা সভ্যদের মদের গেলাসে হাসি এঁকে দিচ্ছিল দুর্গন্ধের দেবতা;
পথ হারিয়ে হঠাৎ নরক দর্শনে সে ছিল বেদনায় বিহ্বল;
তার দিকে ছুঁড়ে দেয়া লাঞ্চনার তীর এফোঁড ওফোঁড হয়ে বিঁধছিল,
তার দেহ ন্যুব্জ হয়ে ক্রমেই যেন মাটিতে মিশে যাচ্ছিল,
তার সোনালি স্তনযুগলে ছিল অপমানের হাহাকার,
কিন্ত তার চোখে অশ্রুর কোনাে আভাস দেখিনি, কারণ
সে কাঁদতে জানে না;
কান্নার মতাে ক্লেদযুক্ত জীবনের কোনাে গলিতে তার যাওয়া হয়নি, কখনও।
নগ্ন শরীরে তার কোনাে গ্লানি নেই, লজ্জার শঠতা তাকে স্পর্শ করেনি
পোশাকের আবরণ তার কাছে বাহুল্য, অসুন্দর এবং অপ্রয়োজনীয়;
মানুষই কেবল নিজেকে পোশাকে ঢাকে,
যাতে কুৎসিত আত্মপ্রতিকৃতি কেউ না দেখে ফেলে,
এই তীব্র হুল্লোড়ে সে কোনাে কথা বলেনি,
তথা সভ্যদের ভিডে বলতে পারার মতাে কথার পাঠ তার নেয়া হয়নি,
এখানে যা হয়, তা কেবলই খিস্তিখেউর, সভ্যতার সনদ প্রাপ্তির উপযুক্ত রসদ!
তার ঠোঁট নড়ছিল, শব্দবিহীন কিন্তু স্পষ্ট; যেন বাতাসের ভাষা
তার শরীর বেয়ে সমুদ্র জলের ধারা নেমে আসছিল সভ্যতার পাটাতনে,
সমুদ্র গন্ধা সে, হঠাৎ ফিরে যেতে লাগল সমুদ্রেরই কাছে,
দেখছি, তার দু’হাত হংসের মতাে সাদা হতে হতে ক্রমশ অদৃশ্য
একবারও পিছনে না ফিরে সে শূন্যে মিলিয়ে যেতে লাগল,
কিংবা মৃত্যুরই কাছে।
তবুও সেই গন্ধ আজও আমার শরীরে লেগে আছে,
একাকী বিজনে সেই গন্ধ জড়িয়ে বলি, সমুদ্রগন্ধা, তোমায় ভালোবাসি।

 

৭।
জড়িয়ে রাখাে বুকের অতলে

ভেজা পাতার দেয়ালভেদী দ্বৈত মাদলের বোল
দূর অরণ্যের বুক চিরে লিখে যেমন অন্ধকার জয়ের গান,
তোমার হৃদয় তেমনই নিয়ত মন্থনে
রাত পাখিদের খেয়ালী গানে সুর তুলে।
আমাকে আমূল বন্দি করে বলে, ভালোবাসি।
মৃত্তিকার গর্ভসূতা বিচ্ছিন্ন করেছে দুঃস্বপ্নের রাত
ক্রমশ এগিয়ে আসছে তার নিপুন অভ্যস্ততার হাত,
টেনে আনছে ধীরে অশেষ ছায়ার শরীর
প্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনের রোদ গায়ে মেখে;
তাই বলছি, জড়িয়ে রাখাে আমাকে আবেগে প্রবল
আমাদের গন্তব্য হোক বিশুদ্ধতার পাঠশালার উঠোন
তোমার বুকের মাদলে জাগুক পঙ্কিলতার বিরুদ্ধ সুর;
জিজ্ঞাসু তারাদের দিকে ছুটে যাবে স্বপ্নের ছায়াপথ
কানে কানে বলবে, দূরত্বের দরজা খোলার চাবি ঐ একটাই-
ভালোবাসা তার পোশাকী নাম;
যতন করাে তাকে যেমন পারাে,
জেনো তবে, অযত্নে সে হারায় অতল সাগরে।

