ধারাবাহিক উপন্যাস প্রত্যাবর্তন [৩য় পর্ব]

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২০ | ২:১৬ পূর্বাহ্ণ | 243 বার

ধারাবাহিক উপন্যাস প্রত্যাবর্তন [৩য় পর্ব]

॥ হাসান তারেক চৌধুরী ॥
প্রত্যাবর্তন [৩য় পর্ব]

ঢাকা শহর থেকে বাইরে বের হতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হলো মামুনের। পুরোটা শহর যেন কোন হরর সিনেমার ভূতুরে এক নগরী। করোনা আতঙ্কের সাথে যোগ হয়েছে টহলরত সেনাবাহিনীর সাথে দেখা হওয়ার ভয়। বাইরে আসার কারণ ঠিক মতো ব্যাখ্যা করতে না পারলে, ছাল-চামড়া আস্ত রাখছে না ওরা। তাই একেবারে বাধ্য না হলে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না কেউ।
বাইরে এসে প্রথম দুই ঘন্টায় তিনবার সেনাবাহিনীর কবলে পরলো মামুন। মায়ের অসুখের বাহানা দিয়ে, মাকে দেখতে যেতে হবে ইত্যাদি বলে প্রথম দু’বার সৌভাগ্যক্রমে সেনাবাহিনীর কবল থেকে ছাড়া পেলেও, তৃতীয় দফায় আর ভাগ্যের সহায়তা পেলো না সে। ভীষণ রাগী এক সেনাসদস্যের কবলে পড়ে ভয়ানক বেকায়দায় পড়তে হলো তাকে।
“এত ভোরে বের হয়েছেন কেনো? কোথায় যাচ্ছেন?” ওকে দেখেই রাগী গলায় জানতে চাইলো সেনাসদস্য।
“মায়ের অসুখ, তাই মায়ের ওখানে যাচ্ছি।“ রাগী চেহারা দেখে কিছুটা ঘাবরে গিয়েছে মামুন।
“আপনার মা থাকেন কোথায়?”
“কাছেই থাকেন?”
“কাছে মানে কি? উনি কোথায় থাকেন সেটা ঠিক করে বলেন।”
“সাভারে।“
“এত বড় ব্যাগ কেনো পিঠে? সাথে এটা কি? স্লিপিং ব্যাগ?”
“জ্বি।“ ছোট্ট করে উত্তর দিলো মামুন। বেশ বুঝতে পারছে, ফেঁসে যাচ্ছে সে।
“মায়ের কাছে যেতে স্লিপিং ব্যাগ নেয় কেউ?”
কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে রইলো মামুন।
“কি হলো উত্তর দিচ্ছেন না কেনো?” ছোটখাট একটা হুংকার দিলো সেনাসদস্য।
কেঁপে উঠলো মামুন। তারপর, কোনরকমে বলল, “প্লিজ আমার জরুরী দরকার।“
“ঠিক আছে যাবেন নাহয়। এখন কানটা ধরেন।“
সেনা সদস্যটি মামুনের চেয়ে কম করে হলেও পাঁচ বছরের ছোট হবে। লজ্জা আর অপমানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে।
আবারো হুংকার দিলো সেনাসদস্য, “কি হলো? কথা কানে যায় না? মেরে হোগার চামড়া তুলে ফেলবো তোর। ফাজলামি করার জায়গা পাস না। তাই না? কান ধর এখনি।”
মামুন আরো কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকলো। তারপর সেনা সদস্য লাঠি বাগিয়ে মারতে উদ্যত হতেই দুই হাতে কান ধরলো সে।
“গুনে গুনে বিশবার কান ধরে উঠবস করবি। থামলে খবর আছে তোর।“
উঠবস শুরু হলো। পাশ থেকে একজন জোরে জোরে নামতা পড়ছে … ১…২…৩…
চোখের কোনা দিয়ে মামুন দেখতে পেল, একজন সেনা সদস্য আবার দৃশ্যটা মোবাইলে ভিডিও করছে। মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার।
