দেশের বই ঈদ সাময়িকী

নাহিদ বেগম লাকীর ছোটগল্প কাকতাড়ুয়া

সোমবার, ১৬ মে ২০২২ | ৫:০৫ অপরাহ্ণ | 321 বার

নাহিদ বেগম লাকীর ছোটগল্প কাকতাড়ুয়া

ভাষাচিত্র বুক ক্লাব আয়োজিত ‘শনিবারের গল্প’ শীর্ষক আয়োজন থেকে বাছাইকৃত গল্প নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে “দেশের বই ঈদ সাময়িকী”। আজ প্রকাশিত হলো নাহিদ বেগম লাকীর ছোটগল্প কাকতাড়ুয়া


 

 

প্রায় একযুগ পরে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন অনন্যা হক। সেই তাল সোনাপুর গ্রাম, গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শীর্ণকায় নদী আর আঁকাবাকা মেঠোপথ! অনেকদিন পর এবারের ঈদটা স্বজনদের সাথে কাটাতে চাইছেন তিনি! শহরের কোলাহল আর জঞ্জাল পেরিয়ে একটা নির্মল আনন্দ আর খোলা হাওয়ার জন্য মনটা কেমন আকুল হয়ে উঠেছিল তার! সবকিছু গুছিয়ে তাই আগেভাগেই রওনা দিলেন মাটির টানে, শেকড়ের টানে!

 

আঁকাবাঁকা মেঠোপথ! দু’ধারে সবুজ ফসলের মাঠ! থোকা থোকা ধানের শীষ বেরিয়েছে! প্রকৃতি জুড়ে কেমন একটা সাজ সাজ রব! ফসল আসছে ফসল! কাঁচা ধানের মাতাল গন্ধে মন কেমন করে ওঠে! প্রাণ ভরে শ্বাস নেন। আহ্ কি শান্তি ! রিকশা থামিয়ে নেমে যান। জমির আইল ধরে হাঁটতে থাকেন, বাতাসে কেঁপে ওঠা ধান ফসলের গায়ে হাত বুলিয়ে দেন নিবিড় মমতায়! এই প্রকৃতি, এই ফসলের মাঠ তার একান্ত নিজের! যেখানে তিলতিল করে বেড়ে উঠেছেন তিনি! ঘড়ির কাটার মতো কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর আর মেয়েবেলার দিনগুলো! হঠাৎই কিছু একটার সাথে হাতটা লেগে যায় তার। চমকে উঠে ফিরে তাকাতেই দেখতে পান একটা কাকতাড়ুয়া তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে!
কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে যান, মন চলে যায় দূর অতীতে! সেদিনও এমনিভাবে একটা কাকতাড়ুয়া অদ্ভুত তাকিয়ে ছিল তার চোখে! ভয় পেয়ে গেছিলেন তিনি! কাকতাড়ুয়ার চোখ দুটো কেমন মানুষের চোখের মতো মনে হচ্ছিল আর নাকি গলায় কেমন তার নাম ধরে ই ডাকছিল! ভয় পেয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে প্রাণপনে চিৎকার করে উঠেছিল সে! দূর এই অসময়ে কেনই বা আসতে গেল? নিশ্চয়ই ভূত-প্রেত কিছু একটা হবে! আস্তে আস্তে বুঝতে পারলো কেউ একজন তার হাত সরাতে চাইছে। ভয়ের ঘোর কেটে গেলে দেখতে পেলো তার সামনে অনিন্দ্য দা দাঁড়িয়ে আছে!
‘অনু ভয় পেয়েছিস? দূর বোকা আমি তো মজা করছিলাম!’
‘এভাবে কেউ মজা করে? আমি যদি ভয় পেয়ে মরে যেতাম! তাহলে কি হতো?’
‘ধুর পাগলী! আমি আছি না? আমি থাকতে তোর কিছু হতেই দিতাম না।’
‘তুমি বুঝি সারাজীবন এভাবে সব ভয় আর বিপদ থেকে আমাকে আগলে রাখবে?’
‘হু রাখবোই তো!’

 

 

সময়ের স্রোতে সে প্রতিশ্রুতি আজ কোথায় ভেসে গেছে! দু’জন দুই পৃথিবীর বাসিন্দা! কত কত বছর আর দেখা ও হয় না কারও সাথে! চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে যায়! মনে হয় সেদিনের মতো আজও কেউ দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, পেছনে, চারপাশে! নিজের অজান্তেই কাকতাড়ুয়াটা কে ছুঁয়ে দেখে! অবচেতন মনে ভাবতে থাকে সত্যি সত্যি কাকতাড়ুয়ার আড়ালে অনিন্দ্য দা দাঁড়িয়ে নেই তো?
কার যেন ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায় সে! স্মৃতিকাতরতা পেয়ে বসে তাকে! অবচেতন মনে বাড়ির পথে পা বাড়ান তিনি!

Facebook Comments Box