ধারাবাহিক উপন্যাস প্রত্যাবর্তন [২য় পর্ব]

বুধবার, ২০ মে ২০২০ | ৪:৪৯ অপরাহ্ণ | 222 বার

ধারাবাহিক উপন্যাস প্রত্যাবর্তন [২য় পর্ব]

॥ হাসান তারেক চৌধুরী ॥

প্রত্যাবর্তন [২য় পর্ব]

নাস্তার টেবিলে মুখোমুখি বসেছে বাড়িওয়ালা রহমান সাহেব আর মামুন। একপাশে বসে দু’জনকে নাস্তা তুলে দিচ্ছিলেন বাড়িওয়ালার স্ত্রী, সালমা বেগম। তিনি কম কথার মানুষ। খাবার প্লেটে এটা ওটা তুলে দেয়া অথবা এগিয়ে দেয়া ছাড়া, খাবার টেবিলে খুব একটা কথাবার্তা বলেন না তিনি। তার মূল মনোযোগ থাকে টিভির পর্দায়, প্রতিদিনের খবরে।
আজকে একটা খবর দেখে তিনি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। রহমান সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “আচ্ছা , টিভিতে বলছে যে সারা পৃথিবীতে এক বিরাট দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে। সেটা কি সত্যি নাকি?”
“সেটার সম্ভাবনা খুব বেশি।“ স্বভাব-সুলভ শান্ত গলায় বললেন রহমান সাহেব।
মামুনের মনে পড়লো যে খবরটা গত রাতেই স্ক্রলে বারবার দেখাচ্ছিল। দক্ষিন আমেরিকা ইতিমধ্যেই বেশ বড় রকমের খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়েছে।
রহমান সাহেব বলে যেতে লাগলেন, “এই করোনার ফলে শুধু যে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধ্বস নামবে তাই না, খাদ্যের জোগানেও বড় একটা প্রভাব ফেলবে। উন্নত দেশেগুলোতে যদিও ফসলের উৎপাদন তেমন ব্যাহত হবে না, কিন্তু করোনাজনিত অনিশ্চয়তার কারণে খাদ্যশস্য রফতানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ হবে। আর যে খাদ্যদ্রব্যগুলো সহজে পচে যায়, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রভাবটা আরো অনেক বেশি ক্ষতিকর হবে। আর আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর তো কথাই নেই।“
একটু ভেবে মামুন বলল, “কিন্তু, আমরা তো খাদ্যশস্য তেমন কিছুই রফতানি করি না। আমাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব তো তেমন বেশি হওয়ার কথা না।“
“আমাদের মতো দেশগুলোতে কৃষি ব্যবস্থা পুরোটাই কায়িক শ্রম নির্ভর। লকডাউন আর করোনা সংক্রমনের ভয়ে আর কিছুদিনের মধ্যেই শ্রমিক সংকট দেখা দিবে। ফলে ফসল উৎপাদনের পর তা কেটে ঘরে তোলার মতো লোক পাওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়বে তখন। লক্ষ লক্ষ টন শাক-সবজি ঘরে তোলার জন্য শ্রমিক আর পরিবহন সংকটের কারণে জমিতেই পচে যাবে। ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে তাতে।
রিটায়ারমেন্টের আগে রহমান সাহেব একটা নামকরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যপক তিনি। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার কারণেই হয়তো, যে কোন বিষয়কে খুব গুছিয়ে সহজ করে বুঝিয়ে বলতে পারেন তিনি। তার ওপরে তার কথা বলার ভঙ্গিটাও দারুণ আকর্ষনীয়। তাই সব সময় রীতিমত গুণমুগ্ধ শ্রোতার মতো মুদ্ধ হয়ে তার কথা শোনে মামুন। আজকে সে খুব মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিল, কিন্তু হঠাৎ রহমান সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ড্রইং রুমে চলো, আরাম করে কথা বলি।“