সেনাসদস্যের নাম আসলাম। ব্যাজ থেকে নামটা দেখে নিয়েছে মামুন। উঠবস শেষ হতেই, আসলাম বলল,
“এবার উল্টাদিকে ঘুর।“
মামুন উল্টাদিকে ঘোরা মাত্রই, লাঠির প্রচন্ড এক বাড়ি পড়লো তার পশ্চাৎদেশে। পুলিশ বা সেনাবাহিনীর লাঠির বাড়ি কখনো খায়নি। ঘটনার আকস্মিকতা আর প্রচন্ড ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো সে। কিন্তু তাতে মন গললো না তাদের কারো। গুনে গুনে পাঁচটা বাড়ি দিলো, তারপর যেতে দিলো ওকে।
প্রচন্ড ব্যথায় হাঁটতে পারছিল না মামুন। কিন্তু লাঠির ভয় বড় ভয়। তাই কষ্ট করে হলেও প্রায় দৌড়ে সরে আসল ওখান থেকে। এবার সিদ্ধান্ত নিলো সে, মূল রাস্তা এড়িয়ে মহল্লা বা গ্রামের ভিতর দিয়ে যাবে এখন থেকে। তাহলে সেনা টহল এড়ানো হয়তো কিছুটা সহজ হবে তার জন্য।
আশুলিয়া পর্যন্ত রাস্তা পায়ে হেঁটে পার হয়ে বিরুলিয়া-সাভার রাস্তায় ঢুকতেই, একটা ঔষধ কোম্পানীর কাভার্ড ভ্যান চোখে পড়ল তার। রাস্তার এক পাশে সাইড করে দাঁড়িয়ে আছে, সাভারের দিকে যাবে সম্ভবত। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলো মামুন, যেভাবেই হোক, যত টাকা লাগুক, এই কাভার্ড ভ্যান চালককে রাজি করিয়ে ওদের সাথে যত দূর যাওয়া সম্ভব, এগিয়ে যেতে হবে তাকে। ভাবা মাত্রই ভ্যানের জানালায় গিয়ে দাঁড়ালো মামুন।
“ড্রাইভার ভাই” চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো সে।
ড্রাইভার ভূত দেখলেও সম্ভবত এতটা ভয় পেতো না। চিৎকার করে বলল, “এ্যাই, এক পা’ও আর সামনে আগাবি না তুই।“
জীবনে কখনো কেউ ওকে এভাবে তুই তুকারি করে ডাকেনি, আর একজন ড্রাইভার থেকে এই আচরণ তো ওর ধারণারও বাইরে। কিন্তু আপাতত বিষয়টা মাথায় স্থান দিল না মামুন। বিপদের সময় এটা, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে এখন। ড্রাইভারকে আশ্বস্ত করার জন্যে এক’পা এগিয়ে গিয়ে সে বলল, “ভাই, আমি সুস্থ মানুষ, ভয় …।“
কথাটা শেষ করতে পারলো না মামুন। মোটা এক লাঠি দিয়ে বুকের মধ্যে প্রচন্ড এক গুতো মেরে বসলো ড্রাইভার। আঘাতের ধাক্কা সামলাতে না পেড়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল সে। আঘাতের জায়গাটায় প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছে মামুন, ভীষণ জ্বালা করছে ওখানে, সম্ভবত ছিলেও গিয়েছে বেশ খানিকটা জায়গা। কিন্তু সে মরীয়া, “ভাই, দয়া করে একটু শুনুন আমার কথা। যা টাকা লাগে আমি দিবো। আমাকে শুধু একটু সাথে নিয়ে যান।“
“তোর টাকায় আমরা পেচ্ছাব করি।“ চিৎকার করে কথাটা বলেই, লম্বা একটা লোহার বার নিয়ে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো কাভার্ড ভ্যানের হেল্পার। তারপর মুখ খিঁচরে বলল, “শালা, ভাগ তাড়াতাড়ি। নাইলে রড দিয়া পিটায়া তোর মাথা ভাইংগা দিমু।“
