থ্রিলার গল্প : বাঁশির সুর

সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৭:৩০ অপরাহ্ণ | 378 বার

থ্রিলার গল্প : বাঁশির সুর

॥ আরকান ফয়সাল ॥

যেন দুটি চাঁদ উঠেছে।
একটা চাঁদ উঠেছে আকাশের এক কোণে। আর একটা চাঁদ উঠেছে দীঘির পানিতে। আকাশের চাঁদটি স্থির। কিন্তু দীঘির চাঁদটি অস্থির। আকাশের চাঁদটা চুপ করে রয়েছে। আর দীঘির চাঁদটা ঢেউ এর তালে তালে যেন নাচছে।
আকাশের চাঁদটি যেন একটা রূপালী থালা। রূপালী থালাটার ভেতর জোছনা থৈ থৈ করছে। রূপালী থালাটাকে ঘিরে গোল একটা আলোর চক্র তৈরি হয়েছে। তাতে চাঁদটিকে আরও মহামারী রকম অপূর্ব দেখাচ্ছে।
আজ রাতের আকাশের সমস্ত তারাগুলো যেন বেরিয়ে এসেছে। ঝকঝক করে তাকিয়ে রয়েছে যেন সেগুলো পৃথিবীর দিকে। পৃথিবীর মানুষেরা যেভাবে আকাশের তারাদের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকে সেগুলোও মনে হয় পৃথিবীর দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রয়েছে। আকাশের চাঁদটির যেন বুকভরা জোছনা। সেই জোছনা ঢেলে দিচ্ছে ধরণীর বুকে অকৃপণতায়। জোছনাগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে গাছের ডালে। ডাল থেকে পাতায়। আর পাতা থেকে যেন চুইয়ে টপ টপ করে জোছনার ফোঁটাগুলো পরছে ধরণীর বুকে।
আর হাজার হাজার বছর ধরে পিপাসিত হয়ে থাকা পিপাসিত ধরণী যেন সে জোছনাগুলো চুষে চুষে খাচ্ছে। জোছনা ঢেলে পড়ছে সবখানে। মাঠ থেকে বিল। বিল থেকে ঝিল। জোছনা ছাপিয়ে পড়েছে গ্রামে। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে।

 

 

জোছনার কারণে চকচক করছে দীঘির পানি। তার থেকেও বেশি চকচক করছে দীঘির ভেতর ভেসে ওঠা চাঁদটি। আকাশের চাঁদটিকে ধরা যায় না। কিন্তু দীঘির চাঁদটিকে ধরা যায়। তাকে ধরা যায় কিন্তু ধরে রাখা যায় না। আঙুলের ফাঁকা দিয়ে পানির সাথে গলে বেরিয়ে যায়।
মাঝরাত!
বাতাস হচ্ছে খুব। বাতাসের কারণে তাল গাছের কাঠ দিয়ে বানানো কালো কুচকুচে নৌকাটি দুলছে। আর এই কারণে নৌকার নিচে দীঘির পানিতে কেমন কলকল করে শব্দ হচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে যে কোনো আবেগপ্রবণ মানুষের পাগলের মতো হাসা অথবা পাগলের মতো কাঁদা উচিত। পাগলের মতো দু’হাত ছড়িয়ে হাঁসি দিয়ে তার মনের ভেতরের দুঃখকে জানান দিবে। পাগলের মতো কেঁদে মনের ভেতরের সুখকে জানান দেবে। সেগুলোকে ছড়িয়ে দিবে দীঘির পানিতে। কিন্তু কিবরিয়ার মনে এ সব হচ্ছে না। সে তাকিয়ে রয়েছে আলো ঝলমল দূর আকাশে। মনের ভেতর দুঃশ্চিন্তা! ভাবছে আসবে তো?
কিবরিয়া দীঘির ভেতর নৌকাতে রয়েছে। তবে একা নয়। তার সাথে আরও একজন রয়েছে। একটি ছেলে। ছেলেটির নাম মধু। বয়স আঠাশ উনত্রিশ। তবে তাকে দেখে মনে হয় তার বয়স আঠাশ উনত্রিশ না। তার বয়স দুশো অথবা তিনশ। এই বয়সে ছেলেটার শরীরের সমস্ত মাংস যেন গলে গেছে। এখন শুধু চামড়া আর হাড় রয়েছে। চামড়াগুলোও ঝুলে পরেছে। শরীরের হাড়গুলো যেন সব কয়টি গোণা যায়। বুকের খাঁচাটা দেখলে মনে হয় সে খাঁচাটা কোন মানুষের খাঁচা না। সে খাঁচাটা চিকন লোহার তার দিয়ে বানানো খাঁচা। যে খাঁচাটাকে চাইলেই হাত দিয়ে দুমড়ে মুছড়ে ফেলা যায়। ছেলেটির হাত পায়ের সব আঙুলগুলো কোঁকড়ানো। মুখের চামড়া ফুঁড়ে যে কোন সময় চোয়ালের হাড় দুটো যেন বেড়িয়ে আসবে। চোখ দুটো গভীরে চলে গেছে। আলোহীন চোখ। সে পরে রয়েছে নৌকার পাটাতনে। কিবরিয়া বলল, ‘ওটা আসবে তো?’
ছেলেটি খসখসে গলায় বলল, ‘আমি জানি না। ওটা আর কখনো আসেনি।’

কিন্তু যেভাবে হোক না কেন আজ ওটা কে আবার নামিয়ে আনতে হবে। তুমি আবার বাজাও। সুর ওঠাও। সেই সুর! যে সুর তুমি সে রাতে উঠিয়ে ছিলে।
ছেলেটি শোয়া অবস্থায় একটা চিকন বাঁশের বাঁশি ধরে রয়েছে। বাঁশের চিকন বাঁশিটার মত ছেলেটার হাত দুটো চিকন!