দু’জন এসে ড্রইং রুমের সোফায় বসতেই, টিভির স্ক্রলে একটা সংবাদ চোখে পড়লো মামুনের। একটা সরকারি হাসপাতালে করোনা মোকাবেলার জন্য যথাযথ পিপিই না থাকায়, পাঁচজন চিকিৎসক রোগীকে চিকিৎসা প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। শাস্তি স্বরূপ ওই পাঁচজন চিকিৎসককে চাকুরী থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। একই কারণে অন্য আরেক হাসপাতালে ইন্টার্ন ডাক্তাররা ধর্মঘটে গিয়েছেন।“
খবরটা দেখে মামুন ভীষণ রেগে উঠল, “এই ডাক্তাররা নিজেদের কী ভাবে? নবাবজাদা সবগুলো। রোগী দেখবি না তো ডাক্তার হয়েছিস কেন?”
“মামুন, তুমি এই নিউজটা খেয়াল করেছো, সাথে কিন্তু আরো একটা নিউজও ছিলো।“
“কোন নিউজটা আংকেল?”
“ডাক্তারদের ও অন্যান্য সেবা কর্মীদের মধ্যে করোনা সংক্রমনের কারণে কয়েকটি হাসপাতাল লকডাউন করা হয়েছে।“ শান্তভাবে বললেন রহমান সাহেব।
মামুন কোন মন্তব্য না করে পরবর্তী বক্তব্যের জন্য অপেক্ষায় রইলো।
রহমান আংকেল এবার তাকে সমস্যাটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “একজন ডাক্তার যে কোন পরিস্থিতিতেই রোগীকে তার প্রাপ্য চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করতে পারেন না। এই বিষয়টা যেমন সত্য, তেমনি এর সাথে অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও কিন্তু জড়িয়ে আছে। ধরা যাক, এই করোনার সময়ে কোন ডাক্তার তার প্রটেকটিভ সরঞ্জাম ছাড়াই একজন রোগী দেখলেন। রোগী বা ডাক্তার, দু’জনের কেউই জানেন না যে রোগীটি ইতিমধ্যেই করোনা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। তাহলে এর ফলাফল কি হবে?”
কথা শেষ করে মামুনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন রহমান সাহেব।
নিজের অজান্তেই মামুনের মুখ থেকে বের হয়ে আসল, “ডাক্তার নিজেও সংক্রমিত হয়ে পড়বেন।“
“এর অবধারিত ফল হবে, রোগ লক্ষণ প্রকাশের আগে এই ডাক্তার যতজন রোগী দেখবেন তারা সবাই এই করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবেন। পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিবে।“
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন তিনি, “তাছাড়া ডাক্তার নিজেও একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, অন্য সবার মতোই তাদেরও একই রকম বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাদেরও বাসায় সন্তান আছে, পরিবার পরিজন আছে; যারা তাদের মাধ্যমে অন্য সবার মতই সংক্রমনের শিকার হতে পারে।“
কথাগুলো মামুনকে এমনভাবে নাড়া দিলো যে, সে একদম চুপ করে গেল।
“সত্য যখন কোন মিথ্যার সম্মুখীন হয়, সেটা সত্যিকারের ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করেনা। বড় ট্র্যাজেডিগুলো তখনি সৃষ্টি হয়, যখন একটা সত্য বা ন্যায্য অধিকার, একইরকম আরেকটি সত্য বা অধিকারের মুখোমুখি হয়।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন রহমান সাহেব।
মামুনের বিস্মিত দৃষ্টি দেখে একটু মিষ্টি করে হাসলেন রহমান সাহেব। তারপর বললেন, “কথাগুলো আমার নয়, হেনরী কিসিঞ্জার সাহেব বলেছিলেন। অবশ্য মূল কোটেশনটা ওনার নয়, জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ হেগেলের।“