প্রয়োজনে সত্যিই যে তার পক্ষে রড দিয়ে আঘাত করা সম্ভব, এই কথাটা বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যেই বোধহয়, চাকার উপর রড দিয়ে সজোরে আঘাত করল সে। বুঝিয়ে দিলো, প্রয়োজনে সে এটা ব্যবহার করবে।
বিপদ বুঝে কয়েক পা পিছিয়ে গেল মামুন। তারপর সেখান থেকেই শেষ চেষ্টা করলো, “ভাই, আমার মা খুব অসুস্থ। আমাকে যেতেই হবে। একটু সাহায্য করো প্লিজ।“
“ওই তুই যাবি? নাকি …?” প্রায় একসাথে চিৎকার করে উঠল দু’জন।

 

ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, তাই ওখান থেকে সরে এসে একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে গিয়ে বসল মামুন। সেখান থেকে কাভার্ড ভ্যানের হেলপারকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল সে। কোন একটা তরল পদার্থ দিয়ে লাটির মাথাটা পরিষ্কার করে নিচ্ছিলো হেলপার। এটা লাঠির সেই অংশ যেটা দিয়ে ড্রাইভার তাকে আঘাত করেছিল। অপমানে শরীরটা গুলিয়ে উঠলো তার! একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে এখন এতটাই অচ্ছুত হয়ে উঠেছে! মামুনের মনে হলো যেন কয়েকটা সরীসৃপ একসাথে তার শরীরের ভেতর দিয়ে কিলবিল করে অনবরত নড়াচড়া করে চলেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে তাকে। সামান্য এইটুকু পথ অতিক্রম করে আসতেই অনেকগুলো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে মামুনকে। সহজেই বুঝতে পারছে সে, বাসা থেকে যেরকম ভেবে বের হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও বহুগুন খারাপ। একবার ভাবলো ফিরে যাবে, কিন্তু চিন্তাটা জোর করে মাথা থেকে দূর করে দিলো সে।
সে যে বাড়ি যাচ্ছে, এই খবরটা এখন কাউকে জানাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলো মামুন। কারণ এটা শুনে সবাই এখন খুবই চিন্তায় পড়ে যাবে, আর সবাই মিলে বাড়ি যেতে প্রবলভাবে বাধা দিবে তাকে। এছাড়াও তাদের বুঝিয়ে বলার মতো যুক্তি কি তার কাছে আছে? মামুন নিজেকেই প্রশ্নটা করেছিল। অনেক চেষ্টা করেও উপযুক্ত কোনো যুক্তি খুঁজে পায়নি সে। স্বপ্ন দেখে সে এভাবে বের হয়ে এসেছে, একথাও কি কাউকে বলতে পারবে সে? সবাই স্রেফ ধরে নিবে, নিশ্চয়ই তার মাথায় বড় রকমের কোনো গোলমাল হয়েছে।
ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মামুন, তাই ভাবলো একটু বিশ্রাম নিয়ে নেয়াই ভাল হবে তার জন্য। এই সুযোগে বাঁধনকেও একটা ফোন করা যাবে তাহলে।
পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলো মামুন। তিনবারের চেষ্টায় ফোন ধরলো বাঁধন, “হ্যালো মামুন, কেমন আছো?”
“ভাল আছি। তুমি কেমন আছো?
“আমি ভাল আছি।“
“বীণা কেমন আছে?”
“বীণাও ভাল আছে।“
“মা? মা কেমন আছেন?”
