ফেসবুকে শিশুসাহিত্যিক, গল্পকার ও গবেষক আতাউল করিম…

মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৯ | ১:২১ অপরাহ্ণ | 222 বার

ফেসবুকে শিশুসাহিত্যিক, গল্পকার ও গবেষক আতাউল করিম…

পঁচিশ বছরের গল্প…

বৃটিশ রাজকবি টেড হিউজেস পরিণত বয়সে লেখা বার্থডে লেটার কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রেমিকা এবং স্ত্রী আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথের সাথে প্রথম পরিচয়ের একটি রোমান্টিক বর্ণনা দিয়েছেন । টেড হিউজেস তখন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ছাত্র । আমেরিকা থেকে ফুলব্রাইট স্কলারশিপে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে সে বছর কেমব্রিজে পড়তে আসছে । নতুনদের ছবিগুলো নোটিশ বোর্ড দিয়ে দেয়া হয়েছে । টেড হিউজেস দাঁড়িয়ে ছবিগুলো দেখলেন । স্বাভাবিকভাবে মেয়েদের ছবিগুলোই মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলেন। একটি সুন্দরী মেয়ের ছবি তাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল । কবি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ভাল লাগা সেই চিবুকের, মুখমন্ডলের, লম্বা চুলের । কবির কবিতার সেই সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে কবিতাটির মৌলিক পাঠের কোন বিকল্প নেই ।
রেখার সাথে আমার পরিচয়টা কী সেরকমই কিছু, নাকি তার চেয়ে অনেক আকর্ষণীয় কিছু যা এতোবছর পরে আমার বর্ণনায় এঁকে ফেলা হয়তো সম্ভব নয় ! বিশ্ববিদ্যালয়ের একদঙ্গল ছেলেমেয়ে তখন বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দিতে এসেছে প্রশাসন ক্যাডারে । আমি চার ব্যাচ আগে যোগ দিয়ে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সহকারী সচিব । আমাদের কর্মসময় সকাল আটটা থেকে দুপুর আড়াইটা, আর ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের অফিস চলে মাঠ প্রশাসনের নিয়মে দশটা পাঁচটা । আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী এবং বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ব্যাচমেট সাজ্জাদ সেগুন বাগিচার সে অফিসে কাজ করে । আমাদের আগের ব্যাচের আশফাক ভাই , গোকুলদা, রিয়াজ ভাই, ওরাও এ অফিসে এবং সিনিয়র ব্যাচের হলেও বন্ধুর মতোই সম্পর্ক । সচিবালয়ে অফিস ছুটির পর সেগুন বাগিচার এ অফিসটিতে এসে আড্ডা দেয়া, গল্পগুজব করা, প্রায়ই হয়ে থাকে । সেদিন সকালে আশফাক ভাই ফোন করলেন, তুমি আসছোনা কেন, বেশ কিছু নতুন ছেলেমেয়ে এসেছে,ওদের প্রশিক্ষণ চলছে । বেশ সুন্দরী কয়েকজন মেয়েও আছে । ঐ বয়সে সুন্দরীদের প্রতি আকর্ষণ থাকাটা তো স্বাভাবিক ! সেদিন আমি না গিয়ে পারলাম না । আশফাক ভাই নিয়ে গেলেন মিলনায়তনটিতে যেখানে নতুনরা কাগজপত্রে মনোযোগ দিয়ে লেখালেখির কাজ করছিল । আশফাক ভাই ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে পরিচয় করিয়ে দিলেন, এরপর এদের উদ্দেশ্যে আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বলতে বললেন । সেদিন কী বলেছিলাম মনে নেই । চোখ আটকে গেল রেশমের মতো সুন্দর চুল একটি মেয়ের দিকে, ওর কেশরাশি কোমর ছাড়িয়ে আরও দীর্ঘ, চুলে কতগুলো ফুল গুজে দেয়া, অসম্ভব সুন্দরী মিষ্টি মেয়েটি । আশফাক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম মেয়েটির নাম কী ! আশফাক ভাই জানালেন তিনিই এদের কোর্স কোঅর্ডিনেটর । তিনি তার কক্ষে আমাকে নিয়ে গিয়ে সহকারীকে ডেকে বললেন নতুন যোগদানকারীদের জীবন বৃত্তান্তের নথিটি নিয়ে আসতে । মেয়েটি হলিক্রসের মেধাবি ছাত্রি,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) থেকে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি।,ফার্মাকোলজিতে রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়ে দেশের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড পেয়ে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট পজিশন নিয়ে গ্রাজুয়েশন করেছে । বাসা ঢাকার ফার্মগেটের কাছে ইন্দিরা রোডে । জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে মনবসু স্কলারশিপে জাপানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানব মস্তিকের জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য । মায়ের অনুরোধে দেশে এসেছে বিসিএস এর চাকুরিতে যোগদানের জন্য । হয়তো যোগদান করেই ছুটি নিয়ে চলে যাবে । আশফাক ভাই এর প্রতি রাগ করে বললাম আমার প্রয়োজন শিল্প সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত একটি মেয়ে যে কবিতা বোঝে, রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিম পড়ে । আশফাক ভাই বললেন তুমি ওর