 

মামুন সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে একেবারে চুপ করে গেল। ভোর রাতে স্বপ্নটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে এখন। রহমান সাহেব সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন, ছাত্রদের চেহারা দেখেই মনের কথা বুঝে ফেলতেন তিনি। মামুনের এই উসখুস ভাবটা চোখ এড়ালো না তার। ওকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন,
“তুমি কি আজকে আমাকে বিশেষ কোনো কিছু বলতে এসেছো?”
“জ্বি, আংকেল।“ মামুন মৃদুস্বরে বলল।
“বলছো না কেন তাহলে? কোন বড় সমস্যা?”
“নাহ তেমন কিছু না। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মামুন বললো, “আমি একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছি আংকেল।“
“বল শুনছি।“ সোফায় একটুখানি এগিয়ে বসলেন রহমান সাহেব।
স্বপ্নটা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলো মামুন। একবার নয়, মনোযোগ দিয়ে দু’বার স্বপ্নটা শুনলেন রহমান সাহেব। তারপর বিষণ্ণ একটা দৃষ্টি নিয়ে অনেকটা সময় ধরে, জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন তিনি।
মামুন বিচলিত হয়ে পড়লো, “স্বপ্নটা কি খুব খারাপ, আংকেল? কোন খারাপ কিছুর কি ইঙ্গিত দিচ্ছে আমাকে?”
সরাসরি কোনো উত্তর দিলেন না রহমান সাহেব, “ভয় পেয়ো না। বাসায় গিয়ে নামাজ পড়ো। আল্লাহ আমাদের সাথে থাকেন সব সময়।“
“বড় কোন বিপদের আলামত না তো আংকেল?”
ওর দিকে তাকিয়ে স্নেহ মাখানো স্বরে বললেন, “তাঁর ইচ্ছা আমরা জানতে পারি না মামুন। শুধু তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়ার ক্ষমতাটুকুই আমাদের দিয়েছেন তিনি।“
রহমান সাহেবের কথায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো মামুন। তিনি পরিস্কারভাবে কিছু না বললেও, তার কথায় এটা স্পষ্ট যে স্বপ্নে খারাপ কিছু একটার ইঙ্গিত আছে। অন্যথায়, হয় তিনি স্বপ্নটার কোনো একটা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করতেন, তাহয় অভয় দিয়ে একটা কিছু বলতেন।
বাড়িওয়ালার বাসা থেকে বের হয়ে চারতলায় নিজের ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই মামুনের মনে ভীষণ এক অশুভ ভাবনা চেপে বসলো।
এদিকে মামুন বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই নিজের বেডরুমে গিয়ে ঢুকলেন রহমান সাহেব । তার স্ত্রী ঘরেই ছিলেন, তাকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, “মামুনের জন্য একটা খাসি সদকা দিতে হবে আজকেই।“
“কেন? কোন বিপদ হয়েছে মামুনের?” অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলেন সালমা বেগম।
প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না রহমান সাহেব।
দুপুর পর্যন্ত খুবই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কাটলো মামুনের। কোন কিছুই ভাল লাগছে না তার। মাঝে একবার বারান্দায় গিয়েছিল, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি সেখানে । তবে ওই সময় রাস্তার একটা দৃশ্য অল্প সময়ের জন্য হলেও তাকে একটু মজা দিয়েছিল।
করোনা প্রতিরোধের কাজে নিয়োজিত একদল ভলান্টিয়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। আট জনের একটা দল, অদ্ভুত তাদের পোশাক। মহাকাশচারীদের মতো এক ধরণের সাদা সিনথেটিক পোষাকে আপাদমস্তক মোড়া, মাথায় হেলমেটের মত একটা কিছু, মুখে মাস্ক – সে এক এলাহী কান্ড। টিভিতে কয়েকবার এরকম দৃশ্য দেখলেও সামনাসামনি এই প্রথম দেখছে সে। দৌড়ে গিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে এসে চটপট কয়েকটা ছবি তুলে নিলো মামুন- এগুলো সবই স্মৃতি হয়ে থাকবে, ইতিহাস হবে একদিন।
বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে এসে টিভি চালিয়ে বসল মামুন। করোনার খবরও এখন তাকে আর টানতে পারছে না। স্বপ্নটা ছাড়াও অন্য আরেকটি বিষয়ে চিন্তিত হয়ে আছে সে। এবার পরিবারের সাথে ঈদ করতে পারবে তো বাড়িতে? ইতিমধ্যেই অবরোধের কারণে সারাদেশ পুরোপুরি অবরুদ্ধ। রোজার মাত্র দুই বা তিন দিন বাকি। ঈদের আগে অবস্থার উন্নতির আশা তেমন নেই। এদিকে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার লকডাউনের ব্যাপারে আরো কঠোর অবস্থানে যাবে। কি যে করবে বুঝে উঠতে পারছে না, মেয়েটাকে কত দিন দেখেনা সে!
হঠাৎই টিভিতে একটা খবর দেখে বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠলো সে। বাংলাদেশে যে গুটি কয়েক অঞ্চলে এখনও করোনা সংক্রমন হয়নি তার ভেতরে একটা তার নিজের এলাকা নাটোর। মামুন ভাবছিলো যে, একবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি বাড়িতে যাওয়া যায় কিনা? ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লো সে।
ঘুমের ভেতরে আবারও সেই ভয়ানক স্বপটা দেখল মামুন।
এবার আরো যেন স্পষ্টভাবে দেখল সে। ঘুমের ভেতর প্রায় দম আটকে আসল তার। প্রানপণে কোন আশ্রয় খুঁজছিল একটা, কিন্তু কোন কিছুই আশেপাশে পাচ্ছিল না। যখন সে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেল যে, সে মারা যেতে যাচ্ছে এখুনি, ঠিক এমন সময় ঘুম ভেঙে গেল তার। এবারও একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠেছে সে।
হঠাৎ একটা জিনিস মনে পড়তেই আতঙ্কে হাত-পা যেন জমে আসলো মামুনের। দানবটাকে এখন চিনতে পেরেছে সে! ছোট বেলাতেই এই বর্ণনা কোথাও শুনেছে সে।
কলিং বেলের আওয়াজে সম্বিত ফিরে পেল মামুন। হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে আছে একেবারে। বিছানা থেকে উঠে কোনরকমে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। সালমা খালা দাঁড়িয়ে আছেন দরজার বাইরে। ভিতরে না ঢুকে বাইরে দাঁড়িয়েই বললেন, “কি ব্যাপার? খাবে না দুপুরে? তাড়াতাড়ি আসো, তোমার আংকেল অনেকক্ষণ ধরে টেবিলে অপেক্ষা করছেন তোমার জন্য।“
রহমান সাহেবের খাবার টেবিল …