“মা ভাল আছেন।“
“শোন, আমি বাড়ি চলে আসতে চেষ্টা করছি। আসার মতো কোন যানবাহন পেলেই, যত তাড়াতড়ি সম্ভব আমি চলে আসবো।“
“এ্যাই শোনো, আমরা ভাল আছি। শুধু শুধু রিস্ক নিয়ো না কিন্তু।“
“আরে না। আমি দেখে শুনে আসবো।“ সত্যি কথাটা এড়িয়ে গেল মামুন।
“সাবধানে থেকো।“
“তোমরাও সাবধানে থেকো। আচ্ছা আরেকটা কথা শোনো, বীণাকে কোলে নিয়ে একটা ছবি তুলে পাঠাও তো! মায়েরও ছবি পাঠাও একটা।”
“ছবি তো তোমার কাছে অনেক আছে।“
“নতুন চাই। দেখবো তোমাদের।“
“আমাদেরটা এখন পাঠাচ্ছি। মা রান্না ঘরে। ওনারটা পরে তুলে পাঠাবো।“
“সাবধানে থেকো। খোদা-হাফেজ।“
লাইন কেটে দিলো মামুন।
“টিং”
ছবি চলে এসেছে। মায়ের কোলে ফুটফুটে ছোট্ট বীণা। দু’জনেই অদ্ভুত সুন্দর মায়া মায়া হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মোবাইলটা কিছুক্ষণ বুকে চেপে ধরে রইলো মামুন, তারপর ছবিটাকে স্ক্রীন সেভার হিসেবে সেভ করে নিলো।
নিজের অজান্তেই দু’চোখ ভিজে আসে মামুনের। চোখের পানি বাঁধ মানছিল না কিছুতেই। আস্তে আস্তে ভিজে উঠল পোলো শার্টের উপরের অংশ, ঠিক তার বুকের কাছটায়।
দূর্ভাগ্য থেকে কিছুতেই যেন মুক্তি পাচ্ছেনা মামুন। মিলিটারি ডেইরীর কাছাকাছি আসতেই আবার সেনাটহলের সামনে পড়লো সে। টহল ভ্যান থেকে তিন/চারজন সেনাসদস্য প্রায় লাফিয়ে নামলো। একজন তেড়েফুঁড়ে এলো তার দিকে,
“এ্যাই, কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
“মায়ের ভীষণ অসুখ, তাই বাড়ি যাচ্ছি। সাভার যাবো আমি।“
“মিথ্যা কথা বলছেন!” বলেই লাঠি বাগিয়ে তেড়ে আসল একজন সেনাসদস্য।
“প্লিজ, মারবেন না ভাই, এটা মিথ্যা কথা না। এই দেখেন আমার ব্যাগ প্যাক।“
“প্রমাণ দেখান তাড়াতাড়ি। মায়ের যে অসুখ, তার প্রমাণ দিন।“
“অসুখের প্রমাণ কোথায় পাবো ইয়াসিন ভাই?” নামের ব্যাজ দেখে বলল মামুন।
“তাইলে ঘুরেন”, লাঠি বাগিয়ে বলল ইয়াসিন।
“আজকে আপনেরা আমাকে একবার পিটাইছেন ভাই। আর মারবেন না প্লিজ।“
“প্রমাণ দেখান।“
জেদ চেপে গিয়েছে মামুনের। এই ভীষণ গরমে মাথাটাও যেন ঠিক মতো কাজ করছে না তার। ঘুরে দাঁড়িয়ে ইয়াসিনকে বলল, “প্যান্ট নামায় দ্যাখেন ভাই। পাছায় এখনো মাইরের দাগ আছে ইনশা আল্লাহ।“
“কি বললেন? ইনশা আল্লাহ!“ হেসে ফেলল ইয়াসিন।
“ভয়ে মাথা ঠিক নাই ভাই।“
“আচ্ছা চলে যান তাড়াতাড়ি।“ ছেড়ে দিল ওকে।
