নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছি : দীলতাজ রহমান

বৃহস্পতিবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৬:৫১ অপরাহ্ণ | 322 বার

নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছি : দীলতাজ রহমান

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা। আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি গল্পকার দীলতাজ রহমান-এর

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভজ্ঞিতা জানতে চাই।

লেখালেখি করব তেমন কোনো স্বপ্নই জীবনে ছিল না। ক্লাস নাইনে থাকতে বিয়ে হয়। ধরতে গেলে স্কুলের খেলার মাঠ থেকে স্বামীর ঘরে চলে আসা। সেদিন স্কুল ছুটির পর স্কুলের পিছনে গোল্লাছুট খেলছিলাম। আব্বা কাউকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বললেন, জামাই তোমাকে দিয়ে আসতে বলেছে!’ বিয়ে হয়েছিল বিশ দিন আগে।

টঙ্গী রেল স্টেশনের কাছেই ছিল আমাদের বাসা। খেলা ভেঙে আমি তখনকার বহুল প্রচারিত একখানা টকটকে মালা শাড়ি জড়িয়ে আব্বার সাথে স্টেশনের দিকে হাঁটছিলাম। টের পেলাম আমার সাথে হাঁটছে আমার তখনকার খেলা ভাঙার সাথীরা। ট্রেন যখন ছেড়ে দেয়, জানালায় বসা আমার হাত থেকে একসাথে ওদের সবার হাত সরে যায়। সংসার জীবনে ঢুকে বহুবছর আমার সেই ঘোর কাটেনি। মনে হতো আমি স্টেশনে এখনি ছেড়ে যাওয়া ট্রেনে বসে আছি, স্কুলের বন্ধুরা সবাই আমার হাত ধরে আছে…। আসলে সেদিন থেকেই তো পৃথিবীর মুক্ত আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হলাম।

পরপর চার চারটি ছেলেমেয়ে হলো। আমার লেখাপড়া করার মতো ফুসরত হলো না। ক্রমে ভাবতে লাগলাম, আমি যা হতে পারিনি, তারচে’ বেশিদূর আমার ছেলেমেয়েকে এগিয়ে দিতে হবে। ফুল হয়ে ফোটার চেয়ে চারার টবে মাটি হওয়ার প্রবণতা আমাকে পেয়ে বসলো। বড়টির কথা ফোটার সাথে সাথেই অক্ষর চেনাতে বসি। এভাবে তাদের দলামুচড়ো করে ফেলে দেয়া কাগজগুলো জাজিমের নিচে রাখি। ক্রমে ওদেরকে শব্দগঠন শেখানোর ফাঁকে আমার অবচেতন মনের কথাগুলো লিখে লিখে কাগজগুলোর সদ্ব্যবহার করতে থাকি। দিনের পর দিন। আর ওটুকুতেই ছিল আমার পরম তৃপ্তি। যে কাগজের কাগজ জীবন ব্যর্থ হতে দিলাম না!

কিন্তু একদিন আমার স্বামী একটা কাগজের দলা তুলে তা খুলে পড়ে আমাকে বললেন, ইদানীং তুমি যা লিখছো তা কবিতা হয়ে যাচ্ছে। এগুলো ফেলো না। রেখে দাও। বই করে দেব।

সত্যিই আমি আর সেগুলো না ফেলে একটা ডায়েরিতে তুলতাম। আর ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করাতে করাতে সে ডায়েরি থেকে আবার তুলে দুইটাকার খামে পত্রিকা অফিসগুলোতে পাঠাতাম। আর এই তুলতে গিয়ে নিজেরই নতুন নতুন সংকীর্ণ বোধের সাথে পরিচিত হতে থাকলাম। আমার অভ্যাস ছিল একই লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় দেয়া। তখন তো কম্পিউটারে লিখতাম না, ফটোকপি করার কথাও মাথায় আসতো না। তার কারণ তখন যেখানে সেখানে ফটোকপি মেশিনও ছিল না। বিয়ের পরপর এক অনুন্নত এলাকায় বাড়ি করে ফেলেছিলাম। এখন যে এলাকার পাশে রাজকীয় বনশ্রী! তাই হাতে লেখা মানে নিজেকে উৎর্কীণ করতে করতেই যেন উৎর্কষীত হতে থাকি…।

তারপর কবিতা জমতে জমতে ৯৫ সালে আমার ‘আশ্চর্য সর্বনাশ’ ও ‘সবুজের সাথে সখ্য’ নামে দুটি বই একসাথে আসে। আর বই প্রকাশিত হওয়ার সে আনন্দ ছিল সত্যিই অপরিসীম।

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলাে?