 

খাওয়ার সময় সাধারণত মামুন আর রহমান সাহেব নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করে থাকে। বেশিরভাগ সময়েই রহমান সাহেব বক্তা আর মামুন মনোযোগী শ্রোতা। নানা বিষয়ে অগাধ জ্ঞান রাখেন রহমান সাহেব, তাই কথা জমে উঠতে মোটেই সময় লাগে না তাদের। কিন্তু, আজকে পরিস্থিতি অনেকখানি ভিন্ন। চুপচাপ খেয়ে উঠে দুজনে ড্রইং রুমে গিয়ে বসল।
মামুন এখনও ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছে না। কোন কথা বলছিল না সে। সেটা লক্ষ্য করে, পরিস্থিতি হালকা করতে রহমান সাহেব বললেন, “শোন, স্বপ্নটা নিয়ে এতো ভেবো না। অনেক কারণেই মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারে।“
“আংকেল, স্বপ্নে দেখা দানবটাকে আমি চিনতে পেরেছি।“ শান্তভাবে বলল মামুন।
কথাটা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন রহমান সাহেব। কিন্তু তৎক্ষণাৎ কোন মন্তব্য করলেন না। কোনো কিছু বলার আগে মামুনের পুরোটা কথাটা শুনে নিতে চান তিনি।
“আংকেল, স্বপ্নটা খুব খারাপ। আমি শুনেছি খারাপ স্বপ্ন দেখলে নিজের না হলেও, তা পরিবারের অন্য কারো ক্ষতির চিহ্ন হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নাটোর চলে যাবো ওদের কাছে।“
“এই লকডাউনের মধ্যে সেটা একেবারেই ঠিক হবে না তোমার। রাস্তায় কোন যানবাহন নেই, যাবে কিভাবে? তাছাড়া করোনা সংক্রমনের ভয় তো আছেই।“ নিষেধের স্বরে বললেন রহমান সাহেব।
“ভেঙে ভেঙে গেলে, কিছু না কিছু রাস্তায় পাওয়া যাবেই। বাকিটা হেঁটে যেতে পারবো।”
“খবরে দেখলাম রাস্তায় পুলিশ আর আর্মি আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে সাধারণ লোকজনও অনেক আক্রমনাত্মক মনোভাব নিয়ে আছে। এই অবস্থায় এই রিস্ক নেয়া একেবারেই উচিত হবে না তোমার।“
“পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে আংকেল। রোজা দুই একদিনের মধ্যেই, তারপর ঈদ। এই অবস্থা চললে তখন তো ঈদও করতে পারবো না বাড়িতে। সবাই খুব কষ্ট পাবে তাহলে।“
“বাড়িতে একসাথে ঈদ করার চেয়ে, তোমার নিরাপত্তা আর সুস্থতাই এই মুহূর্তে তোমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেশি জরুরী। না যেতে পারলে, যাবে না। নাহয় এবার এই বুড়ো-বুড়ির সাথেই একটা ঈদ করবে।“
“কিন্তু আংকেল, স্বপ্নটা যদি সত্যিই খুব খারাপ হয়? ওদের যদি কোন বিপদ হয়? তাহলে তো এখনি আমার ওদের কাছে যাওয়া উচিত।“
“এভাবে ভাবছো কেন? স্বপ্নটার আদৌ যদি কোন গুরুত্ব থেকে থাকে, তাহলে তো তার ব্যাখ্যা অন্যরকমও হতে পারে। এমনও তো হতে পারে যে এই স্বপ্নটাই হয়তো তোমার নিয়তি? হতে পারে কিনা বলো?”
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মামুনের দিকে এক মুহূর্ত তাকালেন রহমান সাহেব, তারপর ওকে কথা বলার কোন সুযোগ না দিয়েই, আবার বলতে শুরু করলেন, “হতে পারে এই স্বপ্নটাই তোমার নিয়তি হয়ে, তোমাকে হয়তো বড় কোন বিপদে ফেলতে চাইছে। তাই এই মহাদূর্যোগের সময়ও প্ররোচনা দিচ্ছে, যেন তুমি ঘরের নিরাপদ আশ্রয় থেকে বাইরে বেড়িয়ে যাও। ভেবে দেখো, এই পরিস্থিতিতে এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাও কিন্তু প্রবল।“ শীতল গলায় বললেন রহমান সাহেব।
