বুক রিভিউ

পাতায় পাতায় পাঠককে তার নিজের কথা মনে করিয়ে দেয়

বুধবার, ০৭ এপ্রিল ২০২১ | ১১:৩৮ অপরাহ্ণ | 106 বার

পাতায় পাতায় পাঠককে তার নিজের কথা মনে করিয়ে দেয়

।। বনানী রায় ।।

কোনো বই যখন পাতায় পাতায় পাঠককে তার নিজের কথা মনে করিয়ে দেয়; নিজেকে নতুন করে তার ছেলেবেলা, তার পাখির ডানায় ভর করে মন উড়িয়ে দেবার চেষ্টা, জোৎস্না রাতে চাঁদের উজাড় করে দেয়া জোৎস্নায় ভাসা, শত কোলাহলে হাজার মানুষের ভিড়ে নিজের একাকী মনকে খুঁজে চলার কথা বলে তখন সে বই মনে জায়গা করে নেয় আপনাআপনি। এ যেন আমারই কথা লেখক বলে চলেছেন তার নিজস্ব ভাষায়, জাদুকরি বর্ণনায়, সাহিত্যের ছোঁয়ায়। পড়ে শেষ করলাম লেখক রয় অঞ্জনের ‘পথিক পরান’ এর চারটি অধ্যায়ে ভাগ করা তিনটি অধ্যায়। বাকি আছে পুরোদমে পুরুলিয়ায় অধ্যায়টি। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে লেখার তাড়না অনুভব করছি। তাই তিনটি অধ্যায় নিয়েই লিখতে বসে পড়লাম।