আগের প্রশ্নের উত্তরেই দ্বিতীয় এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা নীরবে মিশে আছে। আসলে যেটুকু বিদ্যা ছিল, তা দিয়ে তো কিছুই হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তবু আমার অনেককিছু হতে ইচ্ছে করত। কেন যেন মনে হত মাথা উঁচু করে,বুক ফুলিয়ে চলা মানুষের মতো আমিও একদিন সটানে চলতে পারব।

যদিও এর পেছনে একটা প্রচণ্ড হীনমন্যতা ছিল। আর তা হচ্ছে, আমার মায়ের কোনো ছেলে ছিল না। মা সবসময় আহাজারি করত শেষ বয়সে তার কি হবে। দ্বিতীয়ত ছেলে না থাকার কারণে তার নামটা আর উচ্চারিত হবে না, এটা ছিল তার ধারণা।
একদিন আদম শুমারি থেকে লোক এসে সবার নাম জানতে চাইলো। তাকে তথ্য জোগান দিতে বের হলো আমার থেকে বয়সে তিন বছরের বড়- আমার সৎভাই। আমার তখন বছর তেইশ বয়স। সৎভাইয়ের ছাব্বিশ। আমার তখন চতুর্থ বাচ্চাটির বয়সও বছর দুয়েক। যাহোক, সৎভাই সব প্রশ্নের উত্তর দিলো। কয় ভাইবোন এবং কে কোথায়। তারপর বাবার নাম। তারপর মায়ের নাম জিজ্ঞেস করলে শুধু তার মায়ের নামটি বলল। আর এটি টের পেয়ে আমার মায়ের আহাজারী আরো বেড়ে যায়। কারণ আমার মা-ই তাদেরকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। তার মায়ের কাজ ছিল সংসারের কাজ করা। আর আমার মায়ের কাজ ছিল ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করানো।

সৎভাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার মায়ের নামটা বাদ দেয়ায়, মায়ের যে আহাজারী আমি দেখেছিলাম, সেই তখন আমার মনে হয়েছিল, আমার মায়ের নামটি সারাপৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমার। কিন্তু কীভাবে সম্ভব তা ভাবিনি। তাই বই করার সময় কভারে নিজের পরিচিতি লিখতে গিয়ে যখন শুরু করলাম, ‘মা রাহিলা বেগম…’ সেই তখন আমার মন থেকে জগদ্দল পাথরের মতো অক্ষমতার ভারটা নামলো। সম্ভবত মায়ের নামটি আরো ওপরে তুলতেই আমার লেখালেখির প্রচেষ্টটা একটু মারমুখি টাইপের ছিল। তাতে করে প্রকাশের ধার না ধেরেও অল্প সময়ে বেশ কিছু গল্প কবিতা লিখে ফেলেছিলাম। আমার লেখালেখির সময়টা কিন্তু বয়সানুপাতে দশ বছর কম। মানে আমি নব্বই দশক থেকে লিখি। কিন্তু হওয়া উচিৎ ছিল আশি থেকে।

মাকে পরে বলেছিলাম, তোমার ছেলে ছিল না বলে তোমাকে যে সব ছেলের মায়েরা কোণঠাসা করে রেখেছিল, আজ তাদের নাম কোথায়? মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে কঠিন যন্ত্রণার ভেতরও আমার মায়ের মুখে এটুকু তৃপ্তি দেখেছি, যে তার নামটা তার মেয়ের বইয়ে ছাপা হয়েছে এবং তাকে নিয়ে আলাদা করে লেখাও হয়েছে।

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কােনাে অভজ্ঞিতা জানতে চাই।

দেখো, এই আধাখাস্তা জীবনটা নিয়েই আমি খুব মজায় থাকি! আর তা এরকম, শুরুতেই তো পেট খালি করে বিদ্যার দৌড়টা জানিয়ে দিলাম। যে বিদ্যা নিয়ে ঢোল পিটালাম, সেই বিদ্যা নিয়ে তো কিছুই হওয়ার কথা ছিল না। অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে বলি, বাইশ-তেইশ বছর বয়সের ভেতর চার চারটি বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাদের লালন-পালন করতে করতে আমি দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভাবতাম, ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলে আমি আবার দুই বেণী দুলিয়ে স্কুলে যাব। আবার ক্লাস নাইনে গিয়ে বসব। আবার সেই ছেড়ে আসা সতীর্থদেরও পাশে পাব! বিশ্বাস কর, দীর্ঘদিন ধরেই আমার মনে হতো না যে আমি যাদের সাথে পড়েছি, তারা কেউ আর ওখানে থাকবে না। তাদেরও বয়স হয়ে গেছে। তারাও সবাই যার যার নিজস্ব জীবনে ঢুকে ছড়িয়ে-ছিঁটিয়ে পড়েছে।

