দেশের বই ঈদ সাময়িকী

তৌফিক মিথুন-এর ভৌতিক গল্প ‘জালাল মুন্সী’

বৃহস্পতিবার, ২০ মে ২০২১ | ২:৩০ পূর্বাহ্ণ | 11143 বার

তৌফিক মিথুন-এর ভৌতিক গল্প ‘জালাল মুন্সী’

ভৌ তি ক  গ ল্প

জালাল মুন্সী
।। তৌফিক মিথুন ।।


 

সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে।
কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো মুষলধারে। আবহাওয়ার একেবারে বেকায়দা অবস্থা। এখন বৃষ্টি নেই, তবে আকাশ থমথম করছে কালো মেঘে। হালকা ঠান্ডা বাতাস জানিয়ে দিচ্ছে, এখানে বৃষ্টি না পড়লেও আশেপাশে কোথাও ঠিকই পড়ছে।

একে তো বৃহস্পতিবার, তার ওপর বৃষ্টির কারণে অফিসে আজ খুব একটা মানুষের ভিড় হয়নি। ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে দেখলাম, চারটা বাজে। কিন্তু আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় যে কোনো সময় সন্ধ্যা নেমে আসবে। এমন দিনে মুড়ি চানাচুর মাখা আর তেলেভাজা পেয়াজু-চপের সাথে আড্ডা জমে ভালো। আড্ডার কথা মনে হতেই, টেলিফোন সেটটা তুলে নিলাম। বন্ধু রাসেলকে ফোন করা যাক। ওর অফিস কাছেই। এমন বৃষ্টি বাদলায় অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বের হলে, কেউ কিছু মনে করে না।

কীরে কি করছিস?
কী আর করবো? বসে বসে ঝিমুচ্ছি।
আর ঝিমিয়ে কাজ নেই। চল, জালাল মুন্সীর চেম্বার থেকে ঘুরে আসি।
ওনার ওখানে কেন? হোমিওপ্যাথিতে তোর আবার বিশ্বাস জন্মালো কবে থেকে? মনে রাখিস এখন কিন্তু এলোপ্যাথির যুগ।

আমি রাসেলের খোঁচার জবাবে কিছু কড়া কথা বলতে গিয়েও বললাম না। কেননা, হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি কিংবা ভেষজ, কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থাই একদিনে দুম করে ডেভেলপ করেনি। অনেক অনেক গবেষণা, অভিজ্ঞতার ফলে একেকটা চিকিৎসা ব্যবস্থা যার যার মতো এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস করি কি না, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। তবে কাউকে ছোট করে দেখতে আমার তীব্র আপত্তি আছে।

আমি রাসেলকে সেটা বুঝতে না দিয়ে বললাম, চিকিৎসার জন্য না হলেও ওনার ওখানে দু’একটা আজব গল্প তো শোনা যাবে। আজ এই বৃষ্টি-বাদলার দিনে, ওনার চেম্বারে খুব একটা লোকজন হওয়ার কথা না।

জালাল মুন্সী বিচিত্র লোক। তার অভিজ্ঞতার ঝুলি অসামান্য। বয়স ষাটোর্ধ। তবে গায়ে-গতরে এখনো বেশ সবল। এক জীবনে বিভিন্ন রকম পেশায় কাজকর্ম করে, এই শেষ বয়সে এসে হোমিওপ্যাথির চেম্বার দিয়ে বসেছেন। খুব একটা যে রোজগার হয়, তা না। তবে বিপত্নীক একা মানুষ, কোনো রকমে চলে যায়।

রাসেলের ভৌতিক গল্পে বেশ আগ্রহ। তাই সে দশ মিনিটের মধ্যে আসছি বলে ফোন রেখে দিলো।
আমিও দ্রুত হাতের কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নিলাম। যেতে হবে জালাল মুন্সীর কাছে।

