না লিখে থাকতে পারি না তাই লিখি : ফারুক সুমন

রবিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২১ | ৪:৪৩ অপরাহ্ণ | 609 বার

না লিখে থাকতে পারি না তাই লিখি : ফারুক সুমন

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা। আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি কবি ও প্রাবন্ধিক ফারুক সুমন–এর

 

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা একজন লেখকের জন্যে যুগপৎ উৎকণ্ঠা ও আনন্দের। কখনো আবার তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। বোধকরি, বিক্ষিপ্তভাবে পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হলেও গ্রন্থ প্রকাশের ভেতর দিয়ে একজন লেখকের আসল অভিষেক হয়। সন্তান জন্মদানের মধ্যে যেমন মায়ের পরিপূর্ণ পরিচয়। গ্রন্থপ্রকাশের ভেতর দিয়ে একজন লেখকের অনুরূপ অবস্থা হয় বৈকি।

মূলত কবিতা লিখলেও আমার প্রথম প্রকাশিত বই গবেষণাকেন্দ্রিক। নাম ‘শামসুর রাহমানের কবিতা : নগরচেতনা ও নাগরিক অনুষঙ্গ’ (২০১৫)। এটি আমার এম. ফিল গবেষণার অভিসন্দর্ভপত্রের গ্রন্থরূপ। প্রকাশ করেছে ‘রাবেয়া বুকস’। মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিসন্দর্ভপত্র জমা দেওয়ার কিছুদিন পর আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক এএসএম আবু দায়েন স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে ‘রাবেয়া বুকস’-এর প্রকাশক আলমগীর হোসেনের সাথে পরিচয় হয়। তিনি আমার অভিসন্দর্ভপত্রটি গ্রন্থকারে প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আমিও স্যারের অনুমতিক্রমে আলমগীর ভাইকে বই প্রকাশের অনুমতি দিই। এই দিক থেকে আমি বোধহয় ভাগ্যবান। কারণ প্রথম বই প্রকাশের যে বিড়ম্বনা। সেটা আমাকে পোহাতে হয়নি। বইটি প্রকাশের পর প্রথম যখন হাতে এলো। আমি তখন ভীষণরকম আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। সেদিনই প্রথম আপন সৃষ্টির অনির্বচনীয় আনন্দ উপলব্ধি করেছি।

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?

‘কেন লিখি?’ হঠাৎ এমন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তরে যদিও বলি, ‘না লিখে থাকতে পারিনা তাই লিখি।’ তবুও অতৃপ্তি রয়েই যায়। বুকের গোপন-গহীন বাতায়ন খুলে উঁকি দিয়ে দেখি। নাহ, এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক মতো দেওয়া হয়নি। দূরে আবছা হয়ে আছে না বলা অনেক কথা। আবছায়া, অধরা সেই কথার কাছে গিয়ে হাঁটুমুড়ে বসি। দু’হাত পেতে উত্তর প্রার্থনা করি। কিছু উত্তর হয়তো পাই। কিছু অধরাই থেকে যায়। অন্তঃপুরে উদিত ‘কেন লিখি’ প্রশ্নটি আমাকে আন্দোলিত করে। বোধকরি, এই প্রশ্নের গুঞ্জরন সকল কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর মনেই শোনা যাবে। সবাই যার যার উপলব্ধি এবং বিশ্বাসের পাটাতনে বসে প্রশ্নের জবাব হয়তো খুঁজেছেন। আদতে সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। কী এক অলৌকিক তাড়নায় শরাহত হয়ে একজন শিল্পী পাড়ি দেন শিল্পের মোহহীন দীর্ঘপথ? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা দুর্গম অরণ্যে হেঁটে যাওয়ার মতোই।