বইটির প্রথমে বান্দরবানের বন পাহাড়ের গল্প। আহা! বেড়ানোর জন্য, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার জন্য আমার আকুল হৃদয় যেন আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে পৌঁছে গেল মিলনছড়ি। দেখে এলো সাঙ্গু নদী, ভিজে এলো শৈলপ্রপাতের ঝর্না ধারায়, হঠাৎ মনে হলাে আমার পায়েও কে যেন ঘষে ঘষে লাল ফুলের রস লাগিয়ে দিচ্ছে আলতার মতাে করে সৌরভেরই মতাে। তারপর এক এক করে অ্যাডভেঞ্চার- গ্যালেংগার তাইমাতং পাহাড়, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার ফুট উঁচু ডিম পাহাড়, পাহাড়ি জীবনের সাথে মিশে তাঁদের সাথে দিন কাটানো, রাত কাটানো; রাতে পাহাড়িদের আসর, উৎসব, ফানুস ওড়ানো সব যেন রূপকথার বর্ণনা নয় জীবন্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। প্রত্যেকবার এক জায়গা থেকে বিদায় নেওয়া বিচ্ছেদের রাগিণী নতুন জায়গায় গিয়ে সুর হয়ে ফিরে এসেছে।
আহারে পূর্ণিমা রাত, আহারে জোৎস্না! পাহাড়ে গিয়ে এভাবে জোৎস্না গায়ে মাখার সাধ সবার পূরণ হয় না। লেখক সে দিক থেকে রাজাধিরাজ, সৌভাগ্যের চূড়ান্ত শিখরে।
এই পর্বে গল্পের মধ্যে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্ব হারানো একটি পরিবারের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমন উঠে এসেছে কিছু বাস্তব চিত্র। যেমন সমাজের ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে বিকৃত রুচির সমকামী হিংস্র জানোয়ারদের শিকার কিশোরের কথা। মনের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে পাহাড়ি মানুষের জীবন, তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর আতিথেয়তা-যত্নের মায়া কাড়া সব সম্পর্কের বর্ণনা। তারপর গল্পে গল্পে সেই মাকে নাকফুল পরানোর কী মর্মস্পর্শী গাঁথা, আহ্!
এই পর্বটিতে আমার দু’একটি জায়গায় খাপছাড়া লেগেছে বা খামতি লেগেছে। মায়া আর সৌরভের সাথে কথা বলতে বলতে লেখক হঠাৎ যেন কখনও মায়ার কথা, কখনো সৌরভের কথা ভুলে যাচ্ছিলেন। নিজেকে আর প্রকৃতিকে নিয়েই মজে ছিলেন। হয়তো তিনি প্রকৃতিকে বেশি প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন বলেই। আবার একটি দলের সাথে বেড়াতে গেলেন তাইমাতং পাহাড় এবং ডিম পাহাড়ে। সেখানেও দলের অন্যদের কোনো বর্ণনায় না এনে যেন একটু অবিচার করলেন। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে।
তারপর চলে এলাম পন্থে পন্থে ঘুরে বেড়ানো লেখকের কলকাতার অদূরে মৌসুনী দ্বীপে। অন্য কোনো দ্বীপে আমার যাওয়া হয়নি। পড়তে গিয়ে বার বার আমি চলে যাচ্ছিলাম আমার স্মৃতিতে অম্লান সেন্টমার্টিনে। লেখকের চায়ের নেশা আর কোনােরকম লজ্জার তোয়াক্কা না করে চা চেয়ে খাওয়া বেশ মজাই দিয়েছে। খাবারের লোভনীয় বর্ণনা আমার মতাে খাবারে অরুচি মানুষের জিভে জল এনেছে। মৌসুনী দ্বীপে ট্রাভেলার্স ক্যাম্পের চারজনের জন্য ফ্যামিলি টেন্টে থাকার ভয়ংকর ইচ্ছে জাগিয়েছে। বকখালি বিচের বর্ণনায় আমার ভালােলাগার, বুকের মধ্যে শিহরণ জাগানো কক্সবাজার বিচের আর হোটেল সি প্যালেসের স্মৃতি মনে করিয়েছে বারবার। এই ভ্রমণে লেখার কোনো ত্রুটি আমার চোখে পড়েনি।
শেষে চলে আসলাম লেখকের নাড়িপোঁতা ঘরে। এই পর্বটিতে তিনি তাঁর গ্রাম, ছেলেবেলার স্মৃতি, ছেলেবেলার বিভিন্ন আত্মার আত্মীয়ের বর্তমান আর অতীতকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে মনের মধ্যে ঝড় তুলেছেন। ছেলেবেলার কিছু অভাবের চিত্র তুলে মন ভার করে বর্তমানের স্বচ্ছলতার ছবি তুলে মন ভালাে করে দিয়েছেন। আমাদের দেশের সব গ্রামের দৃশ্য, আমাদের বেড়ে ওঠার স্মৃতিগুলো, ছেলেবেলার বাজার আর সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অমুক কাকা, তমুক চাচা কোথায় যেন আমাদের সবার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ছেলেবেলার কিছু কিছু মজার স্মৃতির বর্ণনায় হেসে লুটোপুটি খেয়েছি। যেমন: ডাব চুরির অভিনব পদ্ধতির বর্ণনা এবং বুক ফুলিয়ে দলের আগে আগে গিয়ে ধরা পড়া, চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে দুই বাড়ির যৌথ মারের ভয়ে মায়ের কাছে ভালাে সাজার চেষ্টা- মাগো, আমি কি ডাব গাছে উঠতে পারি গো! তারপর, টিউব অয়েলের উপরের দিক দিয়ে শুকনো বিস্কিট ছেড়ে বাদুর ঝোলা হয়ে চাপ দিয়ে টিউব অয়েলের মুখ দিয়ে ভেজা বিস্কিট বের করা (এ বোধহয় অঞ্জনদার পক্ষেই সম্ভব)। আরও একটা জায়গায় বেশ মজা লেগেছে যেটা আমি গ্রামে গেলেও আমার সাথে হয়। ছেলেবেলার বন্ধুরা বহু বছর পর দেখা হলে তুই বলতে না পেরে হঠাৎ তুমি সম্বোধন করে, কেউ কেউ ভাব বাচ্যেও কথা বলে, আমিও যার প্রতিবাদ করি সাথে সাথে।
আর আছে কিছু দুঃখ গাঁথা যার বর্ণনা আপনারাই পড়ে নিন। এখানে ত্রুটি নয় শুধু চোখে পড়েছে মায়া।

বইয়ের নাম : পথিক পরান
লেখক : রয় অঞ্জন
প্রচ্ছদ : বিপুল শাহ্
প্রকাশনী : ভাষাচিত্র
ক্যাটাগরি : ভ্রমণকাহিনি
প্রকাশকাল : বইমেলা ২০২১

Facebook Comments Box