জালাল মুন্সীর চেম্বারটা ফরিদপুর রেলস্টেশনের পেছনের দিকে। চেম্বার না বলে এটাকে বাসা বলাই শ্রেয়। অন্তত রাসেলের তেমনই মত। দুই রুমের একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন তিনি। পেছনের রুমে নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আর সামনের রুমটা একটু ভদ্রস্থ করে চেম্বারের রূপ দিয়েছেন।
বাড়িটা এমন এক চিপা গলির ভেতরে, আগে থেকে জানা না থাকলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

আমি আর রাসেল থানার মোড় থেকে রিকশা নিয়ে রওনা দেয়ার সময়ই এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট নিয়ে নিলাম। আমাদের দুজনের কেউ ধুমপানে অভ্যস্ত নই। তবুও সিগারেট নিলাম। কেননা এ বস্তুর ধোঁয়া ছাড়া জালাল মুন্সীর পেট থেকে গল্প বের করে আনাটা দুষ্কর।

বার দুয়েক কড়া নাড়তেই হাসিমুখে দরজা খুলে দিলো জালাল মুন্সী।
ঘরে ঢুকেই রাসেল জিজ্ঞেস করলো, ঘটনা কি মুন্সী সাহেব? বেশ তেলেভাজার গন্ধ পাচ্ছি।
মৃদু হেসে জালাল মুন্সী বলল, স্টেশনের ছাপড়া হোটেল থেকে আনিয়েছি। একটু মুড়ি মাখা করবো বলে। তাছাড়া মন বলছিল, তোমরা আসবে। মুড়ি মাখা ছাড়া বৃষ্টির সন্ধ্যা জমে?

জালাল মুন্সীর আধ্যাত্মিক টুকিটাকি শক্তির কথা আমরা শুনেছি। সেই সব দিয়ে তিনি প্রায়শই আমাদের চমকে দিতে চেষ্টা করেন। যদিও রাসেল প্রতিবারই এসবকে ‘নিতান্ত কাকতালীয়’ বলেই ঘোষণা দিয়েছে। যাই হোক, রাসেল কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় হোটেলের ছেলে এসে তিন কাপ চা রেখে গেল।

তাহলে কি সত্যিই জালাল মুন্সী বুঝতে পেরেছিল, আমরা আসবো?
আমি একবার কাপের দিকে আর একবার রাসেলের দিকে তাকালাম। রাসেল ব্যাপারটা সজ্ঞানে এড়িয়ে গেল। জালাল মুন্সীর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার ব্যাপারটা মানতে সে নারাজ।

মুড়ি মাখানো চিবুতে চিবুতে হাতের বেনসনের প্যাকেটটা এগিয়ে দিলাম জালাল মুন্সীর দিকে। তিনি বেনসনের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে একটু মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কি ঘুষ দিচ্ছো নাকি?

আমি দাঁত দিয়ে জিভ কাটার মতো একটু ভাব করে বললাম, কী যে বলেন মুন্সী সাহেব। ঘুষ হবে কেন? উপঢৌকন কিংবা গুরুদক্ষিণা বলতে পারেন। আপনার কাছে এলে কত সুন্দর সুন্দর গল্প শুনি। এ জিনিসের কি মূল্য হয়?
আমার উত্তরে মুন্সী সাহেব বেশ খুশিই হলেন বুঝতে পারলাম। তার মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।

তিনি সিগারেটের প্যাকেট খুলতে খুলতে বললেন, তোমরা যাকে গল্প বলছো, এসবই আমার অভিজ্ঞতা। আরেকটু আলাদা করে বললে, ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা।

রাসেল কথার মাঝে বলে উঠল, তা অভিজ্ঞতাই হোক আর গল্পই হোক শুনতে কিন্তু মন্দ লাগে না।

রাসেলের কথায় মুন্সী সাহেব ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন। স্পষ্টতই বিরক্ত হয়েছেন।
যে সব ঘটনা বিশ্বাস করো না, সে সব শুনতে চাও কেন?