শিশু যেমন পিতামাতাকে প্রশ্ন করে- ‘আমাকে ভালোবাসো কেন?’ প্রেমিকপ্রেমিকা যেমন পরস্পরকে প্রশ্ন করে- ‘আমাকে ভালোবাসো কেন?’ এসব প্রশ্নের উত্তর একেবারেই যে নেই তা নয়। তবুও পিতামাতা কিংবা প্রেমিকপ্রেমিকার মনে অতৃপ্তিকর দ্বন্দ্বমুখর জিজ্ঞাসা রয়েই যায়। আদতে এই অতৃপ্তিকর জিজ্ঞাসা আছে বলেই মানুষ এখনো অনুসন্ধিৎসু অভিপ্রায় নিয়ে বেঁচে আছে। ভ্রুকুঞ্চনে খুঁজে ফিরে সেই অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান। কিছু হয়তো মিলে, কিছু রয়ে যায় আগের মতোই কুয়াশাময়।

খুব ছোটবেলায়, যখন শিল্পসাহিত্য ব্যাপারটি আদতে কি? এই প্রশ্নের বিন্দুবিসর্গও বুঝি না। তখন পুকুরপাড়ে উবু হয়ে থাকা হিজলগাছের কাছে বসে ভাবতাম। জলের গায়ে হিজলগাছের কী চমৎকার প্রতিছায়া ভেসে আছে। শেওলাজমা পুকুরে টুপটাপ ঝরে পড়ছে হিজলফুল। নাওয়াখাওয়া ভুলে সেসব দৃশ্যে মগ্ন হয়ে থাকি। অঞ্জলিপূর্ণ করে ফুল কুড়াই। মালা গাঁথি। কলিজায় কাঁপন ওঠে। আবেগে থরথরানি অনুভব করি শিরায় শিরায়। আমার এই আত্মমগ্ন দিনে অন্য বন্ধুরা তখন ব্যস্ত আছে অন্যকোনো খেলায়। যেখানে হয়তো এরকম ভাবমগ্ন অনুভূতি অনুপস্থিত।

খুব শৈশবে এই যে আবেগের ছটফটানি। একা একা উদাস হয়ে হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া। এটা সবার ক্ষেত্রে সমান ভাবে হয়নি। প্রকৃতির এই অভাবিত লীলারহস্য যারা আচ্ছন্ন থেকেছেন সেই অবুঝ সবুজ শৈশবে। তারাই বোধহয় শিল্পী কিংবা কবিবোধের ইশারা নিয়ে বেড়ে ওঠেন। অবশ্য এই বোধ শৈশবকৈশোর এবং তারুণ্যে অনেকের মাঝেই থাকে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই সবুজ সারল্য ক্রমশ অপসৃত হয়। নিসর্গের সেই লীলারহস্যের সন্ধান হারিয়ে যায়। পার্থিব ভোগবিলাস কিংবা মাত্রাতিরিক্ত অর্থবিত্তের মোহে পড়ে শিল্পীর সেই শৈশবভাবনার মৃত্যু ঘটে।

কেবল তারাই শৈশবসময়ের সেই ইশারাকে বহন করতে সক্ষম হয়। যারা ভুলে যায়নি প্রখর রৌদ্রে প্রজাপতির পেছন পেছন কাটানো ব্যাকুল সময়। যারা ভুলে যায়নি শবেবরাতের
জ্যোৎস্নাপ্লাবন রাত।
যারা ভুলে যায়নি নদীতে ঝিলিক দিয়ে
হারিয়ে যাওয়া ছোট মাছের ঝাঁক।
যারা ভুলে যায়নি রাতের শেষপ্রহরে
পাখির কিচিরমিচির।
যারা ভুলে যায়নি অসীম আকাশে
হাওয়ায় ভেসে থাকা নিঃসঙ্গ চিল।

কেন লিখি, এই প্রশ্নের উত্তরে তবে কি বলা যায়?
বলা যায়-
-আমি চন্দ্রাহত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারি না।
-আমি নিসর্গের ডাকে তৃষ্ণার্ত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারি না।
-আমি স্রষ্টা ও সৃষ্টিরহস্যে বিপর্যস্ত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারি না।

এই যে না লিখে থাকতে পারা অসম্ভব। এটাও একধরনের রোগ। এই রোগ শৈশবকৈশোর কিংবা তারুণ্যে যদি সেরে যায় তবে ভালো। যদি না সারে তবে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হয়। এই রোগ যিনি প্রাপ্ত হন। তিনি সৌভাগ্যবান বটে। কারণ এই রোগের শিল্পিত নাম ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এটাকেই বলেছেন-
‘আপন বিরাট নীড়।-অলৌকিক আনন্দের ভার
বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার,
তার নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান
ঊর্ধ্বশিখা জ্বালি চিত্তে আহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

ছোটবেলায় লেখা নিয়ে মজার একটি ঘটনা মনে পড়ে। তখন সিক্স কি সেভেনে পড়ি। ক্লাসের বাংলা বইয়ের ছড়া-কবিতার অনুকরণে কেবল ছড়া-কবিতা লিখতে শুরু করেছি। কিন্তু লেখা কাউকে না দেখিয়ে লুকিয়ে রাখি। সবাই ঠাট্টা করবে ভেবে সংকোচিত ছিলাম। আমার ছোটবোনের নাম নয়ন। সে স্কুলের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করতে চায়।

আমি তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে আমার লেখা একটি ছড়া দিলাম। বললাম এটা পড়লে তোর পুরস্কার পাওয়া নিশ্চিত। সে উৎসাহিত হয়ে সত্যি সত্যি পুরস্কার পেয়ে গেলো। বাড়িতে এসে আবেগের আতিশয্যে মায়ের কাছে আমার ছড়া লেখার কথা রাষ্ট্র করে দেয়। এভাবে পরিবার এবং আশেপাশের বাড়িতে প্রথম কবি হিসেবে আমার অভিষেক হয়। ছোটবেলার এই ঘটনাটি এখনও ভেবে খুব মজা পাই। বলা যায়, এই ঘটনা সর্বপ্রথম লাজুক আমাকে আড়াল থেকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশে সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাই।

আমাদের শিল্পসাহিত্য সৃজনশীলতায় উদ্ভাসিত হোক। মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করি। কারণ জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ অতীত। রয়েছে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকেন্দ্রিক সুদীর্ঘ পরম্পরা। তবে হতাশার ব্যাপার হচ্ছে, সাহিত্যাঙ্গনে এখন কিছু স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানীর আনাগোনা দেখা যায়। যারা শিল্পের নামে করছে প্রতারণা। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা আমাদের মিডিয়ায় বসে অযোগ্যদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। ফলে যোগ্য লেখকেরা রয়ে যাচ্ছেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। সিরিয়াস সাহিত্যচর্চার ধারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বৈকি। এভাবে দিনে দিনে তৈরি হচ্ছে দুর্বল পাঠক-প্রজন্ম। আমাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ অন্যান্য শিল্পমাধ্যম আরও বেশি সৃজনমুখর করতে হলে এসব আমাদের ভাবতে হবে। শুধু শিল্পসাহিত্য নয়। আমি স্বপ্ন দেখি একটি সৃজনশীল বাংলাদেশ। মানবিক সমাজ।

প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?

শিল্পের অলৌকিক আনন্দভার যেহেতু অন্তরে লালন করি। সেহেতু আমৃত্যু লিখতে চাই। যদিও আমার গভীর অনুভব ও উপলব্ধির নান্দনিক উদযাপন কবিতায়। পাশাপাশি সাহিত্যের অন্য শাখায়ও কাজ করতে চাই। কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও ইতোমধ্যে আমার কয়েকটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস এবং গল্পগ্রন্থ প্রকাশের পথে। সর্বোপরি, শিল্পমুখর একটা জীবন বাহিত হোক। এটাই প্রত্যাশা।

Facebook Comments Box