পাঠক প্রোফাইল

পাঁচ হাজার বইয়ের ছোট্ট একটা লাইব্রেরির শখ আমার

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০ | ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ | 580 বার

পাঁচ হাজার বইয়ের ছোট্ট একটা লাইব্রেরির শখ আমার

॥ শামীমা ইসলাম ॥

নদীমাতৃক দেশ হলেও উত্তরবঙ্গে তেমন নদী নেই। আমার জেলা ঠাকুরগাঁও, নদী বলতে টাঙ্গন আর তার শাখা নদী “শুক”। এই শুক নদীর গা ঘেষে আমাদের গ্রাম, ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়।

 

স্কুল ফিরে পাড়ার সবাই দলবেঁধে ভাসতে যেত নদীতে, আমাদের সে উপায় ছিল না। আম্মা আমাদের ডুবতে পাঠাতেন। স্থান : ব্র্যাক গণকেন্দ্র পাঠাগার। একইসাথে ঘরে ফিরতাম আমরা, ওদের গায়ে ভেসে উঠতো সাদা শ্যাওলা আর আমাদের চোখে-গায়ে তখন সাদা হাঁসের পালকের মতাে প্রশান্তি। ঘরের কাজ সেরে আম্মাও সামিল হতেন হাঁসের মতাে শামুক খোঁজার সে আনন্দযজ্ঞে।
বিকেলটা পাঠাগারে কাটিয়ে আমরা মা-মেয়েরা ঘরে ফিরতাম। বই লেনদেনের ব্যবস্থা ছিল, তবে মায়ের আইনে আমাদের বই ঘরে আনা গর্হিত কাজ। আম্মা আনতেন। রাতে হারিকেনের আলোয় মেঝেতে মাদুর পেতে আমরা যার যার ক্লাসের বই পড়তাম, আম্মা পড়তেন নজীবর রহমান সাহিত্যরত্নের ‘আনোয়ারা’, ইমদাদুল হকের “আব্দুল্লাহ”, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দূর্গেশনন্দিনী’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘পথের পাঁচালী ‘ আর কত কত বই!
আমার পড়া শেষ হলে ঘুমিয়ে পড়তাম, আম্মা বালিশে হেলান দিয়ে, হারিকেনের শিখা কমিয়ে দিয়ে পড়তেন তারাশঙ্করের ‘ধাত্রীদেবতা’ কিংবা মানিকবাবুর ‘জননী’। খেতে বসলে আম্মা ভাত মেখে ছোট ছোট গোল বানিয়ে প্লেটে সাজিয়ে দিতেন আর সুফিয়া কামালের পল্লীবালা ছড়া কাটতেন
“পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে
আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনী খেয়ে”।

সেই আমাদের তথা আমার শুরু, আমার সাহিত্যযাত্রা মায়ের দেখানো পথে। প্রাথমিক পেরিয়ে মাধ্যমিক… সেখানেও ব্র্যাকের গণগ্রন্থাগার। ভাগ্যদেবতার বিশেষ কৃপায় আমাদের শ্রেণিকক্ষও লাইব্রেরি রুম ঘেঁষে। ক্লাসের ফাঁকে আমি কোনােদিন কমন রুমে যাইনি, বইয়ে মুখ লুকিয়ে থেকেছি। আনন্দের সংবাদ সেই সময়ে লাইব্রেরিতে যত বই ছিল সবগুলোর পেছনে যে নিবন্ধন কার্ড থাকে তাতে আমার হাতের লেখা ছিল। লাইব্রেরিয়ান ম্যামের সাথে বসে বসে রেজিস্টার খাতায় বইয়ের নাম নিবন্ধন করেছি আমি।

বন্ধুরা যখন দলবেঁধে হুটোপুটি করতো তখন আমি নীহারঞ্জন রায়ের কিরীটির সাথে কোথায় কোথায় ঘুরছি। ফেলুদা, বোমক্যাশ, শার্লক, টম সয়্যারের সাথে দূদার্ন্ত প্রেম আমার কৈশোরেই। সংশপ্তক, সারেং বউ, রাইফেল রোটি আওরাত, চিলেকোঠার সেপাই, চাচাকাহিনী, দেশেবিদেশে, শেষের কবিতা, মৃত্যুক্ষুধা আরও কত কত বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই।
মাধ্যমিকে ভালো ফলাফলটা কাল হয়ে দাঁড়ালো। পরিবারের স্বপ্নের সাথে আমার সাদা এপ্রোনের স্বপ্ন যোগ হলো। বইয়ের সাথে হলো সাময়িক বিচ্ছেদ। বিচ্ছেদ দীর্ঘস্থায়ী হলো স্বপ্নভঙ্গের কষ্টে। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত আমি সিলেবাসের বাইরে কোনাে বই পড়িনি। দীর্ঘ অভিমান থেকে মুক্তি পেয়েছি এই ফেসবুকের কল্যাণে, বুকস ইয়ার্ড গ্রুপের মাধ্যমে। আবার পড়া শুরু, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি আর দিনাজপুর পাবলিক লাইব্রেরি আমার কাছে সমুদ্র। সুনীল বাবুর ট্রিলজি, কড়ি দিয়ে কিনলাম, জীবনানন্দের কবিতা, উপন্যাস এত এত বইয়ের কী নাম বলা যায়?

আর সংগ্রহের শুরুটা অনেক পরে। প্রথমদিকে কাচারি রোডের পুরাতন বই দিয়ে, তারপর নীলক্ষেত প্রিন্টের চিরায়ত সাহিত্য এবং টিউশনির টাকা দিয়ে পরবর্তীতে সমসাময়িক লেখকদের বই কেনা।
খুব বেশি নয়, মাত্র পাঁচ হাজার বইয়ের ছোট্ট একটা লাইব্রেরির শখ আমার এবং সেটা নিজের টাকায় (অবশ্যই বিয়ে-শাদীর আগেই)।
বই নিয়ে লিখতে, বলতে গেলে আমি অক্লান্ত কর্মী। চিরায়ত প্রেমী হলেও থ্রিলারও কম পছন্দ নয়। ইদানিং ননফিকশনের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে।
স্বপ্নটা স্বচ্ছ, যাত্রাপথ দীর্ঘ, ইচ্ছেটা দূর্মর কতটা যেতে পারব জানি না। তবু ভবিষ্যতটা বইকে জড়িয়ে হলেই আমি বেঁচেবর্তে যাই।
সবশেষে চাওয়া,
আমরা বইয়ের হই
বই আমাদের হোক।

 

[ বই-পুস্তক-প্রকাশনা এবং বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের যে কোনো সংবাদ প্রকাশের জন্য আমাদের ই-মেইল করতে পারেন : desherboi@gmail.com ]

 

Facebook Comments