সাভারের কাছাকাছি আসতেই পা’দুটো বিদ্রোহ করে বসলো মামুনের সাথে। গ্রামের ভিতরের একটা স্কুলে, মাঠের এক কোণে বড় একটা গাছের নিচে শুয়ে পড়লো সে। এখন কিছুক্ষণ বিশ্রাম না নিলে এক পা’ও আর হাঁটা সম্ভব না তার। কিন্তু ক্লান্ত শরীর কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল বুঝতেই পারল না সে।
ঘুম ভাঙলো ব্যাপক গোলমালের শব্দে। উঠে বসতেই মামুন লক্ষ্য করলো একজন লোক প্রাণপণে দৌড়ে আসছে ওর দিকে। তার পিছনে লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়াচ্ছে আরো জনা পাঁচেক লোক। লোকটা কোন রকমে মামুনের কাছাকাছি পৌঁছেই প্রাণপনে জড়িয়ে ধরল তাকে। ঘটনার আকস্মিকতায়, কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই লোকটার ধাক্কায় তার মাস্ক খুলে ছিটকে পড়ে গেল দূরে। হাতের গ্লাভসটাও ছিঁড়ে গেল টান লেগে।
মামুন জোর খাটিয়ে লোকটাকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলেও, কিছুতেই ওকে ছাড়ছে না সে। চিৎকার করে বলছে, “ভাই বাঁচান। ওরা মেরে ফেলবে আমাকে।“
“কেন কি হয়েছে আপনার? কি করেছেন?” ওকে সরিয়ে দিতে গিয়ে আবারও ব্যর্থ হলো মামুন।
“ওরা আমার বাড়িতে আগুন দিয়েছে। এখন আমাকে মারবে।“
লোকটা কথা শেষ করার আগেই লাঠিসোটা হাতে লোকগুলো পৌঁছে গেল। তবে ওদের একেবারে কাছে না এসে ৭/৮ ফুট দূরে একটা নিরাপদ দূরত্বে সবাই দাঁড়িয়ে গেল।
ওদেরই একজন চিৎকার করে বলল, “ছেড়ে দেন ওকে। আজকে পিটায় মারবো শয়তানটাকে।“
“এই লোক কি করেছে ভাই?” বিপদ বুঝে সাবধানে প্রশ্ন করলো মামুন।
উত্তেজিতভাবে লোকগুলো বলল, “ইতালি থেকে আসছে। বারবার না করছি আমরা, কিন্তু কোয়ারান্টাইন মানে নাই সে। ওর কারণে আজকে গ্রামে করোনা হইছে কয়েকজনের। “
লোকটা কথা শেষ করতে না করতেই প্রাণপণে দৌড় দিল ইতালি ফেরত লোকটি। ওর পিছে পিছে লাঠি নিয়ে ছুটলো অন্য সবাই। ওদের একজন দৌঁড়াতে গিয়েও হঠাৎ ফিরে আসলো, তারপর সন্দেহের দৃষ্টিতে মামুনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “আপনি কে? কার কাছে আসছেন?”
মামুন শান্ত গলায় বলল, “আমি এই গ্রামের না। সামনের গ্রামে যাবো। আমার বাড়ি ওখানে।“
“কি নাম আপনের গ্রামের?”
প্রমাদ গুনলো মামুন। কোন কথা না বলে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। গলাটা শুকিয়ে আসছে তার, কি উত্তর দিবে ওকে?