সাথে কথা না বলেই কেমন করে জানলে যে, ও রবীন্দ্রনাথ পড়েনা ! আশফাক ভাই মেয়েটিকে তার কক্ষে ডাকালেন এবং আমার সাথে কথা বলার পরিস্থিতি তৈরি করে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন । আমি লক্ষ্য করলাম একটি সাধারণ সূতির শাড়ির সঙ্গে চমৎকারভাবে ম্যাচ করা জুতো, গলার মালা, কপালের টিপ, নেল পালিশ, সব কিছুর মধ্যে কেমন যেন উন্নত রুচির ছাপ আছে । মেয়েটি জানালো পরদিন সে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যাবে তার ছুটির খোঁজ নিতে । জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পাশের ভবনেই স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয়। আমি মেয়েটিকে আমার অফিসে আমন্ত্রণ জানালাম । সচিবালয়ের অভ্যর্থনা কক্ষে অভ্যর্থনা পদ্ধতি খুবই খারাপ। মেয়েটি যাতে প্রথম দিনই বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয়, তাই ওদের প্রশিক্ষণস্থল শাহবাগের বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে আমার বাহনটি পাঠিয়ে দিলাম অতিথিকে সসন্মানে নিয়ে আসার জন্য । আমার ড্রাইভার মহিউদ্দিন বেশি কথা বলে ।সচিবালয়ে আসার পথে তার স্যারের যতোটা গুণকীর্তন করা যায়, করতে করতে অতিথিকে ব্যতিব্যস্ত রাখলো। সেইসঙ্গে জানাতে ভুললো না যে, তার স্যার ব্যাচেলর । আমার সুন্দরী অতিথির আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠলো আমার পুরো অফিস । পিয়ন বাদল, অফিস সহকারী সুবল, ওরা এ সময়টাতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রাখলো । স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ডাক্তারদের ভিড়ের চাপ সামলানো মুশকিল। কিন্তু যখনই আমার এই বিশেষ অতিথি আমার কক্ষে আসতো, বাদল সুবলরা যে করেই হোক দর্শনার্থীদের চাপ সামলে আমাদের একান্ত পরিবেশ নিশ্চিত রাখতো । গল্পে গল্পে জানা হয়ে গেল মেয়েটি বিজ্ঞানের মেধাবি ছাত্রি হলেও সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ পাঠক, আমার মতেই একজন জীবনানন্দ প্রেমিক, আবুল হাসান, শঙ্খ ঘোষ তার পছন্দের কবি,বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ থেকে হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েছে । আমার সাথে সবকিছুই মিলে, যতই কথা বলি, মুগ্ধতা ততই বাড়ছে । অফিস ফাঁকি দিয়ে কাকরাইলের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলাম, রমনার বটমূলে বৈশাখি মেলায় নিয়ে গেলাম, আস্তে আস্তে ওর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে থাকলাম । কিন্তু এপ্রিল শেষ হতে না হতেই পাখি একদিন উড়ে চলে গেল । আমার মনে হলো বিশ্বাস বলে কিছু হয়তো এ জগতে ছিলনা । কিন্তু কয়েকদিন পরের ঘটনা, সরকারী সব চিঠিপত্রের ভিড় থেকে আলাদা করে বাদল নিয়ে এলো বিদেশি খামে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠি । অফিসের দরজা বন্ধ করে বাদলকে দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়ে একান্ত পরিবেশে খুললাম সেই বিদেশি খাম । বিমানের একটি টিস্যুতে বল পয়েন্ট কালিতে লেখা সেই চিঠি । সেদিন আমি জানলাম, মেয়েটি যত দূরেই থাকুক, সে এখন আমার হয়ে গেছে ।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, আস্তে আস্তে উভয় দিকে পারিবারিক পরিবেশ অনুকূলে এনে, কনের গায়ে হলুদ,বরের গায়ে হলুদ,ঢাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান, বৌভাতের অনুষ্ঠান সবকিছুর মধ্য দিয়ে সেই মেয়েটি মানে রেখা আমার বউ হলো । আজ ২৯শে এপ্রিল, রেখা আমার বউ হওয়ার ২৫ বছর পূর্ণ হলো । পরিবার বড় হয়ে ছেলে দীপ্র এবং মেয়ে ধ্রুবাকে নিয়ে আমরা চারজন হলাম ।সেদিন যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই এখনও ঢাকাতেই আছেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ।
আমরা এখন প্রবাসে, আমেরিকার আরকানসাসে । গতকাল ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাসের একটি মিলনায়তনে এখানকার প্রবাসি বাঙালিদের নিয়ে উদযাপন করেছি আমাদের বিয়ের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান । পুরো অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনের দায়িত্বে ছিলেন শাহ আশরাফ অ্যাপোলো । অনুষ্ঠানের কয়েকটি ছবি এখানে দিলাম । আমাদের জীবনের সামনের দিনগুলোও যেন সুন্দর হয়, সবার শুভকামনাগুলো যেন থাকে আমাদের পাশে ! আমরাও কামনা করি আমাদের শুভাকাঙ্খি এবং চারপাশের মানুষের সুখি ও সুন্দর জীবন ।

ছবি কৃতজ্ঞতা : মারুফ এবং পীযুষ, উভয়েই ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাসের পিএইচডি গবেষক, কিন্তু ফটোগ্রাফিকেও সাধনার বিষয় হিসেবে নিয়েছেন বলে জানি ।