কথাটার গুরুত্ব অনুধাবন করে একটু চমকে গেল মামুন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে আংকেল। একটু ভেবে দেখি।“
নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না রহমান সাহেব। তিমি আন্দাজ করতে পারছেন মামুন শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত নিবে। তাই গলায় যতটা সম্ভব স্নেহ ঢেলে বললেন, “তোমাকে বাধা দিয়ে আমি আটকে রাখতে পারবো না, এটা বুঝি। কিন্তু, সম্ভব হলে জোর করে হলেও তোমাকে আমি ঘরে আটকে রাখতাম। ভাল করে ভেবে দেখো, এখন তোমার এভাবে যাওয়া কিছুতেই ঠিক হবেনা।“
মামুন উত্তর দিলো না। শুধু মৃদুভাবে উপরে নিচে মাথা নাড়লো। যার অর্থ যে কোন কিছুই হতে পারে।
রাতে আবারও দুঃস্বপ্নটা দেখলো মামুন।
ঘুম ভেঙে জেগে উঠতেই, এক অদ্ভুত ধারণা বাসা বাধলো তার ভিতরে – মারা যাচ্ছে সে! যেন এই কথাটাই তাকে জানিয়ে দিতে, কেউ একজন বারবার তাকে স্বপ্নটা দেখিয়ে যাচ্ছে। রাত যত বাড়তে লাগলো মামুনের ধারণাটা ততই এক অন্ধবিশ্বাসে রূপ নিতে থাকলো। একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো, বাড়ি যাবে সে। এক্ষুনি।
সবরকম গণপরিবহন বন্ধ, এটা ভাল করেই জানে মামুন। তাই সিদ্ধান্ত নিলো, পায়ে হেঁটেই বাড়ি যাবে সে। মরতেই যদি হয়, তাহলে স্ত্রী বাঁধন, দুই বছরের মেয়ে বীণা আর মায়ের কাছে গিয়ে নাটোরে বাড়িতেই মরবে সে। তার হিসেবে পাঁচ থেকে ছয়দিনেই পায়ে হেঁটে পৌঁছানো সম্ভব ওখানে।
অনেক দূরের রাস্তা, যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে তাকে। এই করোনার সময়ে কেউ তাকে ঘরে থাকতে দিবে না, এটা প্রায় নিশ্চিত মামুন। রাস্তা বা কোন মসজিদে ঘুমাতে হবে তাকে। গতবছর চাঁদপুরে চিল্লায় যাওয়ার সময়ে একটা স্লিপিং ব্যাগ কিনেছিলো, ওটা তাই সাথে নিয়ে নিলো সে। হালকা কয়েকটা কাপড়, পাওয়ার ব্যাঙ্ক, একটা টর্চ, কিছু খাবার স্যালাইনের প্যাকেট আর ঘরে থাকা কয়েকটা বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে নিল একটা হালকা ব্যাগে। বছরের এই সময়ে যে কোন সময় ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে, সেটা মাথায় রেখে একটা ছোট ছাতা আর পলিথিনের তৈরি নতুন কয়েকটা ময়লা রাখার ব্যাগও সাথে নিল।
ভোর বেলা ফজরের নামাজ শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই, বেল কলিং বেলের আওয়াজ পেলেন রহমান সাহেব। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মামুন। ওকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন তিনি। কাজ হবে না জেনেও বেশ কয়েকবার ভাল করে বোঝালেন তাকে। বললেন, এই সময়ে এখানে থাকাই তার জন্য মঙ্গল। বাইরে যাওয়া মানে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা। কিন্তু সেসব উপদেশ শোনার মতো মানসিক অবস্থায় নেই মামুন।
ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটে ওঠার আগেই বাইরে বেরিয়ে এলো সে।

[চলবে]

Facebook Comments