দেশের বই ঈদ সাময়িকী

নওশীন নাবিলার ছোটগল্প ‘নীরা’

রবিবার, ১৬ মে ২০২১ | ১১:০৪ অপরাহ্ণ | 359 বার

নওশীন নাবিলার ছোটগল্প ‘নীরা’

।। নওশীন নাবিলা ।।


 

নীরার জন্য আজ একটা বিশেষ দিন। আজ নীরাকে আংটি পরাতে আসবে। উত্তেজনায় নীরার বুক কাঁপছে। একটু লজ্জা লজ্জাও লাগছে। গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরেই তার বিয়ের কথা চলছে। পাত্র টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক। নাম আনোয়ার। পুরো নাম অবশ্য জানে না এখনও সে। কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই বলে দিত কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে অস্বস্তি হচ্ছে। ফারজানা আপা তাকে সাজিয়ে দিচ্ছে। আপার কাছে জানতে চাইবে কি না চিন্তা করছে নীরা। এমন সময় দরজায় শব্দ হলো।
নীরা আর ফারজানা দুজনেই একসাথে তাকাল। সাদাত সাহেব ঘরে ঢুকছেন। ফারজানা সোজা হয়ে দাঁড়াল। নীরা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে একটু হাসল। নীরার বাবা পাটওয়ারী সাহেব মারা যাওয়ার পর থেকে তার এই ভাইটিই সংসারের কাণ্ডারি। তাদের এই ছোট্ট মফস্বল শহরে পাটওয়ারী সাহেব একদম সাধারণ কিন্তু সম্মানিত জীবনযাপন করেছেন, তার ছেলেও তাই করছেন। সাদাত সাহেব কিছুক্ষণ বোনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। তার বোন, আদরের বোনটাকে পর করে দেয়ার সময় এসেছে। এখন থেকেই কেমন যেন একা একা লাগতে শুরু করেছে।
সাদাত সাহেব নীরার কপালে আলতো করে চুমু খেলেন। ছোট করে হেসে বললেন, ‘ঠিক আছিস?’
নীরা মাথা কাত করে সায় দিল। এরপর সাদাত সাহেব ফারজানার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এক্টু তাড়াতাড়ি করো, হ্যাঁ? ওদের আসার সময় প্রায় হয়ে গেছে।’
‘জি সাদাত ভাই। আপনি চিন্তা করবেন না। ওরা আসার আগেই হয়ে যাবে।’ ফারজানা উত্তর দিল। এরপর নীরাকে সাজানোতে মনোযোগ দিল। সাদাত সাহেব চলে গেলেন বাকি সবকিছু তদারকি করতে।
‘পাত্র দেখতে কেমন রে?’ ফারজানা আপা জিজ্ঞাসা করলেন। ফারজানা আপা নীরাদের পাশের বাড়িতেই থাকেন। প্রতিবেশী হলেও ছোট থেকেই ওদের সম্পর্ক আসলে বোনের মতো। নীরার নিজের কোনো বোন নেই। ফারজানা আপার ছোট বোনটাও পাঁচ বছর বয়সে জন্ডিস হয়ে মারা যায়।
নীরা এর উত্তরেও মাথা কাত করল।
ফারজানা আপা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘অরে বাবা! লজ্জায় তো দেখি মারা যাচ্ছিস!’