রাসেল কিছু বলে উঠার আগেই, ওকে থামিয়ে আমি বললাম, আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কী যায় আসে বলুন। আমাদের কথায় তো আর আপনার অভিজ্ঞতা মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে না। আপনি আপনার গল্প, ইয়ে মানে ঘটনা বলা শুরু করুন। বর্ষার সন্ধ্যায় শোনা যাক বৃষ্টিমাখা কোনো ঘটনা।

জালাল মুন্সী আমার দিকে বেশ উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকালেন। বুঝে নিতে চাইলেন, ইয়ার্কি মারছি কি না। যখন বুঝলেন ইয়ার্কি না, তখন খুললেন তার গল্পের ডালি।

তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। পড়ালেখার চাপ খুব একটা নেই। ক্লাশ শুরু হয়েছে। ঐ সময়ে কলেজে ভর্তি ব্যাপারটা এখনকার মতো ডাল-ভাত রকমের ছিল না। অনেক কষ্ট করেই স্কুল পাশ করতে হতো। আর এখনকার মতো গলি-ঘুপচির মধ্যে ছোট ছোট কলেজ ছিল না। হাতে গোণা যে কটা কলেজ ছিল, সব ছিল শহরে।

তোমরা তো জানোই, আমি গ্রামের সন্তান। বিলমামুদপুর ছিল আমার আদি পূর্বপুরুষদের বসবাস। কলেজে ভর্তি হতে আসতে হলো ফরিদপুর। উদ্দেশ্য ছিল রাজেন্দ্র কলেজে কোনোমতে ভর্তি হওয়া। আমার পক্ষে ঢাকায় গিয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব ছিল না।

ছাত্র খুব একটা খারাপ ছিলাম না। তাছাড়া তখনকার দিনে এতটা প্রতিযোগিতাও ছিল না। তাই রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।
ভর্তি হলাম বটে, কিন্তু ছোট্ট আবাসিক হলে সিট পেলাম না। তাই কাছাকাছি একটা বাড়ি ভাড়া নিলাম। সঙ্গত কারণেই জায়গার নামটা বলছি না।

বাড়িটা সুন্দর। বাড়ির মালিক পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। এখানে আছেন শুধু একজন কেয়ারটেকার। মালিক বছরে এক-দু’বার আসেন। আসলে বাপ-দাদার ভিটে, তাই হয়তো বিক্রি করতে মন টানেনি।

বাড়িতে উঠে ভাবলাম, শুধু শুধু ঘরে বসে থেকে কী হবে? যাই একটু গ্রাম থেকে ঢুঁ মেরে আসি।

রাসেল কিছু বলতে যাবে, তাকে থামিয়ে দিয়ে জালাল মুন্সী বললেন, ঐ সময় রাজেন্দ্র কলেজের আশেপাশের জায়গাগুলো এতটা উন্নত ছিল না। তাই গ্রাম বললেও, কেউ কিছু মনে করতো না।
এ কথা বলে, সিগারেটে একটা লম্বা টান দিলেন জালাল মুন্সী।

আসলে শুধু ঢুঁ মারার ইচ্ছেতেই গ্রামে গিয়েছি, এমন না। মানুষজনের সাথে চেনাজানা থাকলে মন্দ কি? তাই এলাকার মানুষজনদের সাথে পরিচয় পর্বের সূচনা করছিলাম।

ঐ সময় আমার অল্পস্বল্প লেখালেখির অভ্যাস ছিল। তাই ভাবলাম নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া গেছে। কয়েকটা লেখা শেষ করা যাবে। বিভিন্ন ম‍্যাগাজিন,পত্র-পত্রিকায় লেখার সুবাদে লেখক হিসেবে ততদিনে আমার একটু-আধটু পরিচিতি হয়েছে। সাহিত্য পাতার সম্পাদকরা সবাই নতুন লেখা চায়। নতুন লেখা তো আর চা-নাস্তা বানানোর মতো কাজ না, যে চুলায় বসালাম আর হয়ে গেল। এসব ঠান্ডা মাথার কাজ।