একদিন চার বাচ্চার কোনো একটার ওপর বিরক্ত হয়ে মারপিট করতে করতে বলছিলাম, কবে এগুলো বড় হবে, আর কবে থেকে আবার আমি স্কুলে যাব…। সেদিন একটু দূরেই আমার স্বামী বসে ছিলেন। তিনি আমার কথা শুনে সম্ভবত ভয় পেয়ে গেলেন, যে আমি স্বাভাবিক মানসিকতায় আছি কি না। না হলে আমি এমন আশা করি কী করে, যে আবার স্কুলে যাব! তিনি ভয়ে ভয়ে বললেন, তোমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না। অন্যরা স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করে যা পারে না, তুমি অনেক কিছুই তাদের থেকে বেশি পারো। বিশেষ করে তুমি যে ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছ, এটা অনেক বড় কাজ।

আমি তাকে বলেছিলাম, ছেলেমেয়ে পড়ানো তো মা’দের স্বাভাবিক কাজ। আমার মাও আমাদের লেখাপড়া শেখাতো। কিন্তু আমি কি কোনোদিন তোমার মতো অফিসে গিয়ে চাকরি করব না? তার জন্য তো একাডেমিক শিক্ষা ও সার্টিফিকেট লাগবে। নাকি? দেখলাম আমার এবাবের কথায় তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। তড়বড় করে বললেন, ‘তুমি বরং মন দিয়ে তোমার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাও। বড় হয়ে দেখবে ওরা বড় কোনো প্রতিষ্ঠান করেছে। তুমি তার চেয়ারম্যান হয়ে বসো। তোমাকে কারো আণ্ডারে চাকরি করা মানারব না।

আমি আমাদের ‘বিট মাস্কট’ এর চেয়ারম্যান। এটা একটি আন্তর্জাতিকমানের ফার্ম। এখন মনে হয়, এই তো যেন পরশুদিন স্বামীর সঙ্গে এসব নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আর যতটুকু যা লিখেছি, লেখক হিসেবে মানুষ আমাকে চিনছেন। লেখক হিসেবে একখানা জমি পেয়েছি, এই বা কম চমক! দেয়াল ভেঙে বহুদূর না যেতে পারি, বোধের বন্দীত্ব কাটিয়ে এপারে যে এসেছি, ধরতে গেলে সেটাও তো একটা চমক! আমি মনে করি- এর থেকে বেশি বলতে লজ্জা পাই। যেটা, বহু পাঠক আমার গল্প ভালোবাসেন, বলেন।

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশে সৃজনশীল লেখালেখির ভবষ্যিৎ সর্ম্পকে আপনার মতামত জানতে চাই।

শিল্পের প্রকৃত সাধক যারা তারা তাদের চর্চার মাধ্যমটি নিয়ে সবসময়ই আন্তরিক এবং সোচ্চার। এটা নিয়ে যেহেতু সস্তা বাণিজ্যের কোনো উপায় নেই, তাই লেখালেখিতেও অভূতপূর্ব উৎর্কষ আসবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ সাহিত্যে আমাদের শেকড় বা ভিত্তিটাই সুসংহত অনেক। এটা নিয়ে কারো দ্বিমত পোষণ করার উপায় নেই।

প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবষ্যিৎ স্বপ্ন?

আমি আসলে লেখালেখির স্বপ্নের ভেতর ডুবে থাকি। সেটা সব লেখকই থাকেন। বেশিরভাগ লেখকই লেখেন এবং পড়েন। পড়েন এবং লেখেন। আসলে জীবন এবং পরিস্থিতি যাকে যে ছকে ফেলে, মানে সৃষ্টিটাও তেমনি ছাঁচের পিঠার মতো হয়। একটু যাদের অবস্থা ভালো, সেসব লেখকেরা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না। কোথাও সময় নষ্ট করতে চান না। এমন কাজ করতে চান না, যাতে তার মন লক্ষ্য থেকে সরে যায়।

কিন্তু আমার জীবনটা এমনভাবে গঠিত, লেখালেখির চেয়ে ওই ঝামেলার কাজটিই আমার ভালোলাগে। আর তা লেখার জন্যই মনে হয় ওই কয়লার খনিতে না নামলে খাঁটি হীরে পাব না। তবে এটা জানি না, তুলে আনা সে হীরে দিয়ে আমি গহনা কতটা সাজাতে পারি। সেটা পাঠক বলতে পারবেন।

আমি কখনো প্রাসাদে থাকার স্বপ্ন দেখি না। মাটিমাখা জীবন আমার কাছে ভালোলাগে। চোখের সামনে বেড়ে ওঠা, পরিবর্তনশীল প্রকৃতি আর বারান্দায় বা জানালার কাছে একটি সচল কম্পিউটার ছাড়া আমার স্বপ্নে আর কিছু নেই। কোনো পুরস্কার, বা প্রচারের স্বপ্ন আমি কখনো দেখি না। আমি স্বপ্ন দেখি আমার গল্পগুলোর স্বাদ মানুষকে আস্বাদিত করে রেখেছে। আর আমি ঘুণপোকার মতো মানুষের হৃদয়ের দরজায় পৌঁছতে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছি…

Facebook Comments Box