নারীর জীবন নিয়ে উপন্যাস ‘নারীজনম’

বুধবার, ২০ মে ২০২০ | ৫:৩১ অপরাহ্ণ | 485 বার

নারীর জীবন নিয়ে উপন্যাস ‘নারীজনম’

বইয়ের নাম : নারীজনম
লেখক : সুমন কুমার
ধরন : উপন্যাস
প্রকাশক : ভাষাচিত্র

॥ আলতাফ হোসেন ॥
এক সময় হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা ও ওয়েস্টার্ন সিরিজ অনেক পড়েছি। এখন পড়া মানে পেপার আর রেফারেন্স বই। করোনার সময়ে বাসায় বসে আছি, ছোট বোন রিমির টেবিলে ‘নারীজনম’ বইটি পেলাম। ফিকশন পড়ি না বললেই চলে, তাছাড়া লেখকের নামও শুনিনি। হাতের কাছে কিছু নেই তাই পড়তে শুরু করলাম। রিমির আগেই পড়া, শেষ হলে ও জিজ্ঞাসা করলো কেমন লাগলো। অনেকক্ষণ আলাপ হলো বইটি নিয়ে, পরে বলল রিভিউ লিখে ফেলতে। রীতিমত পীড়াপীড়ি শুরু করল। কখনও রিভিউ লিখিনি, কিন্তু ওর জেদের কাছে হার মানলাম।
গল্পটা শুরু হলো মাসুম আর শম্পা নামে একজোড়া যুবক যুবতীর বৈকালিক ঘুমের বিবরণ দিয়ে। ঘটনাটির ডিটেইল খুব চমৎপ্রদ। শেষে উপর থেকে কিছু একটা পড়লো যুবতীর বুকে। কী পড়লো কী পড়লো, পাঠক হিসেবে ওটা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হলাম। শেষে জানলাম ওটা ছিল একটি টিকটিকি।
জাহানারা-জামাল সাহেব, শম্পার বাবা মা, বয়স পঞ্চাশের উপরে। পরস্পরকে খুব ভালবাসে, সেটা শারীরিক মানসিক দুইই। অথচ শরীরের বিশেষ স্থানে আদরের হাত বুলালেও ব্যথা পান। কিসের ব্যথা? ও সময়ে পুরুষ হিসেবে আমিও বিরক্ত হই।
ঢাকা শহরের একটি থিয়েটার দলের সদস্য তানশা, নবনীতা, শম্পা, মাসুম, রবিউল, অমল। রাজা শরীফ সেই দলের প্রধান প্রগতিশীল মানুষ, তার স্ত্রী জেরিন। রোগা স্বাস্থ্যে অধিকারিনী। ঠিক বোঝা যায় না, স্ত্রী শরীরের গঠনের জন্যই কিনা শরীফ সাহেবের আগ্রহ অন্য নারীর প্রতি, প্রয়োজনে তিনি তার সাংগঠনিক ক্ষমতাও ব্যবহার করেন।
শম্পা ঢাকার বাইরে শো করে এসে মা কে গল্প শোনায়, সেই গল্পে আমরা জানতে পারি ধরাসতী নামের এক নারীর কথা। হিন্দু পৌরাণিক আখ্যান বোধ হয়। ভগবান যার পরীক্ষা নিতে এসে কেটে নিয়ে যায় স্তন। রবিউল নানগেলি নামে এক তামিল মেয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লিখছে নাটক সুন্দরী সে গল্পও জানতে পারি শম্পার কাছে। ব্রেস্ট ট্যাক্সের ভয়াবহ সময়ে সে প্রতিবাদ করেছিল, তার স্তন কেটে রাজাকে উপহার পাঠিয়েছিল কেবল শাড়িটি সমস্ত গায়ে জড়িয়ে রাখার অধিকারের জন্য।

 

ঘুরে ফিরে কেবল নারী দেহ নিয়ে কথা হচ্ছে পড়তে পড়তে একটু ‍বিরক্ত হলাম। লেখক কি ইচ্ছে করে এমনটা করছে পাঠককে ধরে রাখার জন্য? এভাবে একটি বইতে পাঠক ধরে রাখা গেলেও পেরে ঠিকই ছুড়ে ফেলে দেবে। কিন্তু অচিরেই ধারণা পরিবর্তন হয়ে গেল। গল্পে গল্পে আসতে লাগলো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। নিজেও মানুষ হিসেবে নিজেকে বিচার করতে শুরু করলাম। আমার, মা, স্ত্রী, বোন সবাইকে মিলিয়ে দেখতে পেলাম। কয়েকটি চরিত্র মিলে যেন সত্যিকার মানুষ আমি।
অসাধারণভাবে চর্যাপদের পদের সাথে মিলিয়েছেন নারী জীবন। কী রোগ, কী শোক, কী ভালবাসা, কী হিংসা সবকিছুই নারীর শত্রু যেন। ঘরের মধ্যে স্তন ক্যানসার নিয়ে জাহানারা বসত করেন, জামাল সাহেব কিছু করেন না, মা মেয়েকে জানতেই দেন না। কিংবা নমিতার উড়ু উড়ু মনের খবর কেউ জানতে পেল না।
মাসুম-শম্পার মিলনে কোন বাঁধা ছিল না অথচ শম্পা রবিউলের মিলন হওয়াটা বাঁধার জালে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা মাসুম আর শম্পাকে মিলতে দিলো না, আর অভাবনীয়ভাবে বাঁধা হয়ে গেল শম্পা-রবিউলের স্বপ্নের ঘর।
জাকির চরিত্রটি ইন্টারেস্টিং, ঢাকা শহরে কৃষি কাজের স্বপ্ন দেখা মানুষ। এই করোনার সময়ে ধারণাটির গুরুত্ব অনুধাবন করা সহজ। ঢাকা একটি ৪০০-৪৫০ বর্গকিলোমিটারের বিশাল শহর, কিন্তু কৃষি জমি নেই। অথচ অনুমান দুইশ বর্গকিলোমিটার ছাদ রয়েছে। যেখানে চাষাবাদ একটি বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।
জাহানারার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গল্পটা শেষ হলো। জাহানারাকে নিজের মায়ের সাথেই মিলিয়ে ফেলেছিলাম। মায়ের কতো অসুখ হয় আমরা জানতেই পারি না। তার মৃত্যুতে গলার নিচে দলা পাকিয়ে গেল। চোখ ভিজেই উঠলো। চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে নারীজনম সত্যিকারভাবে অনুধাবন করার প্রয়াস পেলাম।
গল্পটা বলার ধরন খুব চমৎকার। লেখক জানে কোথায় থামলে পাঠককে পরের পরিচ্ছেদ পড়তেই হবে। নারী শরীরের বিবরণগুলো উদার কিন্তু কখনও অশ্লীল মনে হয়নি, যৌন আকাঙ্খা সৃষ্টি করেনি। ফলে লেখক যা বলতে চেয়েছেন তার সাথে কোন বিবরণই অকারণ মনে হয়নি। ‘নারীজনম’ লেখকের প্রথম উপন্যাস, এর আগে মাত্র একটি গল্পের বই বেরিয়েছে, দেখলাম বায়োগ্রাফিতে। ত্রুটি কিছু আছেই। কিন্তু মহৎ রচনায়ও ত্রুটি থাকে। ত্রুটি বিচ্যুতিসহই লেখককে একশ তে একশ দেয়া যায়।

Facebook Comments