এটুকু বলে আমার আর রাসেলের দিকে আড়চোখে তাকালেন, জালাল মুন্সী।
শোনো, লেগে থাকলে তোমরা হয়তো শরৎচন্দ্র কিংবা বঙ্কিম না পড়ে জালাল মুন্সীর লেখা পড়তে। তাছাড়া ঐ সময় কিছু পত্রিকা এমনও ছিল, ভালো লেখা পেলে অল্পবিস্তর টাকা-পয়সাও মানিঅর্ডার করতো। এতে হাত-খরচের টাকাটা উঠে আসতো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেসব লেখা আছে কিছু?
নাহ্। পত্রিকা, ম্যাগাজিনের লেখা, সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে ফেলেছি সব।
যাই হোক, তোমাদের আগেই বলেছি, ঐ বাড়িতে আমি আর একজন বৃদ্ধ কেয়ারটেকার ছাড়া আর কেউ থাকে না। ঐ বৃদ্ধ কেয়ারটেকার সর্বনাশা পদ্মার ভাঙ্গনে বাড়িঘর হারিয়ে, এখানে থিতু হয়েছেন। যাই হোক, অল্পদিনেই বুঝলাম চাচা বেশ আন্তরিক। তিনিই আমার খাওয়া-দাওয়াসহ সব কিছুর আয়োজন করেন। সমস্যা হয় না। এই বাড়িতে দীর্ঘদিন একাকী নিঃসঙ্গ থাকতে থাকতে তিনিও হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। আর যাই হোক, কোনো বাড়িতে দীর্ঘদিন একা থাকাটা যন্ত্রণাদায়ক। তাই একজন সঙ্গী পেয়ে, আমার যত্নের কোনো কমতি রাখলেন না।

ওখানে এসেছি দিন চারেক হলো। এখনও তেমনভাবে লেখা শুরু করে উঠতে পারিনি। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে নিতেই সময়টা কীভাবে যেন কেটে যাচ্ছে।

তোমাদের তো বলিনি, সময়টা ছিল বর্ষাকাল। হুটহাট বৃষ্টি এসে হানা দেয়। এই বৃষ্টির হুমকি মাথায় নিয়ে সকালবেলা গ্ৰামের রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা গল্পের প্লটগুলো একটু একটু করে গুছিয়ে নেই। মনে মনেই কাটাকুটি করি, আবার গোছাই। কলেজের লাইব্রেরি থেকে কয়েকটা রেফারেন্স বই নিয়ে এসেছিলাম। রাত্রে সেগুলো পড়ছি। লিখতে গিয়ে যেন ভুলভাল তথ্য না দেই, এই ব্যাপারে আমি সজাগ থাকার চেষ্টা করি। এজন্যই রেফারেন্স বইগুলো বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হচ্ছে।

সেদিন সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি পড়ছিল। মুষলধারে বৃষ্টি। বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই। পথঘাট ভিজে কাদামাটিতে মাখামাখি। এমন পিচ্ছিল পথে একবার পিছলে পড়লে, কোমর ভাঙ্গার সম্ভাবনা প্রচুর। এই বৃষ্টির জন‍্যই ঘরে বসে আছি। সারাদিন আকাশ মেঘলা থাকার কারণে অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু আগেভাগেই অন্ধকার নেমে এলো।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। হাতে চায়ের কাপ। গরম ধোঁয়া উঠছে।
মাথার মধ্যে একটা গল্পের প্লট গুছিয়ে এনেছি। চা শেষ করেই লিখতে বসবো।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছি, এখানকার বৃষ্টির দিনটা সত‍্যিই সুন্দর। একেক জায়গার বৃষ্টির একেক রকমের সৌন্দর্য। টিনের চালে বৃষ্টির এক নাগারে টুপুরটুপুর শব্দ, যেমন অদ্ভুত মায়ার জন্ম দেয়। তেমনি জানালা দিয়ে হাত বের করে বৃষ্টির স্পর্শ নেয়া কিশোরী মেয়ের অনুভূতিও, কম মায়ার জন্ম দেয় না।

রাত তখন দশটা বাজে।
চাচা রাতের খাবার টেবিলে দিয়েছেন। সন্ধ্যা থেকে টানা লিখছি। হাত ব্যথা করছে। আমি লেখায় কিছুটা বিরতি দিয়ে খেতে গেলাম।
চাচা তাঁর রুমে চলে গেছেন। গ্রামের মানুষ। রাত নয়টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার সেই ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। আমিই বলেছি, আমার জন্য জেগে থাকার দরকার নেই। ফ্লাক্সে গরম পানি ভর্তি করে নিতে পারলেই, বাকি রাত নিশ্চিন্ত। চা আমি নিজেই বানিয়ে নিতে পারবো।

যাই হোক, রাতের খাবার খেয়ে এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছি।
আশেপাশের বাড়িঘরের বাতিগুলোও জ্বলছে না। সামনের উঠোন থেকে ব‍্যাঙের ডাক আসছে। পুকুরের ব্যাঙগুলো সব মনে হয় আনন্দে মাটিতে উঠে এসেছে। মনে হচ্ছে অনেকগুলো ব‍্যাঙ একসাথে মিছিলের শ্লোগান দিচ্ছে।

বারান্দা থেকে উত্তর-পূর্বদিকে তাকালে বড় পুকুরটা চোখে পড়ে। ঐ পুকুরের পাড়ে একটা বাঁশের ঝাড় আছে। বাড়িতে ওঠার সময়ই কেয়ারটেকার চাচা স্পষ্টভাবে মানা করে দিয়েছেন যেন কোনোভাবেই ঐ বাঁশঝাড়ের দিকে না যাই।
না দিনে, না রাতে। কখনোই না।

বাঁশঝাড়ের দিকে এমনিই তাকিয়েছি। মাথার মধ্যে তখনও গল্পটা ঘুরছে।
হঠাৎ দেখি সেই ঝোপঝাড়ের মধ‍্যে আগুন জ্বলছে। এত রাতে বাঁশঝাড়ে আগুন নিয়ে যাবে কে? ঐখানে কী এমন গুপ্তধন আছে, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাতের বেলা যেতে হবে?

কৌতুহলী হয়ে একটু ভালোভাবে লক্ষ‍্য করে দেখলাম, আগুন যে একজায়গায় জ্বলছে এমন নয়। যেন অনেকগুলো ছোট ছোট আগুনের গোলা একসাথে মালার মতো মিলেমিশে জ্বলছে।

অদ্ভূত! ওখানে আগুন এলো কোথা থেকে?
তার ওপর এই বৃষ্টির মধ‍্যে আগুনটা স্থির হয়ে জ্বলছেই বা কীভাবে? পানির ফোটায় তো নিভে যাওয়ার কথা। বিজ্ঞান তো তাই বলে।

ব‍্যাপারটা আমল না দিয়ে ঘরে চলে এলাম। শুনেছিলাম গ্রামের দুষ্ট কিশোরেরা রাতের বেলায় মাছ চুরি করে খায়। পিকনিক করে। তাই হয়তো চুরি ঠেকাতে বৃষ্টির মধ্যে কেউ মাছ পাহারা দিতে গেছে। ওসবে আমার দৃষ্টি না দিলেও চলবে।

লেখাটা যখন শেষ হলো, রাত তখন গভীর। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি দুইটা চল্লিশ।
টানা লেখালেখি করায় মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। আঙুলগুলোতেও ব্যথা অনুভব করছি। জড়তা কাটাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।

তখনো একটানা বৃষ্টি পড়ছে। তবে বৃষ্টির গতিটা কিছুটা মন্থর। বারান্দায় পায়চারি করছি। হঠাৎ সেই আলোর কথা মনে পড়তেই পুকুরের দিকে তাকালাম। অবাক ব্যাপার। সেই আগুনের গোলাগুলো এখনো আছে। তবে এবার একজায়গায় স্থির নেই, ছোটাছুটি করছে।

এভাবে সময় গেছে অনেকক্ষণ। হঠাৎই আমার পায়ের সাথে লেগে, বারান্দার কোণায় রাখা পা ধোয়ার বালতিতে ঠুশ করে একটা শব্দ হলো।

আমার অস্তিত্ব বুঝতে পেরেই কি না জানি না, হঠাৎ আগুনের গোলাগুলোর ছোটাছুটি একসাথে বন্ধ হয়ে গেল। সবগুলো আবার সেই আগের মতোই এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা চোখ। তাকিয়ে আছে আমার দিকেই। আর আমিও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ঐদিকেই।

ঘরে ফেরার তাগিদ অনুভব করতেই বুঝতে পারলাম, আমি ঐদিক থেকে চোখ সরাতে পারছি না। কেউ যেন আমাকে সম্মোহন করছে। টানছে ঐ আগুনের দিকে।

কতক্ষণ ঐ আগুনের দিকে তাকিয়েছিলাম জানি না। এক সময় লক্ষ্য করলাম, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছি। নিজে থেকেই এগিয়ে যাচ্ছি ঐ আগুনের দিকে। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছি কিন্তু সেদিকে আমার কোনো খেয়াল নেই। এক পা দু’পা করে এগিয়ে যেতে থাকলাম বাঁশঝাড়ের দিকে। নিজের ওপর আমার নিজেরই কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। পা ভর্তি কাদা। বৃষ্টিতে ভিজে হয়েছি চুবচুবে। আমি যতই আগুনের গোলার কাছাকাছি যাই, সেই গোলাটা একটু-একটু পুকুরের মাঝে যেতে লাগল। আমিও আগুনের গোলার পেছন পেছন এগুতে লাগলাম পুকুরের দিকে।

আমার পায়ে পুকুরের পানির স্পর্শ পেতেই যেন আমার বোধ ফিরে এলো।
একি! আমি এখানে কেন?

বিপদ বুঝতে খুব একটা সময় লাগল না। দ্রুত পানি থেকে উঠতে যাচ্ছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই পানির নীচ থেকে দুটো লোমশ হাত উঠে এলো। খচ করে আমার পা’দুটো ধরে দিলো এক হ্যাচকা টান। পা ভর্তি পিচ্ছিল কাদার কারণে প্রথম চেষ্টায় ধরে সুবিধা করতে পারলো না। তবে হ্যাচকা টানে আমি পুকুরের পাড়ে পড়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম হাত দুটো আমাকে নিয়ে যেতে চাইছে পানির গভীরে। ভয়-আতংকে, একটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো আমার মুখ দিয়ে। এরপর কোনোমতে পুকুরের পাড়ে উঠে আসি। কিন্তু তাড়াহুড়োয় উঠতে গিয়ে পুকুরের পাড়েই পিছলে পড়ে জ্ঞান হারাই। এরপর আর কিছু মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরলো দেখি বিছানায় শুয়ে আছি। ঘড়ির কাঁটা বলছে সময় রাত চারটা।
বাড়ির কেয়ারটেকার চাচা মাথার কাছে বসে আছে। চারপাশে আরও কয়েকজন লোক। ওদের মুখেই শুনলাম, আমার বিকট চিৎকার শুনে আশেপাশের এরাই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে পুকুরের পাড়ে।

আমার কাছে ঘটনা শুনে সবাই একটাই কথা বললেন, আমি ওই আলো দেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খুব ভুল করেছিলাম। এটা আলো নয়, আলেয়া। অনেক বড় বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেছি। কেননা আলেয়া যাকে টানে, তাকে ফিরিয়ে দেয় না।

কথা শেষ করে জালাল মুন্সী আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি বিশ্বাস হচ্ছে না তো? এখনো কি গল্প মনে হচ্ছে?

আমরা কিছু বলার আগেই জালাল মুন্সী তার পাজামার পায়ের দিকটা একটু টেনে উপরে তুলে বললেন, দ্যাখো।

আমরা দুজনই দেখলাম, দু’হাতে অনেকক্ষণ পা চেপে ধরলে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেমন কালসিটে দাগ হয়ে যায়। ঠিক তেমনই একটা দাগ দেখা যাচ্ছে জালাল মুন্সীর পায়ে। পাঁচটি আঙুলের অস্তিত্ব এখনও স্পষ্ট। তার অভিজ্ঞতাকে প্রমাণের জন্য যেন কালের আবর্তনেও মুছে যায়নি দাগটা।

Facebook Comments Box