 

কিন্তু গ্রামের নাম জানার জন্য লোকটার বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না। মামুনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনেরে জড়ায় ধরছে, আপনেও শেষ। পালান তাড়াতাড়ি। ফিরা আইসা আপনাকে যেন আর না দেখি এইখানে।“ বলেই আবার দৌড় দিলো লোকটার পিছে।
বিপদটা ভালই আঁচ করতে পেরেছে মামুন। যে করেই হোক, এই গ্রাম ছেড়ে সামনে অন্য কোন গ্রামে চলে যেতে হবে তাকে। কিন্তু, লোকটার কথা শুনে মনের ভেতরে খঁচখঁচ শুরু হলো তার। ব্যাগ থেকে সেনিটাইজার বের করে ভাল করে হাত ধুয়ে, যে জায়গাগুলোতে স্পর্শ হয়েছে বলে মনে আছে, ওগুলোও ধুয়ে নিলো মামুন। তারপর ব্যাগের ভেতর থেকে নতুন মাস্ক আর গ্লাভস বের করে পড়ে নিলো সে।
কিন্তু এতো কিছু করেও খঁচখঁচানিটা কিছুতেই গেল না মন থেকে। একসময় মামুন ভাবল, যা হওয়ার তাতো নিশ্চয়ই হয়েই গিয়েছে এতক্ষণে। এত ভেবে লাভ কি। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আবার চলতে শুরু করলো সে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে বহুক্ষণ …
যদিও রাত এতটা গভীর হয়নি এখনো, কিন্তু পুরো এলাকায় একটাও মানুষের দেখা পেল না মামুন। কেমন যেন এক অশরীরি পরিবেশ চারিদিকে। অথচ করোনার আক্রমণ না হলে, এই সময়েও নিশ্চয়ই অনেক মানুষের আনাগোনা থাকতো এখানে। এদিকে ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে মামুনের, সারাদিন বিস্কুট, পানি আর স্যালাইন পানি খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছে সে। তবে এই মুহুর্তে তার সবচেয়ে জরুরী যেটা প্রয়োজন, তা হলো রাত কাটাবার মতো একটা জায়গা। খাবার জন্যে ব্যাগে কিছু বিস্কুট এখনও রয়েছে, ওতে রাত চলে যাবে তার।
গ্রামের ভিতরে বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে যেতেই পুরানো একটা মসজিদ চোখে পড়লো মামুনের। মনটা একটু শান্ত হলো তার, মসজিদের বারান্দায় হলেও ঘুমাতে পারবে অন্তত। কিন্তু মসজিদের কাছে গিয়ে বড়রকম একটা ধাক্কা খেলো সে, এই মসজিদের কোন বারান্দাই নেই। বিল্ডিং এর বাইরে বড় একটা কলাপসিবল গেট, সেটা তালা দিয়ে আটকানো।
অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও কারো কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, হতাশ হয়ে কলাপসিবল গেটের পাশেই বসে পড়লো মামুন। সিদ্ধান্ত নিলো স্লিপিং ব্যাগটা বিছিয়ে এখানেই আজ রাতে ঘুমাবে সে। একটানা হাটাহাটিতে প্রচন্ড পানি পিপাসা পেয়েছে তার। কিন্তু জমা পানিটা এই মুহূর্তে নষ্ট করতে চাইলো না সে। মসজিদ যখন, অজুখানা নিশ্চয়ই আশেপাশেই কোথাও হবে। আপাতত ওখান থেকেই পানি খাবে সে।
দূরে যেতে হলো না, অজুখানাটা একেবারে মসজিদ লাগোয়া। ওখান থেকে পানি খেয়ে, তারপর ওজু করলো মামুন। অপূর্ব এই পানির স্বাদ, ডিপ টিউবওয়েলের পানি হবে নিশ্চয়ই। শরীরটা একেবারে জুড়িয়ে গেল ওর। কিন্তু এই আনন্দ বেশীক্ষণ ভাগ্যে জুটলো না তার। অজুখানা থেকে বাইরে বের হয়ে আসতেই, কলিজাটা সাংঘাতিকভাবে কেঁপে উঠল মামুনের। সে এখন তাকিয়ে আছে মসজিদের পাশেই গোরস্থানে দিকে। পুরানো গোরস্থান! এখানে পুরো রাত সে কিভাবে কাটাবে! কিন্তু এখন অন্য কোন উপায়ও তো দেখছে না সে!