এক্টু থেমে নিজেই বলল, ‘ছবিতে অবশ্য ভালোই লেগেছে।’
সত্যি বলতে ফারজানা সবই জানে পাত্র সম্পর্কে। তাকে দিয়েই এই প্রস্তাবের কথা সাদাত সাহেব নীরাকে জানিয়েছেন। তবে পাত্রের সাথে তার দেখা হয়নি। যেদিন ওরা প্রথম বাসায় আসে সেদিন ফারজানা আপা শ্বশুরবাড়ি থেকে ছুটি পায়নি।
নীরার প্রথম দিনের কথা মনে পড়ল। প্রথমবার পাত্রের সাথে তার দেখা হয় একটা রেস্টুরেন্টে। নীরার সাথে সাদাত সাহেব, তাঁর স্ত্রী আর বড় মামা ছিলেন। পাত্রের সাথে ছিল তার বড় ভাই- ভাবি, আরও প্রায় পাঁচ-ছয়জন। প্রথমদিকে তো নীরা চোখ তুলে তাকাতেই পারছিল না। একদম আসার আগে মামা ছেলেকে বললেন, যদি সে কোনো প্রশ্ন করতে চায় নীরাকে করতে পারে। ছেলে শুধু জানতে চেয়েছিল চাকরি করার কোনো ইচ্ছা আছে কি না। তা-ও প্রশ্নটা মামার দিকে তাকিয়েই করেছে। তবে নীরা নিজেই উত্তর দিয়ে জানিয়েছে, ‘হ্যাঁ।’
উত্তর দেয়ার আগে এক সেকেন্ডের জন্য মুখের দিকে তাকিয়েছে, ব্যস এতটুকুই। এরপর ছেলে আর কিছু জানতে চায়নি। কিন্তু নীরার কেন যেন মনে হয়েছিল তার উত্তর ছেলের পুরোপুরি মনঃপুত হয়নি।
নীরার বাবা পাটোয়ারী সাহেব সরকারি চাকরি করতেন। কোনোদিন ঘুষ খাননি। শিক্ষা আর আত্মসম্মানই মানুষের আসল সম্পদ বলে চিনিয়েছেন ছেলে-মেয়েদের। এজন্য তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন ছেলে-মেয়েদের সুশিক্ষিত করতে। ছেলেকে তো মাস্টার্স করিয়েছেনই, মেয়েকেও কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের দায়িত্ব পালন করার আগেই তিনি চলে যান। সাদাত সাহেব বাবার দায়িত্ব মাথায় করে নিয়েছিলেন। বোনকেও তিনি নিজের মতো মাস্টার্স করিয়েছেন। ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পরই তিনি নীরার জন্য পাত্র দেখা শুরু করেন। সাত-আট মাস ধরে চেষ্টা করার পর মনের মতো পাত্র পেয়েছেন। নীরাকে দেখতে আসার আগেই পাত্রপক্ষ দুইটি বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছে। মেয়ে শিক্ষিত কি না, আর লম্বা কি না। নীরা সেটা জানে। পাত্রপক্ষ বলতে ছেলের ভাই-ভাবি। পাত্রের বাবা নেই, মা গ্রামে থাকে। সমস্ত দায়িত্ব তাঁদের উপরই দিয়ে রেখেছেন তিনি। আজই প্রথম ছেলের মায়ের সাথে তাদের দেখা হবে।
কলিংবেল বাজতেই নীরার চিন্তায় ছেদ পড়ল। আর সাথে সাথে বুকের ধুকপুকানিও বেড়ে গেল। ফারজানা আপাও হঠাৎ তাড়াহুড়া শুরু করে দিলেন। শেষবারের মতো কাজলটা ঠিক করে দিচ্ছিলেন এমন সময় ভাবি ঘরে ঢুকে তাড়া দিল– ‘আপা, ওরা কিন্তু চলে এসেছে্ একটু পরেই নিয়ে যাব, রেডি যেন থাকে।’
বলেই পর্দার ওপাশে উধাও। নীরার হাত-পা ঘামতে শুরু করেছে।
নীরার চেহারা দেখে ফারজানা আপা বলল, ‘ভয় পাচ্ছিস কেন? ওরা কি বাঘ না ভাল্লুক? বোকা মেয়ে! শান্ত হ। সাজ খারাপ হয়ে যাবে। তোকে দেখে জামাইয়ের আজকে মাথা নষ্ট হয়ে যাবে!’
নীরা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আপা, চুপ করো তো।’
নীরার লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে ফারজানার নিজের বোনের কথা মনে পড়ল। আফরিন বেঁচে থাকলে এতদিনে তারও হয়তো এমন একটা দিন আসত। ফারজানা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এর মধ্যেই আবার ভাবি এসে উপস্থিত, ‘চলো, তোমাকে নিয়ে যেতে হবে।’
নীরা ফারজানা আপার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। ভাবি ঘোমটা আরেকবার টেনে দিলেন। নীরা ভাবির সাথে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল। ফারজানা বাসার দিকে পা বাড়াল একটু তৈরি হয়ে নেয়ার জন্য।
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সবাই যেন একসাথে চুপ হয়ে গেল। নীরা তাকাচ্ছে না। কিন্তু বুঝতে পারছে যে সবাই তাকেই দেখছে। ভাবি আস্তে করে বললেন, ‘সালাম দাও নীরা।’
নীরা অল্প মাথা তুলে সালাম দিলো। এর মধ্যেই চট করে মানুষগুলিকে দেখে নিলো। আনোয়ার বসে আছে মাঝখানে, একপাশে তাঁর ভাই-ভাবি, আরেকপাশে একজন বয়স্ক মহিলা বসে আছেন। নিশ্চয়ই আনোয়ারের মা হবেন। তাঁর পাশে দুজন বয়স্ক লোক বসা। একটু দূরের সোফায় আরও দুজন আনোয়ারের বয়সের। আরেকপাশে দুইটি চেয়ারে নীরার মা আর সাদাত সাহেব বসা। তার পাশে বড়মামা। ভাবি নীরাকে নিয়ে আনোয়ারের ভাবির পাশে বসালেন। এরপর তিনি নিজে পাশের চেয়ারে বসলেন।
একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, ‘কেমন আছ মা?’
নীরা আস্তে করে বলল, ‘জি ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ মা। আল্লাহর দয়ায় ভালো আছি।’
এরপর হেসে বললেন, ‘আমি কে হই তুমি জানো?’
নীরা লজ্জা পেয়ে চুপ করে থাকল। ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি তোমার চাচা শ্বশুর।’
আনোয়ার কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আচ্ছা প্লিজ, এখনও হওনি।’
কে যেন বলল, ‘ঐ একই কথা।’ ঘরের ভেতর অল্প-বিস্তর ভদ্রতার হাসি শোনা গেল।
ভদ্রলোক এরপর বয়স্ক মহিলাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ইনি হচ্ছেন আমাদের আনোয়ারের মা, আমাদের সব চেয়ে বড় ভাবি। আনোয়ারের তো আবার আগে আগে কিছু বলাতে আপত্তি তাই আর শাশুড়ি বললাম না আর কি।’ গলায় রসিকতার সুর এনে একটু আনোয়ারের দিকে তাকালেন। আনোয়ারকে দেখে অবশ্য মনে হলো না যে, সে এই রসিকতায় একটুও প্রীত হয়েছে। তবে ঘরের বাকি লোকজন আবারও একটু হাসল। নীরার ভাবি উঠে নাস্তার প্লেটগুলি সবার হাতে দিতে থাকলেন। নীরার মা উঠে গেলেন মূল খাবারের আয়োজন তদারকি করতে। নাস্তা খেতে খেতে আর টুকটাক গল্প করতে করতেই ফারজানা আপাও চলে এসেছেন খালাম্মাকে সাথে নিয়ে। এতে করে আরও দুইটি চেয়ার যোগ হলো তাদের ড্রয়িংরুমে। আনোয়ারের মা নীরাকে ডেকে তাঁর পাশে বসতে বললেন। সাথে সাথে ঘরের পরিবেশ একটু নীরব হয়ে গেল। আনোয়ারের মা আংটি বের করার জন্য ব্যাগে হাত দিলেন। হঠাৎ করে আনোয়ার বলে উঠল,
‘আচ্ছা, আমার একটা কথা জানার দরকার ছিল।’
এক সেকেন্ডের মতো সবাই চুপ হয়ে গেল। সাদাত সাহেব তাড়াতাড়ি বললেন, ‘বলো না, কি জানতে চাও ‘
‘আমি জানতে চাচ্ছিলাম যে, পড়াশোনাটা কোন ইউনিভার্সিটি থেকে করা?’ আনোয়ার ভাববাচ্যে প্রশ্ন করল।
‘আমাদের এখানেই সরকারি কলেজ থেকে।’
‘মানে ঢাকা ইউনিভার্সিটি বা বড় কোনো সরকারি ইউনিভার্সিটি না, তাই তো?’
সাদাত সাহেব একটু হোঁচট খেলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘না, কিন্তু –’
আনোয়ার উঠে দাঁড়াল। এরপর সোজা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। সবাই স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকল।
‘আমি একটু আসছি।’ বলে আনোয়ারের ভাবি তাড়াতাড়ি উঠে বেরিয়ে গেলেন। ঘরে পিনপতন নীরবতা। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সাদাত সাহেব বোনের দিকে তাকিয়ে দেখেন তার চেহারা সাদা হয়ে গেছে। সাদাত সাহেব চোখ সরিয়ে নিলেন। এরমধ্যে মা-ও ফিরে এসেছে। দেখে মনে হচ্ছে এখনই মাথা ঘুরে পড়ে যাবেন। কেউ কোনো কথা বলছে না।
আনোয়ারের ভাবি দোলা বাইরে এসে দেখে আনোয়ার পায়চারি করছে। তার চোখমুখ লাল।
‘ব্যাপার কি আনোয়ার!’ ভাবির প্রশ্ন।
আনোয়ার ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা জানতে?’
‘কী? পড়াশোনা কোথা থেকে করেছে সেটা? অবশ্যই জানতাম।’
‘তাহলে আমার সাথে এটা কীভাবে করলে?’
‘কী করলাম! তুমি বলেছিলে সে যেন ভালো ছাত্রী হয় আর শিক্ষিত হয়–’
‘তুমি জানো না পড়াশোনায় আমার সেরা মেয়ে চাই?’
‘আনোয়ার! মেয়ে মাস্টার্স পাস। রেজাল্ট ভালো। তোমার আর কী চাই? কলেজ না ইউনিভার্সিটি দিয়ে কী হবে? এতকিছু তো আগে বলোনি!’
‘কারণ তোমাদের ওপর ভরসা করেছিলাম। আমি তো যাকে-তাকে বিয়ে করতে পারি না।’
‘কাকে তুমি যাকে-তাকে বলছ? এত ভালো ফ্যামিলি। এত অমায়িক মানুষজন। এত লক্ষ্মী মেয়ে। দেখতে কত মিষ্টি–’
‘দেখতে কেমন দিয়ে আমার কিছুই যায় আসে না।’
ভাবি এবার সিরিয়াস কণ্ঠে বললেন, ‘আসলে তুমি এমন করছ কেন? পড়াশোনা দিয়ে কী হবে? তুমি তো এটাও চাও না যে তোমার বউ চাকরি করুক ‘
‘ছেলেমেয়ে মানুষ করার জন্যও মাথায় কিছু থাকতে হয়। এই মেয়ে আমি বিয়ে করব না।’
এমন সময় পায়ের শব্দে দুজন পেছন ফিরে দেখল যে আনোয়ারের মা উপস্থিত। আনোয়ারের ভাবি ছুটে গেলেন তার কাছে।
‘আম্মা দেখেন আনোয়ার কী বলছে এই সময়ে! সে নাকি বিয়ে করবে না।’
আনোয়ারের মা নির্লিপ্ত জবাব দিলেন, ‘মেয়ে পছন্দ না হলে করবে না।’
দোলা শাশুড়ির কথায় হতভম্ব হয়ে গেল, ‘কী বলছেন আপনি? আজকে বাগদানের দিন।’
দোলার শাশুড়ি রাগত গলায় বললেন, ‘তুমি জোরাজুরি করছ কেন? আমরা যদি আমার ছেলের জন্য আরও ভালো মেয়ে পাই তো তোমার সমস্যা কী?’
এবার দোলাও রেগে গেল, ‘কোনো সমস্যা নেই আম্মা। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কথা আজকে কেন? আজকে আংটি পরাতে এসে এত কথা কেন? এতদিন ধরে বিয়ের কথাবার্তা চলছে, এতদিন এসব বলতে কী অসুবিধা ছিল? শেষ মুহূর্তে এসব কথা উঠছে কেন? এটা কেমন যুক্তি বিয়ে ভাঙার?’
দোলার শাশুড়ি বললেন, ‘এত কথার কী আছে দোলা? বিয়ে তো আর হয়ে যায়নি। আনোয়ার যদি বিয়ের পিঁড়িতে বসেও বলে মেয়ে পছন্দ হয়নি তো বিয়ে হবে না।’
দোলা জানে তার শাশুড়ি অত্যন্ত অহংকারী মহিলা। এও জানে যে চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট বলে তিনি আনোয়ারকে মাথায় চড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের প্রতি এত নির্দয় আচরণ তিনি করবেন এতটা দোলা ভাবেনি। দোলা শেষ চেষ্টা করল,
‘আম্মা, এটা কিন্তু ওদের দোষ না। ওরা কিন্তু কিছু লুকায়নি। আনোয়ার যদি ওর ডিমান্ড এতদিনেও সামনে না রাখে এটা কিন্তু আনোয়ারের সমস্যা। তারপরও তার কাছে যদি এটা এতই ইম্পরট্যান্ট, তাহলে প্রথমদিন কথা হওয়ার পরেই সে কেন বলল না! আমরা দিনের পর দিন ওদের বাসায় দাওয়াত খেয়েছি; চৌদ্দগুষ্টি নিয়ে খেয়েছি। মেয়ের সব আত্মীয়স্বজনের কাছে, পাড়া-প্রতিবেশীর কানে খবর চলে গেছে। এরপর যখন সবাই এই সংবাদ জানতে পারবে, এই ফ্যামিলির উপর দিয়ে কি যাবে?’
এবার আনোয়ার মুখ খুলল, ‘এটা তো ভাবি আমাদের মাথাব্যথা না।’
দোলা ঘুরে তাকাল, ‘এতবার মেয়ের বাসায় দাওয়াত খাওয়ার সময় মনে ছিল না।’ এরপর নরম সুরে বলল, ‘প্লিজ আনোয়ার, আমি রিকোয়েস্ট করছি, মেয়েটার এত বড় সর্বনাশ করো না। এটা মফস্বল। ওরা কেউ মুখ দেখাতে পারবে না। মেয়েটার এত বড় অভিশাপ নিও না।’
‘তুমি যাই বলো ভাবি, এই বিয়ে আমি করব না।’ বলে আনোয়ার হনহন করে রাস্তার দিকে হাঁটা দিলো।
দোলার শাশুড়ি নির্বিকারভাবে ঘরের ভেতর চলে গেলেন। আরেকটু পরে চোরের মতো তার পেছনে ঢুকল দোলা। ঘরের সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। দোলার শাশুড়ি সোফার কাছে গিয়ে নিজের ব্যাগটা তুলে নিলেন। এরপর ‘আজকে আসি আমরা’ বলে হাঁটা ধরলেন।
সাদাত সাহেব তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বললেন, ‘কী সমস্যা আমাকে বলেন। কোনো অসুবিধা থাকলে আমরা কথা বলে সেটা সমাধান করার চেষ্টা করি।’ এরপর হঠাৎ খেয়াল করে বললেন, ‘আনোয়ার কোথায়?’
আনোয়ারের মা বললেন, ‘আনোয়ারের কাজ ছিল। ও চলে গেছে।’
‘চলে যাবে কেন, কী বলেন এসব?’
‘আমরা আসি এখন।’
সাদাত সাহেব মরিয়া হয়ে বললেন, ‘আসেন খালাম্মা, খাওয়া-দাওয়া শেষে কথা বলি।’
‘না বাবা, খাওয়া-দাওয়া আজকে থাক। এছাড়া, কথা বলার তো আর কিছু নাই। আনোয়ার সারাজীবন পড়াশোনা ছাড়া কিছু বুঝে নাই। ওরও এটাই একমাত্র চাওয়া, সেই মেয়েকেই সে বিয়ে করবে যে মেয়ে পড়াশোনায় সেরা হবে। ওর তো আর কোনো দাবি-দাওয়া নাই, তাই না?’
‘খালাম্মা প্লিজ। আমরা দেখি কী করা যায়। দাবি-দাওয়া যদি থাকে তো সেটাও দেখি?’
‘বাবা, আমাদের বের হতে হবে এখন।’ আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাকিদের দিকে ফিরে বললেন, ‘চল, আবার বাড়ি ফিরতে ফিরতে আসরের ওয়াক্ত হয়ে যাবে।’
সাদাত সাহেব যেন আর কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। আনোয়ারের বাসার সবাই আস্তে আস্তে উঠে প্রায় নীরবে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল।
নীরা চুপ করে বসে আছে মূর্তির মতো। এতটুকু নড়ছে না। মামা নীরার মাথায় হাত রাখলেন। মা জ্ঞান হারিয়ে হেলে পড়লেন। ভাবি, ফারজানা আপা, খালাম্মা চিৎকার করে ছুটে গেলেন। নীরা তখনও একইভাবে বসে আছে। সাদাত সাহেব দরজার পাশে মেঝেতেই বসে পড়লেন। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। কী হবে এখন? পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব সবাই জানে আজ নীরার পান-চিনি। চিন্তা করতে করতেই সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

 

সাত বছর পর
নীরা আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরেছে। কাল থেকে রোজা শুরু। রমজান মাস শুরুর আগের প্রয়োজনীয় শেষ বাজার করে সন্ধ্যার আগেই বাসায় ঢুকতে পেরেছে। বাজারগুলি রান্নাঘরে রেখে, হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে এসে দেখে ভাবি আর মা চা নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। চেয়ারে বসতেই ফিরনির বাটিটা ভাবি তার সামনে এনে রাখল।
‘বাহ, আজ ফিরনি!’ নীরা বলল।
ভাবি নিচু স্বরে বললেন, ‘কাল তোমার ভাইয়ার জন্মদিন।’
নীরা চুপ হয়ে গেল। আজ প্রায় চার বছর হলো ভাইয়া নেই। বাবার মতো ভাইয়াও হঠাৎ একদিন হার্ট অ্যাটাক করে চলে গেলেন। এর আগে ভাবির দুইবার ছেলে হলো। একজনকেও বাঁচানো যায়নি। নীরাকে আর বিয়েতে রাজি করানো যায়নি। আর ভাইয়া মারা যাওয়ার পর তো এখন নীরাই সব। যেই এনজিওতে চাকরি করছে সেখান থেকে তাদের তিনজনের চলার মতো বেতন চলে আসে। এখন আর কেউ বিয়ের কথা বলতে সাহসও করে না। বেশিরভাগ সময় সবাই বাসাতেই থাকে, যাবেই বা কোথায়? আত্মীয়স্বজনও কেউ তেমন যোগাযোগ রাখেনি। অবিবাহিত মেয়ে যাদের ঘরে থাকে তাদের থেকে ছেলেমেয়েদের দূরে রাখাই ভালো। ভাবির বাবা-মা তো অনেক আগেই চলে গেছেন। ভাইরাও কেউ খোঁজ নেয় না।
নীরা, মা আর ভাবি। তারা জীবন নিয়ে কোনো অভিযোগ আর করেন না। মেয়েমানুষের এত চাহিদা থাকতে নেই।

Facebook Comments Box