‘বাজাও!’
ছেলেটি কয়েকবার কাঁশলো। কাঁশির কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ দিয়ে। শুধু শরীরটা দাঁপিয়ে উঠলো।
কিবরিয়া এসেছে বন্যি গ্রামে। এখানে এসেছে সে তার এক বন্ধুর সাথে। বন্ধুর নাম হেলাল। সে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। হেলালের গ্রামের বাসা এখানে। হেলালের ছোটো বোনের বিয়ে। এই বিয়েতে হেলালের সাথে কিবরিয়া এখানে এসেছে। হেলাল তার কলেজের বন্ধু ছিল। এবং খুব ঘনিষ্ট বন্ধু। বন্যি গ্রামটা সুন্দর। চারদিক গাছগাছালি। চারদিক শুধু সবুজ আর সবুজ। আর রয়েছে পাখি। নানান রকমের পাখি। তারা সবসময় কিচিরমিচির করতেই থাকে।
এখানে এসে কিবরিয়ার ভালোই লাগছিল। হেলালের গ্রামের বাসার লোকেরা খুবই ভালো। হেলালের মা-বাবা, বোন অন্য সবাই খুব ভালো। তারা সবসময় ব্যস্ত থাকতো কিবরিয়া কী খাবে আর না খাবে এটা নিয়ে। তারা এত ব্যস্ত থাকতো যে কিবরিয়ার মাঝে-মধ্যে লজ্জা লাগত।
এখানে এসে কিবরিয়া বাজারে এক দোকানে গিয়ে চা খেত। গ্রামের চায়ের দোকানগুলো সব থেকে সন্ধ্যার পর ভিড় হয়। সবাই কাজ শেষ করে এসে চায়ের দোকানে বসে চা-বিড়ি খায়। চায়ের দোকানের পাশে আবার পাটি পেতে রাখা। সেখানে তারা লুডু খেলে, তাস খেলে। কিবরিয়া রোজ সন্ধ্যার সময় সেখানে যেত। গিয়ে তাদের লুডু খেলা দেখত। এক সন্ধ্যায় সে বসে বসে তাদের লুডু খেলা দেখছে। খেলার ভেতর হঠাৎ কী দিয়ে কী একজন বলে উঠলো চাল দিতে ‘এত দেরি হয় ক্যান তোমার? মধুর মতো এক রাতে বুড়ো হয়ে গেছ নাকি?’
এই কথাটা কিবরিয়ার কানে এসে বাঁধল। তার কারণ এই বাক্যটা সে এই গ্রামের আরও কয়েকজনের মুখে শুনেছে। কেউ যদি কোনো কাজ করতে না পারে বা কাজে অলসতা করে তখন তাকে বলে মধুর মতো এক রাতে বুড়ো হয়ে গিয়েছ নাকি?
হেলালের বাসায়ও সে এ কথা শুনেছে। হেলালের বড়ো ভাই গ্রামে থাকে। সে তার ছেলেকে কী একটা কাজ করতে বলেছিল। সে দেরি করাতে হেলালের ভাই তাকে বলল মধুর মতো এক রাতে বুড়ো হয়ে গেছো নাকি?
কিবরিয়া ভাবলো এটা মনে হয় এই গ্রামের কোনো প্রচলিত প্রবাদ বাক্য। মধুর মতো এক রাতে বুড়ো হয়ে গেছ নাকি?
কিবরিয়া রাতে হেলালকে বলল, ‘তোমাদের গ্রামে এই কথাটা খুব জনপ্রিয় নাকি?’
‘কোন কথাটা?’
‘এই যে কোনো কিছু হলেই গ্রামের সবাই বলে মধুর মতো এক রাতে বুড়ো হয়ে গেছো?’
হেলাল বলল, ‘এ কথাটা গ্রামের সবাই মজা করে বলে। কিন্তু এটা আসলে মজা করায় কোনো কিছু না। বরং মন খারাপের বিষয়।’
বুঝতে না পেরে কিবরিয়া বলল, ‘মন খারাপের বিষয় মানে?’
‘মধু আসলে একটা ছেলের নাম। সে এই গ্রামের শেষদিকটাতে থাকে। ঐ যে বিল? ঐ বিলের ওপাড়ে। তার অসুখকে নিয়ে এমন একটা বাক্য তৈরি হয়েছে গ্রামটাতে।’
‘মধুর অসুখটা কী?’
‘অসুখটা কী তা কেউ জানে না। কেউ জানে না বলতে গ্রামের কেউ জানে না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে বলেছে প্যারালাইস। সাথে পুষ্টির অভাব।’
‘মানে মধু এখন প্যারালাইস রোগী?’
‘হ্যাঁ।’
‘আগে কি মধু সুস্থ ছিল?’
‘ছিল।’
‘কিন্তু একজন প্যারালাইস রোগীকে নিয়ে এমন উপহাস কেন সবার ভেতর?’
‘এর কারণ হলো মধুুর এক রাতে তার চেহারা পুরোটা বুড়ো মানুষদের মতো হয়ে যায়। থুরথুরে বুড়ো।’
‘একরাতে সে বুড়ো মানুষদের মতো হয়ে যায়?’
‘হ্যাঁ।’
‘কীভাবে?’

‘এটা কেউ জানে না। মধু একরাতে যুবক হয়ে মাছ ধরতে যায়। কিন্তু ফিরে আসে পুরোপুরি থুরথুরে বুড়ো হয়ে। কেন এমন হলো এটা মধু কাউকে বলতে পারেনি। কারণ মধু যখন সে রাতে বাসায় ফিরেছে তখন সে কোনো কথা বলতে পারেনি। এরপর প্রায় চার বছর সে কোনো কথা বলতে পারেনি। আর তাই কেউ কিছু জানতেও পারেনি। কিন্তু এখন নাকি সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা অস্পষ্ট কথা বলতে পারে।’
‘এমন ঘটনা ঘটলে তো পত্রিকায় এ কথা ছাপানোর কথা ছিল। পত্রিকায় ছেপে ছিল এ খবর?’