৮।
বিভ্রান্তির জাল ছিন্ন করে জেগে ওঠার গল্পপাঠ

ভালো লাগে নিশীথের এই প্রেম,
ঘুমের আচ্ছন্নতার দেয়াল ভেদ করে পরস্পরের কাছে আসা;
তুমি তীব্র ঘুমে যখন অদৃশ্য হতে হতে ক্রমশ উধাও হতে চাও
ঠিক তখনই বিভ্রান্তির সকল জাল ছিন্ন করে আমি জেগে উঠি
তোমাকেও জাগাই;

নিবিড় মগ্নতায় স্বপ্নের গভীর পথ বেয়ে উড়ে যায় তোমার হৃদয়
কিন্তু তোমার বসন্ত শরীর এবং তার সজীব নিঃশ্বাস খুঁজে ফেরে আমাকে
ঠিক যেমন করে অন্ধকার ভেদ করে চারাগাছ তার চোখ মেলে থাকে
সূর্যের আলোয় নিজেকে জুড়িয়ে নেয়ার আহ্লাদে।
তারপরের সকালে জেগে ওঠা তুমি এক ভিন্ন মানুষ,
তবুও বিছানায় ছেড়ে যাওয়া বাসি কাপড়ের মতাে
এলিয়ে পড়ে থাকে গতরাতের প্রেমনিমগ্ন পুষ্প কুসুমের দল,
যা জীবনের আলো হাতে আমাদের পরস্পরের কাছে আসার কাব্য লিখে;
ঠিক যেমন গোপন আঁধারের বুক চিরে সূর্য তার উপস্থিতির উল্কি আঁকে।

 

৯।
স্বর্গের ছায়াপথ

আরও একবার চলাে নতজানু হই আলোর কাছে,
তার বিস্তীর্ণ জালের ঝর্ণা নিভিয়ে দিক যত অনাহুত কাজ,
একঘেঁয়েমির অথর্ব চাকা এবং অগ্নিশিখায় পুড়ে যাওয়া বিদায় শাঁখ;
এসো, রাতের এই শুদ্ধ বিভার পায়ে সমর্পন করি শস্যের নিয়ত চলন,
ধরণীর আলো হতে চুরি যাওয়া মধ্যাহ্নের গায়ে মিশে থাকা শস্য পাঁচালি;
স্বর্গের বিরাণ উপসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ ভিত স্তম্ভের মতাে
বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে জেগে থাকে একা, চাঁদ;
স্বর্ণের আভাও ধীরে ক্ষয় হয়ে আসে
তুমিও ত্রস্ত হাতে সাজাও প্রতীক্ষিত সমর্পণের রাত্রি, বেহাগের সুরে;
কী পরম রাত!
নদীর গাঁ বেয়ে নেমে আসা অভেদ্য জলের ধারা
স্বর্গের ছায়াপথে সাজায় আহ্লাদি বৃত্তবন্দি কামনার গম্বুজ;
আবেগের প্রচন্ডতায় সে কখনো ভাসায়, কখনো বা ডুবিয়ে দেয়
জীবনভর কুড়িয়ে নেয়া রং
যতক্ষণ না আমরা অন্ধকারের গান ভেদ করে উঠে আসি,
বিশাল অথচ অলস সমুদ্রের জলে যতক্ষণ না আলিঙ্গন পাতে
স্বর্গ থেকে উড়ে আসা ছাই সমাহার।

 

১০।
যেখানে জীবনের জয়গান

এ মাটির গভীরে একটা জায়গা কী দিতে পারাে আমাকে?
হোক সে ধূলি ধুসরিত কোনাে বিভ্রান্তির সমতল,
যেখানে ইচ্ছে করলেই আমি যেতে পারি দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে;
চাইলেই কোনাে স্পর্শ ছাড়া বিপ্রতীপ ঘুরে দাঁড়িয়ে
ভেঙে দিতে পারি জগদ্দল পাথরের মূক অচলায়তন
কিংবা পড়ে থাকা আঙ্গুলের দীর্ঘ ছায়াপথ;
আমি জানি, তুমি পারবে না। কেউ না।
কেউ পারেনি দিতে খোঁজ সেই নন্দন সমতল,
সেই পথ, যা সুন্দরতম;
আমার হৃদয় মথিত আবেগের কী’বা মূল্য আছে
যদি না সে পেল নিত্যদিনের অর্থবহ জীবন উদযাপনের সুখ
কী হবে এত হাহাকার বুক পকেটে জমা রেখে
ঘুমকাতুরে মৃত্যুর ছায়া মাড়িয়ে
যদি না জাগতে দেখি জীবনের সমুদ্র সফেন!