আগের সিদ্ধান্ত মতই স্লিপিং ব্যাগ কলাপসিবল গেটের পাশে বিছিয়ে, ওটার উপরেই এশার নামাজ পড়ে ফেললো মামুন। নামাজ শেষ হতেই যেন কিছুটা সাহস ফিরে পেলো মামুন। নিজেকে প্রবোধ দিলো, মসজিদ আল্লাহর ঘর এখানে ভয়ের কিছু নেই তার। সাথে থাকা কয়েকটা বিস্কুট তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর গুটিসুটি মেরে ঢুকে পড়লো সে।
গভীর রাত।
ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে মামুনের। রাত কত হলো দেখতে ঘুমের মাঝে মোবাইল ফোনের দিকে হাত বাড়াল সে। হঠাৎ আশেপাশে একটা খসখস শব্দে সতর্ক হয়ে উঠলো সে। সাপ-খোপ নয়তো! সাবধানে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো মামুন। কিন্তু চোখের সামনে যা দেখলো, তাতে হৃৎপিন্ডের কম্পন যেন থেমে গেলো তার। বর্ননাতীত আতঙ্কে তার চোখজোড়া যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চাইলো!
স্বপ্নে দেখা সেই ভয়ানক দানবটা ঠিক মাথার পেছনে বসে আছে তার! একেবারে মুখের উপরে ঝুঁকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে তাকে! দানবের ঠোঁটের কোণে এক বিভৎস হাসি। মামুনের মুখের উপর দিয়েই ছায়ার মতো বড় হতে শুরু করলো দানবের শরীরটা। পাখার উপরে অসংখ্য পালক এদিক ওদিক একটু একটু করে দুলছে। আস্তে আস্তে স্পষ্ট হতে শুরু করলো প্রতিটি পালকের সাথে জুড়ে থাকা মাথাগুলো। এমনকি তার নিজের মতো দেখতে মাথাটাও এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। প্রতিটি পালক থেকে দুই জোড়া করে, অগণিত চোখ সরাসরি তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আতঙ্কে মাথা এলোমেলো হয়ে গেল মামুনের। হাত-পা একেবারে পাথরের মতো ভারী হয়ে গিয়েছে তার। তবুও প্রাণপনে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে, কোন রকমে পৌঁছে গেল কলাপসিবল গেটের কাছে। গেটটা দু’হাতে ধরতেই তার চোখে পড়লো ভিতরে ঝুলছে আল্লাহু লেখা একটা সোনালী রঙের প্লেট। ওটার দিকে তাকিয়েই আল্লাহ … আল্লাহ চিৎকার করতে শুরু করলো মামুন। একই সাথে প্রবল শক্তিতে গেট ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলো সে। কিন্তু তার ডাক শোনার জন্য বা গেট খুলে দেয়ার মতো তখন কেউ ছিলনা সেখানে।
প্রচন্ড জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে মামুনের শরীর। ইতিমধ্যেই ঘাড়ের কাছে অশরীরি অনুভুতিটা আরো গাঢ় হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে যেন ঘাড়ের উপরে শ্বাস ফেলছে জিনিসটা। পিছন ফিরে তাকাতে পারছে না সে, শুধু উন্মাদের মতো চিৎকার করে যাচ্ছে এখন। এক পর্যায়ে শরীরটাকে কলাপসিবল গেটের সাথে চেপে ধরে প্রায় মিশিয়ে ফেলল মামুন।
হঠাৎ ঘাড়ের উপর একটা লোমশ স্পর্শ! অসহ্য আতঙ্কে ভেঙ্গে গেলো তার শেষ প্রতিরোধ। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শুরু করলো, সঙ্গে শরীরে প্রবল খিঁচুনী আরম্ভ হলো তার। একসময় চোখ জোড়াও যেন উল্টে গেল মামুনের। অন্ধকারে ওভাবেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো সে।

[চলবে]

Facebook Comments