‘না।’
‘আমি ছেলেটা সাথে দেখা করতে চাই।’
‘কেন?’
‘দেখতে মন চাইছে ছেলেটাকে। এক রাতে কেউ বুড়ো হয়ে গেল তাকে কেমন দেখায় এটা দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। কাল নিয়ে যাবে আমাকে ছেলেটার বাসায়?’
‘কাল তো একটু শহরে যেতে হবে। বিয়ের কিছু জিনিস পত্র কিনতে হবে।’
‘তাহলে তুমি শহরে যেয়ো। আমি ছেলেটার বাসায় যাব।’
‘একা একা চিনবে?’
‘এ রকম ছেলের বাসা না চিনলেও সমস্যা নেই কারণ তার বাসা এ গ্রামের সবার এখন চেনার কথা। আমি তাদের কাছ থেকে শুনে চলে যাব।’
সকাল বেলা নাস্তা করে কিবরিয়া মধুর বাসায় দিকে চলে গেল। তার বাসা চিনতে কোনো সমস্যা হলো না। কারণ আসলেই মধুর বাসা সবাই চেনে। চিনবার ই কথা।
মধুর বাসাটা মাটির। বাড়ির সামনে গোল পাতা দিয়ে বাড়িটা ঘেরা। কিবরিয়া বলল, ‘বাসায় কেউ আছেন?’ দু’বার ডাকার পর এক ছোটো মেয়ে বেড়িয়ে এসে বাইরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো।
কিবরিয়া বলল, ‘মধু কি বাসায় আছে?’
মেয়েটি মাথা কাৎ করে জানিয়ে দিলো, ‘আছে।’
‘তার সাথে কি একটু দেখা করা যাবে?’
মেয়েটি তার জামার ফিতা ধরে কামড়াতে লাগল
একটু পর একজন মহিলা মাথায় ঘোমটা দিয়ে এসে বলল, ‘কাকে চাই?’
‘মধু বাসায় আছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি একটু তার সাথে দেখা করতে চাই।’
‘কেন?’
‘আপনি কি মধুর মা?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার সাথে একটু কথা বলব।’
‘সে তো কথা বলতে পারে না।’
‘যেটুকু পারে সেটুকুতেই চলবে।’
‘আসেন।’
কিবরিয়া বাড়িটার ভেতর গেল। বাড়ির উঠানে দুটো বড়ো বড়ো মাছ ধরার জাল রোদে বিছিয়ে রাখা। কিছু কবুতর রয়েছে। পুরুষ কবুতরগুলো গলা ফুটিয়ে ঘুড়ে ঘুড়ে ডাকছে। রাঁজা হাস রয়েছে বাড়ির ভেতর। কিবরিয়াকে দেখে তারা গলা উঁচু করে ডাক ছাড়লো
মধু রয়েছে ঘরের ভেতরে। সে যে ঘরে রয়েছে মধুর মা কিবরিয়াকে সে ঘরে নিয়ে গেল। কিবরিয়া মধুকে দেখতে পেল। দেখেই তার বুকের ভেতর চিনচিন করে উঠলো। তার সামনে একটা বিছানায় ময়লা চাদরে এ কে পরে রয়েছে? মধু নামের কোন ছেলে? নাকি মধু নামের কোন বয়স্ক থুর থুরে বুড়ো?
কিবরিয়া বলল, ‘মধু! কেমন আছো?’
অপরিচিত একটা কণ্ঠ শুনে মধু কেমন একটা করতে লাগল। মনে হল যেন কে এসেছে এটা বোঝার চেষ্টা করছে।
‘তুমি আমাকে চিনবে না। আমার নাম কিবরিয়া। আমি কি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?’ মধু চিকন বাঁশের কুনচির মত হাত দিয়ে বসতে বলল তাকে। কিবরিয়ার পাশে রাখা একটা চেয়ার। সে চেয়ার টাতে বসলো না। সে মধুর পাশে ময়লা চাদর টাতে বসলো।
মধুর মা বলল, ‘আপনি কি কোন সরকারি লোক?’
‘না। আমি কোন সরকারি লোক না।’
‘তাহলে কোন এনজিওর লোক?’
‘না। আমি হেলালের বন্ধু।’
কিছুটা নিরাশ হলো মধুর মা। বলল, ‘আপনি কথা বলেন। এই বলে সে চলে গেল মধু তোমর এখন বয়স কত?’
মধু ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল, ‘আঠাশ উনত্রিশ।’
‘আমি শুনেছি এক রাতে নাকি তোমার শরীরের এমন অবস্থা হয়েছে। এটা সত্যি?’
মধু চুপ করে থাকলো।
‘তুমি এখন কোনো চিকিৎসা করছো না?’
মধু মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘না।’
মধুর হাতে একটা জিনিস দেখে অবাক হলো কিবরিয়া। তার হাতে একটা বাঁশের বাঁশি।
সে বাঁশিটা তার বুকের ওপর ধরলো। মধুর মা কিবরিয়ার সামনে এক বাটি মুড়ি আর এক টুকরো গুড় দিয়ে গেল। সে বলল, ‘মধু আগে বাঁশি বাজাতে পারত। এখন আর পারে না। কিন্তু বাঁশিটা সব সময় সে সাথে করে রাখে।’
কিবরিয়া কিছু সময় মধুর সাথে কথা বলল। মধু কিছু কথার ভাঙ্গা ভাঙ্গা উত্তর দিল। মধুর মায়ের সাথে ও কিছু কথা বলল মধুর চিকিৎসার ব্যাপারে। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে আজ তাহলে চলি।’ যাবার আগে কিবরিয়া বলল, ‘মধু আমি তোমার বাঁশি বাজানো শুনতে চাই। আমি লোক মুখে শুনেছি যে তুমি নাকি খুব মিষ্টি বাঁশির সুর তুলতে পারো।’
এ কথা বলার সাথে সাথে মধু কেমন কেঁপে উঠলো। কিবরিয়া মধুর মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে তাড়া তাড়ি সে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলো। কারণ এমন ছেলের সামনে এত সময় থাকা যায় না। মন খারাপ হয়ে যায়।

হেলালের বোনের গায়ে হলুদ সেদিন। তাকে হলুদ রংয়ের শাড়ি পড়ানো হয়েছে। হলুদ রংয়ের শাড়ি পড়ানোর কারণে তাকে হলুদ পাখির মতো দেখাচ্ছে। আশে পাশের বাসার মেয়েরা এসে ভিড় করেছে। তারা নানা রকম কথা বলাবলি হাঁসাহাঁসি করছে। সবাই এসে তার মুখে হলুদ মেখে দিচ্ছে। একটা সময় ছেলেদের বাসা থেকে লোকজন এলো। হৈ চৈ চিৎকার চেচাঁমেচিঁ হল। হেলাল খুব ব্যস্ত। খুব ছুটাছুটি করছে। ছুটাছুটি করতেই হবে। ছোটো বোনের বিয়ে বলে কথা। কিবরিয়া বসে রয়েছে একটা চেয়ারে। খোঁড়া পা নিয়ে বেশি ছোটাছুটি করতে পারে না। তার হাতে এক বাটি পায়েস। পায়েসের ওপর দুটো মিষ্টি।
এমন সময় একটি ছেলে এলো কিবরিয়ার কাছে। এসে বলল, ‘আপনার নাম কিবরিয়া?’
কিবরিয়া ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘আপনাকে ডাকে।’
‘কে ডাকে?’
‘মধু!’
‘মধু?’
‘হ্যাঁ। এখন যেতে বলেছে।’
এমন সময় হেলাল এসে বলল, ‘কী হয়েছে?’
ছেলেটা চুপ করে রইল। কিবরিয়া বলল, ‘মধু ডাকছে আমাকে।’
‘মধু ডাকছে তোমাকে? কেন?’
‘তা তো বলতে পারবো না।’
‘কোনো টাকা পয়সা দিয়ে ছিলে নাকি তাকে?’
চুপ করে রইল কিবরিয়া। বুঝতে পারছে হেলাল কী বলতে চাইছে। সে বলতে চাইছে এক বার টাকা দিয়েছে সে আর এই কারণে আবার তাকে কোন অজুহাতে বাসায় ডাকছে তাকে। যদি আবার কিছু টাকা নেওয়া যায়। হেলাল ছেলেটিকে বলল, ‘তুমি চলে যাও। সে এখন যেতে পারবে না। দেখছো না বাসায় অনুষ্ঠান হচ্ছে। ছেলেটি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে চলে যাবার জন্য ঘুরে দাড়ালো।’
কিবরিয়া বলল, ‘দাঁড়াও। যাব আমি।’

কিবরিয়া আর মধু পাশাপাশি। কিবরিয়া বসে আছে। মধু বিছানায় শুয়ে রয়েছে। ময়লা চাদরে।
‘তুমি আমায় ডেকেছো মধু?’
মধু চুপ করে রইল।
‘কিছু বলবে?’
এবার ও চুপ সে।
কিবরিয়া অস্বস্তিভরা কণ্ঠ নিয়ে বলল, ‘টাকা লাগবে ঔষধ কেনার জন্য?’
মধু ভাঙ্গা কণ্ঠে বলল, ‘না।’
অবাক হলো কিবরিয়া। বলল, ‘তাহলে ডেকেছো কেন?’
‘একটা কথা বলব।’
‘কী কথা?’
‘সে রাতে কী হয়েছিল। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার।’
‘কোন রাতে?’
‘যে রাতে আমি বুড়ো হয়ে যাই। কাউকে বলিনি সে কথা। আপনাকে বলতে চাই।’
‘আমাকে বলতে চাও কেন?’
‘কারণ আপনি বলেছেন আপনি আমার বাঁশির সুর শুনবেন। আমি আপনাকে বাঁশির সুুর শুনাবো বলে বাঁশিটাতে সুর তুলবার চেষ্টা করেছি। আর সে রাতের পর এই প্রথম আমি বাঁশিতে সুর তুলতে পেরেছি। তবে পুরোপুরি না।’
‘এর ভেতর আর কখনও পারোনি?’
‘না। খুব চেষ্টা করেছি। কিন্তু সুর ওঠেনি।’
‘তাহলে এবার পারলে কীভাবে?’
‘জানি না।’
মধুর হাতের দিকে তাকিয়ে রইলো কিবরিয়া। মধু বাঁশিটা ধরে রেখেছে। কাঁপছে হাতটা।
‘আমি বলতে চাই সে রাতে কী হয়েছিল।’
‘হ্যাঁ বল। আমি শুনবো।’

একটা লম্বা শ^াস নিল মধু। তারপর শুরু করলো। “মাছ ধরার নেশা আমার খুব। আমি প্রতি রাতেই বিলে মাছ ধরতে যেতাম। এক রাতে বিল থেকে মাছ ধরে দীঘির পাড়টা ধরে হেঁটে যাচ্ছি। কিন্তু হঠাৎ আমি সেখানে দাঁড়িয়ে গেলাম। কারণ তখন দীঘিটাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিল। মিষ্টি বাতাস বইছিল। আমি বাতাস খেতে থাকলাম। সে রাতে আকাশে অনেক তারা উঠেছিল। চাঁদ উঠেছিল। চাঁদের চারপাশে গোল আলো ছিল। চারদিক জোছনায় ভরে ছিল। আমি এত রাত বাইরে থেকেছি কিন্তু সে রাতের মত সুন্দর রাত আমি কখন ও দেখিনি। আমার সাথে সব সময় বাঁশি থাকতো। আমার মনটা এত ভালো হয়ে গেল যে আমি দীঘির পাড়ে বসে বাঁশি সুর তুললাম। আর সে রাতে যে সুর উঠেছিল আমি তেমন সুর কোনো দিন ওঠাতে পারি নি। সুরটা বাতাসের সাথে ছড়িয়ে পরলো সব জায়গায়। আমি আাকশের দিকে চোখ বন্ধ করে তাকিয়ে সুরটা তুলছিলাম। যখন আমি আবার চোখ খুললাম তখন দেখি আকাশের নীল এক রং এ দুটো আলো ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি বঁশি বাজানো থামিয়ে দিলাম। অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম আলো দুটো কিসের। আমি দেখলাম সে আলো দুটো ছুটাছুটি করতে করতে আকাশ থেকে নীচের দিকে নামছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আমার কাছে মনে হলো আলো দুটো আমার দিকেই ছুটে আসছে।
এবং তাই হলো। আলো দুটো এসে দীঘির পানির ভেতর পড়লো। আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাড়ালাম। দেখলাম দীঘির পানিটা কেমন অন্য রকম রং হয়ে গেছে। দীঘিটা আলোতে ঝলমল করছে। প্রচন্ড ঢেউ উঠল দীঘিতে।
আমি পাড়টা থেকে সরে গিয়ে আম গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। আমার খুব ভয় লাগছিল। আবার কি হচ্ছে দীঘির পানিটাতে ওটা ও না দেখে যেতে পারছিলাম না। কিছু সময় পর দেখলাম দীঘির পানির ভেতর থেকে দুজন নীল মানুষ ভেসে উঠলো। একজন ছেলে আর একজন মেয়ে। ছেলেটি মেয়েটিকে তার দু’হাত দিয়ে কোলে তুলে রেখেছে। মেয়েটির দু’চোখ বন্ধ। মাথাটা এক পাশে পরে রয়েছে মেয়েটার। নীল ছেলেটা কি একটা নাম ধরে মেয়েটিকে ডাকছে। আর কাঁদছে। কিন্তু মেয়েটি কোন কথা বলছে না।
নীল ছেলেটা ডেকেই চলছে। তবুও নীল মেয়েটি কোন কথা বলছে না।
আমি অবাক হয়ে তাদের দুজনকে দেখতে লাগলাম। তাদের চেহারা অনেক টা মানুষদের মত। কিন্তু পুরো পুরি নয়। তাদের শরীর পুরো নীল আলোয় চকচক করছে।
প্রথমে আমি ভয় পেলাম। ভাবলাম এরা যদি আমায় দেখে ফেলে তাহলে তো আমায় মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু যখন দেখলাম ছেলেটা মেয়েটিকে ধরে কাাঁদছে তখন আমার ভয় একটু কমলো। ভাবলাম এরা যখন কাঁদতে পারে তাহলে এদের মনেও মায়া আছে। আমি গাছটার আড়াল থেকে বেড়িয়ে এলাম। তবে বেড়িয়ে আসার কারণ রয়েছে। কারণ আমি শুনতে পেলাম নীল ছেলেটা একা একা অস্থির গলায় বলছে ছেলেটা কোথায় গেল? সে আমাদের বাঁচাতে পারে। কোথায় গেল সে?
এ কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম তারা আমাকে খুঁজছে। তারা কোনো বিপদে পরেছে। আর আমার বাঁশির সুরের কারণেই তারা আমার কাছে এসেছে। আমি তখন একটু ভয়ে ভয়ে আড়াল থেকে বেড়িয়ে আসলাম তাদের সামনে। আমি এক ভাবে তাকিয়ে রইলাম তাদের দিকে। ছেলেটাও আমার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে রইল।
আমি বললাম, ‘তোমরা কারা?’
ছেলেটি বলল, ‘ভয় পেয়ো না আমাদের। আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।’
আমি আবার ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘তোমরা কারা?’
ছেলেটা বলল, ‘আমরা শূন্যের মানব মানবী। আমরা শূন্যে থাকি। ও আমার সঙ্গিনী।’
আমি বললাম, ‘তোমরা কি চাও? কেন এসেছো এখানে?’
ছেলেটি বলল, ‘আমর সঙ্গিনীর আয়ু ফুরিয়ে এসেছে।’
‘আয়ু ফুরিয়ে এসেছে?’
‘হ্যাঁ। আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। একটু পরই ও মারা যাবে। তখন ওকে আমি আর কখনো পাবো না।’
এই বলে সে কাঁদতে থাকলো। এরপর বলল, ‘তুমি আমাদের সাহায্যে করতে পারো।’
‘আমি? কীভাবে?’
‘তুমি তোমার কিছু আয়ু ওকে দিতে পারো। তাহলে তোমার আয়ু পেলে ও সুস্থ হয়ে উঠবে।’
‘আমার আয়ু?’
‘হ্যাঁ।’
‘কীভাবে?’
‘তুমি তোমার হাত ওর হাতে রাখলেই হবে।’
আমি তখন ভয় পেলাম। ভাবলাম আমি আমার আয়ু দিলে তো আমি মরে যাব। আমি বললাম, ‘না। আমি আমার আয়ু দিতে পারবো না।’
ছেলেটি বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার মনের কথা। তুমি ভাবছো তুমি তোমর আয়ু দিলে তোমার আয়ু কমে যাবে। এটা ঠিক যে তোমার আয়ু কমে যাবে। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি আমি আবার তোমার আয়ু ফিরিয়ে দিবো।’
ছেলেটি বলল, ‘তুমি যদি ওকে আয়ু না দাও তাহলে ও কিছু সময়ের ভেতর মারা যাবে। আর তখন আমি শূন্যে একা হয়ে যাব। হাজার হাজার বছর ধরে আমার একা থাকতে হবে। যত সময় না আমার আয়ু ফুরিয়ে না আসে। আর আমি ওকে ছাড়া কিভারে থাকবো তুমি বল?’ এ কথা বলে সে আবার কাঁদতে থাকলো। ছেলেটির চোখের নীল চোখের ভেতর থেকে নীল পানি বের হচ্ছে।
সে এমনভাবে কাঁদতে থাকলো যে আমার মায়া লাগল। আমি বললাম, ‘আমি আমার আয়ু দিবো তাকে। কিন্তু আমি আবার আমার আয়ু ফেরত পাবো কীভাবে?’
ছেলেটি নীল পানি মুছে বলল, ‘আজ তুমি তোমার আয়ু দাও। আগামী কাল রাতে ঠিক এ সময়ে এখানে দাঁড়িয়ে আজ যে বাঁশির সুর তুলেছো তুমি সেই সুর তুলবে। আমরা তখন আবার ফিরে আসবো।’
আমি তখন চুপ করে রইলাম।
ছেলেটি বলল, তুমি বাঁশির এই সুরটা তুললে আমরা আসবো। আমি কথা দিলাম।’
আমি তখন বললাম, ‘আমি রাজি।’ কারণ ওদের দেখে আমার খুব মায়া লাগছিল।
ছেলেটি তখন বলল, ‘তুমি নেমে এসো পানিতে।’
আমি দীঘির পানিতে নেমে গেলাম। চলে গেলাম তাদের কাছে। তাদের নীল আলোতে আমাকে ও নীল দেখালো।
ছেলেটি বলল, তুমি ওর হাত দুটো ধরো।’
আমি তখন ভয়ে ভয়ে মেয়েটির হাত দুটো ধরলাম। আর তখন ভীষণ ঝাঁকুনি খেলাম আমি। মনে হলো আমার শরীরের ভেতর থেকে কিছু বেড়িয়ে যাচ্ছে। আমি সব কিছু কেমন আলো আলো দেখতে পেলাম। আমি বুঝতে পারলাম ধীরে ধীরে আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।
যখন আমার হাত টা এমনি এমনি মেয়েটির হাত থেকে পরে গেল তখন আমি আমার চেহারা দীঘির নীল চকচকে পানির ভেতর দেখেতে পেলাম। আমি দেখলাম আমি সত্যি বুড়ো হয়ে গেছি। আমার আয়ু চলে গেছে মেয়েটার কাছে। আমার ভীষণ দূর্বল লাগল। মনে হলো যেন আমি দীঘিটার ভেতর ডুবে যাব।
ছেলেটি তার নীল চোখের নীল পানি মুছে ফেলল। সে অস্থির গলায় বলতে লাগল, ‘মেয়েটিকে এবার তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। আবার বেঁচে যাবে তুমি। আমরা আবার পুরো আকাশ ছুটাছুটি করে বেড়াবো।’
আমি তখন দেখলাম মেয়েটি চোখ খুলেছে। কি সুন্দর তার চোখ দুটি। তার চোখের ভেতর তাকালে পুরো আকাশটা যেন দেখা যায়। ছেলেটি বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি ওকে তোমার আয়ু দিয়েছো। তোমার কারণে ও আবার হাজার হাজার বছরের আয়ু পেল। তুমি আগামী কাল রাতে ঠিক এই সময়ে এই জায়গায় আজ যে সুরটা তুলেছো সেই সুরটা তুলবে। আমরা আসবো। আমরা ফিরে আসবো। ফিরে এসে তোমার আয়ু ফিরিয়ে দিবো।’
‘আবার দেখা হবে।’ এই বলে ছেলেটি মেয়েটিকে কোলে নিয়ে নীল আলো হয়ে আবার আকাশের দিকে ছুটে গেল। আমি দীঘির পানিতে দাঁড়িয়ে তত সময় তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম যত সময় তারা আকাশে তারাদের ভেতর হারিয়ে না যায়। কথা বলা শেষ করে লম্বা একটা শ্বাস ফেলল মধু।”
কিবরিয়া বলল, ‘এর পর কী হলো?’
‘তুমি পরের রাতে আর দীঘির পাড়ে যাও নি?’
‘না।’
‘কেন?’
‘কারণ আমি বহু কষ্টে বাসায় ফিরে ছিলাম। বাসায় ফিরেই আমি ভীষণ দুর্বলতার কারণে অজ্ঞান হয়ে যাই। সে রাতে আমাকে দেখে বাসার লোকরা অস্থির হয়ে যায়। ভোর বেলাতেই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার কত দিন পর হুশ ফেরে আমি জানি না। আর যখন আমার হুশ ফেরে তখন আমার হাতের আঙুল ও নড়ানোর শক্তি নেই। কথা বলার কোন শক্তি নেই। চোখে দেখার কোন শক্তি নেই। আমি আর পারলাম না দীঘির পাড়ে যেতে আর তুলতেও পারলাম না বাঁশির সুর।’
কিবরিয়া তাকিয়ে রয়েছে ছেলেটার দিকে। এমন ঘটনা কখনো কোনো মানুষ বিশ^াস করবে না। কিন্তু সে করেছে। সে জানে কত রকম ভয়াবহ ঘটনা ঘটে এ পৃথিবীতে।
‘এই বাঁশিটাই কি সেই বাঁশি যে বাঁশিতে তুমি সুর তুলেছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘সে সুর আর কখন ও তুমি তুলেছো?’
‘না।’
‘কেন?’
‘আমি পারিনি। আর সুর তুলবার মত অবস্থাও আমার ছিল না। কিন্তু আপনি যখন আমার বাঁশির সুর শুনতে চেয়েছেন তখন আমি সুর তুলবার চেষ্টা করেছি। কারণ সে রাতের পর আপনিই প্রথম মানুষ যে আমার বাঁশির সুর শুনতে চেয়েছে।’
‘তুমি সুরটা তুলতে পেরেছো?’
‘না।’
‘তুমি কি মনে করো যে তুমি দীঘির পাড়ে গিয়ে সে সুর তুলতে পারলে তারা সত্যি আসবে?’
‘আমি জানি না। কিন্তু এটা জানি সে সুরটা আমি ভুলে গেছি।’
সকালে হেলালের বোনের বিয়ে। বাসার লোকজন সবাই অনেক রাত পর্যান্ত জেগে রয়েছে সবাই আনন্দ করছিল। কিবরিয়া মধুর বাসা থেকে এসে চুপ করে বসে থাকলো। হেলাল বলল, ‘আবার টাকা চেয়েছিল?’
‘না।’
‘তাহলে কেন ডেকেছিল?’
চুপ করে রইলো কিবরিয়া। আকাশের দিকে তাকলো সে। আকাশে তারা যেন থৈ থৈ করছে। চাঁদ উঠেছে। চাঁদটাতে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটা আলোর চক্র। জোছনাতে ভরে গেছে চার পাশ।
কিবরিয়া বলল, ‘আমায় একটা ভ্যান জোগাড় করে দিতে পারবে?’
‘ভ্যান?’
‘হ্যাঁ ভ্যান।’
‘এত রাতে ভ্যান দিয়ে কি হবে? হেলাল জানতে চাইলো।’
‘তুমি পারবে কি না বলো!’

হেলাল কিবরিয়াকে একটা ভ্যান ঠিক করে দেয়। সে ভ্যানে কিবরিয়া মধুকে তুলে দীঘির পাড়ে নিয়ে এসেছে। ভ্যান চালক দু’বার জানতে চেয়েছে, ‘এমন সময় দীঘির পাড়ে কি?’
কিবরিয়া কথার উত্তর দেয়নি।
দীঘির পাড়ে এসে কিবরিয়া দেখলো দীঘিতে একটা নৌকা বাঁধা। সে ভ্যান চালককে বলল মধুকে নৌকার ওপর উঠিয়ে দিতে। সে কিছু সময় অবাক চোখে তাকিয়ে কিছু না বলে মধুকে নৌকার ওপর তুলে দেয়। কিবরিয়া ও নৌকাতে উঠে পরে। নৌকার দড়ি খুলে দেয়। ভ্যান চালককে বলে এখান থেকে চলে যেতে। সে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায়। কিবরিয়া নৌকার দাঁড় বেয়ে দীঘির মাঝখানে চলে আসে।
‘সে সুরটা ওঠাও মধু।’
‘আমি পারবো না। মধু দুর্বল গলায় বলল।’
‘পারবে তুমি। ওঠাও সুরটা।’
‘আমার দম নেই। দম ফুরিয়ে গেছে সব আবার।’
‘চেষ্টা করো।’
‘সুরটা আমি ভুলে গেছি।’
‘মনে করার চেষ্টা কর।’
‘আমার মনে নেই। তোমার মনে আছে। একটু তুমি তোমার মনের ভেতর ঢুকে পড়ো। দেখবে সুরটা তুমি খুঁজে পাবে।’
‘মধু কাঁদছে।’
এই প্রথম মধুকে কাঁদতে দেখলো কিবরিয়া। তার মায়া লাগল খুব। সে আবার বলল, ‘মধু তুমি যা বলেছো তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে তোমার বাঁশির সুরে তারা তোমাকে খুঁজে নেবে। একটু সাহস কর মধু। বাজাও বাঁশিটা। সুরটা ওঠাও। আমি জানি তুমি পারবে। ওঠাও সুরটা।’
মধু বাশিটা তার ঠোটের সাথে রেখে ফুঁ দিলো। বাঁশিটা বেজে উঠলো। কিন্তু ওটাকে কোন সুর বলা যায় না।
‘মধু পারবে তুমি! পারবে।’
মধু আবার ফুঁ দিলো বাঁশিতে। এবার আগের থেকে জোরে বেজে উঠলো বাঁশিটা। কিবরিয়া মধুর পাশে বসে রয়েছে। তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে।
‘ধীরে ধীরে সুর উঠছে।’
কিবরিয়ার বুকের ভেতরটা কাঁপছে।
হঠাৎ সুরটা কেমন বদলে গেল! সুরটা হয়ে গেল করুণ। ভীষণ করুণ সুর। সুরটা ছাপিয়ে গেল দীঘি ছেড়ে যেন অন্য কোথাও। ‘এ কেমন সুর?’ কিবরিয়ার কাছে মনে হচ্ছে দূর থেকে কিছু মানুষ কাঁদছে। সে কাঁদার শব্দের সাথে আলাদা আরেক টি শব্দ মিশে অন্য এক সুরে রূপান্তিত হয়েছে।
মধুর যেন তাল উঠে গেছে। তার যেন আগের দম ফিরে এসেছে। সে বাঁশিটা দীর্ঘ নিঃশ^াসে বাজাতেই রয়েছে।
কিবরিয়ার মনে হলো মধুর বাঁশির সুরে বাতাসগুলো কাঁদছে। কাঁপছে দীঘির পানি। আকাশের দিকে তাকালো সে। না। এখন ও কোন নীল দুটি আলো তার চোখে পরেনি।
মধু বাঁশির সুর তুলছে। কিবরিয়া দু’হাত নেড়ে নেড়ে মধুকে সুর উঠিয়ে যেতে ইশারা করছে। সুর যেন না থামে এটা চাচ্ছে সে। মধুর বুক ভীষণ ভাবে উঠা নামা করছে। বোঝা যাচ্ছে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার।
তার বুক এমন ভাবে উঠা নামা করছে যে কিবরিয়ার কাছে মনে হচ্ছে যে কোন সময়ে মধুর বুক ফেটে ছিটকে গলগল করে রক্ত বেড়িয়ে আসবে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে কিবরিয়া রাতের আকাশে তারাদের পাশ দিয়ে দুটো আলোকে দেখতে পেল। সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো নীল আলো দুটির দিকে। সে নীল আলো দুটি ছুটে আসছে পৃথিবীতে ‘তাদের কাছে আসছে কি? ওরাই কি তারা?’
কিবরিয়া এর কেমন একটা ঘোর ঘোর ভাব এলো যেন।
নীল আলো দুটি ছিটকে এসে দীঘির পানিতে পরলো। নৌকাটির খুব কাছেই। নীল আলো দুটো পারার সময় বড়ো একটা ঢেউ উঠলো দীঘির পানিতে। সে ঢেউ এর বাড়িতে নৌকা দুলে উঠলো। কিবরিয়া নৌকার ওপর বসে ছিল। নৌকাটার দুলুনির কারণে নৌকা থেকে ছিটকে দীঘির পানিতে পরে গেল। কিন্তু মধু শুয়ে থাকলো নৌকার পাটাতনে। কিবরিয়া আর নৌকায় ওঠার চেষ্টা করলো না। সে পানিতে ভেসে মাথাটা বের করে দিয়ে দেখতে লাগল কি হয়। শাপলা ফুলের আড়ালে সে লুকিয়ে থাকলো।
দীঘির পানিটা পুরো নীল আলোয় চকচক করছে। সে দেখলো দীঘির পানির ভেতর থেকে দুটো মানুষ ভেসে উঠলো। দুটো নীল মানুষ। একটি ছেলে। আর একটি মেয়ে। তারা নৌকাটির কাছে গেল।
‘মধু বলল কে? কে?’
‘নীল ছেলেটা বলল আমরা।’
‘তোমরা? কারা তোমরা?’
‘আমার সেই নীল আলো।’
‘তোমরা এসেছো?’
‘হ্যাঁ এসেছি।’
‘তোমরা এতদিন কোথায় ছিলে?’
‘তোমার বাঁশির সুরের অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি এতদিন সুর ওঠাওনি কেন? প্রতি রাতে তোমার জন্য আমরা যন্ত্রণায় ছটফট করতাম। কারণ তোমাকে বলেছিলাম তোমার আয়ু আমরা ফিরিয়ে দেবো।’
মধু বলল, ‘আমি ভুলে গিয়েছিলাম সুরটা। কিন্তু আজ মনে করতে পেরেছি।’
‘আর আমরও এসেছি।’
‘আজ আমার আয়ু ফিরিয়ে দিবে?’
‘দিবো।’ মেয়েটি বলল। সে এগিয়ে আসলো মধুর দিকে। তারপর সে মধুর চিকন হাত নিজের হাতের ওপর রাখলো
কিবরিয়া দেখতে পেল মধু যেন থরথর করে কাঁপছে। তার শরীরে নীল আলো ছুটাছুটি করছে।
চোখ ধাঁধিয়ে গেল কিবরিয়ার। কিছু সময় পর সে আবার সব কিছু দেখতে পেল। সে দেখলো নৌকার ওপর কোনো ভয়ংকর চেহারার ছেলে বসে নেই। বসে রয়েছে সুন্দর চেহারার এক যুবক। যার শরীরের রং ফর্সা মাথা ভর্তি কুচকুচে কালো চুল। চোখ দুটি কি সুন্দর।
নীল মেয়েটা বলল, ‘তোমার ধন্যবাদ। তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ।’
মধু ও বলল, ‘তোমায় ও ধন্যবাদ। তুমি ও আমার জীবন বাঁচিয়েছো।’
আমরা তাহলে চলি।
নীল ছেলেটা বলল, ‘আবার আসবে কখনো তোমরা?’
‘আসবো।’
‘কবে?’
তা তো জানি না। তবে আবার আসবো। তুমি আমাদের দু’জনের বন্ধু। তোমার সাথে আবার আমরা দেখা করতে আসবো। এটা বলে তারা আবার দুটি নীল আলো হয়ে আকাশের দিকে ছুটে গেল।
তারা চলে যেতেই মধু কিবরিয়ার দিকে তাকালো এবং তার দিকে তাকিয়েই মধু বুঝতে পারলো ইদ্রসের কিছু একটা হয়েছে। কিবরিয়ার পা আটকে গেছে দীঘির ভেতরের বড়ো বড়ো ঘাসে। সেই পা যে পাটা তার খোড়া। কিবরিয়া সেখান থেকে আর বের হতে পারছে না। হাবুডাবুু খেতে লাগল কিবরিয়া। নাক মুখ এর ভেতর দিয়ে পানি চলে গেছে তার। কাশতে লাগল কিবরিয়া।
মধু ঝাপিয়ে পরলো দীঘির পানিতে। সাঁতরে চলে যেতে লাগল তার কাছে। এই মানুষ টিকে যেভাবেই হোক সে বাঁচাবে। বাঁচাতেই হবে তার!

Facebook Comments