 

১১।
এসো, ইচ্ছেগুলো সাজাই

আমাদের মতাে এমন করে কে কবে কাকে চেয়েছে,
এসো, স্মৃতির পিঁড়িতে জিরোই খানিক,
হৃদয়ের পুড়ে যাওয়া ছাইগুলোর দিকে তাকাই
যেগুলো উড়ে চলে গেছে অনেক কাল আগে বহু দূরে,
তবু যারা বাতাসে রেখে গেছে প্রেমগন্ধা কথা পুরাণ।
এসো আমাদের ভুলে যাওয়া চুম্বনগুলোকে
আবার একে একে ঠোঁটে সাজাই,
যতক্ষণ না শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ফুলগুলো
প্রাণময় হয়ে ফোটে;
আহা, ডানাভাঙা ইচ্ছেপাখিটা কেমন জবুথবু প্রাণহীন পড়ে আছে
এসো, সেই ইচ্ছেপাখিটাকে জাগাই,
তার ডানায় আজ সাতরঙা প্রজাপতি ভর করুক;
আকাশের নীলে তাকে লিখতে বলাে সেই সব কথা
যা ক্রমশ রুদ্ধ হতে হতে গহীনে বন্দি হয়ে হাঁসফাঁস করে মরছে;
ভঙ্গুর বীজতলা থেকে উঠে আসা অবিনশ্বর স্বপ্নদ্বীপে
আলো জ্বালিয়ে রাখার দায় কীভাবে এড়াবে বলাে?
সময়ের শীতগুহায় প্রোথিত যে তুষারে ঢাকা ইচ্ছেদল
এসো, তাতে শরতের মায়া ছুঁইয়ে দিই
তার জাগরণ উন্মুখ বুকের গভীরে বসন্তের আলো জ্বেলে দিই;
ডুবে যাওয়া প্রাচীন প্রস্তরে গাঁথা ইচ্ছেমালা
যারা নিজেদের ভাসিয়েছে অনন্তকালের নিঃশব্দ যাত্রায়
এসো, তাদের ফিরিয়ে আনি,
জীবনের অদ্ভুত সজীবতার আলো গায়ে মেখে তারা উদ্ভাসিত হোক।

 

১২।
ভালোবাসি, গোপনতম তোমাকে

যে তুমি ছিলে কাঁটার পোশাকে ঢাকা সমুদ্র গোলাপের মঞ্জুরি
তাকে তো আমি ভালোবাসি না;
আমি যে তাকে ভালোবাসি-
সোহাগি রাত এবং হৃদয়ের মাঝখানে যে তুমি থাকাে
সলাজ গোপন;
যে চারাগাছটি উন্মুখ সূর্যস্নানে
পুষ্পবিহীন, কিন্তু তার গর্ভে অনাগত পুষ্পের অবারিত সুগন্ধ বর্ষণ
মাটি হতে ক্রমোত্থিত সেই অনাগত সম্ভার আমার আমাকে
অপার প্রেমে আচ্ছন্ন করে;
তুমি কে, কোথায়, কেমন
এতসব পোশাকী জানা-শোনার বৃত্ত ভেঙে তোমায় ভালোবাসি,
নিঃসংকোচ, নিরঅহংকারে সত্যের আগুন বুকে চেপে
তোমায় ভালোবাসি;
ভালোবাসা ছাড়া বিকল্প কোনাে পথের খোঁজ প্রয়োজনই নেই,
না তোমার , না আমার;
পরস্পরের অস্তিত্বে ভিন্নতার দেয়াল ভেদ করে আমরা এক হয়ে আছি,
আমার বুকের উপর তোমার যে হাত মমতা বুলায়
কিংবা আমার চোখের যে পাতা ঘুমের কাছে নিজেকে সঁপে;
কোনটা যে কার!
সে প্রশ্ন বাহুল্যের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ঘুরে মরছে, মরুক।

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments