না ফেরার দেশে রাবেয়া খাতুন

রবিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৯:০১ অপরাহ্ণ | 294 বার

না ফেরার দেশে রাবেয়া খাতুন

না ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন। তার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি গুলশানের নিজ বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেন।

 

 

তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের সাহিত্যাঙ্গনে। রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের সুধীজনরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

বাংলা একাডেমির সভাপতি লোক-বিজ্ঞানী অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক বিশিষ্ট লেখক রাবেয়া খাতুন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তার মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমন কাহিনী খুব ভালো লিখতেন। হাসি-খুশি স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন- রাবেয়া খাতুন, বাংলাসাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক, আমাদের রাবেয়া খালাম্মাও চলে গেলেন। আমরা এতিম হয়ে গেলাম। আর প্রখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন বলেন, কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন- আমার খালাম্মা! তার মৃত্যুতে ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশে আমার প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা আর নির্মল স্নেহের সবচে বড় আশ্রয়টি হারালাম।

স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমিসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন রাবেয়া খাতুন। সাহিত্যের সকল শাখায় ছিল তার সফল বিচরণ। তার প্রকাশিত ১০০-এর বেশি বইয়ের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, গবেষণাধর্মী রচনা, ছোটগল্প, ধর্মীয় কাহিনী, ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথা ইত্যাদি। রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে তার লেখা অসংখ্য নাটক, জীবন্তিকা ও সিরিজ নাটক। তার গল্পে নির্মিত হয়েছে কয়েকটি চলচ্চিত্র।

তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মেঘের পরে মেঘ’ জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্র। ‘মধুমতি’ এবং ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ও প্রশংসিত হয়েছে দর্শক মহলে।

লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতাও করেছেন তিনি। দৈনিক ইত্তেফাক এবং সিনেমা পত্রিকা ছাড়াও তার নিজস্ব সম্পাদনায় পঞ্চাশ দশকে বের হতো ‘অঙ্গনা’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা।

১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাবেয়া খাতুন। তার বাবা মৌলভী মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ এবং মা হামিদা খাতুন।

১৯৫২ সালে তার বিয়ে হয় দেশের চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রথম পত্রিকা সিনেমার সম্পাদক ও চিত্রপরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সঙ্গে। তাদের চার সন্তানের মধ্যে রয়েছেন ফরিদুর রেজা সাগর, কেকা ফেরদৌসী, ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী।

রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি। এ পর্যন্ত চার খণ্ডে সংকলিত তার ছোটগল্পের সংখ্যা ৪০০-এর বেশি। বাংলাদেশের ভ্রমণ সাহিত্যের অন্যতম লেখক রাবেয়া খাতুন। প্রথম উপন্যাস মধুমতী (১৯৬৩) প্রকাশের পরপরই কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের শ্বাসরূদ্ধকর দিনগুলোর কথা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন ‘একাত্তরের নয় মাস’ (১৯৯০) বইয়ে।

রাবেয়া খাতুন সাহিত্যচর্চার জন্য পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক (১৯৯৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৩), নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), হুমায়ূন স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), কমর মুশতারী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৪), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৯৪), শের-ই-বাংলা স্বর্ণপদক (১৯৯৬), ঋষিজ সাহিত্য পদক (১৯৯৮), লায়লা সামাদ পুরস্কার (১৯৯৯) ও অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯)। ছোটগল্পের জন্য পেয়েছেন নাট্যসভা পুরস্কার (১৯৯৮)। সায়েন্স ফিকশন ও কিশোর উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন শাপলা দোয়েল পুরস্কার (১৯৯৬), অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার (১৯৯৮), ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কারে (২০০৩)। টিভি নাটকের জন্য পেয়েছেন টেনাশিনাস পুরস্কার (১৯৯৭), বাচসাস (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) পুরস্কার, বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড (২০০০), টেলিভিশন রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ড (২০০০)।

 

Facebook Comments Box